রমজান মাস যেন একটি ব্যাংকের চেকবই। যেন আল্লাহ তাআলা আমাদের হাতে ত্রিশ পৃষ্ঠার একটি চেকবই তুলে দেন। প্রতিটি পৃষ্ঠা একটি দিন। সেখানে যত ইচ্ছা অংক লেখার সুযোগ—আর সেই অংকই আখেরাতে আমাদের জন্য জমা হবে।
রমজানের একটি দিন চলে যাওয়া মানে একটি চেক জমা হয়ে যাওয়া। সেখানে যত বড় অংক লিখতে পারবো, আখেরাতে তত বেশি নেকি জমা থাকবে।
সুতরাং এই সোনালী সুযোগ আমরা কীভাবে কাজে লাগাতে পারি—আজকের আলোচনায় আমরা সেটিই জানবো, ইনশাআল্লাহ।
أَقُوْلُ قَوْلِيْ هَذَا أَسْتَغْفِرُ اللهَ لِيْ وَلَكُمْ وَلِسَائِرِ الْمُسْلِمِيْنَ. فَاسْتَغْفِرُوْهُ، إِنَّهُ هُوَ الْغَفُوْرُ الرَّحِيْمُ.اَللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى سَيِّدِنَا مُحَمَّدٍ وَّعَلَى آلِ سَيِّدِنَا مُحَمَّدٍ وَّبَارِكْ وَسَلِّمْ
মুহতারাম হাজিরীন! রমজানুল মোবারক ঈমানদারদের জন্য বসন্তের মাস। যেমন বসন্ত এলে চারদিক সুরভিত হাওয়ায় ভরে যায়, গাছ-পালা শস্য-শ্যামল হয়ে ওঠে, ফুলে ফুলে প্রকৃতি সেজে ওঠে—তেমনি রমজান এলে বান্দার জীবনে রহমতের সুবাস ছড়িয়ে পড়ে।
রমজান আল্লাহ তাআলার রহমতের মাস। এর সকাল রহমত, এর সন্ধ্যা রহমত, এর তাহাজ্জুদ রহমত। যে ব্যক্তি নিজের গুনাহ মাফ করাতে চায়, রবকে খুশি করতে চায়—তার জন্য এটি এক অনন্য গোল্ডেন চান্স, সত্যিই এক সোনালী সুযোগ। ‘গোল্ডেন চান্স’ বা ‘সোনালী সুযোগ’ শব্দটি এখানেই সবচেয়ে মানানসই।
সেই বরকতময় বসন্ত এখন আমাদের মাঝে প্রবাহিত হচ্ছে।
আমাদের শায়খ ও মুরশিদ, মাহবুবুল ওলামা পীর জুলফিকার আহমদ নকশবন্দী রহ. একটি সুন্দর দৃষ্টান্ত দিতেন। তিনি বলতেন, রমজান মাস যেন একটি ব্যাংকের চেকবই। যেন আল্লাহ তাআলা আমাদের হাতে ত্রিশ পৃষ্ঠার একটি চেকবই তুলে দেন। প্রতিটি পৃষ্ঠা একটি দিন। সেখানে যত ইচ্ছা অংক লেখার সুযোগ—আর সেই অংকই আখেরাতে আমাদের জন্য জমা হবে।
রমজানের একটি দিন চলে যাওয়া মানে একটি চেক জমা হয়ে যাওয়া। সেখানে যত বড় অংক লিখতে পারবো, আখেরাতে তত বেশি নেকি জমা থাকবে।
সুতরাং এই সোনালী সুযোগ আমরা কীভাবে কাজে লাগাতে পারি—আজকের আলোচনায় আমরা সেটিই জানবো, ইনশাআল্লাহ।
মনে রাখবেন, আল্লাহ তাআলা অত্যন্ত গুণগ্রাহী। বান্দা যখন পরিচ্ছন্ন অন্তর নিয়ে তাঁর দরবারে এসে দাঁড়ায়, তাঁর চৌকাঠে মাথা রাখে—তখন তিনি অবশ্যই রহমতের আচরণ করেন।
রমজানে নানান আমলের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য ও সন্তুষ্টি অর্জন করা যায়। কিছু আমল বিশেষভাবে রমজানের সাথে সম্পৃক্ত—যেমন রোজা, যা ফরজ; এবং তারাবিহ, যা সুন্নাতে মুয়াক্কাদা।
এ ছাড়াও কিছু আমল রয়েছে, যেগুলোর প্রতি হাদিসে রাসূলুল্লাহ ﷺ বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন—যেগুলো রমজানের চেকবইয়ে বড় অংক হিসেবে লেখার সুযোগ এনে দেয়।
খুতবায় যে হাদিসটি উল্লেখ করা হয়েছে, তা হযরত সালমান ফারসি রাযি. থেকে বর্ণিত একটি দীর্ঘ হাদিসের অংশবিশেষ। হাদিসটি ইমাম ইবনু খুযায়মাহ রহ. তাঁর ‘সহীহ’ নামক গ্রন্থে এবং ইমাম বাইহাকি রহ. তাঁর ‘শু‘আবূল ঈমান’ নামক গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন। এর শুরুতে রমজানের ফজিলত বর্ণনা করা হয়েছে। এরপর বলা হয়েছে, রমজানের তিনটি দশক রয়েছে—
أَوَّلُهُ رَحْمَةٌ প্রথম দশক রহমতের,
وَأَوْسَطُهُ مَغْفِرَةٌ দ্বিতীয় দশক মাগফিরাতের,
وَآخِرُهُ عِتْقٌ مِنَ النَّارِ আর তৃতীয় দশক জাহান্নাম থেকে মুক্তির।
হাদিসের শেষ অংশে চারটি বিশেষ আমলের কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে দু’টি আমল এমন, যার মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করে। আর বাকি দু’টি আমল এমন, যা ছাড়া কোনো মুসলমানের উপায় নেই। [ইবনু খুযায়মাহ্ : ১৮৮৭, শু‘আবূল ঈমান : ৩৩৩৬]
এই চারটি আমলের প্রথমটি হলো—কালিমায়ে তাওহিদের অধিক জিকির : ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’।
একটু চিন্তা করুন, কত সহজ একটি আমল এটি। এতে আলাদা সময় বের করতে হয় না, বিশেষ কোনো কষ্টও নেই। নিজের দৈনন্দিন কাজ করতে করতেই মানুষ সহজে এই কালিমা জপতে পারে। অথচ এর বিনিময়ে আল্লাহ তাআলা বান্দার ওপর সন্তুষ্ট হন।
কত সহজ একটি আমল—আর কত মহৎ তার প্রতিদান! আল্লাহর সন্তুষ্টি কোনো সাধারণ বিষয় নয়। কুরআনুল কারিমে আল্লাহ তাআলা বলেন
আল্লাহ মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদেরকে জান্নাতের ওয়াদা দিয়েছেন, যার তলদেশে নহরসমূহ প্রবাহিত, যেখানে তারা চিরকাল থাকবে এবং ওয়াদা দিয়েছেন আদন জান্নাতসমূহে অতি উত্তম বাসস্থান। আর আল্লাহর সন্তুষ্টি—এটাই সবচেয়ে বড় নিয়ামত। এটাই মহাসাফল্য। [সূরা তাওবা : ৭২]
এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা প্রথমে জান্নাত ও জান্নাতবাসীদের জন্য প্রস্তুত অসংখ্য নিয়ামতের কথা উল্লেখ করেছেন। তারপর বলেছেন, এসবের চেয়েও বড় হলো তাঁর সন্তুষ্টি। আর এটাকেই তিনি ‘মহাসাফল্য’ বলে ঘোষণা করেছেন। তাহলে যদি শুধু কালিমায়ে তাওহিদের অধিক জিকিরের মাধ্যমে আমরা এমন মহান নিয়ামত লাভ করতে পারি—তবে এর চেয়ে সহজ ও লাভজনক সৌভাগ্য আর কী হতে পারে!
