ইশকে ইলাহী পর্ব-০৭: আল্লাহপ্রেমিকদের প্রেম-কাহিনি

আল্লাহপ্রেমিকদের প্রেম-কাহিনি

একটি নিস্পাপ প্রশ্ন

হযরত হুসাইন রাযি.-এর শিশুকালের ঘটনা। তিনি আলী রাযি.-কে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনি কি আল্লাহকে ভালোবাসেন?’

আলী রাযি. বললেন, ‘হ্যাঁ।’

পুনরায় প্রশ্ন করলেন, ‘আমার আম্মুকে ভালোবাসেন?’

আলী রাযি. এবারও উত্তর দিলেন, ‘হ্যাঁ।’

এবার প্রশ্ন করলেন, ‘আপনি কি আমাকে ভালোবাসেন?’

আলী রাযি. আগের মতই সংক্ষিপ্ত উত্তর দিলেন, ‘হ্যাঁ।’

এবার হুসাইন রাযি. একেবারে নিস্পাপভঙ্গিতে বললেন, ‘বাবা! আপনার অন্তর তো ভালোবাসার গুদাম হয়ে আছে। অন্তরে তো কেবল একজনের প্রতি ভালোবাসা থাকবে।’

তখন আলী রাযি. তাকে বোঝালেন, ‘বেটা! তোমার প্রশ্নটা খুব সুন্দর। কিন্তু তোমার নানাজীকে, তোমার আম্মুকে এবং তোমাকে এজন্য ভালোবাসি, কারণ, এজাতীয় ভালোবাসার নির্দেশ আল্লাহ তাআলা নিজেই দিয়েছেন। সুতরাং এ ভালোবাসাগুলো মূলতঃ আল্লাহকে ভালোবাসারই অংশ।’

এটা শুনে হুসাইন রাযি. শিশুসুলভ মুচকি হাঁসি দিলেন এবং বললেন, ‘এবার কথা বুঝে এসেছে।’

সামনুন মুহিব্বের অবস্থা

সামনুন মুহিব্ব ছিলেন একজন যুবক। চমৎকার চেহারার অধিকারী ছিলেন। ইশকেইলাহিতে তিনি সবসময় ডুবে থাকতেন। একবার লোকেরা তাঁকে কিছু ওয়াজ করার অনুরোধ করল। তিনি মহব্বতে-ইলাহি তথা আল্লাহর প্রতি ভালোবাসার গুরুত্ব সম্পর্কে বয়ান শুরু করে দিলেন। এরই মধ্যে একটি চড়ুই পাখি তাঁর কাঁধে এসে বসে গেল। কিছুক্ষণ পর এসে বসে পড়ল কোলে। তিনি ওয়াজ চালিয়েই যাচ্ছিলেন। এদিকে তাঁর কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। কিছুক্ষণ পর দেখা গেল, চড়ুই পাখিটি তাঁর কোলে ছটপট করতে করতে প্রাণ দিয়ে দিল। এ ঘটনার পর থেকে মানুষ তাঁর নাম রেখে দিল, সামনুন মুহিব্ব।

দুই বছর পর্যন্ত নাম মনে পড়ে নি

হযরত মাওলানা আসগর হুসাইন কান্ধলবি রহ.-এর নানা ছিলেন শায়েখ আহমদ হাসান রহ.। আল্লাহর এই বান্দা নেহায়েত আল্লাহওয়ালা ছিলেন। দারুলউলূম দেওবন্দের ভিত্তিপ্রস্তর করার সময় হযরত নানুতুবি রহ. ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘দারুলউলূমের ভিস্তিপ্রস্তর এমন এক ব্যক্তিত্বের হাতে স্থাপন করা হবে, যিনি আমাদের জানা মতে, সারাজীবন কবিরা গুনাহ করেন নি, এমনকি হয়ত কবিরা গুনাহর ইচ্ছাও করে করেন নি।’

এ ঘোষণা মানুষ খুব অবাক হয়েছিল। তারপর যথাসময়ে হযরত নানুতুবি রহ. শায়েখ আহমদ হাসান রহ.-এর কাছে আবেদন করলেন যে, তিনি যেন ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।

যাই হোক, আল্লাহর এই বান্দা অত্যাধিক যিকিরের কারণে সবসময় জযবের হালতে থাকতেন। তাঁর এক জামাইয়ের নাম ছিল, ‘আল্লাহ কা বান্দা’। তিনি দু’বছর শশুরের খেদমতে ছিলেন। কিন্তু দু’বছর পর্যন্ত শায়েখ আহমদ হাসান রহ. নিজের জামাইয়ের নাম মনে করতে পারেন নি। জামাই যখনি শশুরের সামনে দিয়ে যেতেন, জিজ্ঞেস করতেন, ‘ও মিয়াঁ! তোমার নাম কী?’

