ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা—এটি শুধু মসজিদের ভেতর সীমাবদ্ধ নয়; বরং মানুষের ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয়—এমনকি আন্তর্জাতিক জীবনের প্রতিটি স্তরের জন্য দিকনির্দেশনা ও সমাধান প্রদান করে। ইসলাম শুধু সমাধান দেয় না—এটি দেয় সুস্পষ্ট, ভারসাম্যপূর্ণ এবং সর্বোত্তম সমাধান—যা সব যুগের জন্য প্রযোজ্য, সব মানুষের জন্য কল্যাণকর। তাই যখন আমরা এই দীনকে বুঝতে চেষ্টা করি, তখন আমাদের উচিত—পুরো ইসলামকে দেখা, খণ্ডিতভাবে নয়; গভীরভাবে বোঝা।
اَلْحَمْدُ لِلّهِ وَكَفَى وَسَلَامٌ عَلَى عِبَادِهِ الَّذِيْن َاصْطَفَى اَمَّا بَعْدُ! فَاَعُوْذُ بِاللهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيْمِ. بِسْمِ اللهِ الرَّحْمنِ الرَّحِيْمِ. الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا
بَارَكَ اللهُ لِيْ وَلَكُمْ فِي الْقُرْآنِ الْعَظِيْمِ وَنَفَعَنِيْ وَإِيَّاكُمْ بِمَا فِيْهِ مِنَ اْلآيَاتِ وَالذِّكْرِ الْحَكِيْمِ. وجَعَلَنِيْ إِيَّاكُمْ مِنَ الصَّالِحِينَ
أَقُوْلُ قَوْلِيْ هَذَا أَسْتَغْفِرُ اللهَ لِيْ وَلَكُمْ وَلِسَائِرِ الْمُسْلِمِيْنَ. فَاسْتَغْفِرُوْهُ إِنَّهُ هُوَ الْغَفُوْرُ الرَّحِيْمُ
اَللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى سَيِّدِنَا مُحَمَّدٍ وَّعَلَى آلِ سَيِّدِنَا مُحَمَّدٍ وَّبَارِكْ وَسَلِّمْ
ভূমিকা
হামদ ও সালাতের পর!
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন
الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا
আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দীনকে পূর্ণ করে দিলাম, তোমাদের উপর আমার নেয়ামত সম্পূর্ণ করলাম এবং তোমাদের জন্য দীন হিসেবে ইসলামকে পছন্দ করলাম। [সূরা মায়িদা : ৩]
মুহতারাম হাজিরীন! আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে যে অসংখ্য নেয়ামত দান করেছেন, তার মধ্যে সবচেয়ে মহান, সবচেয়ে মূল্যবান এবং সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ নেয়ামত হলো—ইসলাম। তাই অন্তরের গভীরতা থেকে আমরা সকলেই বলি—আলহামদুলিল্লাহ!
এই ‘আলহামদুলিল্লাহ’ কেবল মুখের একটি শব্দ নয়; এটি কৃতজ্ঞতার ভাষা, ভালোবাসার প্রকাশ এবং এক গভীর স্বীকৃতি যে, আমরা এমন এক দীন পেয়েছি, যা আমাদের জীবনকে আলোকিত করে, পথ দেখায় এবং সফলতার দিকে পরিচালিত করে।
জীবনের সবচেয়ে বড় নেয়ামত : ইসলাম
ওয়াহাব ইবন মুনাব্বিহ রহ. বলেন
رُءُوسُ النِّعَمِ ثَلَاثٌ. فَأَوَّلُهَا نِعْمَةُ الْإِسْلَامِ الَّتِي لَا تَتِمُّ نِعْمَةٌ إِلَّا بِهَا. وَالثَّانِيَةُ نِعْمَةُ الْعَافِيَةِ الَّتِي لَا تَطِيبُ الْحَيَاةُ إِلَّا بِهَا. وَالثَّالِثَةُ نِعْمَةُ الْغِنَى الَّتِي لَا يَتِمُّ الْعَيْشُ إِلَّا بِهَا
নেয়ামতের মূল তিনটি
১. নেয়ামতে ইসলাম—যা ছাড়া কোনো নেয়ামত পূর্ণতা পায় না।
২. নেয়ামতে আফিয়াত (সুস্থতা)—যা ছাড়া জীবন উপভোগ্য হয় না।
৩. নেয়ামতে গিনা (সচ্ছলতা)—যা ছাড়া জীবিকা পরিপূর্ণ হয় না।
হ্যাঁ, প্রিয় ভাইয়েরা! ইসলাম—এটাই আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় নেয়ামত। এজন্য সাহাবায়ে কেরাম রাযিয়াল্লাহু আনহুম এই নেয়ামতের মূল্য এত গভীরভাবে উপলব্ধি করতেন যে, তারা বারবার বলতেন
