তাকওয়ার মাসে তাকওয়ার অনুশীলন

তাকওয়ার মাসে তাকওয়ার অনুশীলন

তাকওয়ার মাসে তাকওয়ার অনুশীলন

মাওলানা উমায়ের কোব্বাদী

হামদ ও সালাতের পর!

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তাআলার জন্য, তিনি আমাদেরকে জুমার নামাজ আদায়ের লক্ষে মসজিদে আসার তাওফিক দান করেছেন। আলহামদুলিল্লাহ।

রমজানের পবিত্রতা রক্ষা করুন

সম্মানিত হাজেরিন! আর কয়েক দিন পরই শুরু হবে রমজান মাস। মাসটিকে কেন্দ্র করে এখন থেকেই দেখা যাবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের বিভিন্ন ধরণের আয়োজন ও আহবান। এখন থেকেই তারা বিভিন্ন ধরণের বিভিন্ন সাইজের বিভিন্ন কালারের পোস্টার ও লিফলেট বিতরণ করবে। ‘রমজানের পবিত্রতা রক্ষা করুন’ শিরোনামে আমাদেরকে বিভিন্ন পরামর্শ দিবে। এটা ভালো। খারাপ নয়। আমরা  মুসলিম সমাজে যে বসবাস করছি; এটা তার কিঞ্চিৎ নমুনা।  আমাদের সালাফগণও আল্লাহর কাছে দোয়া করতেন, যেন মাসটির পবিত্রতা রক্ষা করা যায়। তাবিয়ী ইয়াহইয়া ইবনু আবী কাছীর রহ. বলেন, রমজানের আগমণে সালফে সালিহীন আল্লাহর কাছে এভাবে দোয়া করতেন,

اَللَّهُمَّ سَلِّمْنـِيْ إِلَى رَمَضَانَ وَسَلِّمْ لِـيْ رَمَضَانَ وَتَسَلَّمْهُ مِنِيْ مُتَقَبَّلاً

হে আল্লাহ! আমাকে রমজান পর্যন্ত নিরাপদ রাখুন। রমজানকে আমার জন্য নিরাপদ করুন এবং রমজানের আমলগুলো কবুল করে আমার কাছ থেকে রমজানকে বিদায় করুন। (লাতায়েফুল মাআরিফ ১৪৮)

রোজার মূল মাকসাদ

আসলে এই মাসে রোজা পালন করার মূল মাকসাদ হল, তাকওয়া অর্জন করা। রোজা সংক্রান্ত আয়াতে আল্লাহ তাআলা এটাই বলেছেন যে, لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ যাতে করে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার। রাসুলুল্লাহ ﷺ-ও এটাই বুঝিয়েছেন। এজন্য তিনি বলেন,

لَيْسَ الصِّيَامُ مِنَ الأَكْلِ وَالشُّرْبِ ، إِنَّمَا الصِّيَامُ مِنَ اللَّغْوِ وَالرَّفَثِ

