জিজ্ঞাসা–১৯৫৪ : আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
একজন ডাক্তার MBBS পাস করার পর BMDC (Bangladesh Medical & Dental Council)-এর মাধ্যমে একজন রেজিস্টার্ড ডাক্তার হিসেবে চিকিৎসা সেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে অনুমোদন পান। এরপর উচ্চতর ডিগ্রীর জন্য যখন FCPS Part-1 পাস করে Part-2 ট্রেইনীং (নূন্যতম ৫ বছরের ডিগ্রী)-এ ঢুকেন। তখন জয়েনিং-এর সময় নির্দিষ্ট হাসপাতালে নিম্নবর্ণিত শর্তে সাইন করতে হয়, যেখানে লেখা থাকে—
‘আমি বর্তমানে কোনো বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিকে চাকুরী/ডিউটি করি না, প্রশিক্ষণে নির্বাচিত হইলে বেসরকারি কোনো হাসপাতাল/ক্লিনিকে চাকুরী/ডিউটি করিব না।’
Training-এ জয়েন করার পর, BCPS (Bangladesh College of Physicians and Surgeons) প্রত্যেক ট্রেইনীকে ভাতা দেয়। প্রতি মাসে ৩৫ হাজার টাকা দেওয়া হয়। ৫ বছর ভাতা দেওয়া হয়। এই অবস্থায় যখন ভাতা দেয়া হয়, তখন নিম্নবর্ণিত শর্তে সাইন করতে হয়। যেখানে লেখা—
‘আমি ট্রেইনীং ব্যতীত কোনো চাকুরী/ডিউটি/প্র্যাকটিসে যুক্ত নই এবং বেতন/ভাতা পাওয়া যায় এরকম কোনো উৎসের সাথেও যুক্ত নই। যদি প্রমাণিত হয় (আংশিক হলেও), আমার বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং আমার ভাতা ফেরত দিতে আমি বাধ্য থাকব।’
উল্লেখ্য, বর্তমান বাজার মূল্যের কথা চিন্তা করে একজন রেজিস্টার্ড ডাক্তার এর জন্য এই টাকায় পরিবার এবং সংসার চালানো খুবই কঠিন। । ফলে অধিকাংশ ডাক্তার ট্রেইনীংরত অবস্থায় ডিউটি টাইমের বাইরে ভিন্ন হাসপাতাল/ক্লিনিকে ডিউটি করেন এবং অনেকে চেম্বারও করেন। এমন ট্রেইনী খুজে পাওয়া কঠিন যারা বাইরে কাজ করেননা , স্যাররাও জানেন কিন্তু কিছু বলেন না। এটা কিছুটা ওপেন সিক্রেট এর মতো। এমতাবস্থায় প্রশ্ন হলো—
১) FCPS Part-2 Trainee তার ৫ বছরের FCPS Training পিরিয়ডে তার হাসপাতালের ট্রেইনীং ডিউটি ঠিক রেখে তার ব্যক্তিগত অবসর সময়ে (যেমন বিকাল বা সন্ধায় বা যেদিন তার ছুটির দিন) ভিন্ন কোনো হাসপাতাল বা ক্লিনিকে চাকুরী/ডিউটি করতে পারবেন কি না? (এতে তার ট্রেইনীং এর কোনো ক্ষতি না করে)
২) FCPS Part-2 Trainee তার ৫ বছরের FCPS Training পিরিয়ডে তার হাসপাতালের ট্রেইনীং ডিউটি ঠিক রেখে তার ব্যক্তিগত অবসর সময়ে প্রাইভেট প্র্যাকটিস/চেম্বার করতে পারবেন কি না? (যেহেতু তিনি একজন রেজিস্টার্ড ডাক্তার। তার ক্লিনিক্যাল জ্ঞান অর্জনও দরকার, সাথে অর্থনৈতিক সাপোর্টও দরকার। তিনি তার ট্রেইনীং এর কোনো ক্ষতি না করে চেম্বার/প্র্যাকটিস করতে পারবেন কি না? চেম্বার/প্র্যাকটিস এর বিষয়টি দুইভাবে সামনে আসবে—
ক) FCPS Part-2 Trainee অথবা FCPS Trainee কথাটি তার সাইনবোর্ড/প্রেস্ক্রিপশনে উল্লেখ করে চেম্বার/প্র্যাকটিস করতে পারবেন কি না?
