গিয়ারবি শরিফ বা এগার শরিফ পালন

জিজ্ঞাসা–৭৩৫: আসসালামু আ’লাইকুম ওয়া রহমতুল্লাহি ওয়া বারকাতুহ। মুহতারম, আশা করি ভাল আছেন, আমাদের এলাকার মসজিদে বেশ কয়েক বছর আগে একজন ইমাম “এগার শরিফ” নামে একটা অনুষ্ঠানের প্রচলন করেন । তারপর থেকে অদ্যবদি সে অনুষ্ঠান প্রতি চন্দ্র মাসের ১০ম তারিখ দিবাগত রাতে এশার পর পালিত হয়  ও কয়েক ডেক খিচুরী রান্না করে খাওয়ানো হয় । ইতিমধ্যে দুজন ইমাম পরিবর্তন হলেও এ অনু্ষ্ঠানটি অব্য়াহত ভাবে চলছে । উল্লেখ্য় এ অনুষ্ঠানের জন্য় এলাকার ঘর ঘরে গিয়ে চাঁদা তোলা হয় । যারা চাঁদা দেন তাদের ঘরে খিচুরীর বক্স পাঠিয়ে দেয়া হয় । যেসব যুবকরা এ অনুষ্ঠান আয়োজন করে তারা নামাজ পড়ে না। এমনকি সেসময় মসজিদেই বসে খিচুরী বন্টনে ব্যস্ত থাকে অথচ জামাত চললেও কেউ যামাতে সামিল হয় না । অর্থাৎ তারা নামাজের চেয়ে খিচুরী বন্টনকে বেশি সওয়াবের মনে করে ।প্রশ্ন হল এ অনুষ্ঠানের সূচনা হল কিভাবে এবং এটি পালন করা কি ঠিক ?–মোঃ হাবিবউল্লাহ।

জবাব: وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

অনেকে রবিউস সানীর এগার তারিখে ফাতেহা ইয়াজদহম (এগার তারিখের ফাতেহা) বা শায়খ আবদুল কাদের জীলানী রহ.-এর মৃত্যুদিবস পালন করে থাকে। এটিকে ‘গিয়ারবি শরিফ’ বা ‘এগার শরিফ’ও বলা হয়।  এ উপলক্ষে মসজিদে আলোকসজ্জা করা হয় এবং মাহফিল-মজলিসের আয়োজন করা হয়।

মূলত এটা একটা কু-রসম। ইসলামী শরীয়তে জন্মদিবস ও মৃত্যুদিবস পালনের নিয়ম নেই। নবী-রাসূল, খোলাফায়ে রাশেদীন ও   সাহাবায়ে কেরাম আমাদের জন্য আদর্শ। তাঁদের কারোরই জন্মদিবস-মৃত্যুদিবস পালন করার কথা শরীয়তে নেই। তাঁদের জন্ম বা মৃত্যুদিবস পালন করতে হলে তো বছরের প্রতিদিনই পালন করতে হবে। অথচ নবী-রাসূল ও সাহাবায়ে কেরাম তো সকল ওলি-বুযুর্গেরও আদর্শ। আর এজন্যই বুযুর্গানে দ্বীন নিজেদের জন্মদিবস পালন করেন নি বা অনুসারীদেরকে জন্মদিবস ও মৃত্যুদিবস পালনের আদেশ করেননি। পরবর্তী যুগের লোকেরা তা উদ্ভাবন করেছে।

মজার বিষয় হল, যে তারিখে ‘ফাতেহায়ে ইয়াজদাহম’পালন করা হয় অর্থাৎ এগার রবিউস সানী তা ঐতিহাসিকভাবে শায়খ আবদুল কাদের জীলানী রহ.-এর মৃত্যুদিবস হিসেবে প্রমাণিতও নয়। কারণ তাঁর মৃত্যুর তারিখ নিয়ে ইতিহাসবিদদের মাঝে মতভেদ রয়েছে।

তাঁর জীবনীগ্রন্থ তাফরীহুল খাতির ফী মানাকিবিশ শায়খ আবদুল কাদির-এ  এ সম্পর্কে কয়েকটি মত উল্লেখ করা হয়েছে : রবিউস সানীর নয় তারিখ, দশ তারিখ, সতের তারিখ, আঠার তারিখ, তের তারিখ, সাত তারিখ ও এগার তারিখ। আবার কারো কারো মতে রবিউল আউয়ালের দশ তারিখ। এই আটটি মত উল্লেখ করার পর গ্রন্থকার দশই রবিউস সানীকে প্রাধান্য দিয়েছেন। (ফাতাওয়া রহীমিয়া ২/৭৬-৭৭)

বিখ্যাত ইতিহাসবিদ আল্লামা হাফেয যাহাবী রাহ. (৭৪৮ হি.) বলেন,

توفي في عاشر ربيع الآخر سنة إحدى وستين، وله تسعون سنة

তিনি নববই বছর বয়সে ৫৬১ হিজরীর রবিউস সানীর দশ তারিখে ইন্তেকাল করেন। (তারীখুল ইসলাম ২৯/৬০)

তাছাড়া মৃত্যুর তারিখ নিয়ে মতবিরোধ না থাকলেও ‘মৃত্যুদিবস’ পালন করা শরীয়ত কর্তৃক অনুমোদিত নয়; বরং বছরের যেকোনো দিন নেককার বুযুর্গদের জীবনী আলোচনা করা যায় এবং তাঁদের জন্য ঈসালে ছওয়াব করা যায়। তা না করে নির্দিষ্ট একটি দিনে জায়েয-নাজায়েয বিভিন্ন রকমের কাজকর্মের মাধ্যমে দিবস উৎযাপন করা রসম ও বেদআত ছাড়া আর কিছু নয়।

এই ধরনের বেদআত ও রসম পালনের মাধ্যমে খোদ শায়খ আবদুল কাদের জীলানী রহ.-এর মতো বুযুর্গ-ওলিদের অবমাননাই করা হয়। আর আল্লাহ তাআলার অসন্তুষ্টিসহ বেদআতের অন্যান্য শাস্তি তো রয়েছেই। বেদআত সম্পর্কে নবী স্পষ্টভাবে বলেছেন, مَنْ أَحْدَثَ فِيْ أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ مِنْهُ فَهُوَ رَدٌّ যে ব্যক্তি এমন কোন আমল করে আমাদের দ্বীনে যার অনুমোদন নেই সেটা প্রত্যাখ্যাত। (মুসলিম)

والله اعلم بالصواب
উত্তর দিয়েছেন
মাওলানা উমায়ের কোব্বাদী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

12 + twenty =