পানাহার থেকে বিরত থাকার নাম রোজা নয়। আসলে রোজা হল, অসার ও অশ্লীল কথা ও কর্ম থেকে বিরত থাকার নাম। (সহিহ ইবনু খুযাইমা ১৯৯৬)
সুতরাং যে ব্যক্তি এই মাসে তাকওয়ার অনুশীলন করতে পারবে না, সে ব্যর্থ হবে। রমজান আসল অথচ সে যেমন ছিল তেমনই রয়ে গেল তাহলে সে রমজানের বেনিফিড লাভ করতে পারে নি।
আমাদের মাঝে তাকওয়া আছে কিনা?
এজন্য আজ ইনশাআল্লাহ তাকওয়ার পরিচয় ও আলামত নিয়ে কিছু কথা বলা হবে। আমাদের আকাবির-আসলাফ তাকওয়া বলতে কী বুঝতেন? একজন ব্যক্তির মাঝে তাকওয়া আছে কিনা; তার আলামত কী? শুধু এই দুটি বিষয় নিয়ে আজ আলোচনা করা হবে। তাকওয়ার উপাকারিতা ইত্যাদি নিয়ে আজ আলোচনা করার সুযোগ হবে না। উদ্দেশ্য হল, প্রথমত, যাতে আমরা নিজেদেরকে একটু যাচিয়ে-খতিয়ে দেখতে পারি, আসলে আমাদের মাঝে তাকওয়া আছে কিনা? দ্বিতীয়ত, যদি না থাকে তাহলে যেন আজ থেকে এর অনুশীলন শুরু করতে পারি, তাওবা করে তাকওয়ার জীবন যাপনের প্রতি যত্নশীল হতে পারি। সর্বোপরি আসন্ন রমজান যেন রহমতের রমজান হিসেবে গ্রহণ করতে পারি এবং লানতের রমজান থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারি। আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে তাকওয়ার জিন্দেগি দান করুন। আমীন।
মূলত তাকওয়া তো এমন এক সম্পদ, যে ব্যক্তি এটি অর্জন করতে পারে আল্লাহ তাআলা তাঁর জন্য হয়ে যান। সে মহান মালিকের ভালোবাসার পাত্র হয়ে যায়। আল্লাহ বলেন, فَإِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُتَّقِينَ নিশ্চয় আল্লাহ মুত্তাকিদেরকে ভালোবাসেন। (সূরা আলি ইমরান ৭৬)
কিছু ত্যাগ স্বীকার করতে হবে
মুহতারাম হাজেরিন! মানুষ দুনিয়ার সামান্য ক্ষণস্থায়ী ভালোবাসার জন্য কত কিছু করে। কত সেক্রিফাইজ করে! চিন্তা করে দেখুন, একজন মানুষ ঘুম থেকে ওঠা থেকে শুরু করতে রাতে বিছানায় যাওয়ার আগ পর্যন্ত মাথার ঘাম পায়ে ফেলে কী পরিমাণ কায়িক পরিশ্রম করে! এত ত্যাগ এত সংগ্রাম এত কুরবানি শুধু এজন্যই তো যে, সে তার বিবি-বাচ্চাকে মহব্বত করে, ফ্যামিলিকে ভালোবাসে। অন্যথায় একজন মানুষ শুধু নিজে চলার জন্য তো এত পরিশ্রমের প্রয়োজন হয় না। সুতরাং দুনিয়ার এই ক্ষণস্থায়ী মহব্বতের তাড়নায় তাড়িত হয়ে যদি আমরা এত কিছু করতে পারি তাহলে আল্লাহ তাআলার চিরস্থায়ী মহব্বতের জন্য কি একটুও কষ্ট স্বীকার করতে পারব না? আল্লাহ তাআলা তো বলেছেন, আমি মুত্তাকিদেরকে ভালোবাসি। অতএব তাঁর ভালোবাসা পাওয়ার জন্য আমাদেরকেও কিছু কুরবানি করতে হবে। কিছু ত্যাগ স্বীকার করতে হবে। কিছু আরাম বিসর্জন দিতে হবে। আমরা সকলেই ইনশাআল্লাহ  এর জন্য প্রস্তুত আছি তো? প্রত্যকেই দৃঢ়তার সাথে বলি—ইনশাআল্লাহ প্রস্তুত আছি।
আল্লাহর ভালোবাসাই চিরস্থায়ী
একজন মুমিন হিসেবে আমাদেরকে এটা বুঝতে হবে যে, আল্লাহর ভালোবাসাই চিরস্থায়ী। এছাড়া সকল ভালোবাসা ক্ষণস্থায়ী। আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় হাবীবকে উদ্দেশ্য করে বলেন,
يَا مُحَمَّدُ ، عِشْ مَا شِئْتَ فَإِنَّكَ مَيِّتٌ ، وَأَحْبِبْ مَنْ أَحْبَبْتَ فَإِنَّكَ مَفَارِقُهُ
হে মুহাম্মাদ! যতদিন খুশী জীবন যাপন করুন। কিন্তু মনে রাখবেন, আপনাকে একদিন মরতেই হবে। যার সাথে খুশী বন্ধুত্ব করুন, ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে তুলুন। কিন্তু মনে রাখবেন, আপনাকে একদিন পৃথক হতেই হবে। (মুসতাদরাকি হাকেম ৭৯২১)
আল্লাহর আরেফ বলেন,

أَلاَ يَا سَاكِنَ الْقَصْرِ الْمُعَلَّى + سَتُدْفَنُ عَنْ قَرِيْبٍ فِى التُّرَابِ

قَلِيْلُ عُمْرُنَا فِي دَارِ دُنْيَا + وَمَرْجَعُنَا إِلَى بَيْتِ التُّرَابِ

‘শোন হে সুউচ্চ প্রাসাদে বসবাসকারী! সত্বর তুমি দাফন হবে মাটিতে। ইহকালে আমরা আমাদের জীবনের অল্প সময়ই কাটিয়ে থাকি। আর আমাদের প্রত্যাবর্তন স্থল হল মাটির ঘরে (কবরে)।’

আল্লাহ তাআলা বলেন,

كُلُّ مَنْ عَلَيْهَا فَانٍ * وَيَبْقَى وَجْهُ رَبِّكَ ذُو الْجَلالِ وَالإِكْرَامِ
এই মহা বিশ্বের সবকিছুই ধ্বংসশীল। একমাত্র আপনার মহিমায় ও মহানুভব পালনকর্তার সত্তা ছাড়া। (সূরা আর রাহমান ২৬,২৭)
মালিককে ভালোবাসবো
আল্লাহর বান্দারা! সুতরাং আমরা আমাদের মালিককে ভালোবাসবো। এটাই আমাদের জন্য মরণের আগেও কাজে আসবে এবং মরণের পরেও কাজে আসবে। যদি আমরা তাকওয়া অর্জন করে তাঁর মহব্বত লাভে সৌভাগ্যবান হতে পারি, তাহলে তিনি আমাদের দুনিয়াও দেখবেন, আখেরাতও দেখবেন। আমাদের সকল পেরেশানি, সকল আহাজারি তিনি একজন অভিবাকের মত; বরং পরম বন্ধুর মত কিংবা একসঙ্গে মিলিয়ে বলতে পারি যে, অভিবাবক-বন্ধুর মত দেখবেন, শুনবেন এবং মুক্তি ও সমাধানের রাস্তাও দেখিয়ে দিবেন। এমনকি যা কোন চোখ কখনো দেখে নি, কান কখনো শুনে নি, মানুষের হৃদয় কখনো কল্পনা করে নি—এমন এক জগতের মেহমান বানিয়ে তাঁর দিদার দ্বারা সম্মানিত করবেন।
শেষ হাসিটা মুত্তাকিরাই হাঁসবে
সামনে রমজান আসছে। তাকওয়া অর্জনের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলাকে মানিয়ে নেয়ার সবচেয়ে সুন্দর সময়। এই তাকওয়াই আমাদেরকে আমাদের মালিকের কাছে নিয়ে যেতে পারবে, তাঁর প্রিয় বানিয়ে দিতে পারবে। যার কারণে যুগে যুগে সকল নবী নিজেদের উম্মতকে এই তাকওয়া অর্জনের তাগিদ দিয়ে গেছেন। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন,
إِذْ قَالَ لَهُمْ أَخُوهُمْ نُوحٌ أَلَا تَتَّقُونَ
إِذْ قَالَ لَهُمْ أَخُوهُمْ هُودٌ أَلَا تَتَّقُونَ
إِذْ قَالَ لَهُمْ أَخُوهُمْ صَالِحٌ أَلَا تَتَّقُونَ
إِذْ قَالَ لَهُمْ أَخُوهُمْ لُوطٌ أَلَا تَتَّقُونَ
إِذْ قَالَ لَهُمْ شُعَيْبٌ أَلَا تَتَّقُونَ