২. ইস্তিগফার অধিক পাঠ
এই হাদিসে দ্বিতীয় যে আমলটির প্রতি অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, তা হলো—তোমরা আল্লাহর কাছে নিজের গুনাহের ক্ষমা প্রার্থনা করবে।
মানুষ দৈনন্দিন জীবনে উঠতে-বসতে, চলতে-ফিরতে অনেক গুনাহ করে ফেলে—যার অনেকগুলো সে টেরও পায় না। তাই বেশি বেশি ইস্তিগফার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে; যেন গুনাহ হয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ইস্তিগফারের মাধ্যমে তা মুছে যায় এবং ক্ষমা হয়ে যায়।
ইস্তিগফার করাও কালিমায়ে তাওহিদের মতোই অত্যন্ত সহজ একটি আমল। এতে কোনো জটিলতা নেই, কোনো বিশেষ আয়োজনের প্রয়োজন নেই। যে কোনো অবস্থায়—হাঁটতে হাঁটতে, কাজ করতে করতে, বসে বা শুয়ে—জিহ্বায় কিংবা অন্তরে ইস্তিগফার জারি রাখা যায়। ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’—এই ছোট্ট বাক্যটি উচ্চারণ করা কত সহজ! অথচ এর ভেতরে লুকিয়ে আছে অগণিত রহমত ও মাগফিরাত। কেউ চাইলে নিজের মাতৃভাষায়ও আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে পারে। বারবার বলতে পারে, ‘হে আল্লাহ! আমার গুনাহগুলো ক্ষমা করে দিন।’
ইস্তিগফার এত গুরুত্বপূর্ণ একটি আমল যে, শুধু রমজানেই নয়—সারা বছরই এর চর্চা থাকা উচিত। স্বয়ং রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর জীবন ছিল এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। আবু হুরাইরা রাযি. বর্ণনা করেন, তিনি রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে বলতে শুনেছেন
আল্লাহর কসম! আমি দিনে সত্তরেরও বেশি বার আল্লাহর কাছে তাওবা ও ইস্তিগফার করি। [সহীহ বুখারী : ৬৩০৭]
প্রিয় ভাইয়েরা! একটু ভেবে দেখার বিষয়—রাসূলুল্লাহ ﷺ তো নবী, আর নবীগণ নিষ্পাপ (মাসুম)। তাঁদের থেকে গুনাহ সংঘটিত হয় না। তাহলে তিনি এত বেশি ইস্তিগফার করতেন কেন?
মুহাদ্দিসগণ এ প্রশ্নের বিভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তার একটি হলো—এটি ছিল তাঁর উম্মতের জন্য শিক্ষা। যেন উম্মত তাঁকে ইস্তিগফার করতে দেখে এর গুরুত্ব ও পদ্ধতি শিখে নেয়। যখন নবীজি ﷺ—যিনি নিষ্পাপ—এত বেশি ইস্তিগফার করেন, তখন আমরা যারা গুনাহে জড়িয়ে আছি, আমাদের কত বেশি ইস্তিগফার করা উচিত! কারণ আমাদের দ্বারা তো দিন-রাত অসংখ্য ভুল ও গুনাহ হয়ে যায়।
হাসান বসরী রহ. বলেন, ইস্তিগফার করছে এমন কাউকে আল্লাহ আযাব দিবেন বলে আমি মনে করি না।
এর কারণ জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, তাকে শাস্তি দেওয়ার ইচ্ছা থাকলে কীভাবে আল্লাহ তাআলা তার মনে ইস্তিগফারের প্রেরণা দিতে পারেন?
আল্লাহ তাআলা বলেন
আল্লাহ এমন নন যে, তারা ক্ষমা প্রার্থনা করবে অথচ তিনি তাদেরকে শাস্তি দেবেন। [সূরা আনফাল : ৩৩]
সুতরাং এটি হলো রমজানের দ্বিতীয় সেই আমল, যার প্রতি অধিক গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। আর এর ফল—আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি লাভ। আল্লাহ আমাদের সবাইকে বেশি বেশি ইস্তিগফার করার তাওফিক দান করুন। আমীন।
তৃতীয় যে আমলটির প্রতি বেশি বেশি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তা হলো—আল্লাহ তাআলার কাছে জান্নাত চাওয়া। তাঁর নিকট জান্নাতের প্রার্থনা করা।
এ তৃতীয় ও চতুর্থ আমল সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—এই দুই আমল ছাড়া বান্দার কোনো উপায় নেই। অর্থাৎ প্রতিটি মুমিনেরই সর্বদা এ দোয়া করা জরুরি।
জান্নাত চাওয়ার ফজিলত
জান্নাত চাওয়ার ব্যাপারে একটি হাদিসে অত্যন্ত চমৎকার একটি ফজিলতের কথা বলা হয়েছে। হযরত আনাস ইবন মালিক রাযি.থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন
যে ব্যক্তি আল্লাহর কাছে তিনবার জান্নাত প্রার্থনা করে, জান্নাত বলে, ‘হে আল্লাহ! তাকে জান্নাতে প্রবেশ করান।’ আর যে ব্যক্তি তিনবার জাহান্নাম থেকে আশ্রয় চায়, জাহান্নাম বলে, ‘হে আল্লাহ! তাকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করুন।’ [ইবন মাজাহ : ৪৩৪০]
ভেবে দেখুন, কী অসাধারণ বিষয়! যখন বান্দা আল্লাহর কাছে বেশি বেশি জান্নাত চায়, তখন সে একা থাকে না—জান্নাত নিজেই তার পক্ষে সুপারিশ করে। আর যখন জান্নাত নিজেই কোনো মুমিনের জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে, তখন তা অবশ্যই কবুল হওয়ারই কথা। একইভাবে, যখন কেউ বেশি বেশি জাহান্নাম থেকে আশ্রয় চায়, তখন জাহান্নামও যেন তার পক্ষে কথা বলে, হে আল্লাহ! তাকে আমার থেকে রক্ষা করুন।
একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা দরকার—আমরা যখন আল্লাহর কাছে জান্নাত চাইব, তা যেন আল্লাহর শান অনুযায়ী চাই। আমাদের সামর্থ্য বা ধারণা অনুযায়ী নয়। আল্লাহর ভাণ্ডারে কোনো অভাব নেই, তাঁর দান ও অনুগ্রহেও কোনো সীমাবদ্ধতা নেই। অভাব যদি কিছু থাকে, তা আমাদের চাওয়ার মধ্যে—আমরা ঠিকমতো চাইতেও জানি না। কবি যেমন বলেছেন
এ কারণেই হাদিসে রাসূলুল্লাহ ﷺ নির্দেশ দিয়েছেন
তোমরা যখন আল্লাহর কাছে কিছু চাইবে, তখন জান্নাতুল ফিরদাউস চাইবে। কারণ তা জান্নাতের সর্বোচ্চ ও সর্বোত্তম স্থান। তার উপরে রয়েছে রহমানের আরশ এবং সেখান থেকেই জান্নাতের নহরসমূহ প্রবাহিত হয়েছে। [সহীহ বুখারী : ২৭৯০]
প্রিয় ভাইয়েরা! আল্লাহকে কখনো বান্দাদের সঙ্গে তুলনা করা যাবে না। আমরা যখন কোনো মানুষের কাছে কিছু চাই, সে বিরক্ত হতে পারে। অনেক অনুরোধের পর যদি কিছু দেয়, তখন আমরা আবার বেশি চাইতে সংকোচ বোধ করি। কিন্তু আল্লাহ তাআলার ব্যাপার সম্পূর্ণ ভিন্ন। মানুষ বেশি চাইলে রাগ করে—আর আল্লাহ না চাইলে অসন্তুষ্ট হন। মানুষ চাওয়ায় বিরক্ত হয়—আর আল্লাহ চাওয়ায় খুশি হন।
তাঁর দয়া, অনুগ্রহ ও ভাণ্ডারের বিস্তৃতি এত সীমাহীন যে, আমরা তা কল্পনাও করতে পারি না। তাই রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন—আল্লাহর কাছে জান্নাতের সর্বোচ্চ মর্যাদা, জান্নাতুল ফিরদাউসই প্রার্থনা করতে।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে আন্তরিকতার সঙ্গে জান্নাতুল ফিরদাউস প্রার্থনা করার তাওফিক দান করুন। আমীন।
চতুর্থ যে আমলটি রমজানুল মোবারকে বেশি বেশি করার প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, তা হলো—আল্লাহ তাআলার কাছে জাহান্নাম থেকে আশ্রয় চাওয়া। এ আমলটিও এমন, যার বিকল্প কোনো মুমিনের জন্য নেই।
মুমিন বান্দা যেহেতু আখিরাতের দিনের ওপর দৃঢ় বিশ্বাস রাখে, তাই সে সেই দিনের ভয়াবহতা ও জাহান্নামের শাস্তিকে ভয় করে। তাই যেমন আল্লাহর অনুগ্রহ ও দয়ার আশায় জান্নাত চাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তেমনি তাঁর পাকড়াও ও শাস্তির ভয়ে জাহান্নাম থেকে আশ্রয় প্রার্থনারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কাসেম ইবন মুহাম্মদ রহ. বলেন, আমার সকালে হাঁটা-হাঁটির অভ্যাস ছিল। হাঁটতে বের হলে প্রথমেই আমি আমার ফুফু আয়শা রাযি.-এর বাড়িতে গিয়ে তাঁকে সালাম দিতাম। একদিন গিয়ে দেখলাম, তিনি সালাতুয যুহা তথা চাশতের নামায আদায় করছেন। নামাযে তিনি বারবার এই আয়াতটি পড়ছেন এবং কাঁদতে কাঁদতে দোয়া করছেন
অতঃপর আল্লাহ আমাদের প্রতি অনুগ্রহ করেছেন এবং আমাদেরকে জাহান্নামের শাস্তি থেকে রক্ষা করেছেন। [সূরা আত-তূর : ২৭]
আমি দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে কিছুটা অস্থির হয়ে পড়লাম, কিন্তু তিনি একই আয়াত পুনরাবৃত্তি করেই চলছিলেন। মনে হলো, বাজারে আমার কিছু প্রয়োজন আছে—কাজ সেরে পরে আবার আসব। বাজার থেকে ফিরে এসে দেখি, তিনি এখনো আগের মতোই একই আয়াত পড়ছেন, কাঁদছেন আর দোয়া করছেন। [সিফাতুস সাফওয়া : ২/৩১]
প্রকৃত ঈমানের সৌন্দর্য এখানেই—বান্দার অন্তরে একসঙ্গে দুটি অনুভূতি থাকবে—আল্লাহর রহমত ও মাগফিরাতের আশা এবং তাঁর শাস্তির ভয়।
কুরআনুল কারিমে মুত্তাকিদের পরিচয় দিতে গিয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন
যারা বলে—হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা ঈমান এনেছি; সুতরাং আমাদের গুনাহসমূহ ক্ষমা করুন এবং আমাদেরকে জাহান্নামের আযাব থেকে রক্ষা করুন। [সূরা আলে ইমরান : ১৬]
এই আয়াতের আগের অংশে আল্লাহ তাআলা মুত্তাকিদের জন্য জান্নাত ও তার অসংখ্য নিয়ামতের কথা উল্লেখ করেছেন, সঙ্গে আল্লাহর সন্তুষ্টির কথাও বলেছেন। আর তার পরপরই তাঁদের দোয়া তুলে ধরেছেন—তারা আল্লাহর কাছে গুনাহ মাফ চায় এবং জাহান্নামের আযাব থেকে মুক্তি প্রার্থনা করে।
এ থেকে বোঝা যায়, একজন মুমিনের অন্তরে এই দুই গুণ থাকা অপরিহার্য—সে যেমন জান্নাত কামনা করবে, তেমনি জাহান্নামের শাস্তি থেকে আশ্রয়ও চাইবে।
সারকথা
সারকথা হলো—রমজানুল মোবারকে আমরা বিশেষভাবে নেক আমলের প্রতি যত্নবান হই। সেই নেক আমলগুলোর মধ্যে এই চারটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, যা হাদিসে আলাদা করে উল্লেখ করা হয়েছে
১. কালিমায়ে তাওহিদের অধিক জিকির।
২. বেশি বেশি ইস্তিগফার।
৩. আল্লাহর কাছে জান্নাত প্রার্থনা।
৪. জাহান্নাম থেকে আশ্রয় প্রার্থনা।