الْحَمْدُ لِلَّهِ عَلَى نِعْمَةِ الْإِسْلَامِ
‘সমস্ত প্রশংসা সেই আল্লাহর জন্য, যিনি আমাদের ইসলাম নামক মহামূল্যবান নেয়ামত দান করেছেন।’ [আশ-শোকর, ইব্ন আবিদ্দুনয়া]
দুঃখজনক বাস্তবতা
কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো—আজ আমরা অনেকেই ইসলামের প্রকৃত রূপটি পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারি না। আমাদের প্রত্যেকের কাছে ইসলামের একটি করে আংশিক ধারণা আছে—কেউ এটিকে শুধু ইবাদতের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখি, কেউ সামাজিকতা, কেউ আবার শুধু আখলাকের মধ্যে।
অন্ধের হাতি
এ প্রসঙ্গে একটি প্রসিদ্ধ উপমা মনে পড়ে, যা শাইখুল ইসলাম মুফতি তাকী উসমানী দা. বা. বর্ণনা করেছেন—কয়েকজন অন্ধ মানুষ একটি হাতিকে স্পর্শ করে তার বর্ণনা দিচ্ছিল।
— যে শুঁড় ধরেছিল, সে বলল—হাতি তো কলাগাছের মতো।
— যে কান ধরেছিল, সে বলল—হাতি তো কুলার মতো।
— যে পিঠ স্পর্শ করেছিল, সে বলল—হাতি তো পাহাড়ের মতো।
প্রত্যেকেই ঠিক বলছিল; কিন্তু পুরোটা নয়। কারণ, তারা হাতির একটি অংশ দেখেছে, পুরো হাতি নয়। ঠিক তেমনি, আমরা অনেকেই ইসলামের একটি দিককে দেখে সেটাকেই পুরো ইসলাম মনে করি।
ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা
অথচ ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা—এটি শুধু মসজিদের ভেতর সীমাবদ্ধ নয়; বরং মানুষের ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয়—এমনকি আন্তর্জাতিক জীবনের প্রতিটি স্তরের জন্য দিকনির্দেশনা ও সমাধান প্রদান করে।
ইসলাম শুধু সমাধান দেয় না—এটি দেয় সুস্পষ্ট, ভারসাম্যপূর্ণ এবং সর্বোত্তম সমাধান—যা সব যুগের জন্য প্রযোজ্য, সব মানুষের জন্য কল্যাণকর।
তাই যখন আমরা এই দীনকে বুঝতে চেষ্টা করি, তখন আমাদের উচিত—পুরো ইসলামকে দেখা, খণ্ডিতভাবে নয়; গভীরভাবে বোঝা।
আজকের আলোচ্য বিষয়
ইনশা-আল্লাহ, আজ আমি আপনাদের সামনে ইসলামের একটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু গভীর সারমর্ম তুলে ধরতে চাই—একজন মহান মনীষীর বক্তব্য থেকে।
আবু আব্দুল্লাহ আস-সাবিহী রহ.
আবু আব্দুল্লাহ আস-সাবিহী রহ.। এই মনীষী ছিলেন চতুর্থ হিজরী শতাব্দীর একজন বিশিষ্ট আলেম, ফকীহ, মুহাদ্দিস ও আল্লাহওয়ালা বুযুর্গ। তাঁর জীবনের একটি দিক আমাদেরকে অবাক করে দেয়—তিনি দীর্ঘ ৩০ বছর নিজেকে আত্মশুদ্ধির জন্য নিবেদিত রেখেছিলেন। নিজের খানকায় অবস্থান করতেন—শুধুমাত্র জামাতে নামায আদায়ের জন্য মসজিদে যেতেন, আর প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বের হতেন না। [আত-তাবাকাতুল কুবরা : ১/৮৮]
খানকাহ কী?
খানকাহ হলো আত্মার পরিশুদ্ধির এক বিশেষ পরিবেশ। যেমন ইলম অর্জনের জন্য মাদরাসা, নামাযের জন্য মসজিদ, তেমনি অন্তরকে পরিশুদ্ধ করার জন্য ছিল খানকাহ। আজ সেই পরিবেশ অনেকটাই হারিয়ে গেছে। অথচ আত্মশুদ্ধির প্রয়োজনীয়তা বর্তমানে আগের চেয়ে অনেক বেশি।
দীনের সারসংক্ষেপ
তো এক ব্যক্তি এই মহান আলেমকে প্রশ্ন করলেন, দীন তো অসংখ্য বিষয়ের সমষ্টি—এর মধ্যে মৌলিক দিক আছে, আবার শাখাগত দিকও আছে। সবকিছু যদি তালিকাভুক্ত করা হয়, তা হবে অনেক দীর্ঘ। আপনি কি এটাকে সংক্ষেপে বুঝিয়ে দিতে পারেন?
