পহেলা বৈশাখ উদযাপন হারাম কেন?

পহেলা বৈশাখ পালন হারাম কেন?

পহেলা বৈশাখ পালন হারাম কেন?

সংস্কৃতি বনাম অপসংস্কৃতি

ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে সংস্কৃতি অর্থ সুসভ্য আচরণ, শিষ্টাচার ও উন্নত নৈতিক মূল্যবোধ। সংস্কৃতির বিকৃত রূপই হল অপসংস্কৃতি। ইসলাম সেই সংস্কৃতি গ্রহণের অনুমোদন দিয়ে থাকে যা মুসলিম উম্মাহর জাতিসত্ত্বা ও ধর্মকে কলুষিত করে না। এজন্য যখন কোনো সংস্কৃতি ইসলামী কার্যকলাপে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে এবং নৈতিকতা বিবর্জিত হয় তখন তা অপসংস্কৃতি বলে চিহ্নিত হয়। এই অপসংস্কৃতির প্রভাবে জাতি তার নিজস্ব স্বকীয়তা হারিয়ে ফেলে এবং তরুণ সমাজ হয় বিপদগামী।

পহেলা বৈশাখ উদযাপন: সংস্কৃতি না অপসংস্কৃতি?

আসছে পহেলা বৈশাখ। দিবসটি উদযাপনে গোটা দেশ আন্দোলিত হবে। শহরের আনাচে-কানাচে বসবে অশ্লীল নাচ-গান ও জুয়ার আসর। আবার কোনো কোনো স্থানে বৈশাখ উপলক্ষে অনুষ্ঠিত হবে ‘বৈশাখী মেলা’। থাকবে পান্তা-ইলিশের জমজমাট আয়োজন। বিভিন্ন হোটেল ও মেলার রেস্টুরেন্টে থাকবে তরুণ-তরুণীদের উপচেপড়া ভিড়। পহেলা বৈশাখের দিন সুর্যোদয়ের পর থেকেই মর্ডান তরুণরা বৈশাখী পাঞ্জাবি-পাজামা ও তরুণীরা লাল-সাদা বৈশাখী শাড়ি পরিধান করে সাজগোজ করে ভিড় জমাবে গানের কনসার্ট ও বিনোদন পার্কগুলোতে। জোড়ায় জোড়ায় মিলিত হয়ে ‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো’ এই গানে কণ্ঠ মিলাবে।

প্রশ্ন হল, এই যে এই সংস্কৃতি আদায় করে আমরা গর্ববোধ করি এবং বাঙালির পরিচয় দেই; এই সংস্কৃতি আসলেই কি সংস্কৃতি? না এটা সংস্কৃতির নামে অপসংস্কৃতি?

প্রকৃত সত্য

প্রকৃত সত্য হল,পহেলা বৈশাখ উদযাপনের মধ্যে রয়েছে কমপক্ষে পাঁচটি ইসলাম ও ঈমান বিরোধী বিষয় –

১. ঈমান-আকিদাবিরোধী প্রথার প্রচলন। যেমন, জীবজন্তুর মূর্তি নিয়ে মঙ্গল শোভাযাত্রা, মুখে উল্কি আঁকা,শাঁখা-সিঁদুরের রংয়ে (সাদা ও লাল) পোশাক পরিধান,রাখি বাঁধা, শাঁখা পরা, কপালে লাল টিপ ও চন্দন এবং সিথিতে সিঁদুর দেয়া। রাসূলুল্লাহ বলেছেন,

أَبْغَضُ النَّاسِ إِلَى اللَّهِ ثَلاَثَةٌ: مُلْحِدٌ فِي الحَرَمِ، وَمُبْتَغٍ فِي الإِسْلاَمِ سُنَّةَ الجَاهِلِيَّةِ، وَمُطَّلِبُ دَمِ امْرِئٍ بِغَيْرِ حَقٍّ لِيُهَرِيقَ دَمَهُ

আল্লাহর নিকট তিন শ্রেণীর লোক সবচেয়ে বেশী ঘৃণিত – ১ম শ্রেণী হচ্ছে, যারা হারাম শরীফের মধ্যে কুফরী কার্যকলাপ করে। ২য় শ্রেণী হচ্ছে, যারা ইসলামে থাকা অবস্থায় (মুসলমান হয়েও) জাহিলিয়্যাতের রীতি–নীতি ও আদর্শ (কাফের মুশরিকদের অনুকরণ–অনুসরণ) পালন করে। ৩য় শ্রেণী হচ্ছে, যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে কারো রক্ত প্রবাহিত করে। (বুখারী ৬৮৮২ দিয়াত অধ্যায়)

২. বিজাতির অনুসরণ। বির্ধমীরা তাদের সংস্কৃতির রীতি অনুযায়ী ইংরেজী নববর্ষ পালন করে আর আমরা বাংলা সংস্কৃতি মতে বাংলা নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ পালন করি। অথচ রাসূলুল্লাহ বলেছেন,مَنْ تَشَبَّهَ بِقَوْمٍ فَهُوَ مِنْهُمْ যে ব্যক্তি যে জাতির অনুকরন করবে সে ব্যক্তি সে জাতির মধ্যে গণ্যহবে। (আবু দাউদ ৩৫১২)

৩. নগ্নতা, অশ্লীলতা, ব্যভিচারপূর্ণ অনুষ্ঠান। এই ব্যভিচার বিভিন্ন অঙ্গের দ্বারা হতে পারে, যেমনটি রাসূলুল্লাহ বললেছেন যে,

