মুসলিম উম্মাহর বর্তমান অবস্থান কোথায়?

মুসলিম উম্মাহর বর্তমান অবস্থান কোথায়?

শাইখুল ইসলাম মুফতী তাকী উসমানী

অনুবাদ
মাওলানা উমায়ের কোব্বাদী

হামদ ও সালাতের পর!

মুহতারাম সভাপতি জনাব ড. জাফর ইসহাক আনসারী ও সুপ্রিয় উপস্থিতি!
আমি পরম আনন্দিত যে, দেশের একটি শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান কর্তৃক আয়োজিত আজকের বুদ্ধিজীবীসমাজের সেমিনারে আমি একজন ছাত্র হিসেবে যোগদান করার সুযোগ নিতে যাচ্ছি। এ মহতি অনুষ্ঠানে কিছু বলার সৌভাগ্যও আল্লাহর বিরাট এক অনুগ্রহ। আজকের বিষয়বস্তু আমাদের বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই মুহতারাম ড. জাফর ইসহাক আনসারী আমার সম্পর্কে যা বলেছেন_এটা তাঁর সুধারণা ও ভালোবাসাপ্রসূত মন্তব্য। অন্যথায় এ ব্যাপারে শুধু এতটুকু আরজ করব, আল্লাহ যেন বাস্তবে আমাকে এর যোগ্য বানিয়ে দেন।

মুসলিম উম্মাহর দু’টি বিপরীত দিক
আপনারা জানেন যে, আজকের আলোচনার বিষয়বস্তু হলো, মুসলিম উম্মাহর বর্তমান অবস্থান কোথায়?
এটি একটি ব্যাপক বিষয়। যার রয়েছে অনেকগুলো দিক। রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে মুসলিম উম্মাহর অবস্থান কোথায়? জীবনাচারের দিক থেকে তার বর্তমান পজিশন কী? চরিত্র ও শিষ্টাচারের দিক থেকে তার বর্তমান অবস্থান কোথায়? ইত্যাদি।
মোটকথা, আজকের বিষয়বস্তু মূলত একটি জিজ্ঞাসা। যে জিজ্ঞাসাটিকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণে বিভিন্নভাবে উপস্থাপন করা যেতে পারে। যার প্রতিটি জিজ্ঞাসাই বিস্তারিত আলোচনার দাবি রাখে। এক-দু’টি সেমিনারে প্রতিটি জিজ্ঞাসার সমাধান সম্ভব নয়। তাই এর একটিমাত্র দিক নিয়ে আমরা সংক্ষেপে আলোচনা করব। তা হল, মুসলিম উম্মাহ বুদ্ধিবৃত্তিক দৃষ্টিকোণ থেকে কোথায় অবস্থান করছে?
বর্তমানের মুসলিম উম্মাহকে নিয়ে যদি আমরা একটু ভাবি তাহলে দেখতে পাব, দুটি বিপরীতমুখী দিক আমাদের সামনে উপস্থাপিত হচ্ছে। একটি হল, মুসলিম উম্মাহ বর্তমানের ধ্বংস ও অবক্ষয়ের শিকার। পতনের বেলাভূমিতে তার বর্তমান অবস্থান। দ্বিতীয়তঃ অপর দিকে দেখা যায়, এ বেলাভূমিতেই উচ্চারিত হচ্ছে ইসলামী জাগরণের জয়গান। প্রথমটির ফলাফল হল, ভয় ও শঙ্কা। আর দ্বিতীয়টির ফলাফল হল, স্বপ্ন ও আশা। শঙ্কার বেলায়ও আমরা মাত্রাতিরিক্ত নেতিয়ে পড়ি। আশার ক্ষেত্রেও আমরা আকাশকুসুম স্বপ্নের প্রাসাদ নির্মাণ করি।

প্রকৃত সত্য
অধমের কথা হলো, প্রকৃত সত্য এতদু’ভয়ের মাঝামাঝি। এটা সত্য যে, আমরা আজ জাতি হিসাবে পতনোন্মুখ জাতি। আবার এটাও বাস্তব যে, এই পতনের ভেতরেও গোটা মুসলিম বিশ্বে নবজাগরণের সূর অনুভূত হচ্ছে। সুতরাং হতাশা ও নিরাশার ক্লিষ্টতায় একেবারেই নিথর হয়ে যাওয়া যেমনিভাবে আমাদের জন্য উচিত নয়, তেমনিভাবে ইসলামী জাগরণের কিছু স্লোগান-শিরোনাম দেখে উদাসীনতার শিকার হওয়াও আমাদের জন্য শোভনীয় নয়। বরং শঙ্কা এবং আশার আলো-আঁধারিতে যেহেতু আমাদের বর্তমান অবস্থান সেহেতু বিষয়টি সেভাবেই দেখা উচিত।
এ কারণেই মুসলিম উম্মাহর বর্তমান অবস্থান কোথায়— শিরোনামের এই বিষয়বস্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সুবাদে স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন চলে আসে যে, মুসলিম উম্মাহর অবস্থান কোথায় হওয়া এবং কিভাবে হওয়া উচিত? আমি ব্যক্তিগতভাবে নিরপক্ষ দৃষ্টিকোণে যা বুঝি তা হলো, অনেক বিষয়ে এবং জীবনের বহু অধ্যায়ে আমরা কেবল অধঃপতনের শিকারই নয় বরং বাস্তব অর্থেই অধঃপতিত। কিন্তু তা সত্ত্বেও আলহামদুলিল্লাহ মুসলিম উম্মাহর প্রায় প্রতিটি অঞ্চলে এই অনুভূতি সৃষ্টি হচ্ছে যে, আমাদেরকে মূলের দিকে ফিরে যাওয়া উচিত এবং ইসলামকে পৃথিবীর বুকে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। এই অনুভূতিকেই বর্তমানে ‘আসসাহওয়াতুল ইসলামিয়া’ বা ইসলামী জাগরণ নামে অভিহিত করা হয়।

