ভাগ না হওয়া পৈতৃক সম্পদের যাকাত ও হজ্জের বিধান

জিজ্ঞাসা–১৮৯৯ :আমরা সাত ভাইবোন। (দুই বোন এক ভাই বিবাহিত) মা আছেন। বাবা ইন্তেকাল করেছেন পাচবছর হলো। বাবার সম্পদ ( ব্যাংকে টাকা) সব ভাইবোনের নামে নমিনি করে রাখা আছে। তবে এখনো কেউ হাতে পাইনি। মায়ের আন্ডারে আছে এখনো ভাগ হয়নি। সবার একটা করে ফ্লাট আছে, সেটাও সবার দখলে নেই, দলিল করে ও নামে নেই। যা উপার্জন হয় তা মায়ের মাধ্যমেই সব ভাই-বোন খরচ করি। আবার মা ও একক মালিকানায় নেই। প্রশ্ন হলো, আমাদের যাকাতটা কিভাবে দিতে হবে। যেহেতু আমরা কেউ একক মালিক না, এই অবস্থায় যাকাত কি ফরজ হয়েছে? আর হজ্জ ও কি ফরজ হয়েছে? হজ্জ করতে দেরি হলে এতে আমরা গোনাহগার হবো কি?—শাম’আ ইবনাত।

জবাব : আপনাদের বর্ণনা অনুযায়ী, বাবার ইন্তেকালের পর তাঁর রেখে যাওয়া সম্পদ শরীয়ত অনুযায়ী সকল ওয়ারিসের মাঝে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বণ্টিত হয়ে গেছে, যদিও এখনো আনুষ্ঠানিক ভাগ, দলিল বা হাতে গ্রহণ সম্পন্ন হয়নি। অর্থাৎ কেবল ‘মায়ের আন্ডারে আছে’ বললে সম্পদ শুধু মায়ের মালিকানায় থাকবে না; বরং প্রত্যেক ওয়ারিস তার নির্ধারিত অংশের মালিক হয়ে গেছেন।

নমিনি করা থাকাও চূড়ান্ত মালিকানার প্রমাণ নয়। নমিনি সাধারণত অর্থ উত্তোলনের প্রতিনিধি মাত্র। প্রকৃত মালিকানা মীরাসের বিধান অনুযায়ী নির্ধারিত হবে।

সুতরাং প্রথমে হিসাব করতে হবে—

  • বাবার মোট সম্পদ কত ছিল,
  • দেনা বা অসিয়ত থাকলে তা বাদ দিয়ে অবশিষ্ট সম্পদ কত থাকে,
  • এরপর প্রত্যেক ওয়ারিসের অংশ কত দাঁড়ায়।

যদি কোনো ভাই বা বোনের অংশ নেসাব পরিমাণে পৌঁছে এবং তা মৌলিক প্রয়োজনের অতিরিক্ত হয়, তাহলে তার উপর যাকাত ফরজ হবে; যদিও টাকা এখনো ব্যাংক থেকে তোলা না হয়ে থাকে বা সম্পূর্ণ দখলে না আসে। কারণ মীরাসের মাধ্যমে মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে।

তবে যদি সম্পদ এমন অবস্থায় থাকে যে বাস্তবে ব্যবহার, উত্তোলন বা ভোগদখলের ক্ষমতা একেবারেই না থাকে, তাহলে কিছু ফকীহ দখল পাওয়ার পর যাকাত আদায়ের কথা বলেছেন। কিন্তু সাধারণভাবে ব্যাংকের টাকা ও উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত সম্পদের ক্ষেত্রে যাকাতের হিসাব রাখা নিরাপদ ও অধিক সতর্কতার পথ।

ফ্ল্যাটগুলোর ক্ষেত্রেও একই কথা। যদি প্রত্যেকে শরয়ি হিসেবে নিজ নিজ অংশের মালিক হয়ে থাকে, তাহলে সেটি যাকাতযোগ্য কি না তা নির্ভর করবে ব্যবহারের ধরনে।

  • নিজে থাকার জন্য হলে যাকাত নেই।
  • বিক্রি বা ব্যবসার উদ্দেশ্যে হলে বাজারমূল্য অনুযায়ী যাকাত আসবে।
  • ভাড়ার জন্য হলে ফ্ল্যাটের মূল দামে যাকাত নেই; তবে জমাকৃত ভাড়ার টাকার উপর যাকাত আসবে।

হজ্জের ব্যাপারে—
যার নিজ অংশ থেকে হজ্জে যাওয়ার সামর্থ্য হয়, অর্থাৎ হজ্জের খরচ বহন করার পর পরিবার ও মৌলিক প্রয়োজন ব্যাহত না হয়, তার উপর হজ্জ ফরজ হবে। দলিল এখনো নিজের নামে না হওয়া ফরজ হওয়ার পথে বাধা নয়; আসল বিষয় হলো শরয়ি মালিকানা ও বাস্তব সামর্থ্য।

তবে যদি সম্পদ এখনো পুরোপুরি যৌথ ব্যবস্থাপনায় থাকে এবং কেউ স্বাধীনভাবে নিজের অংশ ব্যবহার করতে না পারেন, তাহলে বাস্তব সামর্থ্য পূর্ণভাবে অর্জিত হয়েছে কি না—এটি বিবেচ্য হবে।

আর হজ্জ ফরজ হওয়ার পর অযথা দেরি করা গুনাহের কারণ হতে পারে। রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন

مَنْ أَرَادَ الْحَجَّ فَلْيَتَعَجَّلْ فَإِنَّهُ قَدْ يَمْرَضُ الْمَرِيضُ وَتَضِلُّ الضَّالَّةُ وَتَعْرِضُ الْحَاجَةُ

যে হজ্জ করার ইচ্ছা করে, সে যেন দ্রুত আদায় করে। কারণ মানুষ কখনও অসুস্থ হয়ে যায়, কখনও প্রয়োজনীয় জিনিস বিলুপ্ত হয়ে যায় এবং কখনও অপরিহার্য প্রয়োজন সামনে এসে যায়। [ইবন মাজাহ : ২৮৮৩] 

তাই আপনাদের জন্য উত্তম হবে একজন নির্ভরযোগ্য আলেম বা মুফতির মাধ্যমে পুরো সম্পদের বিস্তারিত হিসাব করে প্রত্যেকের পৃথক অংশ নির্ধারণ করে নেওয়া। এরপর প্রত্যেকে নিজের অংশ অনুযায়ী যাকাত ও হজ্জের হুকুম নির্ধারণ করবেন।

والله أعلم بالصواب
উত্তর দিয়েছেন