এসব আমল অত্যন্ত সহজ, কিন্তু এর প্রতিদান অসীম মহৎ। তাই আসুন, এই বরকতময় মাসে আমরা এগুলো বেশি বেশি করি এবং আল্লাহ তাআলার নৈকট্য অর্জনের চেষ্টা করি।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে রমজানের প্রকৃত ফায়দা অর্জনের তাওফিক দান করুন। আমীন।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—রমজানুল মোবারকে আমরা যেন কুরআনুল কারিমের সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক গড়ে তুলি।
রমজান এলে সাধারণ মুসলমানও ইবাদতে একটু বেশি মনোযোগী হয়—আলহামদুলিল্লাহ, চারদিকে তার সুন্দর দৃশ্য দেখা যায়। নামাযের প্রতি যত্ন বাড়ে, কুরআন তিলাওয়াত বৃদ্ধি পায়, নফল ইবাদতেও আগ্রহ বাড়ে।
রমজান মাসের সঙ্গে কুরআনের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। রাসুলুল্লাহ ﷺ এ মাসে হযরত জিবরাইল আ.-এর সঙ্গে কুরআনের ‘দাওর’ (পুনরাবৃত্তি) করতেন। এই সম্পর্কের ছাপ আজও মুসলমানদের মাঝে দেখা যায়—সাধারণ দিনের তুলনায় রমজানে তিলাওয়াত অনেক বেশি হয়।
কিন্তু দুঃখের বিষয়, রমজান শেষ হতেই অনেকের কুরআনের সঙ্গে সেই সম্পর্কও শেষ হয়ে যায়। এটা অত্যন্ত বিপজ্জনক প্রবণতা। কুরআনুল কারিম আল্লাহ তাআলার এমন এক মহা-নিয়ামত, যার সমতুল্য আর কোনো নিয়ামত হতে পারে না। তাই রমজান শেষ হলেই কুরআনকে তাকের ওপর সাজিয়ে রেখে দেওয়া—এটি কুরআনের প্রতি বড় অবহেলা।
শাইখুল ইসলাম হযরত মাওলানা মুফতি মুহাম্মদ তাকি উসমানি দা.বা. বলেন—তাঁর পিতা হযরত মুফতি মুহাম্মদ শফি রহ. কুরআন খতমের সময় বলতেন, তারাবিহর উনিশতম রাকাতে ‘কুল আউযু বিরাব্বিন নাস’ পড়ে কুরআন শেষ হয়ে যায়। কিন্তু বিশতম রাকাতে আবার ‘আলিফ-লাম-মীম’ থেকে কিছু আয়াত পড়া হয়। এটি মূলত রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর শিক্ষা—যে মজলিসে একবার কুরআন শেষ করা হয়, সেই মজলিসেই যেন আরেকবার কুরআন শুরু করা হয়।
তিনি আরও বলতেন, কুরআন শেষ করার জিনিস নয়; বরং জীবনকে কুরআনের ভেতরেই শেষ করতে হবে। অর্থাৎ কুরআনের সঙ্গে সম্পর্ক যেন সাময়িক না হয়, বরং আজীবনের হয়।
কুরআন খতম রমজানে কতবার করবে?
রমজানে কতবার কুরআন খতম করা উচিত—শরিয়ত এ ব্যাপারে নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা নির্ধারণ করেনি। যতটা সম্ভব বেশি তিলাওয়াত করা উচিত।
আল্লাহ তাআলা বলেন
এ ব্যাপারে প্রতিযোগীরা প্রতিযোগিতা করুক। [সূরা মুতাফফিফিন : ২৬]
অর্থাৎ ভালো কাজে একে অপরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা যায়—কেউ যদি তিন খতম করে, আমি পাঁচ খতম করার চেষ্টা করতে পারি।
তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—আল্লাহর কাছে গুণগত মান গুরুত্বপূর্ণ, কেবল সংখ্যা নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন
তিনি তোমাদের পরীক্ষা করতে চান—কে তোমাদের মধ্যে আমলে উত্তম। [সূরা মুলক : ২]
অল্প পড়ি, কিন্তু মনোযোগ দিয়ে পড়ি; ভাবনা-চিন্তা করে পড়ি; জীবন বদলানোর নিয়তে পড়ি—এটাই কাম্য।
কুরআনুল কারিমের হক
মুসলমান হিসেবে কুরআনের আমাদের ওপর অনেক হক রয়েছে—
১. সহীহ তিলাওয়াত করা
এর মধ্যে প্রথম ও গুরুত্বপূর্ণ হক হলো—সঠিকভাবে কুরআন তিলাওয়াত করা। কুরআন যেভাবে হযরত জিবরাইল আ. রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে শিখিয়েছেন এবং রাসূল ﷺ সাহাবাদের শিক্ষা দিয়েছেন, আমাদেরও সেভাবেই পড়তে হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন
যখন আমি তা পাঠ করি, তখন আপনি সেই পাঠ অনুসরণ করুন। [সূরা কিয়ামাহ : ১৮]
অর্থাৎ কুরআন যেমন নাযিল হয়েছে, তেমন করেই পড়তে হবে।
এজন্য কুরআন তাজবিদ অনুযায়ী পড়া জরুরি। প্রতিটি হরফের সঠিক উচ্চারণ জানা খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ উচ্চারণ ভুল হলে অর্থ বদলে যেতে পারে, এমনকি নামাযও শুদ্ধ নাও হতে পারে।
আরবি ভাষায় ২৯টি হরফ। সঠিক মাখরাজ শিখে নিলে কুরআন সুন্দরভাবে পড়া কঠিন নয়। নিয়মিত অনুশীলনে এটি সহজ হয়ে যায়।
প্রতিদিন তিলাওয়াতের অভ্যাস
কুরআন তিলাওয়াত আমাদের প্রতিদিনের জীবনের অংশ হওয়া উচিত। অল্প হলেও—প্রতিদিন।
এক সময় মুসলিম সমাজে ফজরের পর ঘরে ঘরে কুরআন তিলাওয়াতের ধ্বনি শোনা যেত। ছোট-বড় সবাই তিলাওয়াতে ব্যস্ত থাকত। আজ সেই দৃশ্য অনেকটাই হারিয়ে গেছে।
আগে কুরআনকে সাতটি মঞ্জিলে ভাগ করে সাত দিনে এক খতম করার রেওয়াজ ছিল। পরে প্রতিদিন এক পারা পড়ে মাসে এক খতম করার অভ্যাস চালু হয়।
কিন্তু আজ অনেকেই নিয়মিত পড়েন না। তাই অন্তত চেষ্টা করা উচিত—এক পারা না পারলে অর্ধেক পারা। তাও না পারলে এক চতুর্থাংশ। কিন্তু এমন যেন না হয়—পুরা দিনই কুরআন ছাড়া কেটে যায়।
কুরআনের সঙ্গে প্রতিদিনের সম্পর্কই আমাদের ঈমানকে জীবিত রাখে।
