বাধ্য হয়ে তালাক দিলে কার্যকর হবে কিনা?

জিজ্ঞাসা–৭১৪: আস্সালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ। আমি ইসলামি শরিয়ত মোতাবেক ২য় বিয়ে সম্পাদন করি। বিয়ের পর দেখা যায় মেয়েটি যক্ষা রোগে আক্রান্ত, যা বিয়ের আগে আমাকে অবহিত করা হয় নি। এবং বিয়ের আগে তার কপালে টিউমার হয় এবং তা অপারেশন করা হয়, যা আমার নিকটে গোপন রাখা হয়। সার্বিক অবস্থা এমন দারায় যে, মেয়েটি খুবই অসুস্থ থাকে এবং আমি তার সমস্ত চিকিৎসা এবং খরচাদি চালাতে থাকি। আমরা স্বামি স্ত্রী হিসেবে ভালভাবেই সংসার করতে থাকি। আমার ২য় স্ত্রী সেজু ভাইয়ের বাসায় থাকতেন এবং তিনি ব্যবসায়ী হওয়ায় সারাদিন বাসায় থাকতেন না। আমি একদিন পর একদিন আমার ২য় স্ত্রী এর সাথে থাকতাম। বিয়ের ৪ মাস পর মেয়ের মা আমার সেজু ভাই এর সাথে এসে যোগাযোগ করে এবং তার মেয়েকে নিয়ে যেতে চায়। সে বলে যে আমার মেয়ে একা বাসায় থেকে মরে যাবে, তাকে আমার সাথে দিয়ে দেন। আমি তাকে সুস্থ করে অন্য যায়গায় বিয়ে দিয়ে দিব। (উল্লেখ্য যে মেয়ের মা অনেক গরীব এবং সাহায্য সহযোগীতা নিয়েই তাদের সংসার চলে, মেয়ের একটি বড় ভাই আছে যিনি প্রতিবন্দি এবং তার জন্মগতভাবে দুটি পা ই নাই)। এ ঘটনার প্রেক্ষিতে সেজু ভাই মেয়ের মাকে কথা দেয় এবং আমাকে বাধ্য করে মেয়েকে তার মায়ের সাথে যাওয়ার অনুমতি প্রদানে। মেয়ে চলে যাওয়ার কয়েকদিন পর সেজু ভাই বলেন মেয়ে তোমার সাথে আর সংসার করবে না এবং মেয়ের অভিভাবক হিসেবে মেয়ের খালুর সাথে তোমাকে নিয়ে বসতে হবে এবং ঐ মিটিং এই মেয়ে তোমাকে তালাক দিবে। তুমি তার কাছে মেয়ের মহরানার টাকা দিয়ে দিবা। নির্ধারিত দিনে আমার বড় ২ ভাই আমাকে সাথে নিয়ে মেয়ের খালুর সাথে বসে। কথা ছিল যে মেয়ে আমাকে তালাক দিবে, কিন্তু মিটিং এ বসার পর আমাকে বলা হয় তুমি তোমার স্ত্রীকে তালাক দাও। (এখানে উল্লেখ্য যে এ মিটিং এ মেয়ে উপস্থিত ছিল না) আমি যতই বলি আমি তালাক দিব না, মেয়ের না তালাক দেয়ার কথা। তারা আমার কোন কথাই শুনেন না এবং বলেন আমরা বড় ৩ ভাই একসাথ হওয়া খুবই কঠিন কাজ, আমরা যেহেতু একসাথে বসেছি আমাদেরকে সাক্ষী রেখে তুমি এখনই তালাক দাও। আমি তখন বলি মেয়ে পবিত্র থাকা অবস্থায় তালাক দিতে হয়, সুতরাং তার পবিত্র সময় আসুক, তখন তালাক দিব। তারা বলেন, তোমার তালাকের সাথে পবিত্রতার কোন সম্পর্ক নেই, সে তো অসুস্ত, সতরাং তুমি তাকে এখনই তালাক দাও। আমি আবার তাদেরকে বলি আমার স্ত্রী তো আমাকে বার বার ফোন দিচ্ছে, সতরাং তালাক দেয়ার আগে অন্তত নতুন ছিম তুলে নেই, যাতে সে আমাকে না পায়, কিন্তু তারা কোন কথাই মানেন না। আমার এ সকল কথার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল যেন তালাক না হয়, এবং যদি আমি সময় পেয়ে যাই তাহলে আর তালাক দিতে হবে না। কিন্তু আমার ভাইয়েরা তাদের পূর্বের কথাতেই বহাল থাকে এবং আমাকে তালাক দিতে বাধ্য করে। আমার বড় ভাই আমাকে বলতে বলেন ”আমি আমার স্ত্রী আফিয়াকে এক তালাক দিলাম ——————– দুই তালাক দিলাম —————তিন তালাক দিলাম। আমিও তাই বলি। তালাক দেয়ার পর ১ মাস অতিবাহিত হয়ে গেছে। আমার মানসিক অবস্থা ভাল যাচ্ছে না, মনে হচ্ছে আমি কোন অন্যায় করে ফেলেছি। আমি আমার স্ত্রী আফিয়াকে আবার নিয়ে আসতে চাই এবং সংসার করতে চাই। এ সম্মন্ধে শরিয়ত কি বলে। আমাদের কি তালাক হয়ে গেছে? বিস্তারিত জানালে বাধিত থাকবো।–আব্দুল বাতেন।