উত্তর দিতেন, ‘আমি আল্লাহ কা বান্দা।’

তিনি তখন বলতেন, ‘আরে মিয়াঁ সবাই তো আল্লাহর বান্দা; তুমি কে?’

জামাই উত্তর দিতেন, ‘আমি আপনার জামাই, আল্লাহ কা বান্দা।’’

তখন তিনি বলতেন, ‘আচ্ছা, ঠিক আছে, ভালো।’

দুই বছর পর্যন্ত এই একই প্রশ্ন-উত্তর চলেছিল। কিন্তু আল্লাহর স্মরণ তাঁর অন্তরকে এতটাই আচ্ছন্ন করে নিয়েছিল যে, দুই বছর পর্যন্ত জামাইয়ের নাম তাঁর মনে পড়ে নি।

জিগর মুরাদাবাদির সত্য  তওবা

উস্তাদ জিগর মুরাদাবাদি। সমকালে প্রসিদ্ধ ও প্রথিতযশা কবি ছিলেন। শুরুর দিকে তিনি কেবল পানকারী ছিলেন না; বরং পান ছাড়া তাঁর চলত না। কল্পনার জগতে সব সময় ডুবে থাকতেন। কবিতার জগতে এতটাই দক্ষ ছিলেন যে, মনে হত, বিষয়বস্তুর নক্ষত্রগুলো আকাশ থেকে পেড়ে নামাতেন। একবার তিনি আবদুররব নশতরির সঙ্গে সাক্ষাতের উদ্দেশে তার অফিসে গিয়েছিলেন। পরনে ছিল সাদামাটা পোশাক, তাই পিয়ন তাকে অফিসে প্রবেশ থেকে বাঁধা দিল। উস্তাদ জিগর পিয়নকে বোঝানোর চেষ্টা করলেন যে, আমার সঙ্গে গর্ভণর সাহেবের সঙ্গে সম্পর্ক বন্ধুসুলভ। কিন্তু পিয়ন তা মানতে নারাজ। অবশেষে উস্তাদ জিগর ছোট্র একটি কাগজের টুকরাতে লিখলেন–

نشتركوملنےآیا ہوں میراجگرتودیکھ

‘নশতরের সাক্ষাতে এসেছি, প্রাণ প্রিয় আমার! একটু দেখো।’

তারপর কাগজের টুকরাটি পিয়নের হাতে দিয়ে বললেন, ‘তোমার সাহেবকে এটা শুধু দেখাবে।’

পিয়ন যখন আবদুররব নশতরির হাতে কাগজটি নিয়ে দিল, তখন তিনি বুঝে নিলেন, কবিতার একটি লাইনে ‘নশতর’ ও ‘জিগর’ এত মায়াবী পদ্ধতিতে একসাথ যিনি করেছেন নিশ্চয় তিনি অসাধারণ কোনো ব্যক্তি হবেন। আর তিনি উস্তাদ জিগর ছাড়া কেউ নন। তারপর তিনি উস্তাদ জিগরকে এগিয়ে নেয়ার জন্য নিজেই অফিস থেকে বের হয়ে এসেছিলেন।

একবারের ঘটনা। কোনো এক মজলিসে উস্তাদ জিগরের সঙ্গে খাজা আজিজুল হাসান মাজযুব রহ.-এর সাক্ষাত হয়। মাজযুব রহ.-এর কথাবার্তা শুনে জিগর সাহেব দারুণ প্রভাবিত হন যে, একজন ইংরেজি শিক্ষিত, উচ্চপদস্থব্যক্তি অথচ তাঁর হৃদয়পাতালে ইশকেইলাহির ঝড় চলছে। কথাবার্তার এক পর্যায়ে তিনি হযরত মাজযুবকে মজা করে জিজ্ঞেস করেন, ‘জনাব! আপনার ‘টার’ কিভাবে ‘মিস’ হয়ে গেল?’ অর্থাৎ ‘মিস্টারের ‘টার’ কিভাবে মিস হল?

