ছেলে-মেয়ে রাজি, কিন্তু মেয়ের অভিভাবক রাজি নয়; তাহলে গোপন-বিয়ের অনুমতি আছে কি?

জিজ্ঞাসা–৫৬৬: এস এস সি পরীক্ষায় পাশাপাশি সিট পরার সুবাদে একটা মেয়ের সাথে আমার পরিচয় হয়। আস্তে আস্তে প্রেমের সম্পর্কে রুপ নেয়। এইচ এস সি তে আমি ঢাকায় এবং মেয়ে গ্রামে ভর্তি হওয়ার কারণে তেমন যোগাযোগ হত না। শুধু বাসায় গেলেই ফোনে কথা হত আর মাঝে মধ্যে দেখা হত। এর মধ্যে আমি দ্বীনের বুঝ পাই। ইসলাম ধর্ম মনে প্রানে মানার চেষ্টা করি। আস্তে আস্তে সুন্নতের উপর উঠার চেষ্টা করি। প্রেম করা যে গুনাহ এর কাজ আস্তে আস্তে আমার কাছে পরিষ্কার হয়। আমি সম্পর্ক ছিন্ন করার চেষ্টা করতাম কিন্তু পারতাম না। কিন্তু আমার খুব পাপ বোধ কাজ করত। আমি মানসিকভাবে খুব ভেঙ্গে পড়লাম। গুনাহ থেকে বাঁচার জন্য এইচ এস সি এর দ্বিতীয় বর্ষে দুইজনকে সাক্ষী রেখে মোবাইলে বিবাহ করি। তার পর মোটামুটিভাবে টেনশন মুক্ত ছিলাম। এক সাথে নির্জনে সময় কাটিয়েছি, শরীর স্পর্শ করছি-হালাল ভেবে। সহবাস হয় নাই। পরে একজন মুফতি হুযুরের নিকট আমাদের বিয়ের ব্যাপারে জানতে চাইলে উনি বলেন, তোমাদের বিয়ে হয় নাই। তবে তোমাদের বিয়ে করে নেওয়া জরুরি। এরপর ভার্সিটির ভর্তি পরীক্ষার ঝামেলার কারণে বিয়ে করা হয় নাই। ২ বছর হল ওই মেয়ের সাথে দেখা করি না। এখন আমি একটা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বি এস সি ইঞ্জিয়ারিং এ প্রথম বর্ষে পড়াশোনা করছি। ওই মেয়ে বেসরকারী মেডিকেল কলেজে এম বি বি এস করছে। আমরা দুইজনই পরিবারে আমাদের বিবাহ দেওয়ার জন্য বলছি। আমার বাবার মত থাকলেও মেয়ের বাবার এখন আমার সাথে বিবাহ দেওয়ার মত নাই। তাই আমরা মোবাইলে কথা না বলার সিদ্ধান্ত নেই। কিন্তু কথা না বলে থাকতে পারি না। এখন আমাদের কি করা উচিৎ? গোপনে বিয়ে করে নেওয়া উচিৎ? না অন্য কোন উপায় আছে? মেয়েও দ্বীনের উপর চলার চেষ্টা করে এবং আমাকে বিয়ে করতে রাজি আছে।–নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক।

জবাব:

এক. বর্তমানের যুবক-যুবতীদের অন্যতম ভুল হল, অবৈধ সম্পর্কের ব্যাপারে দীনদারি উপেক্ষা করা এবং এই সম্পর্ক অব্যাহত রাখার চেষ্টা করা। অথচ এই সম্পর্কের পরিণতি কতটা জঘন্য ও বিশ্রী হয়; তা বলার অপেক্ষা রাখে না। যার আলোচনা আমরা ইতিপূর্বে জিজ্ঞাসা নং–৩৮৮ জিজ্ঞাসা নং–২২৮ -এ করেছি।

আর আপনাদের উক্ত নাজুক পরিস্থিতির পেছনেও কারণ একটাই- তাহল, আল্লাহ তাআলা যা হারাম করেছেন তা থেকে দূরে না থাকা।

দুই. আপনারা উক্ত অবৈধ সম্পর্ককে বজায় রাখার জন্য মোবাইলে বিয়ে করেছেন; যা একজন মুফতির ফতওয়া মতে বিবাহ হয় নি। মুফতি সাহেব যা বলেছেন, নিশ্চয় সেটা ঠিক বলেছেন। আল-লাজনাতুদ্দায়িমাহ লিল-ইফতা, সৌদি আরব-এর ফতোয়াও এটাই যে, টেলিফোন বা মোবাইলে বিবাহ বৈধ হবে না। যেমন, সেখানে বলা হয়েছে,

نظرا إلى عناية الشريعة الإسلامية بحفظ الفروج والأعراض ، والاحتياط لذلك أكثر من الاحتياط لغيرها من عقود المعاملات – رأت اللجنة أنه ينبغي ألا يعتمد في عقود النكاح في الإيجاب والقبول والتوكيل على المحادثات التليفونية ؛ تحقيقا لمقاصد الشريعة ، ومزيد عناية في حفظ الفروج والأعراض حتى لا يعبث أهل الأهواء ومن تحدثهم أنفسهم بالغش والخداع