ইসলাম থেকে দূরে অবস্থান এবং একটি উদাহরণ
কুদরতের বিস্ময়কর কারিশমা যে, মুসলিম বিশ্বের রাজনৈতিক বাগডোর যাদের হাতে তাদের অবস্থা দেখলে মনে হয়, ইসলাম থেকে দূরে অবস্থানের সীমা একেবারে শেষ পর্যায়ে।
একটি ঘটনা। যার তিক্ত অভিজ্ঞতা আমার হয়েছে। ঘটনাটি যদি আমার নিজের সঙ্গে না ঘটত তাহলে হয়ত আমার নিকট বিশ্বাসযোগ্য হতো না। কিন্তু যেহেতু আমার সঙ্গে ঘটনাটির সম্পর্ক তাই বিশ্বাস করা ছাড়া আর কোন উপায় নেই।
একবার একটি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে প্রসিদ্ধ এক মুসলিম রাষ্ট্রে গিয়েছিলাম। দলের পক্ষ থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, রাষ্ট্রপ্রধানের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় আমরা তাকে এক কপি কোরআন মাজিদ হাদিয়া দিব। যথারীতি বিষয়টি প্রটোকলকে জানানো হয়। কিন্তু একদিন পরে আমাদেরকে জানানো হয়েছে, রাষ্ট্রপ্রধানকে কোরআন মাজিদ হাদিয়া দেওয়া যাবে না। এর কারণ হিসেবে আমাদেরকে বলা হয়, এতে দেশের সংখ্যালঘুদের মাঝে ভুল বুঝাবুঝির সৃষ্টি হবে। সুতরাং কোরআন মাজিদ হাদিয়া নেওয়ার ব্যাপারে তিনি অপারগ। এর পরিবর্তে প্রয়োজনে অন্য কিছু হাদিয়া দেওয়া যেতে পারে।
সরকারি ও রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে ইসলামের আজ এই অবস্থা!

ইসলামী জাগরণের একটি দৃষ্টান্ত
উত্তর শুনে আমরা তো হতবাক। সন্ধ্যা বেলায় আমাদের মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়ার সুযোগ হয়। দেখলাম, মসজিদ কানায় কানায় পূর্ণ। প্রবীণ নয় বরং তরুণদের উপস্থিতি বেশি। নামাজশেষে তরুণরা মসজিদের একদিকে বসে পড়ে এবং আলাপচারিতায় লিপ্ত হয়ে যায়। খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম এটা তাদের প্রতিদিনের আমল। নামাজশেষে সকলে প্রতিদিন বসে এবং একটি কিতাব থেকে কিছু পড়া হয়। তারপর পঠিত বিষয়ের উপর পারস্পরিক আলাপ-আলোচনা হয়। আরো জানলাম, এই আমলটি শুধু এই মসজিদে নয় বরং দেশের সকল মসজিদে নিয়মতান্ত্রিকভাবে চলে। অথচ এরা অধিকাংশই তরুণ-যুবক। প্রথাগত কোন সংগঠন তাদের নেই। তবুও এমন মহৎ কাজ সুবিন্যস্তভাবে তাদের মাঝে চলে আসছে।

মুসলিম বিশ্বের সারচিত্র
রাজনীতি ও নেতৃত্বের ক্ষেত্রে বর্তমান মুসলিম বিশ্ব ইসলাম থেকে একেবারে পিছিয়ে আছে– উক্ত আলোচনা থেকে এ ধারণাটুকু নিশ্চয়ই আপনারা পেয়েছেন। অপরদিকে তরুণ প্রজন্ম ইসলামের প্রতি ধীরে ধীরে ধাবিত হচ্ছে– এটাও নিশ্চয় অনুভব করেছেন। মোটকথা, মুসলিম বিশ্বের বর্তমান অবস্থা পর্যবেক্ষণ করলে যে সারচিত্রটি ভেসে উঠে তা হলো, রাজনৈতিক অঙ্গনগুলো ইসলামের সঙ্গে করছে শত্রুতামূলক আচরণ। কিংবা অন্তত ইসলাম তাদের কাছে অপ্রিয়। ইসলামের প্রতি তাদের কোনো আকর্ষণ নেই। পক্ষান্তরে একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের মাঝে বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মাঝে ইসলাম ক্রমান্বয়ে ভরসার কেন্দ্র হয়ে উঠছে। মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন রাস্ট্রে বাস্তবমুখী কর্মসূচি পালিত হচ্ছে। মানবতার মুক্তির জন্য ইসলামের প্রয়োজনীয়তা তীব্র হয়ে উঠছে। ইসলামী বিধান বাস্তবায়নের সন্তোষজনক পদক্ষেপগুলো তরুণদের কাছে গৃহীত হচ্ছে।

ইসলামের নামে জীবনবাজি
এ পথে চলছে যথেষ্ট সংখ্যক ত্যাগ ও কুরবানী। বিভিন্ন রাষ্ট্রে ইসলাম বাস্তবায়ন করার যেসব আন্দোলন পরিচালিত হচ্ছে, এতে অনুমিত হয়, ইসলামের জন্য জান-মালের কোরবানির সংখ্যা নিতান্ত কম নয়। বাস্তবতা হল, এদিকটা আমাদের জন্য গর্বযোগ্য। মিসর আলজেরিয়াসহ অন্যান্য রাষ্ট্রে ত্যাগের যে নজির পাওয়া যাচ্ছে এবং ইসলামী শরীয়ত প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জন্য যে সকল কোরবানি উপস্থাপিত হচ্ছে তা নিঃসন্দেহে উম্মতের জন্য গর্বের বিষয়। এতে প্রতীয়মান হচ্ছে, আজও ঈমানের বিচ্ছুরণ আল্লাহর ফজলে মুসলমানদের অন্তরে বিদ্যমান রয়েছে।

আন্দোলনগুলো ব্যর্থ কেন?
কিন্তু এত সব প্রচেষ্টা ও তৎপরতা সত্ত্বেও একটি বিস্ময়কর দৃশ্য আমরা দেখতে পাই যে, কোন আন্দোলনে বর্তমানে সফলতার শীর্ষ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারছে না। মাঝপথে এসে তাদের কার্যক্রম নিথর হয়ে যাচ্ছে। কিংবা অজানা কোন কারণে স্থবির হয়ে পড়ছে। কিংবা ষড়যন্ত্রের কাল হাত তাদের টুঁটি চেপে ধরছে। ফলে এসব আন্দোলন আশানুরূপ কোন প্রভাব সৃষ্টি করতে পারছে না।
প্রশ্ন হল আন্দোলনগুলো এ নির্মম পরিস্থিতির শিকার কেন হচ্ছে? জাগানিয়া-আন্দোলন, ত্যাগী-সংগঠন, অগণিত প্রচেষ্টা, সময় ও শক্তি ব্যয়, অদম্য স্পৃহা কেন ব্যর্থতায় পর্যবসিত হচ্ছে?
এটি একটি জিজ্ঞাসা। প্রত্যেকেরই আজ এই নিয়ে ভাবা উচিত। একজন তালিবে ইলম হিসাবে আমি এই নিয়ে বারবার ভেবেছি। আর সে ভাবনাই আজ এই সেমিনারে উপস্থাপন করতে চাচ্ছি। আমাদের এত চেষ্টা-তৎপরতা সফলতার মুখ দেখছে না কেন এবং কিভাবে আমরা এ পরিস্থিতি থেকে কেটে উঠবো?
এ প্রসঙ্গে আমি এমন এক স্পর্শকাতর কথা আপনাদেরকে শুনাবো, যার সঠিক ব্যাখ্যা না করতে পারলে আমার আশংকা হয় যে, ভুল বুঝাবুঝির সৃষ্টি হবে। আশঙ্কাকে মাড়িয়ে তবুও আমি এ বিষয়ে আপনাদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে চাই– আমার মতে যেটি ব্যর্থতার মূল কারণ। দিল-দেমাগ ঠাণ্ডা রেখে এ বিষয়ে সকলের একটু চিন্তা করা উচিত বলে আমি মনে করি।