এ সকল আয়াতে বলা হয়েছে নুহ হুদ সালিহ লুত শুয়াইব আলাইহিহিমুস সালামসহ সকল নবী নিজ জাতিকে তাকওয়ার তাগিদ দিয়েছেন।

আল্লাহ তাআলা কোরআন মজিদে তাকওয়ার কথা বলেছেন, একবার নয় , দুইবার নয়; দুইশত আটান্ন বার বলেছেন। তন্মধ্য থেকে সর্ব মোট ৭৬ বার আমাদেরকে  اتَّقُوا বলে সরাসরি তাকওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। তিরমিযির হাদিসে এসেছে, আমাদের নবীজী ﷺও বলেন, اتَّقِ اللَّهِ حَيْثُمَا كُنْتَ ‘তুমি যেখানেই থাকবে তাকওয়া নিয়ে থাকবে।’ তাকওয়া যেন তোমার চব্বিশ ঘণ্টা সময়ের প্রতিটি সেকেন্ডের জন্য নিত্যসঙ্গী হয়। কেন? কারণ হল, فَإِنَّ خَيْرَ الزَّادِ التَّقْوَىٰ সবচেয়ে দামি সম্পদ হচ্ছে তাকওয়া। বুজুর্গানে দীন তো আল্লাহর কাছে দোয়া করতেন এভাবে যে, ‘হে আল্লাহ! ওই সেকেন্ড থেকে পানাহ চাই যে সেকেন্ডে আপনার স্মরণ আমার অন্তরে নেই।’ হাদিস শরিফেও এজাতীয় দোয়া শিক্ষা দেয়া হয়েছে।  فَلَا تَكِلْنِي إِلَى نَفْسِي طَرْفَةَ عَيْنٍ হে আল্লাহ! আমাকে আমার নফসের কাছে চোখের এক পলকের জন্যও ছেড়ে দিবেন না।’ আল্লাহ বিভিন্ন আয়াতে বার বার বলেছেন, শেষ হাসিটা মুত্তাকিরাই হাঁসবে। وَالْعَاقِبَةُ لِلْمُتَّقِينَ আর শেষ ফল তো যারা মুত্তাকী তাঁদের জন্যই। মুত্তাকিরাই জান্নাতের মেহমান হবে। সেখানে তাঁর সঙ্গে দীদারের মহান সুযোগ পাবে। إِنَّمَا يَتَقَبَّلُ اللَّهُ مِنَ الْمُتَّقِينَ আল্লাহ তো মুত্তাকিদেরকেই কবুল করেন।

وہ دل ہی کیا جو ترے ملنے کی دعا نہ کرے
میں تجھ کو بھول کے زندہ رہوں خدا نہ کرے

‘যে অন্তর প্রিয়তমের সঙ্গে সাক্ষাতের কামনা করবে না, সেটা তো অন্তরই নয়। প্রিয়তম! আমি তোমাকে ভুলে গিয়ে জীবিত থাকব; আল্লাহ না করুন এমনটি যেন না হয়।’

তাকওয়ার জিন্দেগি গঠন করুন 

আল্লাহর বান্দারা! সুতরাং আমরা তাকওয়ার মাসে তাকওয়ার প্রতি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিব। এ দুনিয়া তামাশার জায়গা নয়। আল্লাহকে ভুলে গিয়ে জিন্দেগি কাটাবেন তো আফসোস ছাড়া কিছুই পাওয়া যাবে না। যাদেরকে নিয়ে আমাদের সঙ্গ ও স্বপ্ন তারা কোনো উপকারে আসবে না। অতএব, আজ থেকে দৃঢ় সংকল্প করুন, প্রয়োজনে কষ্ট স্বীকার করব, আশা-আকাঙ্খাগুলোকে মাটি দিয়ে দিব, মজা ও বিনোদন ত্যাগ করব। তবুও তাকওয়ার জিন্দেগি তথা আল্লাহকে পাওয়ার জিন্দেগি বানাবো। এই দিল ও দেমাগে আল্লাহর ভয় ও মহব্বত সর্বদা জাগরুক রাখব। হাদিস শরিফে এসেছে,

التَّقْوَى هَاهُنا

তাকওয়ার অবস্থান দিলে। তাকওয়া দিলে থাকে। সুতরাং এই দিল তৈরি করতে হবে। দিলের সব জঞ্জাল দূর করে সেখানে আল্লাহভীতি ঢুকাতে হবে। আল্লাহর আরেফ বলেন,

نہیں دل میں داغ تمنا بھی باقی

انہیں پر سے ان کی نشانی لٹا دی

‘দিলে নেই তামান্নার কোনো নিশানা; তাঁর জন্যই সব মুছে ফেলেছি।’