খ) যেহেতু FCPS করার কারণে শর্তযুক্ত হচ্ছেন, তাই FCPS Trainee ব্যবহার না করেই শুধু তার MBBS Degree উল্লেখ করে তার ব্যক্তিগত অবসর সময়ে রোগী দেখে ফি নিতে পারবেন কি না? (শর্তে শুধু প্র্যাকটিস শব্দটি বলা আছে, কিন্তু কোন ধরনের প্র্যাকটিস সেটি স্পষ্ট করা নেই)
৩) শর্তে বলা হয়েছে, অন্য কোনো উৎস থেকে বেতন/ভাতা নেওয়া যাবে না—তাহলে একজন ডাক্তার তার মেডিকেলের জ্ঞান বাদ দিয়েও যদি তার ব্যক্তিগত অবসর সময়ে ভিন্ন কোনো ব্যবসা করেন, চাকুরি করেন, টিউশনি করান, কোচিং করান, অন্য কোনো কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানে সময় দিয়ে বেতন/ভাতা নেন, তাহলে সেটা জায়েজ হবে কি না? এই শর্তের মধ্যে পড়বে কি না
পরিশেষে, একজন মু’মিন মুত্তাকী মুসলিম হিসেবে একজন FCPS ট্রেইনী ডাক্তার কিভাবে চললে তার ডিউটিও ঠিক থাকবে, তার অর্থনৈতিক অবস্থাও স্বাভাবিক থাকবে এবং তার ইনকামও হারাম হবে না বা তিনি গুনাহগার হবেন না?—Anamul haque
জবাব : وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
এক. প্রিয় প্রশ্নাকারী দীনী ভাই! আপনার দীর্ঘ প্রশ্নের মূল ভিত্তি ফিকহি দৃষ্টিতে দুটি—
১. চুক্তি (عقد) ও অঙ্গীকার (شرط) পূরণ করা ওয়াজিব কি না।
২. ভাতা গ্রহণের জন্য প্রদত্ত ঘোষণাটি বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক কি না।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَوْفُوا بِالْعُقُودِ
হে মুমিনগণ! তোমরা চুক্তিসমূহ পূর্ণ কর। [সূরা মায়িদা : ১]
এবং রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন,
الصُّلْحُ جَائِزٌ بَيْنَ الْمُسْلِمِينَ إِلاَّ صُلْحًا حَرَّمَ حَلاَلاً أَوْ أَحَلَّ حَرَامًا وَالْمُسْلِمُونَ عَلَى شُرُوطِهِمْ إِلاَّ شَرْطًا حَرَّمَ حَلاَلاً أَوْ أَحَلَّ حَرَامًا
মুসলিমদের একে অপরের সাথে সন্ধি স্থাপন করা জায়িয। কিন্তু বৈধকে অবৈধ অথবা অবৈধকে বৈধ করার মত সন্ধি চুক্তি জায়িয নেই। মুসলিমগণ তাদের একে অপরের মধ্যে স্থিরকৃত শর্তাবলী মেনে চলতে বাধ্য। কিন্তু হালালকে হারাম অথবা হারামকে হালাল করার মত শর্ত বৈধ নয় (তা বাতিল বলে গণ্য হবে)। [তিরমিযী : ১৩৫২]
ফিকহের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি হলো,
العِبرةُ في العُقودِ للمَقاصِدِ والمَعاني لا للألفاظِ والمَباني
অর্থাৎ, দুটি পক্ষের মধ্যে যখন কোনো চুক্তি হয়, তখন তারা মুখে কী শব্দ ব্যবহার করল বা কাগজে কী লিখল, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো তাদের আসল উদ্দেশ্য (Intent) এবং নিয়ত কী ছিল। [আহমদ আয-যারকা, আল-কাওয়ায়িদ আল-ফিকহিয়্যাহ : ৫৫]
অতএব কোনো প্রতিষ্ঠানে যোগদানের সময় যে শর্তে সম্মতি দেওয়া হয়েছে, তা বৈধ ও শরিয়তবিরোধী না হলে তা মানা আবশ্যক।
দুই. এখন প্রশ্নের বিভিন্ন অংশের উত্তর—
(১) FCPS Trainee কি অবসর সময়ে অন্য হাসপাতাল বা ক্লিনিকে ডিউটি করতে পারবেন?