অমুসলিমদের ষড়যন্ত্রসমূহ
ইসলামী আন্দোলনগুলো সফল না হওয়ার পেছনে যে কারণটি আমরা সকলেই জানি তাহল, ইসলামবিদ্বেষীদের অব্যাহত ষড়যন্ত্র। এবিষয়ে বিস্তারিত আলোচনার প্রয়োজন নেই। যেহেতু এটা সম্পূর্ণ জানা কথা। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে আমি যা বিশ্বাস করি তা হলো, অনৈসলামিক শক্তিগুলো মুসলিম উম্মাহর ক্ষতিসাধনে ততক্ষণ পর্যন্ত সফল হয় না যতক্ষণ না মুসলিম উম্মাহর ভেতরেই ঘুণে ধরে যায়। উম্মাহর ভিতরে পচন ধরলেই বহিরাগত ষড়যন্ত্র সফল হয়। তখনই শুরু হয় অধঃপতনের ধারা। অন্যথায় রাসূলুল্লাহ -এর যুগ থেকে এ পর্যন্ত ইসলাম কখনো ষড়যন্ত্রর কবল থেকে মুক্ত ছিল না। ষড়যন্ত্রের পথ ধরে মুসলিম উম্মাহকে চলতে হবে। ষড়যন্ত্র আপনাআপনি বন্ধ হবে– এ ধরনের আশাবাদ আত্মপ্রবঞ্চনা বৈ কিছু নয়।

ষড়যন্ত্রগুলো সফল কেন?
ভাবনার বিষয় হলো, কী সেই ত্রুটি-বিচ্যুতি যার ছিদ্রপথে ষড়যন্ত্রগুলো অনুপ্রবেশ ঘটে এবং অবশেষে সফল হয়? ভাবতে হবে এজন্য– যেহেতু আমাদের পতনোন্মুখ অবস্থা আলোচনা যখন উঠে তখনই আমরা সকল দোষ ষড়যন্ত্র নামক শব্দটির ঘাড়ে চাপিয়ে দেই। বলি–অমুকের ষড়যন্ত্রে কিংবা অমুকের বপিত বীজের কারণে আমরা অকেজো হয়ে পড়েছি। এ ধরনের বক্তব্য ঝেড়ে আমরা দোষ মুক্ত হওয়ার হাস্যকর কসরত করি! অথচ ভাবনার বিষয় হলো, আমাদের নিজেদের মাঝে কোন দোষটি বর্তমান? কোন অযোগ্যতার কারণে আমরা আজ লাঞ্চিত-বঞ্চিত?
এ প্রসঙ্গে দুটি মৌলিক বিষয়ের প্রতি আপনাদের মনোযোগ আকর্ষণ করছি, যেগুলো আমাদের ব্যর্থতার অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে।

ব্যক্তি গঠনে উদাসীনতা
তন্মধ্যে প্রথমটি হল, ব্যক্তি গঠনে আমাদের অনাগ্রহ। আমি বুঝাতে চাচ্ছি, জ্ঞানী মাত্রই জানেন যে, জীবনের সকল ক্ষেত্রেই ইসলামের শিক্ষা রয়েছে। ব্যক্তি সমাজ কিংবা রাষ্ট্র সকলের জন্য ইসলাম এক অনুপম আদর্শ। এসকল ক্ষেত্রে ইসলামের রয়ছে স্বতন্ত্র নির্দেশনা। অন্য ভাষায় বলা যেতে পারে, ইসলামের বিধানগুলোতে যেমনিভাবে ব্যক্তির কথা রয়েছে অনুরূপভাবে রয়েছে সমষ্টির কথাও। উভয়ের মাঝে রয়েছে ইসলামের বিধানাবলীর এক সোনালী যোগসূত্র। তা রক্ষা করলে জীবনের মাঝে আসবে ভারসাম্য। তখনই আমল হবে ইসলামের সকল বিধানের উপর– একযোগে এবং একই সাথে। আর যদি তম্মধ্যে থেকে যে কোন একটি দিককে ছেড়ে দেওয়া হয় অথবা অতিমাত্রায় গুরুত্ব দেওয়া হয় কিংবা মোটেও গুরুত্ব দেওয়া না হয় তাহলে ইসলামের সৌন্দর্য ও সঠিক সামঞ্জস্য প্রতিভাত হবে না। ব্যক্তি ও সমষ্টির মাঝে ইসলামের ভারসাম্য আমরা নষ্ট করে ফেলেছি এবং এরই ফলে অগ্রাধিকারের বিন্যাসধারার মাঝে আমরা জট পাকিয়ে ফেলেছি।

সেক্যুলারিজম ও তার প্রতিরোধ
একটা সময় ছিল যখন মানুষ সেক্যুলারিজমের অপপ্রচারে প্রভাবিত হয়ে ইসলামকে মসজিদ-মাদ্রাসা নামাজ রোজা ও নির্দিষ্ট কিছু ইবাদতের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলেছিল। এক কথায়, ইসলামকে প্রাইভেট জীবনের মাঝে আবদ্ধ করে দিয়েছিল। আর এটাই হল, সেক্যুলারিজমের দর্শন। অর্থাৎ ধর্ম মানুষের ব্যক্তিগত বিষয়। রাজনীতি সমাজনীতি ও রাষ্ট্রনীতির সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই। মানুষ কেবল ব্যক্তিগত জীবনে ধার্মিক হবে! এই ত্রুটিপূর্ণ দর্শন যখন সেক্যুলারিজম পেশ করে তখন আমাদের সমাজে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ইসলামী বুদ্ধিজীবী সামনে এগিয়ে আসেন এবং উক্ত মতবাদের খণ্ডন করেন। এই সুবাদে তারা বক্তব্য পেশ করেন যে, ইসলাম শুধু মানুষের প্রাইভেট জীবনের জন্যই নয়। বরং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে রয়েছে ইসলামের সুনির্দিষ্ট বিধানাবলী। ইসলাম যেমনিভাবে ব্যক্তিজীবনের জন্য তেমনিভাবে সমষ্টিগত জীবনের জন্যও।