হযরত মাজযুব রহ. উত্তর দিলেন, ‘হাকিমুলউম্মত থানবী রহ.-এর আলোকিত দৃষ্টির উসিলায় আমার মিস্টারের ‘টার’ পড়ে গেছে।’

উস্তাদ জিগর বললেন, ‘আচ্ছা, খুব ভালো।’

মাজযুব রহ. বললেন, ‘আপনি যদি হাকিমুলউম্মতের সাথে সাক্ষাত করতে চান তাহলে আমি ব্যবস্থা করে দিতে পারি।’

উস্তাদ জিগর উত্তর দিলেন, ‘আমি রাজি আছি তবে সেখানে গিয়েও আমি পান করব। কারণ, পান করা ছাড়া তো এক মূহূর্তও আমার চলে না।’

যাই হোক হযরত মাজযুব রহ. বিষয়টি থানবী রহ.-এর কাছে উথাপন করলেন। থানবী রহ. উত্তর দিলেন, ‘খানকাহ তো সকলের জন্য। সুতরাং এখানে পান করার প্রশ্নই ওঠে না। তবে আমি জিগর সাহেবকে নিজের মেহমান হিসেবে রাখতে পারি। তিনি সেখানে একা থাকবেন। তারপর তাঁর যা করার ইচ্ছা করবেন, এতে আমি কী করতে পারি।’

অবশেষে হযরত মাজযুব উস্তাদ জিগরকে থানবী রহ. এর দরবারে একদিন নিয়ে গেলেন। একজন কমিল ওলির অল্প কিছুক্ষণের সোহবতে উস্তাদ জিগরের হৃদয়জগত পাল্টে গেল। শেষ পর্যন্ত তিনি তো পান করলেনই না, বরং থানবী রহ.-কে দিয়ে নিজের জন্য তিনটি দুআ করালেন। প্রথম দুআ; আমি মদপান ছেড়ে দিলাম। দুআ করবেন যেন মদ ছাড়তে পারি। দ্বিতীয় দুআ; সুন্নাতে-রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (দাঁড়ি) দ্বারা আমি আমার চেহারা সজ্জিত করব। দুআ করবেন। তৃতীয় দুআ; আমি হজ্ব করব। দুআ করবেন।

তারপর উস্তাদ জিগর মুরাদাবাদি থানবী রহ.-এর দরবার থেকে চলে আসলেন। মানুষ তাঁর জীবনের এই পরিবর্তন দেখে বিস্মিত হল। তাঁকে দেখার জন্য লোকজন আসত। তখন উস্তাদ জিগর নিজের সম্পর্কে একটি ছন্দ তৈরি করেছিলেন–

چلو دیکھ آئیں تماشا جگر کا
سنا ہے وہ کافر مسلماں ہوا ہے

‘চলো একটু দেখে আসি তামাশা জিগরের
শুনলাম, বনেছে মুসলিম ওই কাফের।’

মদপান পুরোপুরি ছেড়ে দেওয়ার কারণে উস্তাদ জিগর খুব অসুস্থ হয়ে পড়লেন। ডাক্তাররা পরামর্শ দিল, একবারে না ছেড়ে ধীরে ধীরে ছাড়লে ভালো হত। তিনি উত্তর দিলেন, ‘ছেড়েছি তো ছেড়েছি। নিয়ত পাল্টাবো না-ইনশাআল্লাহ। যদি মৃত্যু এসে যায় তবে তো আল্লাহ চাহে তো তওবা কবুল হয়ে যাবে। আখেরাত সুন্দর হয়ে যাবে।’

এভাবে উস্তাদ জিগরের মাঝে ইশকেইলাহি প্রবল হতে লাগল। এটা কেন হয়েছিল? আল্লাহর ওলিদের সঙ্গে আন্তরিক বন্ধন তৈরির উসিলাতেই হয়েছিল। এমনকি পরবর্তীতে ইশকেইলাহির জোরালো উপস্থিতি তার কথাবার্তায় স্পষ্ট প্রতিভাত হত। কিছু কবিতা তো তিনি হৃদয়ে তুফান সুষ্টি করার মত করে লিখেছিলেন। যেমন–