فَالْعَيْنَانِ زِنَاهُمَا النَّظَرُ ، وَالأُذُنَانِ زِنَاهُمَا الاسْتِمَاعُ ، وَاللِّسَانُ زِنَاهُ الْكَلامُ ، وَالْيَدُ زِنَاهَا الْبَطْشُ ، وَالرِّجْلُ زِنَاهَا الْخُطَا ، وَالْقَلْبُ يَهْوَى وَيَتَمَنَّى ، وَيُصَدِّقُ ذَلِكَ الْفَرْجُ وَيُكَذِّبُهُ

দুই চোখের ব্যভিচার হল হারাম দৃষ্টি দেয়া, দুই কানের ব্যভিচার হল পরনারীর কণ্ঠস্বর শোনা, জিহবার ব্যভিচার হল, [পরনারীর সাথে সুড়সুড়িমূলক] কথোপকথন। হাতের ব্যভিচার হল পরনারী স্পর্শ করা, পায়ের ব্যভিচার হল গুনাহর কাজের দিকে পা বাড়ান, অন্তরের ব্যভিচার হল কামনা-বাসনা আর গুপ্তাঙ্গঁ তা সত্য অথবা মিথ্যায় পরিণত করে। (মুসলিম ২৬৫৭, মুসনাদে আহমাদ ৮৯৩২)

আর আল্লাহ তাআলা বলেছেন,

وَلَا تَقْرَبُوا الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ

নির্লজ্জতা ও অশ্লীলতার কাছেও যেও না, চাই তা প্রত্যক্ষ হোক আর পরোক্ষ হোক। (সূরা আনআম ১৫১)

৪. গান ও বাদ্য ও মদ্যপানপূর্ণ অনুষ্ঠান। রাসূলুল্লাহ বললেছেন,

فِي هَذِهِ الأُمَّةِ خَسْفٌ وَمَسْخٌ وَقَذْفٌ‏ ‏.‏ فَقَالَ رَجُلٌ مِنَ الْمُسْلِمِينَ يَا رَسُولَ اللَّهِ وَمَتَى ذَاكَ قَالَ إِذَا ظَهَرَتِ الْقَيْنَاتُ وَالْمَعَازِفُ وَشُرِبَتِ الْخُمُورُ

এই উম্মতের জন্য ভূমিধ্বস, চেহারা বিকৃতি এবং পাথর বর্ষণের আযাব রয়েছে। জনৈক মুসলিম ব্যক্তি তখন বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, কখন হবে তা? তিনি বললেন, যখন গায়িকা ও বাদ্যযন্ত্রের বিস্তার ঘটবে এবং মদ্যপান দেখা দিবে। (তিরমিযী ২২১৫)

৫. সময় ও অর্থ অপচয়কারী অনর্থক ও বাজে কথা এবং কাজ। আল্লাহ পাক বলেন, সেই মুমিনরা সফলকাম হয়েছে, وَالَّذِينَ هُمْ عَنِ اللَّغْوِ مُعْرِضُونَ যারা বাজে কাজ থেকে বিরত থেকেছে। (সূরা মুমিনুন ৩)

ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে উক্ত পাঁচটি কাজ পুরোপুরিভাবেই নিষিদ্ধ। ইসলামের দৃষ্টিতে বিভিন্ন উৎসব-অয়োজন ও আচার-অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রেও  শরয়ি নির্দেশনার এক চুল বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। এজন্যই অমুসলিমদের উৎসব-অনুষ্ঠানে অংশ নেয়া, আর তাদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে অংশ নেয়া ইসলাম বিরোধী কাজ। অমুসলিমদের কৃষ্টি-কালচার, ইসলাম বিরোধী পথ ও পদ্ধতি অনুযায়ী আয়োজিত উৎসব-অনুষ্ঠানের সাথে একমত পোষণ করার মানে হলো কুফরের সাথে একমত পোষণ করা। কাজেই সন্দেহ নেই, ,পহেলা বৈশাখ উদযাপনে ইসলামের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ হারাম। মুসলিম হিসেবে যা অবশ্যই বর্জন করতে হবে।

যে মুসলিম সত্য মেনে এটি বর্জন করবে না

আল্লাহ তাআলা বলেন,

وَمَنْ يَكْفُرْ بِالْإِيمَانِ فَقَدْ حَبِطَ عَمَلُهُ وَهُوَ فِي الْآَخِرَةِ مِنَ الْخَاسِرِينَ

যে ব্যক্তি ঈমান প্রত্যাখ্যান করবে তার কর্ম নিষ্ফল হবে এবং আখিরাতে সে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে। (সূরা মায়েদা ৫)

উক্ত আয়াতের তাফসিরে আল্লামা বাগাবি রহ বলেন,

من يكفر بالإيمان أي: يستحل الحرام ويحرّم الحلال فقد حبط عمله، وهو في الآخرة من الخاسرين- قال ابن عباس: خسر الثواب

‘যে ব্যক্তি ঈমান প্রত্যাখ্যান করবে’ এ কথার অর্থ হলো, যে ব্যক্তি হারামকে হালাল মনে করবে এবং হালালকে হারাম সাব্যস্ত করবে তার যাবতীয় আমল বৃথা হয়ে যাবে। আর আখেরাতে সে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে। ইবনে আব্বাস রাযি. বলেন, তার সাওয়াবগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হবে। (তাফসীরে বাগাবী ২/২০)

আল্লাহ সকলকে সহিহ বুঝ দান করুন। আমিন।

মাওলানা উমায়ের কোব্বাদী