প্রশ্নটি ছিল গভীর—আর উত্তরটি ছিল আরও গভীর। আবু আব্দুল্লাহ আস-সাবিহী রহ. উত্তরে বললেন, দীনের মূল বিষয় দুইটি, আর শাখাগত বিষয় চারটি। এই ছয়টি বিষয়ের মধ্যেই পুরো দীনকে ধারণ করা যায়।
দীনের মৌলিক বিষয় দু’টি
তিনি বলেন, দীনের দুটি মৌলিক বিষয়ের প্রথমটি হলো—
صِدْقُ الِافْتِقَارِ إِلَى اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ
আল্লাহর প্রতি নিখাদ মুখাপেক্ষিতা।
অর্থাৎ, বান্দা অন্তরের গভীর থেকে অনুভব করবে—সে সম্পূর্ণভাবে আল্লাহর ওপর নির্ভরশীল| তার কোনো শক্তি, সামর্থ্য বা উপায় নেই আল্লাহ ছাড়া।
দ্বিতীয়টি হলো—
حُسْنُ الِاقْتِدَاءِ بِرَسُولِ اللَّهِ ﷺ
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর উত্তম অনুসরণ।
অর্থাৎ, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নবীজি ﷺ-এর আদর্শকে অনুসরণ করা—তার কথা, কাজ, চরিত্র ও জীবনপদ্ধতিকে নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করা|
দীনের শাখাগত বিষয় চারটি
তারপর বলেন, দীনের চারটি শাখাগত বিষয় হলো—
১. الْوَفَاءُ بِالْعُهُودِ অঙ্গীকার পূরণ করা| অর্থাৎ, আল্লাহর সাথে করা প্রতিশ্রুতিসমূহ রক্ষা করা।
২. حِفْظُ الْحُدُودِ সীমারেখা রক্ষা করা। অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলা যে সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছেন—হালাল-হারাম, ন্যায়-অন্যায়—সেগুলো মেনে চলা এবং তা অতিক্রম না করা।
৩. الرِّضَا بِالْمَوْجُودِ যা আছে তাতে সন্তুষ্ট থাকা। অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলা যা দিয়েছেন, তাতে সন্তুষ্ট থাকা। অভিযোগ না করে কৃতজ্ঞ থাকা।
৪. الصَّبْرُ عَلَى الْمَفْقُودِ যা নেই তাতে ˆধর্য ধারণ করা। অর্থাৎ, যা হারিয়ে গেছে বা পাওয়া যায়নি—সেই অভাবেও ধৈর্য্য ধারণ করা, আল্লাহর ফয়সালায় আস্থা রাখা।
সুতরাং এই ছয়টি বিষয় যদি কেউ নিজের জীবনে ধারণ করতে পারে, তবে তার দীন হবে পূর্ণাঙ্গ, সুন্দর ও ভারসাম্যপূর্ণ। [বাইহাকী, শুআবুল ঈমান : ৯৬৪০]
প্রথম মৌলিক বিষয় : আল্লাহর প্রতি নিখাদ মুখাপেক্ষিতা
দীনের মৌলিক দুটি বিষয়ের প্রথমটি—
صِدْقُ الِافْتِقَارِ إِلَى اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ
আল্লাহ তাআলার প্রতি নিখাদ, সত্যিকারের মুখাপেক্ষিতা।
অর্থাৎ, মানুষ সত্যিই অন্তর থেকে অনুভব করবে যে, সে আল্লাহ তাআলার মুখাপেক্ষী। আল্লাহ তাআলার সাথে তার সহজ, সরল, একনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকবে। এমন সম্পর্ক—যেখানে চিন্তা করে নয়; স্বাভাবিকভাবেই বিপদে মুখ থেকে বের হবে—ইন্না লিল্লাহ…। সমস্যায় প্রথম চিন্তা হবে—দুই রাকাত নামায পড়ি..। অসুস্থ হলে ওষুধ নিব, কিন্তু বিশ্বাস থাকবে—শিফা দিবেন আল্লাহ তাআলা। মাধ্যম ব্যবহার করব, কিন্তু নির্ভরতা থাকবে আল্লাহর উপর।
আমাদের দুর্বলতা
কিন্তু প্রশ্ন হলো, আল্লাহ তাআলার সাথে এমন নিখাদ, সহজ, সরল সম্পর্ক আমাদের আছে? জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁর প্রতি সত্যিকারের মুখাপেক্ষিতা ও নির্ভেজাল নির্ভরতা কি আমরা অনুভব করি?
আমরা মুখে তো বলি—সমস্যার সমাধানকারী আল্লাহ তাআলা, রোগ থেকে মুক্তি দেন আল্লাহ তাআলা। কিন্তু যখন বাস্তবে বিপদ আসে, তখন প্রথমে আমরা কার কাছে যাই?