উক্ত বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিরোধের নেতিবাচক প্রভাব
কিন্তু আমরা উক্ত বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিরোধকে গ্রহন করেছি অন্যভাবে। এর ফলে আমরা ব্যক্তিগত জীবনের ক্ষেত্রে ইসলামের বিধানাবলীকে দূরে ঠেলে দিয়েছি কিংবা কমপক্ষে অগুরুত্বপূর্ণ ভেবে বসেছি। যেমন একটা দৃষ্টিভঙ্গি ছিল যে, বলা হত–دع مَا لِقَيْصَرَ لِقَيْصَرَ وَمَا لِلّهِ لِلّهِ অর্থাৎ, ‘কাইজারের প্রাপ্য কাইজারকে দাও এবং আল্লাহর প্রাপ্য আল্লাহকে দাও।’
এর অর্থ হলো,ধর্মকে রাজনীতির অঙ্গনে টেনে আনার প্রয়োজন নেই। এই দৃষ্টিভঙ্গির তীব্র ধাক্কায় ধর্ম নিক্ষিপ্ত হয়েছে রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে অনেক দূরে।
তাই উক্ত দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিরোধকল্পে নতুন আরেকটি দৃষ্টিভঙ্গি জন্ম নিল। যেখানে রাজনৈতিক বিষয়ে ধর্মকে এমন জোরালোভাবে পেশ করা হল, যার ফলে অনেকেই মনে করে বসল– ইসলাম মানেই রাজনীতি।
রাজনীতি ইসলামের বহির্ভূত কিছু নয় বরং এক্ষেত্রে রয়েছে ইসলামের বিধানাবলী– একথা আপন জায়গায় অবশ্যই সঠিক। কিন্তু ইসলাম মানেই রাজনীতি কিংবা রাজনৈতিকভাবে দীন প্রতিষ্ঠা করাই ইসলামের একমাত্র লক্ষ্– এ ধরনের ধারণা মোটেও সঠিক নয়। এতে ইসলামের সঠিক মূল্যায়ন হয় না এবং ইসলামের বিধানাবলীর বিন্যাসধারা সমুন্নত থাকে না। এ দৃষ্টিভঙ্গিকে মেনে নেওয়ার অর্থ হল, রাজনীতিকে ইসলামাইজেশন করার পরিবর্তে রাজনীতিকরণ করে ফেলা এবং ব্যক্তিজীবনের ক্ষেত্রে ইসলামের যে অনুপম আদর্শ রয়েছে তা থেকে নিজেদেরকে বঞ্চিত করে নেওয়া।

রাসূলুল্লাহ এর মক্কী জীবন
বিশ্বনবী মুহাম্মদ -এর পবিত্র জীবন আমাদের জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ের জন্যই সর্বোত্তম আদর্শ। তাঁর তেইশ বছরের জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ই আমাদের জন্য সর্বোত্তম আদর্শ। তাঁর তেইশ বছরের নবুওয়তী জীবন দু’ভাগে বিভক্ত। মক্কী জীবন এবং মাদানী জীবন। মক্কী জীবনের পরিধি ছিল তের বছর। আর মাদানী জীবনের ব্যপ্তি ছিল দশ বছর। তাঁর মক্কী জীবনের প্রতি লক্ষ্য করলে দেখা যায়, এর মাঝে রাজনীতি রাষ্ট্রনীতি ও যুদ্ধ-লড়াই ছিল না। এমনকি চড়ের প্রতিউত্তরে তিনি চড় দেন নি বরং বিধান ছিল, কেউ অন্যায়ভাবে আঘাত করলে তুমি সহ্য করে যাও। ইরশাদ হয়েছে–

وَاصْبِرْ وَمَا صَبْرُكَ إِلَّا بِاللَّهِ
আর তোমরা ধৈর্য ধারণ করো। ধৈর্য তো আল্লাহরই জন্য।

আঘাতের পরিবর্তে পাল্টা আঘাত করা যাবেনা– এই ছিল তখনকার বিধান। অথচ তখন মুসলমানরা দুর্বল থাকলেও এতটা দুর্বল তো ছিল না যে, কেউ দুই হাত চালালে তার উপর এক হাত চালানো যাবে না কিংবা কমপক্ষে তার হাত দমিয়ে দেওয়া যাবে না । অন্তত এতটুকু শক্তি মুসলমানদের ছিল। তবে তখনও বিধান ছিল, ধৈর্যধারণের। প্রতিশোধের বিধান তখনও দেওয়া হয় নি।

মক্কায় হয়েছিল ব্যক্তি গঠন
উক্ত বিধান তখন কেন দেওয়া হয়েছিল? কারণ, গোটা মক্কী জীবনের একটাই উদ্দেশ্য ছিল, তাহল, এমন লোক তৈরি করা–যারা অনাগত ভবিষ্যতে ইসলামের বোঝা বহনে সক্ষম হবে। তের বছরের মক্কী জীবনের সারকথা ছিল একটাই– জ্বলে পুড়ে এরা মানুষ হবে। তাদের আমল ও চরিত্র পবিত্র হবে। ঈমান-আকিদা সুদৃঢ় হবে। এভাবে তারা পরিণত হবে সোনালী মানুষে। এদের দ্বারাই যুগ নির্মিত হবে। এদের সম্পর্ক থাকবে আল্লাহর সঙ্গে। তাঁরই সামনে জবাবদিহীতার অনুভূতি এদের মাঝে সদা জাগরুক থাকবে।

মানবীয় উৎকর্ষ
দীর্ঘ তের বছর ব্যক্তিগঠন-প্রক্রিয়া পরিচালিত হওয়ার পর সূচনা হয় মাদানী জীবনের। সে সময়ে ইসলামী রাষ্ট্রের অস্তিত্ব ঘটে এবং ইসলামের বিধান ও দণ্ডবিধিও প্রতিষ্ঠিত হয়। মোটকথা, একটি পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রের জন্য যত কিছু প্রয়োজন সবকিছুই পরিপূর্ণভাবে বিশ্বমঞ্চে উপস্থাপিত হয়। যেহেতু মানবীয় উৎকর্ষের ট্রেনিংকোর্স নবীজি -এর মক্কী জীবনে সম্পন্ন হয়। তাই একটি পরিপূর্ণ রাষ্ট্রের অধিকারী এবং বিশ্ব নেতৃত্বের আসনে আসীন হলেও তাঁদের হৃদয়ের ধারেকাছেও কখনো এ চিন্তা আসেনি যে, আমাদের উদ্দেশ্য হলো শুধু রাষ্ট্রগঠন কিংবা ক্ষমতাগ্রহণ। বরং ক্ষমতার সর্বোচ্চ আসনে থেকেও আল্লাহ তাআলার সঙ্গে সম্পর্ক তাদের মাঝে পূর্ণমাত্রায় ছিল এবং দ্বীন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে যুদ্ধ -জেহাদেও তারা তাদের পূর্ণ তৎপর ছিল। ইতিহাস সাক্ষী, এক অমুসলিম অফিসার সাহাবায়ে কেরামের সোনালী চরিত্রের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছিলেন–