শাইখুল হিন্দ মাহমুদ হাসান দেওবন্দী রহ. বলেন, আমাদের অধঃপতনের দুটি কারণ—
এক. আমরা কুরআন ছেড়ে দিয়েছি। তথা আমরা তার তিলাওয়াত ছেড়ে দিয়েছি। এর অর্থ বোঝার চেষ্টা ছেড়ে দিয়েছি। এতে যেই তা’লীম ও শিক্ষা রয়েছে তার ওপর আমল করা ছেড়ে দিয়েছি।
দুই. ফেরকাবাজি তথা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিষয়ে গ্রুপিং করার মতো জঘন্য কাজে নিয়োজিত হয়ে নিজেদের শক্তি ক্ষয় করে দিচ্ছি।
বোঝা গেল, আজ মুসলমানরা যে অপমান ও লাঞ্ছনার মধ্যে আছে—তার বড় কারণ কুরআন থেকে দূরে সরে যাওয়া।
আল্লাহ তাআলা বলেছেন
কিয়ামতের দিন মুহাম্মদ ﷺ অভিযোগ করবেন—হে আমার রব! আমার কওম এই কুরআনকে পরিত্যক্ত করে রেখেছিল। [সূরা ফুরকান : ৩০]
ভাবুন তো—যিনি আমাদের জন্য শাফাআত করবেন, তিনিই যদি অভিযোগ করেন আমরা কুরআন ছেড়ে দিয়েছিলাম, তবে আমাদের অবস্থা কী হবে? তাই প্রত্যেক মুসলমানের অঙ্গীকার করা উচিত—আমার জীবনের কোনো দিন যেন কুরআন তিলাওয়াত ছাড়া না যায়।
কুরআনের দ্বিতীয় হক হলো—এটি বোঝা এবং এর নির্দেশনা অনুযায়ী চলা।
আল্লাহ বলেন
এ কিতাব মুত্তাকিদের জন্য হেদায়েত। [সূরা বাকারা : ২]
যখন আল্লাহ নিজেই এটিকে হেদায়েতের কিতাব বলেছেন, তখন একে শুধু কাপড়ে জড়িয়ে তাকের ওপর রেখে দেওয়া এবং বোঝার চেষ্টা না করা—এটাও কুরআনের হক নষ্ট করা।
ধরুন, আপনার প্রিয় কেউ আপনাকে একটি চিঠি পাঠাল—কিন্তু আপনি ভাষাটি বোঝেন না। আপনি কি না বুঝে বসে থাকবেন? কখনোই না। আপনি অবশ্যই এমন কারও কাছে যাবেন, যে আপনাকে বুঝিয়ে দেবে।
তাহলে আল্লাহর পাঠানো কিতাব আমরা কীভাবে না বুঝে রেখে দিই?
এটাও সত্য নয় যে, কুরআন বোঝা খুব কঠিন কাজ। আলহামদুলিল্লাহ, আজ প্রায় সব ভাষাতেই নির্ভরযোগ্য আলেমদের রচিত কুরআনের অনুবাদ ও তাফসির পাওয়া যায়।
তাই প্রত্যেক মুসলমানের উচিত—নিজের কাছে একটি বিশ্বস্ত অনুবাদ বা তাফসির রাখা এবং নিয়মিত পড়ে কুরআন বোঝার চেষ্টা করা।
তবে একটি বিষয় মনে রাখতে হবে—আজকাল অনেক বিভ্রান্ত চিন্তার লোকেরাও অনুবাদ ও তাফসির লিখেছে। তাই কোনো নির্ভরযোগ্য আলেমের পরামর্শ নিয়ে বিশ্বস্ত তাফসির সংগ্রহ করা উচিত।
তাফসিরের মজলিসে অংশগ্রহণ
কুরআন বোঝার আরেকটি সহজ উপায় হলো—মসজিদে আয়োজিত তাফসিরের আসরে অংশ নেওয়া। আলহামদুলিল্লাহ, আমাদের দেশে মাদরাসা বেশি থাকার কারণে বহু মসজিদে বিজ্ঞ ও বিশ্বস্ত আলেমদের মাধ্যমে কুরআনের তাফসিরের ব্যবস্থা থাকে—বিশেষত রমজান মাসে।
এসব তাফসিরের মজলিসে অংশ নিন। মনোযোগ দিয়ে শুনুন। প্রশ্ন করুন। কুরআনকে জানুন, বুঝুন।
৩. কুরআনের তৃতীয় হক : জীবনে বাস্তবায়ন
কুরআন মাজিদের তৃতীয় হক হলো—আল্লাহ তাআলা এতে যে নির্দেশনা দিয়েছেন, তা নিজের বাস্তব জীবনে কার্যকর করা।
শুধু শুদ্ধভাবে তিলাওয়াত করা এবং অর্থ বুঝে নেওয়াই যথেষ্ট নয়; বরং বোঝার পর সে অনুযায়ী আমল করা অপরিহার্য। যতটুকু পরিমাণে কুরআনের ইলম অর্জন করা ফরজ বা জরুরি, ঠিক ততটাই তার ওপর আমল করাও জরুরি। আমল ছাড়া ইলমের কোনো মূল্য নেই।
সারকথা—প্রত্যেক মুসলমানের দায়িত্ব হলো, কুরআনের এই তিনটি হক যথাসম্ভব পূর্ণভাবে আদায় করার চেষ্টা করা—
১. সহীহভাবে তিলাওয়াত।
২. অর্থ বোঝা ও হেদায়েত গ্রহণ।
৩. জীবনে বাস্তবায়ন।
খতমে কুরআন দোয়া কবুলের বিশেষ মুহূর্ত
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—খতমে কুরআনের সময় দোয়া কবুল হওয়ার বিশেষ আশা থাকে। আল্লাহ তাআলার নিয়ম হলো, কুরআন খতমের মুহূর্তে করা দোয়া বিশেষভাবে গ্রহণ করা হয়।
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর খাদেম হযরত আনাস ইবনে মালিক রাযি.-এর আমল ছিল—তিনি যখন কুরআন খতম করতেন, তখন পরিবারের সবাইকে একত্র করে তাদের জন্য দোয়া করতেন। [নববী, আল-আযকার : ১৪১]
অতএব আমাদেরও উচিত—খতমে কুরআনের সময় বিশেষভাবে দোয়ার আয়োজন করা; নিজের জন্য, পরিবার-পরিজনের জন্য, উম্মাহর জন্য দোয়া করা।
প্রিয় ভাইয়েরা! কুরআনুল কারিম ও রমজানুল মোবারকের মধ্যে অনেক মিল রয়েছে। এর মধ্যে তিনটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য উল্লেখযোগ্য—
১️. তাকওয়া তথা আল্লাহভীতি
আল্লাহ তাআলা রোজা সম্পর্কে বলেন
হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর—যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার। [সূরা বাকারা : ১৮৩]
অর্থাৎ রোজা মানুষের অন্তরে তাকওয়া সৃষ্টি করে।
আবার কুরআন সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন
এ কিতাব মুত্তাকিদের জন্য হেদায়েত। [সূরা বাকারা : ২]
যেমন রোজা তাকওয়া অর্জনের মাধ্যম, তেমনি কুরআনও মুত্তাকিদের জন্য হেদায়েতের উৎস। অর্থাৎ উভয়ের লক্ষ্য—মানুষের অন্তরে তাকওয়া সৃষ্টি করা।