তাকওয়া বলতে আমরা যা বুঝি 

মুহতারাম হাজেরিন! এবার আসুন, একটি খতিয়ে দেখি, আমি কি মুত্তাকি? যে তাকওয়ার কথা এতক্ষণ পর্যন্ত বলা হল, যার নির্দেশ আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে ছিয়াত্তর বার সরাসরি কোরআন মজিদে দিয়েছেন, সকল নবী তাঁর উম্মতকে যে তাকওয়া অর্জনের কথা বলতেন, অসংখ্য হাদিসে আমাদের নবীজী যে তাকওয়া অবলম্বনের কথা বলেছেন; তা কি আমাদের মাঝে আছে? এর জবাব পেতে হলে সালফে সালেহীন; যারা তাকওয়ার জীবনে অভ্যস্ত ছিলেন; তারা তাকওয়া বলতে কী বুঝতেন–তা আমাদেরকে জানতে হবে। তাঁদের দেয়া তাকওয়ার সংজ্ঞার সাথে আমাদের যাপিত জীবনকে মিলালেই প্রকৃত সত্য বের হয়ে আসবে যে, আমরা আসলে কতটুকু মুত্তাকি! আমরা তাকওয়া বলতে কী বুঝি আর তাঁরা কী বুঝতেন?

এমনিতে তাকওয়া বলতে আমরা বুঝি, আল্লাহভীতি বা আল্লাহর ভয়। হ্যাঁ, এটা তাকওয়ার ভুল পরিচয় নয়। কিন্তু কেবল কি এতটুকু? না এর আরো ব্যাখ্যা আছে? আমাদের এই অসম্পূর্ণ বুঝের কারণে আমাদের মধ্য থেকে কাউকে যদি প্রশ্ন করা হয়, তুমি কি আল্লাহকে ভয় কর? তখন সে সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিবে, হ্যাঁ, করি তো! অথচ তার বাস্তব জীবন কিন্তু তাকওয়া থেকে অনেক দূরে। বাস্তব জীবনে হয়ত তার মাঝে তাকওয়া বলতে কিছুই নেই। গুনাহর মাঝে ডুবে থাকা এবং আমল থেকে দূরে থাকার মাঝেই হয়ত সে জীবনের স্বার্থকতা খুঁজে নিয়েছে। তাকওয়ার পথের পথিক হওয়া তো দুরের কথা, বাস্তবে সে হয়ত এই পথ কখনও মাড়ায়ই নি। অথচ দেখুন, সালফে সালেহীন তাকওয়া বলতে কী বুঝতেন!

সালফে সালেহীনের দৃষ্টিতে তাকওয়া

— আলী রাযি. বলতেন,

هِي الْخَوْفُ مِنَ الْجَلِيلِ، وَالْعَمَلُ بِالتَّنْزِيلِ، وَالْقَنَاعَةُ بِالْقَلِيلِ، والاستعداد لِيَوْمِ الرَّحِيلِ

অর্থাৎ, তাকওয়া হল চারটি বিষয়।  এক. আল্লাহর ভয়। দুই. কোরআনে যা নাযিল হয়েছে তদানুযায়ী আমল। তিন. অল্পে তুষ্টি। চার. শেষ দিবসের জন্য সদা প্রস্তুতি।

তিনি এও বলতেন, المُتّقي مَنْ اتّقى الذُّنوب যে ব্যক্তি গুনাহ থেকে বেঁচে থাকে, সেই মুত্তাকি। এটাও বলতেন, عِنْدَ حُضُورِ الشَّهَوَاتِ وَاللَّذَّاتِ يَتَبَيَّنُ وَرَعُ الْأتقياءِ প্রবৃত্তির কামনা ও মজার তাড়না সামনে আসলে প্রকৃত মুত্তাকিদের পরহেজগারি প্রকাশ পায়। এও বলতেন, رَأْسُ التَّقْوَى تَركُ الشَّهْوَةَ তাকওয়ার মূল হচ্ছে, প্রবৃত্তির কামনা ত্যাগ করা।

ওমর ইবনুল খাত্ত্বাব রাযি. একদিন উবাই ইবনু কা‘ব রাযি.-কে তাকওয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। উবাই রাযি. বললেন, أَمَا سَلَكْتَ طَرِيقًا ذَا شَوْكٍ؟ ‘আপনি কি কাঁটা যুক্ত পথে চলেননি? ওমর রাযি. বললেন, হাঁ। উবাই রাযি. বললেন, فَمَا عَمِلْتَ فِيهِ ؟ কিভাবে চলেছেন? ওমর রাযি.  বললেন, تَشَمَّرْتُ وَحَذِرْتُ খুব সাবধানে ও কষ্ট করে চলেছি। উবাই রাযি. বললেন, فَذَلِكَ التَّقْوَى ‘ওটাই হল তাকওয়া। অর্থাৎ দুনিয়ার জীবনে নিজেকে সমস্ত গুনাহ থেকে এভাবে বেঁচে চলাই হল তাকওয়া।   

— অনুরূপ প্রশ্ন এক ব্যক্তি আবু হুরায়রা রাযি.-কে করেছিলেন যে, তাকওয়া কাকে বলে? তিনি বললেন,أَخَذْتَ طَرِيْقًا ذَا شَوْكٍ؟ তুমি কি কখনো কাঁটাযুক্ত পথে চলেছ? লোকটি বলল, হাঁ। তিনি বললেন, فَكَيْفَ صَنَعْتَ؟ কিভাবে চলেছ? লোকটি বলল, إِذَا رَأَيْتُ الشَّوْكَ عَدَلْتُ عَنْهُ أَوْ جَاوَزْتُهُ أَوْ قَصُرْتُ عَنْهُ আমি কাঁটা দেখলে তা এড়িয়ে চলি। অথবা ডিঙিয়ে যাই অথবা দূরে থাকি। আবু হুরায়রা রাযি. বললেন, ذَاكَ التَّقْوَى এটাই হল তাকওয়া।

— আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ রাযি. বলেন,

أَنْ يُطَاعَ فَلا يُعْصَى , وَأَنْ يُذْكَرَ فَلا يُنْسَى , وَأَنْ يُشْكَرَ فَلا يُكْفَرَ

তাকওয়া হচ্ছে, আল্লাহ্‌র আনুগত্য করা- নাফরমানি না করা, তাঁকে স্মরণ করা- ভুলে না যাওয়া, তাঁর কৃতজ্ঞতা করা- কুফরী না করা।

— ওমর ইবনু আব্দুল আজিজ রহ. বলেন,

لَيْسَ تَقْوَى اللَّهِ بِصِيَامِ النِّهَارِ ، وَلا بِقَيَامِ اللَّيْلِ ، وَالتَّخْلِيطِ فِيمَا بَيْنَ ذَلِكَ ، وَلَكِنَّ تَقْوَى اللَّهِ تَرْكُ مَا حَرَّمَ اللَّهُ ، وَأَدَاءُ مَا افْتَرَضَ اللَّهُ ، فَمَنْ رُزِقَ بَعْدَ ذَلِكَ خَيْرًا فَهُوَ خَيْرٌ إِلَى خَيْرٍ

দিনে রোজা রাখা আর রাতে নফল নামাজ আদায় এবং এর মাঝে আজেবাজে চলার নাম তাকওয়া নয়; বরং প্রকৃত তাকওয়া হচ্ছে, আল্লাহ্‌ যা হারাম করেছেন তা পরিত্যাগ করা, তিনি যা ফরয করেছেন তা বাস্তবায়ন করা। কেউ যদি এর অতিরিক্ত কিছু করতে পারে তবে সোনায় সোহাগা।

ওমর ইবনু আব্দুল আজিজ রহ.-কে এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন,متَى يبلغُ العَبْدُ سنامَ التَقوى؟ বান্দা তাকওয়ার উচ্চ শিখরে কখন পৌঁছে? তিনি উত্তর দিলেন,

إذا وضَعَ جميعَ ما في قلبِهِ من الخَواطرِ في طَبَقٍ ، وطافَ به في السّوقِ لم يستَحِ من شيءٍ فيه إذْ قلبُهُ طاهرٌ مِن بواطنِ الإثمِ

যখন বান্দা তার অন্তরের যা আছে তার সবই একটি প্লেটে সাজিয়ে যদি বাজারে ঘুরে এবং এর কারণে যদি তাকে মোটেও লজ্জিত হতে না হয় তাহলে তার অন্তর গোপন গুনাহসমূহ থেকে পবিত্র এবং সে তাকওয়ার উচ্চ শিখরে উপনীত।

 — তালাক ইবনু হাবীব রহ. বলেন, যখন ফেতনার আগুন দেখা দিবে তখন তা তাকওয়া দ্বারা নিভিয়ে দিবে। শাগরিদরা জিজ্ঞেস করল, তাকওয়া কী? তিনি উত্তর দিলেন,

أنْ تَعمل بطاعةِ اللَّهِ على نُورٍ من الله، تَرجو ثوابَ الله، وأن تَتركَ مَعصيةَ اللهِ على نُورٍ من الله تَخاف عقابَ الله

আল্লাহপ্রদত্ত হেদায়েত দিয়ে আল্লাহর আনুগত্য করবে, এর মাঝে সাওয়াবের আশা করবে। আর আল্লাহপ্রদত্ত হেদায়েত দিয়ে আল্লাহর নাফরমানি ত্যাগ করবে, এ ক্ষেত্রে আল্লাহর আযাবের ভয় করবে।

— জনৈক বুজুর্গ বলেন,

البكاءُ بَيْنَ يَدي اللَّهِ تَقْوَى و الشَّكوى لِغيره مذلة . هل فكّرت يوما أنّكَ غالية على اللَّهِ

আল্লাহর সামনে কাঁদার নাম তাকওয়া। অন্যের সামনে অভিযোগ করার নাম জিল্লতি। তুমি কি একটা দিন ভেবে দেখেছ যে, তুমি আল্লাহর ব্যাপারে অতিরঞ্জনে লিপ্ত!

— আমাদের শায়েখ ও মুরশিদ মাহবুবুলওলামা পীর জুলফিকার আহমদ নকশবন্দী মুজাদ্দেদী দা. বা. বলেন, কোনো গোলাম যদি তার মালিকের সকল আদেশ মেনে চলে এবং সকল নিষেধ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখে তাহলে মালিক তার উপর সন্তুষ্ট হয়ে যায়। অনুরূপভাবে বান্দা যখন আল্লাহ তাআলার আদেশ ও নিষেধ শুনবে এবং তদনুযায়ী জীবন যাপন করবে তাহলে এরই নাম তাকওয়া। আল্লাহ তাআলা তখন ওই বান্দার ওপর সন্তুষ্ট হয়ে যান এবং তাঁকে ভালবাসেন। 