আমাদের তো প্রথমে যাওয়ার কথা ছিল আল্লাহ তাআলার কাছে, কিন্তু আমরা দৌড়াই মানুষের কাছে—কোনো নেতা, কোনো অফিসার, কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তির কাছে। সব দরজা বন্ধ হয়ে গেলে বলি—আল্লাহ! এখন আপনি ছাড়া আর কেউ নেই! এটাই আমাদের দুর্বলতা—আল্লাহ তাআলা আমাদের প্রথম ভরসা না, শেষ ভরসা হয়ে যান।
এটাই প্রমাণ করে যে, আমাদের অন্তর থেকে স্বাভাবিকভাবে আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়ার অনুভূতি জাগে না; আমাদের সাথে আল্লাহর সেই সহজ, সরল, একনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি।
দৃষ্টি থাকবে আল্লাহর দিকে
আল্লাহ তাআলা দুনিয়াকে মাধ্যম বা ওসিলার মাধ্যমে পরিচালনা করেন। তাই ওষুধ আছে, চিকিৎসা আছে, চেষ্টা আছে—এসব ব্যবহার করতে হবে। কিন্তু আসল বিষয় হলো দৃষ্টি থাকবে কোথায়? দৃষ্টি তো থাকবে আল্লাহর দিকে।
আমি ওষুধ গ্রহণ করবো, কিন্তু আরোগ্য দেবেন কে? আল্লাহ তাআলা।
আমি চেষ্টা করবো, কিন্তু ফল দিবেন কে? আল্লাহ তাআলা।
মাধ্যম ব্যবহার করবো, কিন্তু অন্তরের নির্ভরতা থাকবে কেবল আল্লাহ তাআলার উপর।
এই অনুভূতিটাই হলো আল্লাহ তাআলার প্রতি সত্যিকারের মুখাপেক্ষিতা। এটা এমন একটি অবস্থা, যা সর্ব অবস্থায়, সর্ব মুহূর্তে অন্তরের ভেতর জীবন্ত থাকবে। এই জন্যই বলা হয়েছে لا حول ولا قوة إلا بالله এটি জান্নাতের চাবিগুলোর একটি। কেন? কারণ এটি ঈমানের মগজ। এর অর্থ—কোনো শক্তি নেই, কোনো ক্ষমতা নেই, আল্লাহ ছাড়া।
অথচ হঠাৎ কোনো বিপদে পড়লে, ধাক্কা খেলে—আমাদের মুখ থেকে অটোমেটিক কী বের হয়? ‘উফ!’, ‘ইশ!’, ‘আহ!’ ‘ও মা!’ কিন্তু ‘ইয়া আল্লাহ!’, ‘ইন্না লিল্লাহ…’ সহজে বের হয় না। কেন? কারণ অন্তরের গভীরে আল্লাহর উপস্থিতি সেইভাবে জাগ্রত নেই। আমাদের সাথে আল্লাহর সম্পর্ক এখনো স্বাভাবিক, গভীর ও জীবন্ত হয়নি।
তাই আবু আব্দুল্লাহ আস-সাবিহী রহ. বলেন, দীনের মৌলিক বিষয়গুলোর একটি হলো, মানুষ সর্বাবস্থায় অনুভব করবে যে সে আল্লাহর মুখাপেক্ষী| তার কথা, কাজ, ইচ্ছা-অনিচ্ছা—সবকিছুতেই এই নির্ভরতা প্রকাশ পাবে।
বিলাল রাযি.
হযরত বিলাল রাযি.-কে দেখুন! উত্তপ্ত মরুভূমিতে, বুকে পাথর চাপা—চামড়া পুড়ে যাচ্ছে, তবুও তিনি বলছেন—আহাদ! আহাদ!
কেন তিনি এত কষ্ট সহ্য করতেন? তিনি বলেন
مَزَجْتُ حَلَاوَةَ الْإِيمَانِ بِمَرَارَةِ الْعَذَابِ فَغَلَبَتْ حَلَاوَةُ الْإِيمَانِ مَرَارَةَ الْعَذَابِ
আমি ঈমানের মিষ্টতাকে শাস্তির তিক্ততার সাথে মিশ্রিত করে দিয়েছিলাম, ফলে ঈমানের মিষ্টতা শাস্তির তিক্ততার ওপর জয়ী হয়ে গিয়েছিল।
কারণ, তার দৃষ্টি ছিল আল্লাহ তাআলার দিকে, তার অন্তর ছিল আল্লাহ তাআলার সাথে যুক্ত। [সিয়ারু আলামিন নুবালা : ১/৩৫৫]
আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাযি.
সাহাবী হযরত আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাযি.—ছোট্ট একজন শিশু। কিন্তু নবীজি ﷺ তাকে যে শিক্ষা দিয়েছেন, তা পুরো জীবনের জন্য দিকনির্দেশনা। নবীজি ﷺ স্নেহভরে তাকে ডাকলেন
يَا غُلَامُ إِنِّي أُعَلِّمُكَ كَلِمَاتٍ
‘হে বালক! আমি তোমাকে কিছু কথা শিক্ষা দেব।’
খেয়াল করুন—একটি ছোট্ট শিশুকে শিক্ষা দিচ্ছেন, বয়স মাত্র ছয়-সাত বছর| কিন্তু কী শিক্ষা! এমন শিক্ষা যা একজন পূর্ণাঙ্গ মুমিনের জীবন গড়ে দেয়।
তারপর নবীজি ﷺ বললেন
احْفَظِ اللَّهَ يَحْفَظْكَ احْفَظِ اللَّهَ تَجِدْهُ تُجَاهَكَ
‘তুমি আল্লাহকে হেফাজত করো, আল্লাহ তোমাকে হেফাজত করবেন। তুমি আল্লাহকে হেফাজত করো, তুমি তাঁকে তোমার সামনে পাবে।’
এখানে ‘আল্লাহকে হেফাজত করা’ মানে নিজের জীবনকে এমনভাবে পরিচালনা করা, যেন আল্লাহর সাথে সম্পর্ক অটুট থাকে।
তারপর নবীজি ﷺ যেন এই কথার ব্যাখ্যা দিলেন
إِذَا سَأَلْتَ فَاسْأَلِ اللَّهَ وَإِذَا اسْتَعَنْتَ فَاسْتَعِنْ بِاللَّهِ