যদি ট্রেইনিং চুক্তিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকে যে, ‘আমি কোনো বেসরকারি হাসপাতাল/ক্লিনিকে চাকরি বা ডিউটি করব না’, এবং ট্রেইনী স্বেচ্ছায় এই শর্তে স্বাক্ষর করে থাকেন, তাহলে শরয়ী দৃষ্টিতে ওই শর্ত ভঙ্গ করে বাইরে ডিউটি করা বৈধ হবে না। এখানে মূল সমস্যা ডিউটি নয়; বরং চুক্তিভঙ্গ।
অতএব, কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক অনুমতি থাকলে জায়েজ। কর্তৃপক্ষের অনুমতি না থাকলে এবং চুক্তি বহাল থাকলে জায়েজ নয়। সবাই করছে, স্যাররা জানেন, ওপেন সিক্রেট—এসব দ্বারা চুক্তি বাতিল হয়ে যায় না।
(২) FCPS Trainee কি ব্যক্তিগত চেম্বার বা প্রাইভেট প্র্যাকটিস করতে পারবেন?
এখানেও চুক্তির ভাষা নির্ধারক। যদি চুক্তিতে ‘প্র্যাকটিস’ নিষিদ্ধ করা হয়ে থাকে, তাহলে FCPS Trainee পরিচয়ে হোক বা শুধু MBBS পরিচয়ে হোক—উভয় ক্ষেত্রেই প্রাইভেট রোগী দেখা চুক্তিভঙ্গের অন্তর্ভুক্ত হবে। কারণ নিষেধাজ্ঞা ব্যক্তির ওপর, ডিগ্রির ওপর নয়।
অতএব, FCPS Trainee লিখে চেম্বার করলে নিষেধাজ্ঞার মধ্যে পড়বে। শুধু MBBS লিখলেও যদি বাস্তবে রোগী দেখে ফি নেওয়া হয়, তবুও তা প্র্যাকটিসই গণ্য হবে। শুধু নাম পরিবর্তন করলে হুকুম পরিবর্তিত হয় না।
(৩) চিকিৎসার বাইরে অন্য কাজ (ব্যবসা, টিউশনি, কর্পোরেট চাকরি ইত্যাদি) করা যাবে কি?
এখানে চুক্তির ভাষা গুরুত্বপূর্ণ। আপনার বর্ণনা অনুযায়ী ভাতার ফরমে লেখা আছে—’কোনো চাকরি/ডিউটি/প্র্যাকটিসে যুক্ত নই এবং বেতন/ভাতা পাওয়া যায় এমন কোনো উৎসের সাথেও যুক্ত নই।’
যদি এই ভাষা সত্যিই সর্বপ্রকার বেতনভুক্ত কাজকে অন্তর্ভুক্ত করে, তাহলে টিউশনি, কোচিং, কর্পোরেট চাকরি, পার্টটাইম চাকরি —এসব থেকেও বেতন গ্রহণ করা চুক্তির পরিপন্থী হবে। তবে নিজের ব্যবসা (যেখানে চাকরিজনিত বেতন নয়, ব্যবসায়িক লাভ আসে) চুক্তির পরিপন্থী হবে না।
(৪) অর্থনৈতিক কষ্ট কি শর্ত ভঙ্গের বৈধ কারণ?
