লিখিত তালাক, ইদ্দত ও রুজুর হুকুম; আমাদের ক্ষেত্রে শরীয়তের ফয়সালা কী?

জিজ্ঞাসা–১৮৭৭: আমার স্বামীর সাথে আমার বিচ্ছেদ হয়েছে প্রায় ১১ মাস আগে। আমাদের তালাকটি আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হয়। যখন তালাক দেওয়া হয়, তখন আমি হায়েজ অবস্থায় ছিলাম। এরপর সে একটি তালাকনামা/ডিভোর্স লেটার পাঠায় এবং কিছুদিন আমাদের যোগাযোগ বন্ধ থাকে। আমরা আলাদা বসবাস শুরু করি।

পরবর্তীতে আমি মানসিকভাবে ভেঙে পড়লে সে অনুতপ্ত হয়ে আমাকে ফোন দেয় এবং বলে যে সে তালাক প্রত্যাহার করতে চায়। এই কথোপকথনের সময় আমাদের মধ্যে ভিডিও কলে কিছু ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও হয়। এরপর কিছুদিন এভাবে চলতে থাকে, কিন্তু পারিবারিক জটিলতা আরও বাড়তে থাকে।

পরবর্তীতে তার পরিবার তাকে রিহ্যাবে রাখে, যেন আমার ইদ্দতের সময় শেষ হয়ে যায় এবং সে আর রুজু করতে না পারে। প্রায় ৪ মাস পর সে রিহ্যাব থেকে বের হয়। এরপর তার পরিবার আমাদের কাছ থেকে তালাকনামায় সাইন করিয়ে নেয়। প্রায় ৭ মাস পর সেই সাইনের মাধ্যমে আইনি বিচ্ছেদ সম্পন্ন হয়।

আমার প্রশ্ন হলো—এই পরিস্থিতিতে আমাদের তালাক কি শরীয়ত অনুযায়ী সম্পূর্ণ হয়েছে? নাকি ইদ্দতের ভেতরে রুজুর কারণে আমরা এখনো স্বামী-স্ত্রী হিসেবে আছি? লিখিত তালাক, ইদ্দত, রুজু এবং পরবর্তী সাইন—এসব শরীয়তের দৃষ্টিতে কীভাবে গণ্য হবে?—আসমাউল হুসনা।

জবাব:

এক. হায়েজ অবস্থায় তালাক দেওয়া ঠিক না, এটা গুনাহের কাজ। কিন্তু তবুও তালাক হয়ে যায়। সাহাবায়ে কেরামের সময়েও এমন ঘটনা ঘটেছিল। রাসূল ﷺ তখন বলেছিলেন مُرْهُ فَلْيُرَاجِعْهَا তাকে বলো, সে যেন তার স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেয়। (সহীহ বুখারী ৬৬৭৬)
এই হাদিস থেকে বোঝা যায়—তালাক হয়ে গিয়েছিল, তাই আবার ‘ফিরিয়ে নেওয়ার’ কথা বলা হয়েছে।

দুই.  যদি স্বামী এক তালাক দিয়ে থাকে, তাহলে স্ত্রী ইদ্দতের মধ্যে থাকে (সাধারণত ৩ হায়েজ)। এই সময়ের মধ্যে স্বামী চাইলে আবার ফিরিয়ে নিতে পারে—এটাকেই বলে ‘রুজু’। রুজু দুইভাবে হয়—

الرَّجْعَةُ تَكُونُ بِالْقَوْلِ أَوْ بِالْفِعْلِ

১) রুজু কথা দ্বারাও হয়। যেমন, আমি তোমাকে ফিরিয়ে নিলাম, তুমি আবার আমার স্ত্রী—এভাবে স্পষ্ট করে বলা।

২) বাস্তবে স্বামী-স্ত্রীর মতো সম্পর্ক করা। যেমন, সহবাস করা বা স্পষ্ট দাম্পত্য আচরণ করা। (ফাতাওয়া/ফিকহি কিতাবসমূহ)