‘যখন কিছু চাইবে—আল্লাহর কাছেই চাইবে; যখন সাহায্য চাইবে—আল্লাহর কাছেই চাইবে।’
অর্থাৎ দৃষ্টি থাকবে একমাত্র আল্লাহর দিকে। মানুষের কাছে যাওয়া যাবে, মাধ্যম ব্যবহার করা যাবে—কিন্তু অন্তরের নির্ভরতা, আসল আশা থাকবে কেবল আল্লাহ তাআলার উপর।
এরপর নবীজি ﷺ আরও গভীর একটি আকীদা শিক্ষা দিলেন
وَاعْلَمْ أَنَّ الأُمَّةَ لَوْ اجْتَمَعَتْ عَلَى أَنْ يَنْفَعُوكَ بِشَيْءٍ لَمْ يَنْفَعُوكَ إِلَّا بِشَيْءٍ قَدْ كَتَبَهُ اللَّهُ لَكَ
‘জেনে রাখো, পুরো মানবজাতি যদি একত্রিত হয়ে তোমার কোনো উপকার করতে চায়—তারা তোমার কোনো উপকার করতে পারবে না, তবে সেটুকুই পারবে যা আল্লাহ তাআলা তোমার জন্য লিখে রেখেছেন।’
وَلَوْ اجْتَمَعُوا عَلَى أَنْ يَضُرُّوكَ بِشَيْءٍ لَمْ يَضُرُّوكَ إِلَّا بِشَيْءٍ قَدْ كَتَبَهُ اللَّهُ عَلَيْكَ
‘আর যদি তারা সবাই মিলে তোমার ক্ষতি করতে চায়—তবুও তারা তোমার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না, তবে সেটুকুই যা আল্লাহ তাআলা তোমার জন্য নির্ধারণ করেছেন।’
رُفِعَتِ الأَقْلَامُ وَجَفَّتْ الصُّحُفُ
‘কলম উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে, কাগজ শুকিয়ে গেছে। অর্থাৎ, তাকদীর নির্ধারিত হয়ে গেছে।’ [তিরমিযী : ২৫১৬]
হাদিসটি কী শিক্ষা দেয়?
এই হাদিসটি আসলে কী শিক্ষা দেয়?
— তোমার দৃষ্টি থাকবে আল্লাহর দিকে।
— তোমার চাওয়া থাকবে আল্লাহর কাছে।
— তোমার ভরসা থাকবে আল্লাহর উপর।
— মানুষের হাতে কিছু নেই; সবকিছু আল্লাহর হাতে।
এটাই হলো সেই صِدْقُ الِافْتِقَارِ إِلَى اللَّهِ আল্লাহর প্রতি সত্যিকারের মুখাপেক্ষিতা। যদি এই একটি শিক্ষা অন্তরে বসে যায়—তাহলে মানুষের ভয়, মানুষের উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা, দুশ্চিন্তা—সবকিছু দূর হয়ে যায়।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে এই হাদিসের হাকীকত বুঝার এবং জীবনে বাস্তবায়ন করার তাওফিক দান করুন।আমীন।
দ্বিতীয় মৌলিক বিষয় : রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর উত্তম অনুসরণ
আবু আব্দুল্লাহ আস-সাবিহী রহ. বলেন, দীনের মৌলিক দ্বিতীয় বিষয় হলো—
حُسْنُ الِاقْتِدَاءِ بِرَسُولِ اللَّهِ ﷺ
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর উত্তম অনুসরণ।
আমরা অনেকেই বলি—আমরা নবীজিকে অনুসরণ করি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমাদের অনুসরণ কি ‘হুসনে ইক্তিদা’—উত্তম, পরিপূর্ণ, ভালোবাসাভরা অনুসরণ? নাকি শুধু নামমাত্র অনুসরণ?
মহব্বতের ক্ষেত্রে একটি সহজ নিয়ম
মহব্বতের একটি সহজ নিয়ম আছে—যাকে ভালোবাসা হয়, তার কথা সহজে অমান্য করা যায় না। যেমন—একজন স্বামী যদি তার স্ত্রীকে সত্যিকারের ভালোবাসে, স্ত্রী যদি কোনো কিছু চায়—সাধারণত সে ‘না’ বলতে পারে না।
একজন বাবা যদি সন্তানের প্রতি গভীর মমতা রাখে, সন্তান যদি কোনো কিছু চায়—যদি তাতে ক্ষতি না থাকে, তাহলে বাবা সহজে তাকে ফিরিয়ে দেয় না। কেন? মহব্বতের কারণে।
বুঝা গেল, মহব্বত এমন এক শক্তি—যেখানে ‘না’ বলার প্রবণতা কমে যায়, মান্য করার আগ্রহ বেড়ে যায়।
আমরা কি সত্যিই রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে ভালোবাসি?
এখন চিন্তা করুন—আমরা কি সত্যিই রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে ভালোবাসি? যদি ভালোবাসি—তাহলে তাঁর সুন্নাত মানতে গিয়ে কষ্ট লাগার কথা না; বরং ভালো লাগার কথা।
রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর মহব্বত—এটা কি সত্যিই আমাদের অন্তরে আছে? যদি থাকে, তাহলে একটু নিজের দিকে তাকাই—আমার ব্যক্তিজীবন…আমার পোশাক…আমার চেহারা…আমার চলাফেরা…আমার খাওয়া-দাওয়া…আমার ওঠা-বসা…মানুষের সাথে আমার লেনদেন…এসব কতটুকু নবীজির সুন্নতের মতো?