জগতের সব পেয়েছ কেবল আল্লাহকে পাও নি; তুমি কিছুই পাও নি

আল্লাহর বান্দারা! তাকওয়ার যে পরিচয়গুলো আমাদের সামনে এসেছে, এর আলোকে প্রত্যেকেই নিজেকে প্রশ্ন করি, আপনি আপনাকে প্রশ্ন করেন, আমি আমাকে প্রশ্ন করি, আসলেই কি আমার আর আপনার মাঝে তাকওয়া আছে? আমরা কি আসলে মুত্তাকিদের কাতারে পড়ি? আমাদের কাছে সবই আছে, কেবল আল্লাহ নেই, আল্লাহর ভয় নেই, তাঁর প্রতি পরিপূর্ণ মহব্বত নেই।

اس شہر میں سب کچھ ہے بس اک تیری کمی ہے

‘এই শহরে সবই আছে, কেবল শুধু তুমি নেই।’ তো আসলে আমাদের মাঝে কিছুই নেই। মুজাহিদে মিল্লাত শামসুল হক ফরিদপুরী রহ. বলতেন, তুমি জগতের সব পেয়েছ কেবল আল্লাহকে পাও নি তাহলে তুমি কিছুই পাও নি। আর তুমি জগতের কিছুই পাও নি তবে আল্লাহকে পেয়েছ তাহলে মূলত তুমি সব কিছুই পেয়েছ। আমাদের দেশের বরেণ্য আলেমে দীন মুফতি দেলাওয়ার হুসাইন দা. বা.-কে এক বার মুনাজাতে বলতে শুনেছি, হে আল্লাহ! আপনি আমাদের হয়ে যান এবং আমাদেরকে আপনার বানিয়ে নিন। আজ আমাদের মাঝে এই সম্পদেরই অভাব। যার কারণে আমাদের কাছে সব থাকার পরেও শান্তি নেই, নিরাপত্তা নেই। সব আছে, এরপরেও হাহাকার কমে না, অভাব দূর হয় না।

আসুন, আল্লাহর রঙ্গে রঙ্গিন হই

এজন্য আল্লাহর বান্দারা! এখন সংক্ষেপে তাকওয়ার কিছু আলামত বলে দিচ্ছি। আমরা ইনশাআল্লাহ চেষ্টা করব যেন এই আলামত বা গুণগুলো নিজেদের মাঝে নিয়ে আসা যায়। সামনে রমজান আসছে, যেন এমন হয় যে, এই রমজানেই আমরা নিজেদেরকে মুত্তাকিদের কাতারে শামিল করে নিতে পারি। এজন্য দীর্ঘ অনুশীলন বা প্রশিক্ষণ জরুরি। আল্লাহঅয়ালাদের সোহবত প্রয়োজন। তাই চেষ্টা এখন থেকেই শুরু করতে হবে। আল্লাহঅয়ালাদের কাছে যেয়ে যেয়ে এই গুণগুলোর রঙ্গে রঙ্গিন হতে হবে। এটা মূলত আল্লাহর নূর বা তাঁর রঙ।

صِبْغَةَ اللَّهِ ۖ وَمَنْ أَحْسَنُ مِنَ اللَّهِ صِبْغَةً ۖ وَنَحْنُ لَهُ عَابِدُونَ

আমরা আল্লাহর রঙ গ্রহণ করেছি। আল্লাহর রঙ এর চাইতে উত্তম রঙ আর কার হতে পারে? আমরা তাঁরই ইবাদত করি। ( সূরা বাকারা ১৩৮)

دم كے دم میں قلب نورانی ہوئی

مرد حق سے ملکے حقا نی ہوئی

ধীরে ধীরে অন্তর আলোকিত হয়েছে, আল্লাহঅয়ালার সঙ্গে মিলে হক্কানি হয়েছে।

যাই হোক, তাকওয়ার আলামত অনেক। তন্মধ্য থেকে আমাদের মাশায়েখগণ দশটি আলামত বিশেষভাবে উল্লেখ করে থাকেন। যেগুলো এই–

তাকওয়ার দশ আলামত

. যাবতীয় গুনাহ থেকে দূরে থাকা

الابتعاد عن معاصي الله অর্থাৎ যাবতীয় গুনাহ থেকে দূরে থাকা। এটা করতে পারলে আমরা ইনশাআল্লাহ মুত্তাকি হতে পারব। অনেকে বলেন, বর্তমান পরিবেশটাই হল, গুনাহর পরিবেশ। এই পরিবেশে গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা অসম্ভব। আসলে এ জাতীয় কথা তারাই বলে থাকে, যারা মনে করে পরিবেশ পাওয়া গেলে গুনাহ ছাড়ব; অন্যথায় নয়। এরা মূলত গুনাহ ছাড়ে পরিবেশের জন্য; আল্লাহর জন্য নয়। কারণ যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য গুনাহ ছাড়ে, সে পরিবেশের অজুহাত দেয় না। মর্দে মুমিন তো হল সেই যে গুনাহর পরিবেশেও গুনাহ ছাড়তে পারে।

. ইবাদতের প্রতি লালায়িত থাকা

الحرص على طاعات الله অর্থাৎ ইবাদতের প্রতি লালায়িত থাকা। বিশেষত নামাযের প্রতি লালায়িত থাকা। এজন্য অনেকে এক্ষেত্রে বলেছেন, إقامة الصلاة বা নামাজ কায়েম করা। অর্থাৎ পুরুষ হলে মসজিদে জামাতের সঙ্গে নামায আদায় করা। আর নারী হলে ওয়াক্তের শুরুতে নামাজ আদায় করে নেয়া। এ বিষয়ে অলসতা উদাসীনতা কিংবা শীথিলতা প্রদর্শন না করা।