رهبان بالليل وركبان بالنهارঅর্থাৎ দিনের আলোতে তারা ছিলেন সর্বোত্তম শাহসাওয়ার। বীরত্ব ও সৌন্দর্যের ক্ষেত্রে অনন্য নামদার এবং রাতের নিশীথে ছিলেন অনুপম ইবাদতগুজার। আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ার ক্ষেত্রে ছিলেন তারা খুবই চমৎকার।
সারকথা, সাহাবায়ে কিরামের মাঝে দু’টি বৈশিষ্ট্য ছিল। প্রথমটি হলো, সাধনা ও আমল। দ্বিতীয়টি হলো আল্লাহর সঙ্গে গভীর সম্পর্ক। এ দু’টি বৈশিষ্ট্য একজন মুসলমানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্য থেকে একটি উপেক্ষিত হলে ইসলামের সঠিক চিত্র প্রস্ফুটিত হবে না।

আমরা এক দিকে ঝুঁকে পড়েছি
সাহাবায়ে কেরাম এক মুহূর্তের জন্য ভাবেননি যে যেহেতু আমরা উচ্চ মর্যাদার সমৃদ্ধ আমরা জিহাদ শুরু করেছি এবং বিশ্বময় ইসলাম প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায় লিপ্ত আছি সুতরাং আমাদের জন্য তাহাজ্জুদের কি প্রয়োজন আল্লাহর সামনে কান্নাকাটি কি দরকার আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি ঝক্কি ঝামেলা আমরা কেন পোহাবো ধরনের অর্থহীন চেতনা তাদের মাঝে মোটেও ছিল না বরং তারা যথারীতি এবাদত করেছেন সঙ্গে সঙ্গে ইসলাম প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত আঞ্জাম দিয়েছেন।
অথচ আমাদের অবস্থা হলো সাহাবা চিত্রের সম্পূর্ণ বিপরীত সেকুলারিজমের উপর আঘাত করতে গিয়ে আমরা রাজনীতিকে ইসলামের অঙ্গ সমস্ত করেছি বটে তবে এর মাঝে আকণ্ঠ ডুবে গিয়েছে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি আর শুধু রাজনীতি মুখী দৃষ্টিভঙ্গির উপর আমল করতে গিয়ে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি আলোকিত পথ আমরা হারিয়ে ফেলেছি তাহাজ্জুদের এবাদতের মজা কান্নাকাটি করা আমাদের নিকট আজ উপেক্ষিত চিন্তাগত ভাবে কিংবা অন্তত আমি ভাবে আমরা এদিক থেকে একেবারে বঞ্চিত হলে ক্ষমতা রাজনীতি আজ আমাদের মুখ্য উদ্দেশ্য এবং ব্যক্তিগত আমাদের নিকট পুরোপুরি গুরুত্বহীন।

ব্যক্তিগঠনের চিন্তা থেকে আমরা উদাসীন
সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের উপর অতিমাত্রায় জোর দিতে গিয়ে ব্যক্তিগঠনের চিন্তা আমরা ভুলে যাওয়ার অশুভ প্রতিক্রিয়াই বর্তমানের ইসলামের সংগঠনগুলোকে পঙ্গু করে দিচ্ছে। অন্যথায় এসব আন্দোলন ও সংগঠনের কর্মীদের মাঝে ইখলাস ও জযবার তো কমতি নেই। তবে যেহেতু দ্বিতীয় বিষয়টি তাদের মাঝে নেই, তাই সফলতার দিগন্তে তারা আশার কোনো ঝিলিক দেখছে না।
রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ইসলাম প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা অবশ্যই প্রশংসার যোগ্য। কিন্তু পাশাপাশি ব্যক্তিগঠনের প্রচেষ্টাও থাকতে হবে। কোরআন মজিদের স্পষ্ট বক্তব্যের প্রতি লক্ষ্য করুন–

إِن تَنصُرُوا اللَّهَ يَنصُرْكُمْ وَيُثَبِّتْ أَقْدَامَكُمْ

‘যদি তোমরা আল্লাহর সহযোগিতা করো আল্লাহ তোমাদেরকে সহযোগিতা করবেন এবং তোমাদের অবস্থা সুদৃঢ় করবেন।’
এই আয়াতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, নুসরত-বিজয় ও পৃথিবীর বুকে সুদৃঢ় অবস্থান মুসলিম উম্মাহর ভাগ্যে জুটবে। কিন্তু এর জন্য একটি শর্ত পূরণ করতে হবে। আর তা হলো, সর্বাবস্থায় তারা আল্লাহমুখী থাকতে হবে। আল্লাহর সাহায্য তখনই আসবে যখন তার সঙ্গে সম্পর্ক শুরু হবে। এর মাঝে ঢিলেমিপনা চলে আসলে সাহায্য পাওয়ার উপযুক্ত তারা থাকবে না
ব্যক্তির সঙ্গে সম্পৃক্ত ইসলামের শিক্ষাসমূহ যদি সঠিকভাবে গ্রহণ করা হয় তাহলে সে ব্যক্তি পরিশীলিত জীবনের স্নিগ্ধতা পায়। এ ব্যক্তি গঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার মধ্যে যেমনিভাবে ইবাদতসমূহ রয়েছে তেমনিভাবে চারিত্রিক পবিত্রতার বিষয়সমূহও রয়েছে। এ সম্পর্কে কোন ব্যক্তি গাফলতি করলে কিংবা ব্যক্তিগঠনের  তারবিয়ত ত্রুটিপূর্ণ থাকলে তার অনিবার্য কুফল হলো, তার সকল সংগ্রাম-প্রচেষ্টা অবশ্যই ব্যর্থ হবে।
ব্যক্তিগত জীবনে নিজে পরীশীলিত না হয়ে যদি অন্যকে শুদ্ধ করার চেষ্টা করে তাহলে তার কথা ও কাজের কোনো সুফল আসতে পারে না। মানুষের মাঝে তার কোন মূল্য থাকে না। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তিজীবনে পবিত্র হবে, যার চরিত্র অনুপম হবে তার শুদ্ধি অভিযান সফল হবে। সেই ব্যক্তি অন্যকে আত্মশুদ্ধির প্রতি আহবান করলে এর সুন্দর প্রভাব অবশ্যই পড়বে; বরং এমন ব্যক্তিই অপরের অন্তরে রেখাপাত করতে পারে। কেননা চারিত্রিক অশুদ্ধতা ও আমলী ত্রুটির পথ ধরেই সমূহ ফেতনা জনসমাজে আসে। এর ফলে ধন-সম্পদের লোভ অন্তরে গেঁড়ে বসে। সামনে এগোতে গিয়ে তখনই মানুষ হোঁচট খায়। তখন ক্রেডিট অর্জনের স্বপ্ন মানুষকে গ্রাস করে ফেলে। এ জাতীয় মানুষের প্রতিটি কাজ হয় লোক-দেখানোর উদ্দেশ্যে। আর ইখলাসশূন্য আমল নিয়ে মানুষ কখনো মনজিলে মকসুদে পৌঁছুতে পারে না। এটাই স্বাভাবিক।