২️. শাফাআত বা সুপারিশ
এক হাদিসে রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন
রোজা ও কুরআন কিয়ামতের দিন বান্দার জন্য সুপারিশ করবে। রোজা বলবে—হে রব! আমি তাকে দিনে খাদ্য ও কামনা-বাসনা থেকে বিরত রেখেছি; সুতরাং তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ কবুল করুন। কুরআন বলবে—আমি তাকে রাতে ঘুম থেকে বিরত রেখেছি; সুতরাং তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ কবুল করুন। অতঃপর উভয়ের সুপারিশ কবুল করা হবে। [মুসনাদ আহমদ : ৬৬২৬]
অর্থাৎ রমজানের রোজা এবং কুরআন—দু’টিই আখিরাতে বান্দার জন্য রক্ষাকবচ হবে।
৩️. আল্লাহর নৈকট্য
রমজান ও কুরআনের আরেকটি মিল হলো—এ দু’টির মাধ্যমে আল্লাহর বিশেষ নৈকট্য লাভ হয়।
আল্লাহর কালাম তিলাওয়াতের সময় বান্দা এক বিশেষ রূহানিয়াত ও কুরব-নৈকট্য অনুভব করে। তেমনি রোজাদারের ব্যাপারেও একটি হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ তাআলা বলেন
আদম সন্তানের প্রতিটি আমল তার নিজের জন্য; তবে রোজা আমার জন্য, আর আমি নিজেই এর প্রতিদান দেব। [সহীহ বুখারী : ১৮৯৪]
অর্থাৎ রোজার প্রতিদান আল্লাহ নিজ হাতে প্রদান করবেন—এতে যে বিশেষ সম্মান ও নৈকট্যের ইঙ্গিত আছে, তা অনন্য।
রমজানুল মোবারক ও কুরআনুল কারিমের মাঝে যে মিলিত বৈশিষ্ট্যগুলো রয়েছে, তা থেকেই বোঝা যায়—এই দুইয়ের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর।
তাছাড়া রমজানেই কুরআন নাযিল হয়েছে। রাসূলুল্লাহ ﷺ রমজানে তুলনামূলকভাবে বেশি কুরআন তিলাওয়াত করতেন। হযরত জিবরাইল আ. রমজান মাসে এসে নবীজির সাথে কুরআনের ‘দাওর’ তথা নাযিলকৃত অংশসমূহ পুনরাবৃত্তি করতেন। তারাবিতে খতমে কুরআনের ব্যবস্থা, সাহাবায়ে কেরাম ও পরবর্তী বুযুর্গদের রমজানে বিশেষভাবে তিলাওয়াতে মনোযোগ—এসবই প্রমাণ করে যে রমজান ও কুরআনের সম্পর্ক একেবারে নিবিড়।
রমজানের সাথে কুরআনের সম্পর্কের সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো—এই মাসেই কুরআন নাযিল হয়েছে। এক বরকতময় রাতে আল্লাহ তাআলা লাওহে মাহফুজ থেকে আসমানে দুনিয়ায় সম্পূর্ণ কুরআন অবতীর্ণ করেন। এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী ধীরে ধীরে প্রায় ২৩ বছরে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর ওপর কুরআন নাযিল সম্পূর্ণ হয়। বর্ণনায় এসেছে, অন্যান্য আসমানি সহিফাগুলিও রমজান মাসেই নাযিল হয়েছিল। এভাবে রমজান ও কুরআনের সম্পর্ক দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে যায়।
অতএব এই বরকতময় মাসে বেশি বেশি কুরআন তিলাওয়াতে মশগুল থাকা উচিত।
রমজানে নবীজির আমল
রমজানের সাথে কুরআনের বিশেষ সম্পর্কের আরেকটি প্রমাণ হলো—রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর বিশেষ আমল।
সহীহ হাদিসে এসেছে, প্রতি বছর রমজান মাসে হযরত জিবরাইল আ. নবীজির সাথে কুরআনের নাযিলকৃত অংশসমূহ একবার করে পুনরাবৃত্তি করতেন। আর যে বছর রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর ইন্তিকাল হয়, সে বছর তিনি দু’বার কুরআন দাওর করেন।
এই আমল আমাদের জন্য বড় শিক্ষা—রমজান হলো কুরআনের সাথে নতুন করে সম্পর্ক দৃঢ় করার মাস।
রমজানে সালাফদের আমল
বহু বর্ণনা থেকে জানা যায়—সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়িন ও তাবে-তাবেয়িন রহিমাহুমুল্লাহ রমজানে কুরআনের সাথে বিশেষ সম্পর্ক রাখতেন। অনেক বুযুর্গ সম্পর্কে কিতাবে উল্লেখ আছে—তারা রমজানে অন্যান্য ব্যস্ততা কমিয়ে অধিকাংশ সময় তিলাওয়াতে ব্যয় করতেন।
অনেক সালাফ সম্পর্কে বর্ণিত আছে—তারা রমজানে, বিশেষ করে শেষ দশকে, তিন দিনে বা এক দিনেই একবার কুরআন খতম করতেন। রমজানে খতমে কুরআনের এত ঘটনা কিতাবে উল্লেখ আছে যে সব বলা সম্ভব নয়। উদাহরণস্বরূপ—
ইবরাহিম নাখঈ রহ.
ইবরাহিম নাখঈ রহ. রমজানে প্রতি তিন দিনে একবার কুরআন খতম করতেন। আর শেষ দশকে প্রতি দুই রাতে একবার খতম করতেন। এবং তিনি রমজানের প্রতি রাতে গোসল করতেন। [মুসান্নাফ আবদুর রাযযাক : ৫৯৫৫]
আবু হানিফা রহ.
আবু হানিফা রহ. রমজান মাসে ৬১ খতম করতেন—প্রতিদিন এক খতম, প্রতি রাতে এক খতম এবং তারাবিতে এক খতম। [হাশিয়াতুত তাহতাবী : ১/৪১৫]
ইমাম মালিক রহ.
ইমাম মালিক রহ.—যিনি বিখ্যাত হাদিসগ্রন্থ মুআত্তা মালিক-এর সংকলক এবং বড় মাপের মুহাদ্দিস ও ফকিহ—তিনি সাধারণত গভীর শ্রদ্ধা ও খুশু-খুজুর সাথে হাদিসের দরস দিতেন। কিন্তু রমজান শুরু হলে তিনি হাদিসের পাঠ বন্ধ করে অধিকাংশ সময় কুরআন তিলাওয়াতে কাটাতেন। [লাতায়িফুল মাআরিফ : ১৭১]
ইমাম শাফিঈ রহ.