. আল্লাহর নিদর্শনের প্রতি সম্মান প্রদর্শন

تعظيم شعائر الله অর্থাৎআল্লাহর শাআয়ের তথা নিদর্শনসমূহের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা। যে সকল কথা ও কাজ এবং স্থান ও সময়কে আল্লাহ তাআলা ইসলামের জন্য নিদর্শন বা প্রতীক নির্ধারণ করেছেন, এগুলোকে আল্লাহর শাআয়ের বলা হয়। এগুলো মূলত আল্লাহ তাআলার কুদরত ও রহমতের নিদর্শন এবং ইসলামের প্রতীক। এগুলো অনেক। তন্মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হল চারটি–১. কালামুল্লাহ বা কোরআন মজিদ ২. বাইতুল্লাহ ৩. রাসূলুল্লাহ ৪. আল্লাহ তাআলার সকল ইবাদত-বন্দেগী। বিশেষত কালিমা, নামায, যাকাত, সওম, হজ্ব ইত্যাদি। দাঁড়ি টুপি পাগড়ি মসজিদ মাদরাসাও এর মধ্যে আছে। এগুলোর প্রতি শ্রদ্ধা ও ভক্তি রাখা চাই। কেননা এটা তাকওয়ার অন্যতম আলামত। আল্লাহ তাআলা বলেন,

وَمَنْ يُعَظِّمْ شَعَائِرَ اللَّهِ فَإِنَّهَا مِنْ تَقْوَى الْقُلُوبِ

আর কেউ আল্লাহর শাআয়েরের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করলে এটা তো অন্তরস্থ তাকওয়া থেকেই উৎসারিত। (সূরা হজ ৩২)

. আল্লাহর রাস্তায় সম্পদ খরচ করা 

بذل المال في سبيل الله অর্থাৎআল্লাহর রাস্তায় সম্পদ খরচ করা। এটাও তাকওয়ার আলামত। আল্লাহ তাআলা বলেন,  وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنفِقُونَ মুত্তাকিদের অন্যতম গুণ হল, তাঁরা আল্লাহর দেয়া রিজিক থেকে আল্লাহর রাস্তায় খরচ করে।

. সর্বদা আল্লাহর জিকির করা

المداومة على ذكر الله অর্থাৎ সর্বদা আল্লাহর জিকির করা। হাদিস শরিফে এসেছে, এক সাহাবী বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! ইসলামের বিধিবিধান তো অনেক হয়ে গেছে। তাই আমাকে একটা শর্ট লিস্ট করে দিন তথা সংক্ষেপে এমন কিছু বলে দিন, যাতে আমি সব সময় করতে পারি। নবীজী উত্তর দিলেন, لَا يَزَالُ لِسَانُكَ رَطْبًا مِنْ ذِكْرِ اللَّهِ তুমি সব সময় তোমার জিহবাকে আল্লাহর জিকিররত রাখবে। (তিরমিযী ৩৩৭৫)

ہر دم الله الله کر
نور سے اپنا سینہ بھر

جئے تو اس کا ہو کر جی
مرے تو اس کا ہو کر مر

দমে দমে ‘আল্লাহ আল্লাহ’ কর; হৃদয় নূর দ্বারা পূর্ণ কর। বেঁচে থাকলে তাঁরই জন্য বেঁচে থাক, মরণ হলে তাঁরই জন্য হয়ে মর।

. আল্লাহর কাছে তাওবা ও ইস্তেগফার করা

الاستغفار والتوبة إلى الله অর্থাৎ সর্বদা আল্লাহর কাছে তাওবা ও ইস্তেগফার করা। আল্লাহ তাআলা বলেন,

إِنَّ الَّذِينَ اتَّقَوْا إِذَا مَسَّهُمْ طَائِفٌ مِّنَ الشَّيْطَانِ تَذَكَّرُوا فَإِذَا هُم مُّبْصِرُونَ

যাদের মনে তাকওয়া রয়েছে, তাদের উপর শয়তানের আগমন ঘটার সাথে সাথেই তারা (তাওবা ইস্তেগফার করে) সতর্ক হয়ে যায় এবং তখনই তাদের বিবেচনাশক্তি জাগ্রত হয়ে উঠে। (সূরা আরাফ ২০১)
إلهي عبدُكَ العَاصِي أتاكَ
مُقِرًّا بالذُّنوبِ وقد دَعَاكَ
فإن تغفِر فأنتَ لِذَاكَ أهلٌ
وإن تطرُد فمَن يرحم سِواكَ
ইয়া ইলাহী! আপনার গুনাহগার বান্দা আপনারই কাছে এসেছে, নিজের গুনহগুলোর কথা স্বীকার করে নিয়ে আপনাকেই ডাক দিয়েছে। যদি ক্ষমা করেন আর আপনিই তো ক্ষমাশীল। আর যদি ক্ষমা না করেন তাহলে আপনি ছাড়া রহম  করবে কে!
. আল্লাহর জন্য বিনয়ী হওয়া

التواضع لله অর্থাৎ আল্লাহর জন্য বিনয়ী হওয়া। নিজেকে অপর মুসলমান থেকে ছোট মনে করা। এটাও তাকওয়ার আলামত। কেননা, إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِندَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ মুত্তাকিরা আল্লাহর কাছে সম্মানিত। আর বিনয় ছাড়া আল্লাহ কাউকে সম্মানিত করেন না। আল্লাহ তাআলা বলেন,

وَعِبَادُ الرَّحْمَنِ الَّذِينَ يَمْشُونَ عَلَى الْأَرْضِ هَوْنًا

রহমানের বান্দাগণের বৈশিষ্ট্য হল, তাঁরা জমিনে বিনয়ের সঙ্গে বিচরণ করে। (সূরা ফুরকান ৬৩)

রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন,

وَمَا تَوَاضَعَ أَحَدٌ للَّهِ إِلَّا رَفَعَهُ اللَّهُ

কোনো ব্যক্তি বিনয়ী হলে আল্লাহ তাআলা তাঁকে অবশ্যই সম্মানিত করবেন। (মুসলিম ২৫৮৮)

. আল্লাহর সঙ্গে নির্জন সময় কাটানোর প্রতি ভালোবাসা রাখা

حب الخلوة مع الله অর্থাৎ আল্লাহর সঙ্গে নির্জন সময় কাটানোর প্রতি ভালোবাসা রাখা। দুলহান যেমনিভাবে নববধূর সঙ্গে নির্জন সময় কাটানোর জন্য অধীর আগ্রহী ও অস্থির থাকে তেমনিভাবে মুত্তাকি বান্দাও আল্লাহর সঙ্গে কিছুক্ষণ নির্জন সময় কাটানোর জন্য প্রচণ্ড তাড়নায় তাড়িত থাকে। তাঁর একান্ত তামান্না থাকে–

تمنا ہے کہ اب کوئی جگہ ایسی کہیں ہوتی
اکیلے بیٹھے رہتے یاد ان کی دل نشیں ہوتی

তামান্না আমার যদি পেতাম এমন কোনো নির্জনতা; একাকী বসে ভাবতাম তাঁকে দূর করতাম অস্থিরতা।

আল্লাহ তাআলা বলেন,

إِنَّ اللَّهَ مَعَ الَّذِينَ اتَّقَوا وَّالَّذِينَ هُم مُّحْسِنُونَ

নিশ্চয় যারা মুত্তাকি এবং নেক আমলকারী আল্লাহ তাঁদের সঙ্গে আছেন। (সূরা নাহল ১২৮)

. ইনসাফ করা ও জুলুম থেকে দূরে রাখা

إقامة العدل والبعد عن الظلم অর্থাৎ ইনসাফ করা ও জুলুম থেকে দূরে রাখা। এটাও তাকওয়ার একটি আলামত, মুত্তাকিদের অন্যতম গুণ ও বৈশিষ্ট্য। সুতরাং আমরা এর প্রতিও যত্নবান হব। বিশেষ করে আমাদের পারিবারিক জীবনে এই জিনসটার বড়ই অভাব। মানুষ নিজের কাছের মানুষের উপর জুলুম বেশি করে। স্বজনপ্রীতি দেখিয়ে সঠিক সময়ে সঠিক কথা থেকে বিরত থাকে, যা আরেকজনের জুলুমের কারণ হয়। অথচ আল্লাহ তাআলা বলেন,

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَقُولُوا قَوْلًا سَدِيدًا

হে মুমিনগণ! আল্লাহকে ভয় কর এবং সঠিক কথা বল। (সূরা আহযাব ৭০)

১০. সৎ কাজের আদেশ করা ও অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করা

الأمر بالمعروف والنهي عن المنكر অর্থাৎ তাকওয়ার একটি আলামত হল, সৎ কাজের আদেশ করা ও অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করা। এটা তো বর্তমান দুনিয়াতে নাই বললেই চলে। বিশেষত এর দ্বিতীয় অংশ–অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করা। যার দুর্ভিক্ষ বর্তমানে চলছে। তবে এই ক্ষেত্রে লক্ষ রাখতে হবে যে, হক কথা লাঠি নয় যে মেরে দিতে হবে। বরং হেকমত বুদ্ধিমত্তা ও নম্রতার মিশেলে হক কথা বলতে হয়। শাইখুল ইসলাম শাব্বীর আহমদ উসমানী রহ বলেন, হক কথা হক নিয়তে হক তরিকায় বলতে হয়। অন্যথায় সমস্যা সৃষ্টি হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন,

وَتَعَاوَنُواْ عَلَى الْبرِّ وَالتَّقْوَى وَلاَ تَعَاوَنُواْ عَلَى الإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ وَاتَّقُواْ اللّهَ إِنَّ اللّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ

সৎকর্ম ও তাকওয়ার ভিত্তিতে একে অন্যের সাহায্য কর। পাপ ও সীমালঙ্ঘনের ব্যাপারে একে অন্যের সহায়তা করো না। আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা কঠোর শাস্তিদাতা। (সূরা মায়েদা ২)

সম্মানিত হাজেরিন! এতক্ষণের আলোচনায় আশা করি, এটা স্পষ্ট হয়েছে যে, বর্তমানে তাকওয়ার খুবই অভাব চলছে। আমরা আসলে মুত্তাকি হয়ে উঠতে পারি নি। আর কয়েকদিন পরেই শুরু হবে, বছরের সেরা মাস, রমজান মাস। এটি তাকওয়া অনুশীলনের সবচেয়ে উপযুক্ত মাস। এই মাসকে আমরা অবশ্যই তাকওয়া অর্জনে সচেষ্ট থাকব। তাকওয়ার অনুশীলনের মাধ্যমে মাসটি থেকে আল্লাহর রহমত মাগফিরাত ও নাজাত গ্রহণ করব। মনে রাখবেন, আল্লাহ আমাদেরকে তো দিতে চান। কিন্তু প্রশ্ন হল, আমরা নিতে চাই কিনা?

আল্লাহ আমাদের সকলকে আমল করার তাওফিক দান করুন। আমীন।

وَآخِرُ دَعْوَانَا اَنِ الْحَمْدُ لِلّهِ رَبِّ الْعَالَمِيْنَ

অনুলিখন–জুম’আর বয়ান