প্রথমে নিজেকে শুদ্ধ করার ফিকির কর
এ প্রসঙ্গে কোরআন মজীদের একটি আয়াত এবং রাসূলুল্লাহ -এর একটি হাদিস সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। কোরআন মজীদে আল্লাহ তাআলা বলেছেন,

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا عَلَيْكُمْ أَنفُسَكُمْ ۖ لَا يَضُرُّكُم مَّن ضَلَّ إِذَا اهْتَدَيْتُمْ ۚ إِلَى اللَّهِ مَرْجِعُكُمْ جَمِيعًا فَيُنَبِّئُكُم بِمَا كُنتُمْ تَعْمَلُونَ

‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদের খবর নাও। (নিজেদেরকে পরিশুদ্ধ করার ফিকির করো।) যদি তোমরা সঠিক পথে পরিচালিত হও, তবে যারা পথচ্যুত হয়ে পথভ্রষ্ট পথে চলেছে তারা তোমাদেরকে বিচ্যুত করতে পারবে না। আল্লাহর দিকেই তোমাদের সকলকে ফিরিয়ে যেতে হবে। তিনি সেই সময় জানিয়ে দিবেন যে, তোমরা দুনিয়াতে কি আমল করেছিলে।’ (সূরা মায়িদা ১০৫)
হাদীস শরীফে এসেছে, আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার পর এক সাহাবী রাসুলুল্লাহ -কে জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! এ আয়াতে নিজের ফিকির করার কথা বলা হয়েছে, আরও বলা হচ্ছে–কেউ পথভ্রষ্ট হলে তোমাদের কিছু যায় আসে না। তাহলে আমরা কি সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ ছেড়ে দিব? দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ আমরা কি করব না? প্রতি উত্তরে রাসূলুল্লাহ বলেছেন, না, ব্যাপারটা এমন নয়। বরং তোমরা দাওয়াত-তাবলীগ করতে থাকো। তারপর তিনি বলেছেন,

إِذَا رَأَيْتَ شُحًّا مُطَاعًا وَهَوىً مُـتَّـبَـعًا وَدُنْـيَا مُؤْثَـرَةً وَإِعْجَابَ كُلِّ ذِي رَأْيٍِ بِرَأْيِهِ فَعَلَيْكَ بِخَاصَّةِ نَفْسِكَ وَدَعْ عَنكَ أَمْرَ الْعَامَّـةٍ

যখন সমাজে চারটি জিনিসের ছড়াছড়ি তুমি দেখবে, সে সময় তুমি নিজের ফিকির করবে। প্রথমত, অর্থের প্রতি লোভাতুর হয়ে যখন মানুষ তার সামনে নতজানু হয়ে যাবে। প্রতিটি কাজ অর্থের জন্যই করবে। দ্বিতীয়ত, মানুষ যখন প্রবৃত্তির দাসে পরিণত হবে। তৃতীয়ত, প্রতিটি বিষয়ে দুনিয়াকে প্রাধান্য দিবে এবং আখেরাত সম্পর্কে বেখবর হয়ে যাবে। চতুর্থত, সকল জ্ঞানী যখন নিজস্ব বুদ্ধিপ্রসূত রায়কে উপরে রাখতে গিয়ে অপরের রায়কে তুচ্ছ মনে করবে। নিজেকে রক্ষা করার ফিকিরই হবে তখন বুদ্ধিমানের কাজ। সাধারণ মানুষের ফিকির তখন প্রয়োজন নেই।

পথচ্যুত সমাজকে সোজা পথে আনার কর্মকৌশল
হাদিসের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে কোন কোন আলেম বলেছেন, একটা সময় আসবে যখন একজনের জন্য আরেকজনের উপদেশ কোন কাজে আসবে না। ফলে সেই সময় সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধের দায়ভার থেকে মানুষ মুক্ত হয়ে যাবে। শেষ সময়ে মানুষের দায়িত্ব হবে, ঘরে বসে শুধু আল্লাহ-আল্লাহ করা এবং নিজেকে শুদ্ধ করার চিন্তা করা। এছাড়া অন্য কিছু করার প্রয়োজন নেই।
অপর একদল আলেম এর ব্যাখ্যায় বলেছেন, হাদিসের শেষ সময়ের কথা বলা হয়েছে, যখন সমাজ নষ্ট হয়ে যাবে। সমাজের প্রতিটা সদস্য যখন মোহের ভিতরে এতটা ডুবে যাবে যে, অপরের উপদেশ শোনার মানসিকতাই থাকবে না। শেষ সময়ে নিজের ফিকির করো এবং গণমানুষের ফিকির ছেড়ে দাও।
কিন্তু হাদীসটির অর্থ এই নয় যে, সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ একেবারেই ছেড়ে দিবে। বরং এর মর্মার্থ হলো, তখন সমাজশুদ্ধির চেয়ে ব্যক্তিসংশোধনের গুরুত্ব হবে বেশি। কারণ ব্যক্তির সমষ্টিকেইতো সমাজ বলে। যদি ব্যক্তি ঠিক না হয় তাহলে সমাজ ঠিক হবে না। আর ব্যক্তি ঠিক হলে সমাজও আপনাআপনি ঠিক হয়ে যাবে। সুতরাং পথচ্যুত সমাজকে সোজা পথে আনার সঠিক পন্থা হল, এও আত্মশুদ্ধির প্রতি জোর দেওয়া।
ব্যক্তি সোজা পথে আসলে সমাজ সোজা পথে আসবে।এভাবে সমাজে পরিশুদ্ধ লোকের সংখ্যা বাড়তে থাকবে এবং ধীরে ধীরে সামাজিক নষ্টামি পুরোপুরি মিটে যাবে।
অতএব হাদীসটি দাওয়াত-তাবলীগকে রহিত করছে না। বরং এ বিষয়ে একটি স্বয়ংক্রিয় কৌশলের পথ বলে দেওয়া হচ্ছে।