میرا کمال عشق میں اتنا ہے اے جگر

وہ مجھ پہ چھا گئے میں زمانے پہ چھا گیا

یہ مــوجِ دریا، یہ ریگ صحــرا، یہ غـنچہ و گل یـہ ماہ و انــجم
ذرا جو وہ مسکرا دیئے ہیں، یہ سب کے سب مسکرا رہے ہیں

‘জিগর! প্রেমজগতে বনেছি আমি যাদুকর-কারিগর
ডুব দিয়েছি প্রেমসাগরে, ওঠলো জোয়ার আমার ভেতর।
উচ্ছাস ঢেউ, মরুপ্রান্তর, বালিকণা আর ফুলের আসর
চন্দ্রিমা আর মেলা তারকার হাসিতে তোমার ওহে জিগর!’

রাতভর মুরাকাবা

হযরত মাওলানা হুসাইন রহ. ছিলেন খাজা সিরাজুদ্দিন রহ.-এর ইজাজতপ্রাপ্ত খলিফা। তাঁর খানকায় প্রতিদিন ইশার নামাজের পর মুরাকাবা হত। হযরত নিজেই সকলকে রাতভর মুরাকাবা করাতেন। ক্লান্ত হয়ে গেলে মুরাকাবা ছেড়ে চলে যাওয়ার অনুমতি ছিল। তো হযরত মুরাকাবা করাতেন, লোকেরাও মুরাকাবা করত। আর যে ক্লান্ত হয়ে পড়ত, সে ওঠে চলে যেত। দেখা যেত, যখন অর্ধরাত হত, তখন একজন একজন করে এভাবে সবাই ওঠে চলে যেত। মাঝরাতে যখন হযরত মুরাকাবা থেকে মাথা ওঠাতেন, তখন দেখতেন সামনে কেউ নেই। তখন তিনি উঠে তাহাজ্জুদের জন্য দাঁড়াতেন। সারারাত আল্লাহর স্মরণে কাটিয়ে দিতেন।

جی ڈھونڈتا ہے پھر وہی فرصت کہ رات دن

بیٹھے رہیں تصور جاناں کیے ہوئے

‘অন্তর মোর খুঁজে ফিরে আসবে কখন সুযোগটা ফের;
রাত-দিন থাকব বসে স্মরণ করে প্রিয়তমের।’

তোমার হাত এসে গেছে হাতে

জনৈক বুযুর্গের ঘটনা। কোথাও যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে অগ্নিপূজকের দেখা পেলেন। অগ্নিপূজক আগুনের পূজা করত। বুযুর্গ তাকে বোঝালেন, এটা সৃষ্টি; স্রষ্টা নয়। সৃষ্টির উপাসনা করা যায় না। কিন্তু অগ্নিপূজক কোনোভাবেই তা মানছিল না। এক পর্যায়ে বুযুর্গ রেগে গেলেন। বললেন, এক কাজ কর। একটা জায়গায় আমরা ভালোভাবে আগুন জ্বালাব। আমরা উভয়ে সেখানে হাত ঢুকিয়ে দিব। আমাদের মধ্যে যে সত্য, আগুন তার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। আর মিথ্যুক হলে আগুন তাকে রেহাই দিবে না।

অগ্নিপূজক বুযুর্গের এই প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেল। অবশেষে কথা অনুযায়ী বুযুর্গ করলেন কী- তিনি অগ্নিপূজকের হাত নিজের হাতের ভিতর নিয়ে আগুনের মধ্যে ঢুকিয়ে দিলেন। কিন্তু একটু পরে উভয়ে অনুধাবন করলেন, আগুন কারো হাতই পুড়ছে না। বুযুর্গ খুবই চিন্তায় পড়ে গেলেন। ইত্যবসরে তাঁর প্রতি আল্লাহর পক্ষ থেকে ইলহাম হল যে, হে আমার প্রিয়! আমি এ লোকটির হাত কিভাবে জ্বালাব! কারণ, তার হাত তো তোমার হতের ভিতর ছিল। তোমার হতের ছোঁয়া যার হাতের ভেতর লেগে আছে, তাকে জ্বালাব কেমনে!

