ওলামায়ে কেরামের সঙ্গে সম্পর্ক রাখার ক্ষেত্রে আদব বজায় রাখা

জিজ্ঞাসা–৭০৬: জনাব, আসসালামু আলাইকুম। আমি কয়েকজন হুজুরের সাথে আলোচনা/পরামর্শ করে চলি। হাদিয়া তোহফাও দেই। কিন্তু সমস্যা হলো-(১) একজন হুজুর, আমি কল না করলে কোনদিন সে আমাকে ফোন করে না। দ্বীনি ভাই, তাছাড়া হাদিয়াও তো দেই। এজন্য এই হুজুরের সাথে সম্পর্ক রাখেতে আমার মনে টানে না, অনেক কষ্ট লাগে। (২) আর একজন হুজুর, অনেক হাদিয়া দেই। আমি জানেতে চাইলে উনি আমাকে ভলোভাবে উত্তর দেন, কিন্তু কোনদিন এই হুজুর নিজ থেকে আমাকে দ্বীনের ব্যাপারে খোজখবর নেন না, বা উনার নিজের ইচ্ছায় আমাকে দ্বীনের ব্যাপারে উপকার করেন না। অথচ একই এলাকায় থাকি, কথা হয় ও দেখাও হয়। তাই এই হুজুরের প্রতিও আমার এইজন্য অনেক কষ্ট হয়। বর্নিত দুই জন হুজুরই দেওবন্দী আলেম। আর একজন হুজুর আছেন, উনার ব্যপারে অসুবিধা নাই। তবে আমি চাই মিনিমাম তিনজন হুজুরের সাথে সম্পর্ক রেখে চলবো। বর্ণিত ব্যাপারে আমাকে একটু উপদেশ দিলে উপকৃত হবো।–মামুন হোসেন।

জবাব: وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

প্রিয় ভাই, যারা প্রকৃত আলেম তাঁদের মর্যাদা আল্লাহর দরবারে অতি উচ্চে। সাধারণ মানুষের মাঝে আলেমরা হলেন নক্ষত্ররাজিতুল্য। যাদেরকে অনুসরণ করার মাধ্যমে মানুষ সঠিক পথের সন্ধ্যান লাভ করে থাকে। তবে আলেম-ওলামা থেকে উপকৃত হওয়ার ক্ষেত্রে বেশ কিছু আদব রয়েছে; একজন মুসলিমের সে আদবগুলোতে সুশোভিত হওয়া উচিত। ওই আদবগুলো জানা না থাকার কারণেই আপনার মাঝে তাঁদের ব্যাপারে কিছু সশ্রদ্ধ-ক্ষোভ দানা বেঁধেছে। আমরা আপনার সমীপে সংক্ষেপে কিছু আদব ও উপদেশ পেশ করছি; আশা করি আল্লাহ্‌ সেগুলোর মাধ্যমে আপনাকে এবং সকল পাঠককে উপকৃত করবেন:

এক. তাঁদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন ও সাক্ষাতের পূর্বে নিয়ত সহিহ করে নেয়া; যাতে এর মাধ্যমে আখেরাতে সাওয়াব পাওয়া যায়। এক্ষেত্রে উত্তম হল, তাঁদের থেকে ইলম অর্জন, দীনের সহিহ সমঝ আহরণ, চিন্তা বিশুদ্ধকরণ, অন্তর পরিশুদ্ধকরণ, জটিল বিষয়ের সমাধান গ্রহণ ও জীবনঘনিষ্ঠ জিজ্ঞাসাসমুহের সঠিক নির্দেশনা অর্জনের নিয়ত করা। মূলত এই সবের সমষ্টিকেই পরিভাষায় ‘আল্লাহর জন্য ভালোবাসা’ বলা হয়। আবু হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ বলেছেন,