ব্যর্থতার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ
ইমাম মালিক রহ. বলেছেন,
لَا يُصْلِحُ آخرَ هذه الأمة إلا ما أصْلَحَ أَوَّلَهَاএ উম্মতের শেষ জামানার সংশোধন সে পথেই হবে যে পথে প্রথম জামানার উম্মত সংশোধিত হয়েছে।
এজন্য নতুন কোন ফর্মুলার প্রয়োজন নেই। সাহাবায়ে কেরামের যুগে ব্যক্তির সংশোধনের পথ ধরেই সমাজ শুদ্ধ হয়েছে। আমরা ব্যক্তির কথা ভুলে বসেছি বিধায় বারবার ব্যর্থ হচ্ছি।

আরেকটি অন্যতম কারণ
আমাদের ব্যর্থতার আরেকটি অন্যতম কারণ হলো, ইসলামের সর্বজনীনতার ব্যাপারে আমাদের কোনো কর্মসূচি নেই। কিংবা থাকলেও সেগুলো যথেষ্ট নয়। অর্থাৎ, আমি বলতে চাচ্ছি, একদিকে আমরা ইসলামকে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করার বিষয়টি এতটাই গুরুত্ব দিচ্ছি যে, এটাই ইসলামের পরিচয় হিসেবে আমরা সমাজের সামনে উপস্থাপন করছি। অপরদিকে বর্তমান সমাজে তাকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য কর্মপন্থা কী হতে পারে; এ সম্পর্কে আমাদের কোন সুধারণা ও সুবিন্যাস্ত রোডম্যাপ নেই। কেউ একটুআধটু প্ল্যান সাজালেও তা উল্লেখযোগ্য নয়। আল্লাহ না করুন, আমার উদ্দেশ্য এটা নয় যে, ইসলাম এক যুগে মানানসই নয় এবং ইসলামকে স্বাগতম জানানোর মতো মানসিকতা এই সমাজের মানুষের নেই। বরং ইসলাম তো সর্বকালের জন্য এবং সকল এলাকার জন্যই প্রযোজ্য। স্থান ও কালের সঙ্গে আল্লাহর এই দ্বীন সীমাবদ্ধ নয়। সুতরাং বর্তমান যুগের সঙ্গে ইসলাম খাপ খাবে না–এজাতীয় ধারণা যার মাঝে আসবে, সে ইসলামের গণ্ডি থেকে বের হয়ে যাবে। তবে স্পষ্ট কথা হলো,বর্তমান যুগে ইসলামকে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে হলে বাস্তবধর্মী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। অথচ এ বিষয়ে গভীর গবেষণা ও বাস্তবতা স্বীকার করার মত অনুসন্ধিৎসা নেই বললেই চলে।

ইসলাম প্রতিষ্ঠার কর্মকৌশল যুগের চাহিদা হিসেবে পাল্টে যায়
আমরা ইসলামের জন্য কাজ করছি, চেষ্টা-সাধনা করছিএবং মানবজীবনে ইসলাম প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সংগ্রাম চালাচ্ছি। কিন্তু এ বিষয়ে আমাদের মাঝে একটু ভুল ধারণা আছে। আমরা মনে করি, আমাদের কাছে ফতোয়ায়ে আলমগীরী আছে, তাকে সামনে রাখব এবং যুগজিজ্ঞাসার সমাধান দিব। এজাতীয় নিষ্পাপ ধারণাকে সামনে রেখেই আমরা সামনে এগিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু মনে রাখবেন, কোন মূলনীতি চিরস্থায়ী হওয়া এবং সে মূলনীতির আলোকে যুগজিজ্ঞাসার সমাধান পেশ করা এক বিষয় নয়। মূলনীতিকে অক্ষত রেখে যুগ ও পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য সাধন করে ফতোয়া এত সহজ বিষয় নয়।
ইসলাম আমাদের সামনে যেসব বিধান, শিক্ষা ও মূলনীতি পেশ করেছে, সেগুলো অবশ্যই সকল যুগের জন্যই উপযোগী। কিন্তু সেগুলো বাস্তবায়ন করার কৌশল এবং যুগের চাহিদা সব সময় এক থাকে না। যেমন মসজিদের কথাই ধরুন। মসজিদ নির্মাণ করার পদ্ধতি আগেকার যুগের জন্য এবং বর্তমান যুগের জন্য এক নয়। পূর্বে মসজিদ তৈরি হতো খেজুর পাতার ছাপড়া দ্বারা আর এখন মসজিদ তৈরি হয় ইট বালু সিমেন্ট দ্বারা। সুতরাং মসজিদ নির্মাণের মূলনীতি যথাস্থানে অপরিবর্তনীয় থাকলেও নির্মাণকৌশলে এসেছে ভিন্নতা। অথবা মনে করুন, কোরআন মজীদে ইরশাদ হয়েছে–

وَأَعِدُّوا لَهُمْ مَا اسْتَطَعْتُمْ مِنْ قُوَّةٍ
অর্থাৎ ইসলামবিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে যথাসাধ্য শক্তি সঞ্চয় কর।

কিন্তু প্রথম জামানায শক্তিসঞ্চয় আর বর্তমান যুগের শক্তিসঞ্চয়ের পদ্ধতি এক নয়। সে সময়ের শক্তিসঞ্চয় তরবারি ও কামানের মাধ্যমে হত। আর বর্তমানের শক্তিসঞ্চয় বোমা তোপ বিমান ও আধুনিক সমরাস্ত্রের মাধ্যমে হয়। সুতরাং বুঝা গেল, যুগের পরিবর্তনে পদ্ধতি ও কৌশলগত পরিবর্তনও আসবে। এটাই যুক্তিযুক্ত।