তাহলে বুঝা গেল—আমরা ভালোবাসি ঠিক, কিন্তু অনুসরণটা উত্তমভাবে করি না। এটাই আমাদের বড় অভাব। এই কারণেই আমরা প্রকৃত দীনদার হতে পারি না।
আল্লাহ তাআলা কাকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসেন?
আল্লাহ তাআলা সবচেয়ে বেশি ভালোবাসেন তাঁর প্রিয় হাবীব, রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে। তাই যে ব্যক্তি যত বেশি নবীজিকে অনুসরণ করবে—আল্লাহ তাআলা তাকে তত বেশি ভালোবাসবেন।
এই জন্যই কুরআনে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন
قُلْ إِن كُنتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ
হে নবী! বলে দিন—তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাসো, তাহলে আমার অনুসরণ করো; আল্লাহ তোমাদেরকে ভালোবাসবেন এবং তোমাদের গুনাহ মাফ করে দেবেন। [সূরা আলি ইমরান : ৩১]
অর্থাৎ, আল্লাহর মহব্বত পাওয়ার একমাত্র পথ হলো—সুন্নাতের অনুসরণ। তাই যে বান্দা যত বেশি সুন্নাত মেনে চলে—আল্লাহ তার দোয়া তত বেশি কবুল করেন, তার প্রতি ‘না’ বলা তত কম হয়ে যায়।
একটি চমৎকার দৃষ্টান্ত
এটি বোঝার জন্য একটি দৃষ্টান্ত নিন—ধরুন, একটি কবুতর। তার ডানা আছে—উড়ার পূর্ণ যোগ্যতা আছে। কিন্তু যদি কেউ তার ডানা বেঁধে দেয় বা কেটে দেয়—সে কি আকাশে উড়তে পারবেনা। কিন্তু তার কি উড়ার ক্ষমতা নেই? আছে। তবে সেই ক্ষমতাকে বেঁধে রাখা হয়েছে।
ঠিক তেমনি প্রত্যেক মুমিনের মধ্যেই আল্লাহর ওলি হওয়ার যোগ্যতা আছে। কিন্তু যখন সে সুন্নাতের অনুসরণ ছেড়ে দেয়, তখন তার সেই যোগ্যতাকে বেঁধে ফেলা হয়। সে আর আল্লাহর ˆনকট্যে পৌঁছাতে পারে না।
নবীজির সাথে আমাদের সম্পর্ক হতে হবে حُسْنُ الِاقْتِدَاءِ—উত্তমভাবে অনুসরণের সম্পর্ক। শুধু ভালোবাসা নয়; বরং সুন্দরভাবে, সচেতনভাবে, অনুভব নিয়ে অনুসরণ করা—এই চেষ্টা আমাদের অবশ্যই থাকতে হবে।
বিলাল রাযি. আযানের দায়িত্ব কেন পেয়েছিলেন?
আযানের দায়িত্ব পেয়েছিলেন হযরত বিলাল রাযি.। এই সম্মান আল্লাহ তাঁকে কেন দিলেন? ওলামায়ে কেরাম বলেন, এর পেছনে গভীর রহস্য আছে।
প্রথম রহস্য হলো—যখন তাঁকে নির্যাতন করা হচ্ছিল, উত্তপ্ত পাথরের নিচে চেপে ধরা হচ্ছিল, তখন তিনি বলছিলেন—আহাদ… আহাদ…. অর্থাৎ, এক আল্লাহ… এক আল্লাহ…। মজলুম অবস্থায়ও তিনি আল্লাহকে ভুলেননি। তাই আল্লাহ তাআলা তাঁর কণ্ঠকে এমন উচ্চতায় পৌঁছে দিলেন—যে কণ্ঠ একসময় পাথরের নিচে চাপা ছিল, সেই কণ্ঠই বায়তুল্লাহর মিনারে উঠলো!
দ্বিতীয় রহস্য হলো—রাসূলুল্লাহ ﷺ একদিন বললেন, ‘হে বিলাল! আমি জান্নাতে তোমার পায়ের জুতার আওয়াজ আমার আগে শুনেছি। তুমি কী করো?’
তিনি বললেন, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি যখনই ওযু করি, দুই রাকাত তাহিয়্যাতুল ওযু নামায পড়ি।’ [সহীহ মুসলিম : ২৪৫৮]
ভাই! নবীজির একটা সুন্নাত নিয়মিতভাবে পালন—বিলালকে এই মর্যাদায় পৌঁছে দিল!
আমরা সুন্নাতকে জীবনের অংশ বানাতে পারিনি
আমরা সুন্নাত পালন করি ঠিক। কিন্তু সমস্যা হলো—আমরা সুন্নাতকে জীবনের অংশ বানাতে পারিনি।
পাঞ্জাবি পরি—কিন্তু কেন? মানুষ কী বলবে—এই চিন্তা বেশি; নবীজির সুন্নাত—এই অনুভূতি কম।
পাগড়ি পরি; কিন্তু কতবার মনে হয়—এটা আমার প্রিয় নবীর সুন্নাত?
