জালিম ও চরিত্রহীন বাবার সাথে বসবাসের বিধান

জিজ্ঞাসা–১৯৪৪ : আসসালামু আলাইকুম। আমার বাবা বিয়ের কয়েক বছর পর থেকেই আমার মায়ের সাথে খারাপ ব্যবহার অত্যাচার করে আসছে। এখন তার বয়স ৬০ এর বেশি হবে। আমার মায়ের উপর যতটা অত্যাচার করা সম্ভব সে করে, শুরু থেকেই। গায়ে হাত তোলাসহ সব কিছু। আর বিয়ের কয়েক বছর পর থেকেই সে পরকীয়ায় লিপ্ত। আজ এই বয়সে এসেও সে আমার মাকে অত্যাচার করে, শুধু মাত্র এই জন্য যাতে আমার মা তাকে ডিভোর্স দিয়ে চলে যায়। পরবর্তীতে সে যার সাথে পরকীয়া করছে তাকে বিয়ে করবে। সে এক ওয়াক্ত নামাজ পড়ে না। শুক্রবার দিনও বাসায় পড়ে থাকে, আমি মেয়ে আমাকে সব সময় পর্দা ছাড়া চলার বিষয়ে উৎসাহিত করে। তার থেকে এটাই আশা করা যায়। আমার মা তার অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে, বাসা থেকে চলে যায়। এই মূহুর্তে মায়ের পরিবারের পক্ষে কেউ নেই। সে এক দূরসম্পর্কের আত্নীয়ের বাসায় থাকছে। আমি এখন এখানে টিউশন করাই। মায়ের সাথে ওখানে যাবার মতো অবস্থাও নেই। আর মাকে টাকা পাঠানোর জন্য এই বাসায় থেকে টিউশন করানো দরকার।

আমার প্রশ্ন হলো, মেয়েরা বাবার সাথে একা বাসায় থাকতে পারবে কিনা? বিশেষ করে আমার বাবা কেমন খারাপ কাজ আচরণ, চিন্তাভাবনা, তার অনেক বাজে কাজও আমার নজরে এসেছে। যতটা বাজে হওয়া সম্ভব সে ততটা। এখন, এমন একজন মানুষ হওয়া সত্ত্বেও তার সাথে এই একা বাসায় থাকার বিষয়ে বিধান কি?

আমার ছোটো ভাইকে সে নিজের ছেলে হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না। সে যতটা খারাপ আচরণ করতে পারে তা করে। ছোটো ভাই এখন আম্মুর সাথে, ক্লাস ৮ এ পড়ে। সবার মাঝে বাবা শুধু আমাকেই নিজের মেয়ে বলে দাম দেয়। কিন্তু ব্যবহার ভালো না। আমার বাসায় নিজের দরজার পিছনে লুকানো জামা কাপড়ের দিকে সে অযথায় এসে তাকিয়ে থাকে, আর মাঝে ধরার চেষ্টা করে। আর জিজ্ঞাসা করলে কিছু না বলে চলে যায়। আমার বয়স ২১ বছর। এই মূহুর্তে আমার কী করা উচিত? দুঃখিত, এলোমেলো ভাষায় লিখার জন্য।—নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক।

‎‎জবাব : وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

এক. আপনার বর্ণনা অনুযায়ী বিষয়টি শুধু পারিবারিক অশান্তির নয়; এখানে মানসিক নির্যাতন, শারীরিক নির্যাতন, ধর্মীয় অবহেলা, সম্ভাব্য সীমালঙ্ঘনের আশঙ্কা এবং নিরাপত্তার প্রশ্ন জড়িত। তাই এ অবস্থাকে হালকাভাবে নেওয়া ঠিক হবে না।

ইসলামে কোনো বাবার জন্য স্ত্রী-সন্তানের উপর জুলুম করা, মারধর করা, অপমান করা বা নিরাপত্তাহীন পরিবেশ তৈরি করা হারাম।

আল্লাহ তাআলা বলেন,

وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ

স্ত্রীদের সাথে সদ্ভাবে জীবনযাপন কর। [সূরা আন-নিসা : ১৯]

রাসূল ﷺ বলেছেন,

لَا ضَرَرَ وَلَا ضِرَارَ

নিজে ক্ষতি করবে না এবং অন্যকেও ক্ষতি করবে না। [ইবন মাজাহ : ২৩৪১]

দুই. আপনার বাবা আপনার ছোট ভাইকে নিজের সন্তান হিসেবে অস্বীকার করে এবং তার সাথে খারাপ আচরণ করে বড় গুনাহ করছেন। সন্তানের বংশপরিচয় অস্বীকার করা ইসলামে অত্যন্ত গুরুতর বিষয়। আপনার মা যদি নির্যাতন থেকে বাঁচার জন্য আলাদা হয়ে থাকেন, তাহলে পরিস্থিতি বিবেচনায় তা বোধগম্য।

তিন. ইসলামে বাবা মেয়ের মাহরাম। সাধারণ অবস্থায় বাবার সাথে এক বাসায় থাকা বৈধ। কিন্তু যদি কোনো বাবার আচরণে মেয়ের মধ্যে ভয়, অস্বস্তি বা নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়, তাহলে সতর্ক হওয়া জরুরি। আপনি যেসব আচরণের কথা বলেছেন—অকারণে ব্যক্তিগত জিনিসের দিকে তাকানো, অস্বস্তিকর উপস্থিতি বা সন্দেহজনক আচরণ—এসবকে অবহেলা করা ঠিক হবে না।

তাই আপনার করণীয় হতে পারে—

  • ধীরে ধীরে নিরাপদ আলাদা থাকার ব্যবস্থা খোঁজা; যেমন মহিলা হোস্টেল, নির্ভরযোগ্য পরিবারের সাবলেট বা কর্মজীবী নারীদের মেস।
  • টিউশনি চালিয়ে যাওয়া, যাতে নিজের ও মায়ের খরচে সাহায্য করতে পারেন।
  • বাসায় থাকাকালীন নিজের কক্ষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
  • বাবার সাথে অপ্রয়োজনীয় একান্ত অবস্থান এড়িয়ে চলা।
  • বিশ্বস্ত আত্মীয়, আলেম বা নিরাপদ কাউকে বাস্তব পরিস্থিতি জানানো।
  • মায়ের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা এবং তাঁকে মানসিকভাবে সহায়তা করা।

ইসলামে পিতার সম্মান অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কোনো মানুষের জুলুম মেনে নেওয়া বাধ্যতামূলক নয়। নিজের ইজ্জত, নিরাপত্তা ও মানসিক সুস্থতা রক্ষা করাও শরিয়তের গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য।

আর যদি আপনার মায়ের উপর দীর্ঘদিন ধরে নির্যাতন চলতেই থাকে, তাহলে শরিয়তে তাঁর জন্য বিচ্ছেদের পথ খোলা আছে। ইসলাম কাউকে জুলুমের মধ্যে আবদ্ধ থাকতে বাধ্য করেনি।

আল্লাহ তাআলা আপনাকে হিফাজত করুন, নিরাপদ পথ সহজ করুন এবং আপনার পরিবারকে শান্তি দান করুন।

والله أعلم بالصواب
উত্তর দিয়েছেন