أَنَّ رَجُلًا زَارَ أَخًا لَهُ فِي قَرْيَةٍ أُخْرَى ، فَأَرْصَدَ اللَّهُ لَهُ عَلَى مَدْرَجَتِهِ – أي : طريقه – مَلَكًا ، فَلَمَّا أَتَى عَلَيْهِ قَالَ : أَيْنَ تُرِيدُ ؟ قَالَ : أُرِيدُ أَخًا لِي فِي هَذِهِ الْقَرْيَةِ . قَالَ : هَلْ لَكَ عَلَيْهِ مِنْ نِعْمَةٍ تَرُبُّهَا؟ قَالَ : لَا ، غَيْرَ أَنِّي أَحْبَبْتُهُ فِي اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ . قَالَ : فَإِنِّي رَسُولُ اللَّهِ إِلَيْكَ بِأَنَّ اللَّهَ قَدْ أَحَبَّكَ كَمَا أَحْبَبْتَهُ فِيهِ  .

এক ব্যক্তি তার এক ভাইয়ের সাথে সাক্ষাত করার জন্য তার গ্রামে গেলো। আল্লাহ তার পথে একজন ফেরেশতাকে মোতায়েন করেন। ফেরেশতা তাকে জিজ্ঞেস করেন, আপনি কোথায় যেতে চান? সে বললো, এই গ্রামে আমার এক ভাইয়ের সাথে দেখা করতে। ফেরেশতা বলেন, আপনার উপর কি তার কোন অনুগ্রহ আছে, যার কারণে আপনি যাচ্ছেন? সে বললো, না, আমি তাকে আল্লাহর জন্য ভালোবাসি। ফেরেশতা বলেন, আমি আল্লাহর দূতরূপে আপনার নিকট এসেছি। আপনি যেমন ঐ ব্যক্তিকে ভালোবাসেন, আল্লাহও তদ্রুপ আপনাকে ভালোবাসেন। (মুসলিম ২৫৬৭)

দুই. কাঙ্খিত আলেমের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে হলে উপযুক্ত সময় দেখে যাওয়া। এজন্য ভালো হয়, তাঁর থেকে আগে সময় নেয়া তারপর সাক্ষাৎ করতে যাওয়া। কেননা ওলামায়ে কেরামের সময়গুলো দীনের কাজের জন্য বরাদ্দ থাকে। সুতরাং আপনার হঠাৎ-সাক্ষাৎ যেন তাঁর দীনের কাজের ক্ষেত্রে অসুবিধা সৃষ্টি না করে। 

তিন. তাঁর কাছে গেলে তিনি যেন আপনার সম্মান, মর্যাদা ও কোমল আচরণের পাত্র হন। আপনি তাঁর সাথে বসার ক্ষেত্রে, কথা বলার ক্ষেত্রে, প্রশ্ন করার ক্ষেত্রে, শ্রবণ করার ক্ষেত্রে, তাঁর সামনে উচ্চবাচ্য পরিত্যাগ করার ক্ষেত্রে–যাবতীয় আদব রক্ষা করে চলবেন। কোনো কথা বা হাঁটার মাধ্যমে তাঁর অগ্রবর্তী হবেন না। তাঁর সামনে অধিক কথা বলবেন না। কোনো জবাব দেয়ার জন্য চাপাচাপি করবেন না। তাঁকে সম্বোধন করার ক্ষেত্রে সম্মানসূচক শব্দ ব্যবহার করবেন। যেমন, শায়েখ, হযরত, হুজুর কিংবা এজাতীয় শব্দ। হাদিস শরিফে এসেছে, উবাদা ইবন সামিত রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ বলেছেন,

لَيْسَ مِنْ أُمَّتِي مَنْ لَمْ يُجِلَّ كَبِيرَنَا وَيَرْحَمْ صَغِيرَنَا وَيَعْرِفْ لِعَالِمِنَا حَقَّهُ

সে আমার উম্মতভুক্ত নয় যে আমাদের বড়দের সম্মান করে না এবং আমাদের ছোটকে স্নেহ করে না এবং আমাদের আলেমের হক জানে না। (মাজমাউয যাওয়াইদ ৮/১৪)

নিশ্চয় আল্লাহ তাওফিকদাতা।

والله اعلم بالصواب
উত্তর দিয়েছেন
মাওলানা উমায়ের কোব্বাদী
আরো পড়ুন–

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

five + one =