নারীর সম্ভ্রম ও ইজ্জতের হেফাজত, বিবাহের গুরুত্ব, ধোঁকা ও প্রতারণা থেকে নিরাপত্তা এবং ইসলামি শরিয়তের মাকাসিদের প্রতি লক্ষ্য করে ফাতওয়া বোর্ড এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে যে, বিবাহের ইজাব-কবুল ও প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে ফোনের কথোপকথনের ওপর নির্ভর করা উচিত হবে না। (ফাতওয়া লাজনাতিদ্দায়িমাহ ১৮/৯০)

বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন– জিজ্ঞাসা নং–৪৪৬

তিন. দুইজন প্রাপ্তবয়স্ক অভিবাবকের সম্মতি ছাড়া যদিও বিয়ে করতে পারে, তবে বিবাহের ক্ষেত্রে অভিবাবক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পারিবারিক শান্তি ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এটা বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। এজন্যই ইসলাম বিবাহের ক্ষেত্রে পাত্র-পাত্রীর মতামত ‘চূড়ান্ত’ হিসাবে সাব্যস্ত করলেও পাশাপাশি অভিভাবকের মতামতকেও সবিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। কেননা, যেমনিভাবে রাসুলুল্লাহ বলেছেন,

لاَ تُنْكَحُ الأَيِّمُ حَتَّى تُسْتَأْمَرَ ، وَلاَ تُنْكَحُ البِكْرُ حَتَّى تُسْتَأْذَنَ

 বিধবার বিয়ে তার পরামর্শ ছাড়া এবং কুমারী মেয়ের বিয়ে তার অনুমতি ছাড়া করানো যাবে না। (বুখারী ৫১৩৬)

অনুরূপভাবে তিনি অভিভাবকের উদ্দেশ্যে বলেছেন,

إِذَا خَطَبَ إِلَيْكُمْ مَنْ تَرْضَوْنَ دِينَهُ وَخُلُقَهُ فَزَوِّجُوهُ ، إِلَّا تَفْعَلُوا تَكُنْ فِتْنَةٌ فِي الْأَرْضِ وَفَسَادٌ عَرِيضٌ

তোমরা যে ছেলের দ্বীনাদারি ও চরিত্রের ব্যাপারে সন্তুষ্ট হতে পার সে যদি প্রস্তাব দেয় তাহলে তার কাছে বিয়ে দাও। যদি তা না কর তাহলে পৃথিবীতে মহা ফেতনা-ফাসাদ সৃষ্টি হবে। (তিরমিযী ১০৮৪)

চার. প্রিয় দীনি ভাই, আপনার বক্তব্য থেকে বুঝা যাচ্ছে, প্রশ্নোক্ত ক্ষেত্রে আপনারা উভয় সম্মত আছেন কিন্তু মেয়ের অভিভাবক তাদের মেয়ে আপনার কাছে দিতে রাজি নয়। এর অর্থ হল, তারা আপনাকে তাদের মেয়ের জন্য উপযুক্ত মনে করছেন না। এরকম পরিস্থিতিতে আমরা আপনাকে গোপন বিয়ের মত একটি অসামাজিক কাজের অনুমতি দিতে পারি না। কেননা, পরবর্তীতে মেয়ের অভিভাবক যদি মনে করে আপনি তাদের মেয়ের জন্য উপযুক্ত নন, তাহলে অভিভাবক এ বিয়ে আদালতের মাধ্যমে ভেঙ্গে দেয়ার অধিকার রাখে। (বিদায়াতুল মুজতাহিদ ২/৮)

আমরা ইতিপূর্বে জিজ্ঞাসা নং–৫৫৫, জিজ্ঞাসা নং–২১৬, জিজ্ঞাসা নং–৫১৪ -এ বিষয়ে আরো বিস্তারিত আলোচনা করেছি।

সুতরাং আপনার প্রতি আমাদের পরামর্শ একটাই- তাহল, যা করবেন পারিবারিকভাবেই করবেন।  এক্ষেত্রে বুদ্ধিমত্তা ও শালীনতার সাথে চেষ্টা চালান। পাশাপাশি দোয়া করতে থাকুন। এরপরেও যদি না হয় তাহলে একজন মুমিন হিসেবে এটাই বিশ্বাস করুন যে, এখানে আপনার জন্য কল্যাণ ছিল না। কেননা আল্লাহ তাআলা বলেন,

عَسَى أَن تُحِبُّواْ شَيْئًا وَهُوَ شَرٌّ لَّكُمْ وَاللّهُ يَعْلَمُ وَأَنتُمْ لاَ تَعْلَمُونَ

হয়তোবা কোন একটি বিষয় তোমাদের কাছে পছন্দনীয় অথচ তোমাদের জন্যে অকল্যাণকর। বস্তুতঃ আল্লাহই জানেন, তোমরা জান না। (সূরা বাকারা ২১৬)

والله اعلم بالصواب
উত্তর দিয়েছেন
মাওলানা উমায়ের কোব্বাদী
আরো পড়ুন-
গুনাহ ছাড়তে পারি না-কী করব?
ইসলামে বিয়ের বয়স কত?
গুনাহ থেকে বাঁচার জন্য গোপনে বিয়ে করার অনুমতি দেয়া যাবে কি?
সংসার সুখের হয় দু’জনের গুণে
মোবাইলে বিবাহ জায়েয আছে কি?
মেয়ের অভিভাবকের সম্মতি আবশ্যক নয়-এর দলিল কী? অভিভাবকের সম্মতি ছিল তবে উপস্থিত ছিল না; বিয়ে হবে কি?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

nine + 11 =