দাড়ি রাখি; কিন্তু কয়বার মনে হয়—এটা আমার নবীর শান?
এই অনুভূতিটাই নেই…এইখানেই আমাদের ঘাটতি।
আল্লাহর বান্দা! যদি এই অনুভূতিটা জেগে উঠতো, তাহলে প্রতিটা সুন্নাত হতো আনন্দের! পাঞ্জাবি পরা হতো ভালোবাসার! পাগড়ি হতো গর্বের! দাড়ি হতো প্রেমের পরিচয়!
প্রতিটা কাজে যদি মনে করি—এটা আমার নবী ﷺ করেছেন; আমিও করছি, তাহলে সুন্নাত জীবন্ত হয়ে যেত। আমাদের অন্তরও জীবন্ত হয়ে যেত।
একটি উদাহরণ
একটা উদাহরণ দেই| মা যখন তার সন্তানকে হারায়—সে শুধু সন্তানের জন্যই কাঁদে না; তার কাপড় ধরে কাঁদে, তার খাট ধরে কাঁদে, তার খেলনা দেখে কাঁদে, তার বালিশ জড়িয়ে কাঁদে। এটাই তো মহব্বত!
তাহলে আমরা যদি নবীজিকে ভালোবাসি, তাহলে তাঁর প্রতিটি স্মৃতির সাথে, প্রতিটি সুন্নাতের সাথে আমাদের হৃদয় জড়াবে না? জড়াবে, যদি সত্যিকারের মহব্বত থাকে।
তাই বলি, সুন্নাতকে শুধু পালন না, অনুভব করে পালন করুন। মজা নিয়ে পালন করুন। ভালোবাসা নিয়ে পালন করুন। দেখবেন—আল্লাহ তাআলা সুন্নাতের বরকতে আপনাকে নিজের ওলিদের কাতারে দাঁড় করিয়ে দিবেন!
তখন আল্লাহর সাথে আপনার সম্পর্ক কেমন হবে? রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন
إِنَّ رَبَّكُمْ حَيِيٌّ كَرِيمٌ يَسْتَحِي مِنْ عَبْدِهِ إِذَا رَفَعَ إِلَيْهِ يَدَيْه أَنْ يَرُدَّهُمَا صِفَرًا
নিশ্চয়ই তোমাদের রব লজ্জাশীল, মহান দাতা। বান্দা যখন তাঁর কাছে হাত তোলে, তখন তিনি খালি হাতে ফিরিয়ে দিতে লজ্জা পান। [আবু দাউদ : ১৪৮৮]
ভাবুন—আপনি যদি প্রতিটা কাজে নবীজিকে স্মরণ করে বলতে পারেন, ‘ইয়া আল্লাহ! আপনার নবী যেমন করতেন, আমিও তেমন করার চেষ্টা করেছি, তখন আল্লাহ তাআলা আপনাকে কীভাবে ফিরিয়ে দেবেন? বরং তখন তিনি লজ্জাশীলের মত আচরণ করবেন এবং আপনার দোয়া কবুল করবেন। আল্লাহ আমাদেরকে সেই অনুভূতি দান করুন—আমীন|
হাকিম আখতার রহ.-এর কবিতা
এই জন্যই আরিফ বিল্লাহ হাকিম আখতার রহ. বলেন
نقشِ قدم نبی کے ہیں جنت کے راستے
اللہ سے ملاتے ہیں یہ سنت کے راستے
ان ہی راستوں پہ چل کے منزل ملے گی
جنت میں لے جائیں گے یہ سنت کے راستے
دو عالم میں چاہتے ہو گر کامیابی
اپنا لو خوشی سے یہ سنت کے راستے
নবীজির পদচিহ্নই জান্নাতের পথ,
আল্লাহর সাথে মিলনের পথ হলো সুন্নাতের পথ।
এই পথে চলেই প্রকৃত গন্তব্য খুঁজে পাওয়া যাবে,
সুন্নাতের এই পথগুলোই জান্নাতের দিকে নিয়ে যাবে।
যদি উভয় জগতেই সফলতা পেতে চাও,
তবে খুশি মনে এই সুন্নাতের পথকে আঁকড়ে ধরো।
আমাদের প্রতি নবীজির অতুলনীয় ভালোবাসা
একটা কথা ভাবুন—রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদের জন্য কী পরিমাণ দোয়া করেছেন! আম্মাজান হযরত আয়শা রাযি. বর্ণনা করেন, নবীজি ﷺ এত কেঁদেছেন, এত কেঁদেছেন—যে তাঁর কোলে অশ্রু ভিজে গেছে| দাড়ি ভিজে গেছে।
فَلَمْ يَزَلْ يَبْكِي… حَتَّى بَلَّ الْأَرْضَ
এমনকি মাটিও ভিজে গেছে…। [সহীহ ইবন হিব্বান : ৬২০]
এই কান্নার ভাষা কী ছিল জানেন? ‘আল্লাহুম্মা উম্মাতি…’ ‘আল্লাহুম্মাগফির লি উম্মাতি…’। ‘হে আল্লাহ! আমার উম্মতকে মাফ করে দিন…’, ‘হে আল্লাহ! আমার উম্মতের উপর রহম করুন…।’
আর যখন কাঁদতে কাঁদতে ক্লান্ত হয়ে যেতেন, তখন শুধু বলতেন, ‘উম্মাতি… উম্মাতি…’।
একটু মিলিয়ে দেখেন—যখন কোনো সন্তান তার মা-বাবাকে হারায়, প্রথমে অনেক কথা মনে পড়ে, স্মৃতি মনে পড়ে। কিন্তু যখন কান্নায় ভেঙে পড়ে, গলা বন্ধ হয়ে যায়, তখন শুধু বলে, ‘আব্বা… আব্বা…’, ‘আম্মা… আম্মা…’।
ঠিক তেমনি আমাদের প্রিয় নবী ﷺ কাঁদতে কাঁদতে শুধু বলতেন, ‘আমার উম্মত… আমার উম্মত…’।
আল্লাহর বান্দা! বলুন তো—কোনো বাবা কি তার সন্তানের জন্য সারারাত শুধু কেঁদে কাটাতে পারে? কোনো মা কি পারে?হয়তো নামায পড়বে, তেলাওয়াত করবে, জিকির করবে—এভাবে রাত কাটানো সম্ভব। কিন্তু একটা পুরো রাত শুধু ‘উম্মাতি… উম্মাতি…’ বলে কেঁদে কাটানো—এটা কি মানুষের পক্ষে সম্ভব?