সাধারণভাবে না। যদি ভাতা বাস্তব জীবনের জন্য অপ্রতুল হয়, তাহলে শরয়ী সমাধান হলো—
- কর্তৃপক্ষের কাছে নিয়ম পরিবর্তনের আবেদন,
- অতিরিক্ত কাজের লিখিত অনুমতি গ্রহণ,
- অথবা এমন ট্রেইনিং পদ্ধতি বেছে নেওয়া যেখানে এ শর্ত নেই।
কিন্তু একদিকে ‘আমি অন্য কোথাও কাজ করি না’ মর্মে ঘোষণা দেওয়া, অন্যদিকে গোপনে কাজ করে আয় করা—এটি সততা ও চুক্তি পূরণের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
তিন. যদি একজন FCPS Trainee চুক্তি ভঙ্গ না করে, মিথ্যা ঘোষণা না দিয়ে এবং সন্দেহজনক আয় এড়িয়ে চলতে চান, তাহলে তাঁর জন্য কয়েকটি অপেক্ষাকৃত নিরাপদ পথ হতে পারে—
- প্রথমত, BCPS বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নীতিমালার আলোকে কোনো অতিরিক্ত কাজের অনুমতি নেওয়ার সুযোগ থাকলে সেটি অনুসরণ করা। লিখিত অনুমতি থাকলে অনেক দ্বিধা দূর হয়ে যায়।
- বৈধ ব্যবসা বা বিনিয়োগে অংশীদার হওয়া, যেখানে দৈনন্দিন চাকরি বা ডিউটির মতো সম্পৃক্ততা নেই। যেমন বৈধ ব্যবসায় মূলধন বিনিয়োগ করে লাভের অংশ গ্রহণ।
- চিকিৎসার বাইরে এমন কাজ, যা সংশ্লিষ্ট নীতিমালার স্পষ্ট লঙ্ঘন নয় এবং যার জন্য কর্তৃপক্ষের আপত্তি নেই।উদাহরণস্বরূপ, একাডেমিক বই লেখা, গবেষণাপত্র লেখা বা সম্পাদনা, একাডেমিক কনটেন্ট তৈরি ইত্যাদি।
- ব্যয় ব্যবস্থাপনায় সংযম অবলম্বন করা এবং ট্রেইনিংয়ের সময়টিকে একটি সাময়িক ত্যাগের পর্যায় হিসেবে দেখা। ইসলামী ইতিহাসে বহু আলেম ও বিশেষজ্ঞ দীর্ঘ সময় সীমিত আয়ে ইলম ও দক্ষতা অর্জন করেছেন।
- যদি নীতিমালার কারণে আর্থিক চাপ অসহনীয় হয়ে যায়, তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে ভাতা বৃদ্ধি, আংশিক প্র্যাকটিসের অনুমতি বা নীতিমালা সংস্কারের জন্য যৌথভাবে আবেদন করা। বৈধ উপায়ে নিয়ম পরিবর্তনের চেষ্টা করা চুক্তি ভঙ্গ করার চেয়ে উত্তম।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, একদিকে ‘আমি অন্য কোনো আয়ের উৎসের সঙ্গে যুক্ত নই’ মর্মে ঘোষণা দেওয়া, আর অন্যদিকে গোপনে সেই কাজ করা—এটি একজন মুত্তাকী মুসলিমের জন্য পরিহারযোগ্য। আয় কম হলেও সততার সঙ্গে অর্জিত হালাল আয়, চুক্তিভঙ্গ বা প্রতারণার মাধ্যমে অর্জিত বেশি আয়ের চেয়ে উত্তম ও অধিক বরকতময়।