জবাব: وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

এক. বাধ্য হয়ে তালাক দিলেও তালাক কার্যকর হয়ে যায়। সুতরাং তিন তালাক দেয়ার মাধ্যমে আপনাদের মাঝে বিবাহ সম্পূর্ণরূপে বিচ্ছেদ হয়ে গেছে। (আল ফিকহুল ইসলামী ওয়া আদিল্লাতুহু (৭/৩৬৪ দারুল ফিকর)

হাদিসে এসেছে, আবু হুরায়রা রাযি বলেন, রাসূলুল্লাহ বলেছেন,

ثَلاثٌ جِدُّهُنَّ جِدٌّ وَهَزْلُهُنَّ جِدٌّ : النِّكَاحُ ، وَالطَّلاقُ ، وَالرَّجْعَةُ

তিনটি বিষয় এমন রয়েছে যা গোস্বায় হোক বা হাসি ঠাট্টায় হোক সর্বাবস্থায় কার্যকরী হয়ে থাকে। বিবাহ্, তালাক ও রজয়াত। (আবু দাউদ ২১৯৪ তিরমিযি ১১৮৪)

দুই. স্বামী যদি তার স্ত্রীকে তিন তালাক দেয়ার পর তাকে পুনরায় বরণ করে নেয়ার ইচ্ছা পোষণ করে। তবে তার জন্য একমাত্র বৈধ ব্যবস্থা হলো ‘হালালাহ’ করা। অর্থাৎ অন্য স্বামীর নিকট নিয়মিত বিবাহ দেয়া এবং তাদের মধ্যে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক গড়ে ওঠা। অতঃপর তাদের মাঝে সংসার জীবনে কোনো কারণে যদি ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়; তবে ইদ্দত পালনের পর ওই স্ত্রীকে  প্রথম স্বামী পুনরায় বিয়ে করা হালাল হবে।

এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেন,

فَإِن طَلَّقَهَا فَلَا تَحِلُّ لَهُ مِن بَعْدُ حَتَّىٰ تَنكِحَ زَوْجًا غَيْرَهُ ۗ فَإِن طَلَّقَهَا فَلَا جُنَاحَ عَلَيْهِمَا أَن يَتَرَاجَعَا إِن ظَنَّا أَن يُقِيمَا حُدُودَ اللَّهِ ۗ وَتِلْكَ حُدُودُ اللَّهِ يُبَيِّنُهَا لِقَوْمٍ يَعْلَمُونَ

অতঃপর স্বামী যদি স্ত্রীকে তৃতীয় তালাক দেয় তবে অন্য লোকের সাথে বিবাহ দেয়া ব্যতিত সেই স্ত্রী (প্রথম) স্বামীর জন্য হালাল নয়। অতঃপর যদি দ্বিতীয় স্বামী তালাক দিয়ে দেয়, তাহলে তাদের উভয়ের জন্যই পরস্পরকে পুনরায় বিয়ে করাতে কোন পাপ নেই। যদি আল্লাহর হুকুম বজায় রাখার ইচ্ছা থাকে। আর এই হলো আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত সীমা; যারা উপলব্ধি করে তাদের জন্য এসব বর্ণনা করা হয়। (সূরা বাকারা-২৩০)

والله اعلم بالصواب
উত্তর দিয়েছেন
মাওলানা উমায়ের কোব্বাদী

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

6 − five =