ইমাম শাফিঈ রহ. প্রতি মাসে ৩০ খতম করতেন। আর রমজানে ৬০ খতম করতেন, নামাযে যা পড়তেন তার বাইরে। [সিফাতুস সাফওয়া : ২/২৫৫]
ইমাম বুখারী রহ.
ইমাম বুখারী রহ. রমজানের প্রথম রাতেই তিনি ছাত্রদের একত্র করতেন এবং তাদের নিয়ে নামায আদায় করতেন। প্রতি রাকাতে ২০ আয়াত করে পড়তেন, এভাবে খতম সম্পন্ন করতেন।
সাহরির সময় তিনি কুরআনের অর্ধেক থেকে এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত তিলাওয়াত করতেন।
প্রতিদিন ইফতারের সময় এক খতম শেষ করতেন এবং বলতেন
প্রতিটি খতমের সময় একটি দোয়া কবুল হয়। [সিফাতুস সাফওয়া : ৪/১৭০]
রশীদ আহমদ গাঙ্গুহী রহ.
মাওলানা যাকারিয়া কান্ধলভী রহ. গাঙ্গুহী রহ. সম্পর্কে লিখেছেন, তাঁর মুজাহাদার অবস্থা এমন ছিল যে, তা দেখে অন্যদের করুণা ও ভয় হত। যখন তাঁর বয়স সত্তরের বেশি, তখনো অবস্থা এই ছিল, দিনে রোজা রাখতেন, মাগরিবের পরে বিশ রাকাত আওয়াবীন পড়তেন। তাতে যতটুকু তিলাওয়াত করতেন, তা আনুমানিক দুই পারার কম হবে না। রুকু-সিজদা এত দীর্ঘ হত যে, অন্যদের মনে হত তিনি রুকু বা সিজদা থেকে ওঠার কথা ভুলে গেছেন। আওয়াবীন শেষ করে ঘরে যাওয়া ও খাওয়ার জন্য অবস্থানকালে কয়েক পারা তিলাওয়াত করতেন। কিছুক্ষণ পরে এশা ও তারাবিহ পড়তেন, তাতে এক ঘণ্টা সোয়া এক ঘণ্টা সময় ব্যয় হত। তারাবীহ শেষে সাড়ে দশটা এগারোটার দিকে বিশ্রাম করতেন এবং দুইটা আড়াইটা বাজে অবশ্যই উঠে যেতেন। কখনো খাদেম তাঁকে একটার সময়ও অযু করতে দেখেছেন। আড়াই-তিন ঘণ্টার মতো তাহাজ্জুদে মশগুল থাকতেন। কখনো খাদেম পাঁচটার সময় গিয়েও তাঁকে তাহাজ্জুদে পেয়েছেন। [আকাবির কা রমযান : ১৮]
শাইখুল হিন্দ মাহমুদ হাসান রহ.
শাইখুল হিন্দ মাওলানা মাহমুদ হাসান রহ. রমজানে যখন সাহরির সময় হয়ে যেত, তখনই তাঁর তারাবিহ শেষ হতো। তারাবিহ শেষ করেই সাহরি খেতেন, তারপর সঙ্গে সঙ্গে ফজরের নামাযের প্রস্তুতি নিতেন। পুরো রাতটাই কেটে যেত ইবাদত, তিলাওয়াত ও আল্লাহর জিকিরে।
একবার তিনি এভাবে টানা অনেকদিন কষ্ট ও মুজাহাদা করলেন। ঘরের ভেতরের মানুষ—তাঁর স্ত্রী—দেখলেন, হযরত খুব দুর্বল হয়ে পড়ছেন। অসুস্থ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও ছিল। তাই তিনি অনেক অনুরোধ করে বললেন, ‘হযরত! অন্তত এক রাত বিরতি নিন। শরীরটা একটু আরাম পাবে। এরপর আবার তো ইবাদত চলবেই।’
কিন্তু হযরতের জবাব ছিল গভীর ঈমানভরা—তিনি বললেন, ‘আগামী রমজান পর্যন্ত কে বেঁচে থাকবে, কে থাকবে না—তা তো জানা নেই!’
স্ত্রী চিন্তায় পড়ে গেলেন। তিনি জানতেন, হযরত নিজের জন্য ছাড় দেন না; কিন্তু অন্যের ওজর সহজে কবুল করেন। তাই এক শিশুর মাধ্যমে কারী সাহেবকে খবর পাঠালেন—‘আপনি এক রাতে বলবেন যে আপনি ক্লান্ত, আজ বেশি তিলাওয়াত করতে পারবেন না।’
কারী সাহেবও সম্মত হলেন। রাতে তারাবিতে এসে বললেন, ‘হযরত! আজ আমি খুব ক্লান্ত, বেশি তিলাওয়াত করতে পারব না।’
হযরত সহজেই বললেন, ‘ঠিক আছে, যতটুকু পারেন পড়ুন।’
সেদিন কারী সাহেব অল্প কয়েক পারা পড়ে তারাবি শেষ করলেন। নামায শেষে হযরত বললেন, ‘আপনি তো ক্লান্ত। ঘরে যাবেন না। এখানেই আমার বিছানায় শুয়ে বিশ্রাম নিন।’
কারী সাহেব বাধ্য হয়ে শুয়ে পড়লেন। হযরত নিজেই লাইট বন্ধ করে দরজা টেনে দিলেন। কিছুক্ষণ পর কারী সাহেব অনুভব করলেন, কেউ যেন তাঁর পা টিপছে। তিনি অবাক হয়ে উঠে বসেন। অন্ধকারে তাকিয়ে দেখেন—তাঁর পীর ও মুরশিদ, শাইখুল হিন্দ নিজে বসে তাঁর পা টিপছেন! তিনি বিস্ময়ে বললেন, ‘হযরত! আপনি কী করছেন?’
হযরত শান্ত কণ্ঠে বললেন, ‘আপনি তো বললেন আপনি ক্লান্ত। ভাবলাম, পা টিপে দিই—আপনি আরাম পাবেন।’
কারী সাহেব লজ্জায় ও আবেগে কেঁদে ফেললেন। তারপর বললেন, ‘হযরত! যদি আপনি রাত জেগেই থাকেন, তবে চলুন আমি কুরআন পড়ি—আপনি শুনুন। এভাবেই রাত কেটে যাবে।’
তারপর তিনি আবার মুসল্লায় বসে কুরআন তিলাওয়াত শুরু করলেন, আর হযরত গভীর মনোযোগে শুনতে লাগলেন।
আল্লাহু আকবার! [আনওয়াওে রামাযান : ৯৪]
মহিলাদের কুরআনের সাথে সম্পর্ক
শাইখুল হিন্দ মাওলানা মাহমুদ হাসান রহ.-এর ঘরে শুধু পুরুষদের নয়, মহিলাদের মাঝেও কুরআনের প্রতি গভীর আগ্রহ ছিল। রমজানে তাঁর ছেলে তারাবিতে কুরআন তিলাওয়াত করতেন। পর্দার আড়ালে ঘরের মহিলারা এবং আশপাশের অন্যান্য মহিলারাও জামাতে শরিক হয়ে মনোযোগ দিয়ে কুরআন শুনতেন।
একদিন তাঁর ছেলে অসুস্থ হয়ে পড়লেন। হযরত অন্য একজন কারী সাহেবকে পাঠালেন। তিনি সেদিন তারাবিতে চার পারা পড়ে নামায শেষ করে দিলেন। তারাবির পর যখন হযরত ঘরে এলেন, দেখলেন ঘরের মহিলারা কিছুটা অসন্তুষ্ট। তাঁরা বললেন, ‘হযরত! আজ যাকে পাঠিয়েছেন, তিনি তো আমাদের তারাবিহ নষ্ট করে দিয়েছেন!’