একজন খৃষ্টান, দু’টি সংবাদ

একবার একজন মুসলিম ও একজন খৃষ্টান একই সঙ্গে সফর করছিল। উভয়ের গন্তব্যস্থল ছিল অভিন্ন, তাই তারা ভাবল, সফরে একসঙ্গে থাকলে সফর সহজ হবে। এখনও গন্তব্যস্থালে পৌঁছুতে দু’ দিন বাকি; কিন্তু এরই মধ্যে তাদের খাদ্য ও রসদ ফুরিয়ে গেল। দু’জন পরামর্শে বসল যে, কী করা যায়? মুসলিম লোকটি প্রস্তাব দিল, এক কাজ করি, একদিন আমি দুআ করব যাতে খাদ্যের ব্যবস্থা হয়। আরেকদিন তুমি দুআ করবে যাতে খাদ্যের একটা সুরাহা হয়। খৃষ্টান লোকটি মুসলিম লোকটির প্রস্তাব মেনে নিল। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রথমদিন দুআ করতে বসল মুসলিম লোকটি। দুআ কবুল হয়ে গেল। ফলে দেখা গেল, কিছুক্ষণ পর একজন গরম গরম খানা নিয়ে আসল, তাদেরকে হাদিয়া দিয়ে চলে গেল। এই ঘটনায় মুসলিম লোকটি দারুণ খুশি হল। ভাবল, আল্লাহ তাআলা সম্মান রেখেছেন। খাওয়া-দাওয়া শেষ করে দু’জনই ঘুমিয়ে পড়ল। দ্বিতীয় দিন দুআ করার পালা ছিল খৃষ্টান লোকটির। আজ তাকেও বেশ হাশি-খুশি দেখা যাচ্ছিল। সে রীতিমত এক কোণে গিয়ে দুআ শুরু করে দিল। কিছুক্ষণ পর এক লোক আসল। আজ একটি দস্তরখান নয়; বরং দু’টি দস্তরখানে করে খানা আসল। এই ঘটনাটি দেখে খৃষ্টান লোকটির আনন্দের সীমা রইল না। কিন্তু মুসলিম লোকটি এতটাই চিন্তিত হল যে, তার মনই চাচ্ছিল না খানা খাবে। খৃষ্টান লোকটি মুসলিম লোকটির মনের অবস্থা বুঝতে পেরে বলল, আপনি যদি খানা খান তাহলে দু’টি সুসংবাদ শোনাব। যাই হোক, দু’জনই খেয়ে নিল। তারপর মুসলিম লোকটি বলল, বলুন, ‘সুসংবাদ দু’টি কী?’

খৃষ্টান লোকটি উত্তর দিল, ‘প্রথম সুসংবাদ হল এই যে, আমি এক্ষুণি মুসলমান হব। দ্বিতীয় সুসংবাদটি হল, আমি দুআ করেছিলাম, হে আল্লাহ! যদি আমার সফরসঙ্গী এই মুসলিমটির কোনো মর্যাদা আপনার কাছে থাকে, তাহলে খাদ্যের ব্যবস্থা করে দিন। আল্লাহ আমার দুআ এমনভাবে কবুল করে নিলেন যে, ডাবল খানা পাঠিয়ে দিয়েছেন।’

আল্লাহর কাছে সত্যিকারের আশেকের মর্যাদা অনেক। হাদিস পাকে আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনেক সময় মুহাজির সাহাবিদের উসিলা দিয়ে আল্লাহর কাছে দুআ করতেন। নবীজীর ইন্তেকালের পর বৃষ্টি না হওয়ার কারণে সাহাবায়েকেরাম আব্বাস রাযি.-এর উসিলা দিয়ে দুআ করেছিলেন। তাঁর ইন্তেকালের পর সাহাবায়েকেরাম আয়েশা রাযি.-কে দিয়ে দুআ করাতেন।

তোমাকে বাহির হতে দেয়নি কে?