তিন. এখন আপনার ঘটনাটা দেখুন—আপনারা ফোনে কথা বলেছেন, সে ‘ফিরে আসতে চায়’ বলেছে, আর ভিডিও কলে কিছু হয়েছে। কিন্তু এগুলো শরীয়তের রুজু না। কারণ, ভিডিও কল বাস্তব দাম্পত্য সম্পর্ক না। আর ‘ফিরে আসতে চাই’ বলা—এটা স্পষ্ট রুজুর বাক্য না।  তাই এখানে মূল প্রশ্ন একটাই—সে কি স্পষ্টভাবে বলেছে,’আমি তোমাকে স্ত্রী হিসেবে ফিরিয়ে নিলাম’?যদি বলে থাকে (এবং সেটা ইদ্দতের মধ্যে হয়) তাহলে রুজু হয়ে গেছে, আপনারা তখনো স্বামী-স্ত্রী ছিলেন। যদি এমন স্পষ্ট কথা না বলে, তাহলে রুজু হয়নি

চার. এখন আসি ইদ্দতের কথা। আল্লাহ তাআলা বলেন

وَالْمُطَلَّقَاتُ يَتَرَبَّصْنَ بِأَنْفُسِهِنَّ ثَلَاثَةَ قُرُوءٍ

তালাকপ্রাপ্ত নারীরা নিজেদেরকে তিন হায়েজ পর্যন্ত অপেক্ষায় রাখবে। (সূরা বাকারা ২২৮)

মানে, এই সময়ের মধ্যে স্বামী ফিরিয়ে নিতে পারে। কিন্তু এই সময় পার হয়ে গেলে—তালাক সম্পূর্ণ হয়ে যায় (বাইন), তখন আবার থাকতে হলে নতুন করে নিকাহ লাগবে

আপনি বলেছেন প্রায় ৪ মাস পর সে বের হয়েছে—সাধারণত ৩ হায়েজ এর মধ্যে ইদ্দত শেষ হয়ে যায়।  তাই যদি ওই সময়ের মধ্যে রুজু না হয়ে থাকে তালাক পুরোপুরি হয়ে গেছে।

পাঁচ. শেষ বিষয়—কাগজে সাইন। শরীয়তে তালাক কাগজে সাইন করার উপর নির্ভর করে না। আগেই তালাক হয়ে গেলে পরে সাইন শুধু আইনি কাজ। ফিকহে বলা হয়েছে—

وَإِذَا كَتَبَ الطَّلَاقَ فَإِنْ نَوَى الطَّلَاقَ وَصَلَ إِلَيْهَا وَقَعَ

যদি কেউ তালাক লিখে এবং তার নিয়ত তালাক দেওয়ার হয়, আর তা স্ত্রীর কাছে পৌঁছে—তাহলে তালাক হয়ে যায়। ( আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়া ১/৩৭৮)

ছয়. সবকিছু মিলিয়ে সহজ সিদ্ধান্ত—তালাক হয়ে গেছে। এটাই মূল। এখন নির্ভর করছে—ইদ্দতের মধ্যে স্পষ্ট রুজু হয়েছিল কি না? রুজু হয়ে থাকলে আপনারা তখনো স্বামী-স্ত্রী। না হয়ে থাকলে তালাক সম্পূর্ণ (বায়েন, এখন একসাথে থাকতে হলে নতুন নিকাহ লাগবে।

সবশেষে একটা কথা। এ ধরনের জটিল মাসআলা আপনার উক্ত বক্তব্য থেকে শতভাগ চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করা কঠিন; কারণ এখানে নিয়ত, বাক্য, সময়—সবকিছু বিস্তারিতভাবে যাচাই করতে হয়। তাই কোনো বিশ্বস্ত আলেম বা মুফতির কাছে (সম্ভব হলে দুজন একসাথে বসে) পুরো ঘটনাটি খুলে বলাই সবচেয়ে নিরাপদ ও উত্তম পথ।

والله أعلم بالصواب
উত্তর দিয়েছেন