ইসলাম বাস্তবায়নের পথ ও পদ্ধতি
অনুরূপভাবে যখন ইসলামী বিধানগুলোকে বর্তমান সময়ে বাস্তবায়ন করা হবে তখন সে ক্ষেত্রে বাস্তবধর্মী কিছু কৌশলপদ্ধতি নির্ধারণ করতে হবে। দেখার বিষয় হলো, সেসব কৌশল ও পদ্ধতি কী হওয়া উচিত এবং ইসলামের অপরিবর্তনীয় ও স্বীকৃত মূলনীতিগুলোকে যুগের সঙ্গে কিভাবে খাপ খাওয়ানো হবে? এ ব্যাপারে আমরা আজ পর্যন্ত এমন কোনো প্ল্যান তৈরি করতে পারিনি, যাকে নির্ভরযোগ্য বলা যেতে পারে। অবশ্য এ ব্যাপারে চেষ্টার কোন ত্রুটি সমগ্র বিশ্বে যেমন নেই, তেমনি আমাদের দেশেও চলছে যথেষ্ট প্রয়াস। কিন্তু কোন চেষ্টাকেই একমাত্র কিংবা চূড়ান্ত অভিধায় অভিহিত করা যাচ্ছে না। আর এরূপ বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত তৎপরতার অভাব যদি থাকে তবে কোনো সংগঠন যথেষ্ট প্রভাব সৃষ্টি করতে পারলেও একপর্যায়ে এসে ইসলামের মৌলিক বিষয়গুলো বাস্তবায়নের ব্যাপারে কঠিন কঠিন সমস্যার মুখোমুখি হবেই।
নতুন ব্যাখ্যা নতুন দৃষ্টিভঙ্গি
যুগের পরিবর্তন ঘটেছে। এরই মাঝে আমাদেরকে কাজ চালিয়ে যেতে হবে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে নতুন ব্যাখ্যার প্রয়োজনীয়তাও সামনে আসবে। কিন্তু এখানে এসেই কোনো কোনো মহল ভুল দৃষ্টিভঙ্গির শিকার হচ্ছে। ইসলামের নতুন ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তারা যুগের সবকিছুকেই জায়েজ আখ্যা দিচ্ছে। সুদ জুয়া বেপর্দাসহ চলমান যুগের অবৈধ বিষয়গুলোকে বৈধ সাব্যস্ত করার কসরত করছে।
তাদের এ জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ ভুল। কারণ যা কিছু এযুগে চলছে; সবই ঠিক। প্রয়োজন শুধু ইসলামপন্থিদের হাতে ক্ষমতা চলে আসা এবং পশ্চিমাদের আমদানি করা বিষয়গুলোর মাঝে কোন ধরনের পরিবর্তন প্রয়োজন নেই–এজাতীয় দৃষ্টিভঙ্গির সরল অর্থ দাঁড়ায়, ইসলাম প্রতিষ্ঠার সমূহ প্রচেষ্টাই ব্যর্থ।
অতএব, ইসলামকে বর্তমান যুগে বাস্তবায়ন করতে হবে–এর অর্থ এই নয় যে, ইসলামকে কাটছাঁট করে পাশ্চাত্য দর্শনের ছাঁচে ঢেলে সাজাতে হবে। বরং ইসলামকে বাস্তবায়ন করার সঠিক অর্থ হলো, ইসলামের মূলনীতিসমূহ বিধি-বিধান সম্পূর্ণ অক্ষত রেখে এবং সে গুলোকে যুগের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ঢেলে সাজাতে হবে।
যেমন, ব্যবসাসংক্রান্ত ইসলামের মূলনীতি ও বিধি বিধানসমূহ ফিকাহশাস্ত্রের সকল গ্রন্থে সুন্দর ও পরিপূর্ণভাবে আলোচিত হয়েছে। কিন্তু বর্তমান যুগে ব্যবসা সম্পর্কে যেসব নিত্যনতুন মাসআলা সৃষ্টি হয়েছে, সেগুলোর সমাধান এসব গ্রন্থে স্পষ্টভাবে নেই। সে সবের সমাধান কোরআন হাদিস ও ফিকাহশাস্ত্রের সর্বস্বীকৃত মূলনীতিসমূহের আলোকে খুঁজে বের করতে হবে। অথচ এ ব্যাপারে আমাদের কাজ এখনো সম্পূর্ণ। এ বিষয়ে যতদিন পর্যন্ত আমরা ব্যুৎপত্তি অর্জন করতে না পারব এবং যুগচাহিদা মাফিক পূর্ণ সমাধান দিতে সক্ষম না হব, ততদিন পর্যন্ত আমরা পরিপূর্ণভাবে সফল হবো না।
অনুরূপভাবে রাজনীতি সম্পর্কেও ইসলামের বিধি-বিধান ও মূলনীতি রয়েছে। কিন্তু আধুনিক যুগে সেগুলো কীভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে– এ ব্যাপার আমাদের ধারণা গবেষণা ও কর্মকৌশল এখনো পর্যাপ্ত নয়। অসম্পূর্ণ ধারণা নিয়ে কাজ চালানোর কারণেই আমরা অনেক ক্ষেত্রে ব্যর্থতার জালে আটকে যাচ্ছি।
সারকথা
আমার দৃষ্টিতে উক্ত দু’টি মূল কারণই আমাদেরকে অনেক পিছিয়ে দিচ্ছে। আর উভয় কারণই মূলত বুদ্ধিবৃত্তিক। প্রথম কারণ হলো, ব্যক্তিসংশোধনের ক্ষেত্রে আমাদের দৈন্যতা এবং ব্যক্তিগঠন প্রক্রিয়ার প্রতি আমাদের উদাসীনতা এবং এই দৈন্যতা ও উদাসীনতা নিয়েই সমাজে আমাদের অনুপ্রবেশ।
দ্বিতীয় কারণ হলো, যুগচাহিদার প্রেক্ষিতে ইসলামকে বাস্তবায়ন করতে হলে যে গবেষণা অনুসন্ধান ও বাস্তবসম্মত কর্মপদ্ধতি তৈরি করা জরুরি–তা যথেষ্ট না হওয়া। যদি এই দু’টি কারণকে পুরোপুরি অনুধাবন করে আমরা সমাধানের পথে অগ্রসর হই এবং এগুলোর তাগিদ যদি আমাদের অন্তরে সৃষ্টি হয় তাহলে ইনশাআল্লাহ যুগ আমাদেরকে স্বাগত জানাবে।
আল্লাহ আমাদেরকে দয়া করে সে দিনটি দেখিয়ে দিন, যে দিন আমাদের আন্দোলনগুলো বাস্তব অর্থেই সফলতার পথ খুঁজে পাবে। আমিন।

وَآخِرُ دَعْوَانَا اَنِ الْحَمْدُ لِلّهِ رَبِّ الْعَالَمِيْنَ