এক ব্যক্তি মাছ খরিদ করল। মজদুরকে বলল, ‘বাড়িতে নিয়ে দাও, তোমাকে এত টাকা দেয়া হবে।’

মজদুর বলল, ‘ঠিক আছে, তবে পথিমধ্যে নামাযের সময় হলে আমি প্রথমে নামায পড়ব, তারপর মাছ নিয়ে আপনার বাড়িতে যাব।’

ওই ব্যক্তি রাজি হয়ে গেল। মজদুর চলল মাছ নিয়ে। পথিমধ্যে আযান হল। মজদুর বলল, ‘প্রতিশ্রুতি মোতাবেক আমি আগে নামায আদায় করব।’

লোকটি বলল, ‘ঠিক আছে, তুমি নামায পড়ে আস। আমি মাছের কাছে আছি। একটু তাড়াতাড়ি এসো।’

মজদুর মসজিদে ঢুকে গেল এবং নামায শুরু করে দিল। অন্যান্য লোক নামায শেষ করে মসজিদ থেকে বের হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু মজদুরের নামায তখনও শেষ হয় নি। লোকটি দেখল, দেরি হয়ে যাচ্ছে। তাই সে মসজিদের বাহির থেকে মজদুরের উদ্দেশে হাঁক দিল। বলল, ‘ও মিঁয়া! অনেক দেরি হয়ে গেল। তোমাকে বাহির হতে দিচ্ছে না কে?’

মজদুর উত্তর দিল, ‘যিনি আপনাকে ভেতরে আসতে দেন নি, তিনি আমাকে বাহিরে আসতে দিচ্ছেন না।’

সুবহানাল্লাহ! আল্লাহপ্রেমিকদের অবস্থা সত্যিই আশ্চর্যজনক হয়। তারা নামাযের মধ্যে এই অনুভব করে যে, যেন তারা নামাযের মধ্যে প্রকৃত প্রিয়তমের সঙ্গে ভেদ-রহস্যের কথা বলছেন।

জনৈক বাঁদির বিস্ময়কর দুআ

এক ব্যক্তি বাজারে গেল। সেখানে দেখতে পেল জনৈক মালিক তার বাঁদি বিক্রি করতে চায়, কিন্তু ক্রেতা পাওয়া যাচ্ছে না। লোকটি বাঁদিটাকে অল্প দামে কিনে নিল। রাতের বেলায় যখন লোকটির চোখ খুলল তখন দেখতে পেল, বাঁদি তাহাজ্জুদ নামাজ পড়ে দুআ করছে, ‘হে আল্লাহ! আপনার কসম, আপনি আমাকে ভালোবাসেন।’

এটা শুনে লোকটি বাঁদির ভুল ধরিয়ে দিয়ে বলল, ‘এভাবে বলো না; বরং এভাবে বলো যে, হেআল্লাহ! আপনার কসম, আমি আপনাকে ভালোবাসি।’

মনিবের এই ভুল ধরা বাঁদির কাছে ভালো লাগে নি। সে বলল, ‘আমার মনিব আল্লাহ যদি আমাকে ভালো না বাসতেন তাহলে তিনি আমাকে সারারাত জায়নামাযে বসিয়ে রাখতেন না এবং আপনাকে বিছানায় এমন মিষ্টি ঘুমে বিভোর রাখতেন না।’

এ বলে বাঁদিটি হাত তুলল এবং কেঁদে কেঁদে দুআ করতে লাগল যে, ‘হে আল্লাহ! এতদিন যাবত আমার বিষয়টি গোপন ছিল। এখন মাখলুক জেনে ফেলেছে। আপনি আমাকে আপনার কাছে নিয়ে যান।’

এই দুআ করতে করতে তাঁর প্রাণ সেখানেই চলে গেল।

মাওলানা মুহাম্মাদ আলী জাওহারের কবিতা

মাওলানা মুহাম্মাদ আলী জাওহার রহ.-এর পিতা ছিলেন খাজা মাযহার জানে জানাঁ রহ.-এর মুরিদ। শায়খের তাওয়াজ্জুহের উসিলায় ইসলামের প্রতি ভালোবাসা তার হৃদয়পাতালে প্রোথিত ছিল। যখন ইংরেজদের থেকে স্বাধীনতা অর্জন করার আন্দোলন চলছিল তখন তিনি নিজের ছেলেকে বলেছিলেন, ‘মুহাম্মাদ আলী! খেলাফতের জন্য প্রাণ দিয়ে দাও।’ পরবর্তীতে এই মুহাম্মাদ আলী জাওহারই ইংরেজবিরোধী আন্দোলনে খুব দাপুটে ভূমিকা রেখেছিলেন। ইংরেজ শাসক তাঁকে সতর্ক করল যে, আপনি আন্দোলন থেকে ফিরে না আসলে কঠিন সময় আপনার জন্য অপেক্ষা করছে। প্রতিউত্তরে মুহাম্মাদ আলী জাওহার রহ. কিছু ছন্দ লিখেছিলেন-