হযরত অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কেন, কী হয়েছে?’
তাঁরা বললেন, ‘জানি না তাঁর কী তাড়া ছিল! মাত্র চার পারা পড়ে চলে গেলেন!’
পরে জানা গেল—তাঁরা রমজানে প্রতিদিন তারাবিতে সাত পারা কুরআন শুনতেন। অর্থাৎ, তাঁদের কাছে তারাবিহ শুধু নামায ছিল না; ছিল কুরআনের সাথে গভীর সংযোগের একটি সুযোগ। [আনওয়াওে রামাযান : ৯৫]
আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার পদ্ধতি
সালফে-সালেহীন আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্য এমনভাবে ইবাদত করতেন, যেন কেউ রাগান্বিত প্রভুকে খুশি করার চেষ্টা করছে।
ভাবুন—কোনো গোলাম যদি পালিয়ে যায়, পরে ধরা পড়ে মালিকের সামনে দাঁড়ায়—সে কী করে?
হাত জোড় করে, পা ধরে কাঁদে, বলে, ‘আমার মালিক! আমাকে ক্ষমা করুন। আর এমন করবো না।’
আমরাও রমজানে ঠিক এভাবেই আল্লাহর সামনে দাঁড়াবো। সিজদায় মাথা রেখে বলবো, ‘হে আল্লাহ! আমরা লজ্জিত। এত ত্রুটি করেছি, এত অবহেলা করেছি। আমাদের ক্ষমা করুন। সামনের জীবন তাকওয়া ও পরহেজগারির সাথে কাটানোর তাওফিক দিন।’
আমরাও চেষ্টা করি
কিয়ামতের দিন যখন সালফে-সালেহীন তাঁদের আমল পেশ করবেন—কেউ চল্লিশ বছর ইশার অযু দিয়ে ফজর পড়ার আমল, কেউ সারা জীবনের অসংখ্য ইবাদত—তখন হয়তো আমাদের লজ্জা লাগবে।
তাই আমাদের কর্তব্য—তাঁদের মতো না পারি, অন্তত তাঁদের পথের দিকে কিছুটা হাঁটার চেষ্টা করি। হয়তো আমাদের ইবাদত কম হবে, তিলাওয়াত কম হবে—কিন্তু চেষ্টা, আশা আর কান্না তো থাকতে পারে।
আমরা বলবো, ‘হ আল্লাহ! আমরা দুর্বল ছিলাম। এগার মাস গাফলতিতে কাটিয়েছি। কিন্তু এক মাস চেষ্টা করেছি—তোমার সন্তুষ্টির জন্য। তুমি তা কবুল করে নাও।
আমি কিছু ফুল কুড়িয়ে এনেছি—তোমার দয়ার আঁচলে দেওয়ার জন্য।
আল্লাহ আমাদের সামান্য চেষ্টাও কবুল করে নিন। আমীন।
সুতরাং এ মাসে যতটা সম্ভব সময় কুরআন তিলাওয়াতে ব্যয় করুন। তারাবির নামাযের প্রতি যত্নবান হোন। আর যদি তারাবিতে খতমে কুরআনের ব্যবস্থা করা যায়, তা হলে তা অধিক উত্তম ও ফযিলতপূর্ণ।
রমজানের পরও সম্পর্ক অটুট রাখুন
শুধু রমজানেই নয়—রমজানের পরেও প্রতিদিন কুরআন তিলাওয়াতের নিয়ম চালু রাখুন। আলেমদের তত্ত্বাবধানে কুরআন বুঝে পড়ার চেষ্টা করুন। কুরআনের বিধান ও মাসআলা বুঝে তা জীবনে বাস্তবায়ন করুন এবং অন্যদের কাছেও পৌঁছে দিন।
তিলাওয়াতের আদব
আল-কুরআন আল্লাহ তাআলার কালাম। তাই এর তিলাওয়াত সাধারণ পড়া নয়—এটি একটি মহান ইবাদত, বরং বান্দার তার রবের সাথে কথোপকথন। সুতরাং এর তিলাওয়াতে কিছু আদব ও নিয়ম রয়েছে—
১. ইখলাস বা বিশুদ্ধ নিয়ত
তিলাওয়াত হবে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। না মানুষের প্রশংসা, না দেখানো—শুধু এই নিয়ত থাকবে—‘হে আল্লাহ, আপনি সন্তুষ্ট হোন।’
২. পবিত্রতা ও শিষ্টাচার
— অযু অবস্থায় তিলাওয়াত করা
— কিবলামুখী হয়ে বসা
— শান্ত পরিবেশ রাখা
— অপ্রয়োজনীয় কথা না বলা
মনে রাখবেন—তিলাওয়াতের সময় আমরা আল্লাহর সাথে কথা বলছি।
৩. তাজবীদ ও ধীরস্থির তিলাওয়াত
ধীরে, স্থিরভাবে, তাজবীদের নিয়ম মেনে পড়তে হবে। না খুব জোরে, না খুব আস্তে।
মনে রাখবেন, কতটুকু পড়লাম—এটা বড় কথা নয়; কেমন পড়লাম—এটাই আসল। কম কিন্তু শুদ্ধ তিলাওয়াত, বেশি কিন্তু ভুল তিলাওয়াতের চেয়ে উত্তম।
৪. তাদাব্বুর (গভীর চিন্তা)
কুরআন শুধু সওয়াবের জন্য নয়—হেদায়াতের জন্য নাযিল হয়েছে। তিলাওয়াতের সময় অর্থ ও বার্তা নিয়ে চিন্তা করতে হবে। যখন আয়াত হৃদয়ে বসে যায়, তখন জীবন বদলে যায়।
৫. আমল ও দাওয়াহ
কুরআনের শিক্ষা নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করতে হবে এবং অন্যদের কাছেও পৌঁছে দিতে হবে। কুরআন তাক সাজানোর জন্য নয়—জীবন গড়ার জন্য।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে আল-কুরআন-এর সাথে জীবন্ত সম্পর্ক দান করুন, তিলাওয়াতে ইখলাস ও খুশু দান করুন এবং কুরআনের বরকতে আমাদের জীবনকে তাকওয়াময় করে দিন। আমীন।