تم یوں ہی سمجھنا کہ فنا میرے لئے ہے
پر غیب سے سامانِ بقا میرے لئے ہے

ہیں یوں تو فدا ابر سیہ پر سب ہی مے کش
پر آج کی گھنگھور گھٹا میرے لئے ہے

پیغام ملا تھا جو حسین ابنِ علی کو
خوش ہوں وہی پیغامِ قضا میرے لئے ہے

اللہ کے رستہ ہی میں موت آئے مسیحا
اکسیر یہی ایک دوا میرے لئے ہے

توحید تو یہ ہے کہ خدا حشر میں کہہ دے
یہ بندہ دو عالم سے خفا میرے لئے ہے

‘ভেবে নাও, করেছি লীন নিজেকে নিজের জন্য
আছে সামান অফুরাণ আমার জন্য;
দিগন্তের ওই কালো মেঘ বিপদ সবার জন্য
তবে আজিকার তর্জন-গর্জন কেবলি আমার জন্য;
ছিল পয়গাম আলীর সন্তান হুসাইনের জন্য
খুশি হলাম সেই পয়গাম পেয়ে আমার জন্য;
ওই মৃত্যু, নয় মৃত্যু যা হয় আল্লাহর জন্য।
মরণ তো নয় মহৌষধ হয় এটা আমার জন্য।
তাওহিদ মানে বিচার দিবসে বলবেন বান্দার জন্য,

বান্দা আমার দুই জগত নিয়ে ক্ষিপ্ত আমারই জন্য।’

একবার তিনি ইচ্ছে করলেন যে, আমি ইংল্যান্ডে গিয়ে মুসলমানদের স্বাধীনতার ব্যাপারে কলমি-জিহাদ করব। সংবাদপত্রে লিখে লিখে নিজের মত প্রকাশ করব। এই নিয়তে তিনি ইংল্যান্ডে চলে গেলেন। ভাবলেন, যতদিন মুসলমানরা স্বাধীন হবে না ততদিন সেখান থেকে আসব না।

এ হিসাবে তিনি অনেক দিন ইংল্যান্ডেে বসবাস করে অনেক কষ্ট-মুজাহাদা করেছেন। ওই সময়টাতে তাঁর মেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। চিকিৎসকরা বলল, ‘তার রোগ দূরারোগ্য, বেশি দিন হয়ত বাঁচবে না।’ মা তার যুবতী মেয়েকে জিজ্ঞেস করল, ‘তোমার জীবনের শেষ ইচ্ছ কী?’

মেয়ে উত্তর দিল, ‘মন চায় যে, শেষ সময় আব্বাজানকে একটু মনভরে দেখব।’

মা বলল, ‘তাহলে তোমার আব্বাজানের কাছে চিঠি লেখ।’

মেয়ে তখন চিঠি লিখল। মাওলানা মুহাম্মাদ আলী জাওহার রহ. যখন নিজের মেয়ের চিঠি পেলেন, তখন চিঠির অপর পিঠে কিছু ছন্দ লিখে দিয়েছিলেন–

میں ہوں مجبور پر الله تو مجبور نہیں
تجھ سے میں دور سہی وہ تو مگر دور نہیں

تیری صحت ہمیں منظور ہے لیکن اس کو
نہیں منظور تو پھر ہم کو بھی منظور نہیں

‘মালিক তো নয় অক্ষম, যদিও অক্ষম আমি;

মালিক তোমার নিকটতম, যদিও পড়ে আছি দূরে আমি।
তোমার সুস্থতা করি কামনা, কিন্তু যদি না চান তিনি
তোমার সুস্থতা তখন চাই না যে আর আমি।’

হযরত আলী রাযি. ও হযরত ফাতেমা রাযি.-এর আমল

একবার হযরত হাসান ও হুসাইন রাযি. অসুস্থ হয়ে পড়লেন। দু’জনই খুব কষ্ট পাচ্ছিলেন। তাই ফাতেমা রাযি. তাঁদের সুস্থতার জন্য মান্নত করলেন যে, হে আল্লাহ! যদি বাচ্চা দু’টি সুস্থ হয়ে যায় তাহলে আমরা স্বামী-স্ত্রী তিন দিন লাগাতার রোজা রাখব। আল্লাহ তাআলার বিশেষ রহমতে উভয় শাহজাদা সুস্থ হয়ে উঠেন। আলী রাযি. ও ফাতেমা রাযি. রোজা রাখা শুরু করলেন। প্রথম দিনের ইফতারের সময়ে উভয়ের কাছে ছিল শুধু একটি রুটি। ইত্যবসরে দরজায় কেউ করাঘাত করল। জিজ্ঞেস করলেন, ‘কে?’

উত্তর আসল, ‘আমি গরিব মানুষ, ক্ষুধার্ত, আপনাদের কাছে এসেছি যেন কিছু পাই।’

স্বামী-স্ত্রী চিন্তা করলেন, প্রয়োজনে আমরা না খেয়ে থাকব, তবুও ভিক্ষুককে খালি হাতে ফেরত দিব না। এই ভেবে রুটিটা নিয়ে ভিক্ষুকের হাতে তুলে দিলেন। তাঁরা শুধু পানি দ্বারা ইফতার করে নিলেন। ভোররাতে সাহরিটাও পানি দিয়েই সেরে নিলেন। পরের দিন আলী রাযি. কিছু কাজ করেছেন তবে পারিশ্রমিক বেশি একটা পান নি। সামান্য পেয়েছেন। যার দ্বারা শুধু একটি রুটি জোগাড় করতে পেরেছিলেন। ওই রুটিটা নিয়েই তাঁরা ইফতার করতে বসলেন। কিন্তু আজকেও দরজায় একই আওয়াজ শুনতে পেলেন। জিজ্ঞেস করলেন, ‘কে?’

উত্তর এল, ‘আমি একজন এতিম, ক্ষুধার্ত, তাই আল্লাহর ওয়াস্তে কিছু সাহায্য করুন।’

স্বামী-স্ত্রী ভাবলেন, এতিমকে ফেরত দেয়া ঠিক হবে না। এই চিন্তা করে রুটিটা তাকে দিয়ে দিলেন এবং নিজেরা পানি পান করে ইফতার করে নিলেন। সাহরির সময়েও শুধু পানি ছিল। তৃতীয় দিন আলী রাযি. কিছু খাবারের জোগাড় করলেন। তবে তাও ছিল একেবারে সামান্য। যা দিয়ে কোনো মতে দুইজনের ইফতারি হবে। কিন্তু এই দিনেও একই ঘটনা ঘটল। দরজায় আওয়াজ পড়ল। বলা হল, ‘আমি একজন ভিক্ষুক, আল্লাহর ওয়াস্তে কিছু ভিক্ষা দিন।’

লাগাতার তিনদিনের ক্ষুধার কারণে উভয়ের অবস্থা ছিল নিদারুণ খারাপ। শরীর একেবারে নেতিয়ে পড়ে ছিল। কিন্তু আজও তাঁরা চিন্তা করলেন, আল্লাহর নাম নিয়ে ভিক্ষা চেয়েছে, এমন লোককে ফেরত দেয়া যায় না। এই চিন্তা করে আজকেও রুটিটা ভিক্ষুকের হাতে তুলে দিলেন। নিজেরা ক্ষুধাকে সয়ে নিলেন। কেন? কারণ, আল্লাহর প্রতি ভালোবাসায় তাঁদের অন্তর এতটাই সিক্ত ছিল যে, আল্লাহর জন্য প্রাণ দেয়াও তাঁদের কাছে সহজ ছিল। আর এটা তো মামুলি রুটি।

আল্লাহ প্রেমিকদের অবস্থা এমনই হয়। তারা আল্লাহর জন্য যে কোনো কষ্ট সহ্য করতে প্রস্তুত থাকেন।

یہ بازی عشق کی بازی ہے جو چاہے لگا دو ڈر کیسا
گر جیت گئے تو کیا کہنا ہارے بھی تو بازی مات نہیں‌

‘প্রেম খেলাতে শরিক হতে থাকবে কেন ভীতি;
জয়ে পাবে বন্ধুর মিলন, হারলে পাবে প্রীতি।’

(চলবে)