আমাদের নবী ﷺ পেরেছেন। আমাদের জন্য পেরেছেন…।
আরাফার ময়দানে তিনি দু’হাত এত উঁচু করে দোয়া করছিলেন যে, সাহাবায়ে কেরাম তাঁর বগলের নিচ পর্যন্ত দেখতে পেয়েছেন!
এভাবে মানুষ কখন দোয়া করে? যখন অন্তরে আগুন জ্বলে… যখন ব্যথা অসহনীয় হয়…।
আল্লাহ তাআলা আয়াত নাযিল করলেন
فَلَعَلَّكَ بَاخِعٌ نَّفْسَكَ عَلَىٰ آثَارِهِمْ إِن لَّمْ يُؤْمِنُوا بِهَٰذَا الْحَدِيثِ أَسَفًا
হে নবী! যদি তারা এই কথার প্রতি ঈমান না আনে, তাহলে আপনি এদের পেছনে পেছনে ঘুরে দুঃখে নিজকে শেষ করে দিবেন না-কি! [সূরা কাহফ : ৬]
এত কষ্ট… এত দরদ… শুধু আমাদের জন্য…। কিন্তু বলুন তো—আমরা তাঁর জন্য কয়দিন দোয়া করেছি? আমরা কি একবারও ভেবেছি—যে নবী আমার জন্য কাঁদলেন, আমি তাঁর জন্য কী করেছি? আমরা কতটা নাশোকর…কতটা অকৃতজ্ঞ…।
একটি সহজ সুযোগ
তবুও আল্লাহ আমাদের জন্য একটা সহজ সুযোগ রেখেছেন—পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের আযান| আযান শুনে, উত্তর দিয়ে, আমরা একটা ছোট্ট দোয়া করতে পারি
اللَّهُمَّ رَبَّ هَذِهِ الدَّعْوَةِ التَّامَّةِ وَالصَّلَاةِ الْقَائِمَةِ آتِ مُحَمَّدًا الْوَسِيلَةَ وَالْفَضِيلَةَ وَابْعَثْهُ مَقَامًا مَحْمُودًا الَّذِي وَعَدْتَهُ
‘হে আল্লাহ! এই পরিপূর্ণ আহ্বান এবং প্রতিষ্ঠিত নামাযের আপনিই প্রভু। মুহাম্মদ ﷺ-কে ‘ওয়াসিলা’ (জান্নাতের সর্বোচ্চ স্তর) ও মর্যাদা দান করুন এবং তাঁকে সেই প্রশংসিত স্থানে (মাকামে মাহমুদ) পৌঁছে দিন, যার প্রতিশ্রুতি আপনি তাঁকে দিয়েছেন।’
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, যে ব্যক্তি আযানের পর এই দোয়া পড়বে
حَلَّتْ لَهُ شَفَاعَتِي يَوْمَ القِيَامَةِ
কিয়ামতের দিন তার জন্য আমার শাফায়াত ওয়াজিব হয়ে যাবে। [সহীহ বুখারী : ৬১৪]
ভাই! যে নবী ﷺ আমাদের জন্য সারাজীবন দোয়া করলেন—আমরা কি তাঁর জন্য দিনে পাঁচবারও দোয়া করতে পারবো না? এইটুকুও কি করতে পারবো না?
আল্লাহ আমাদের সবাইকে তাওফিক দান করুন—আল্লাহুম্মা আমীন।
যাই হোক, বলছিলাম, আবু আব্দুল্লাহ আস-সাবিহী রহ.-এর কথা। তিনি বলেছিলেন, দীনের আসল ভিত্তি দুইটি—
১. صِدْقُ الِافْتِقَارِ إِلَى اللَّهِ আল্লাহর কাছে সত্যিকার অর্থে নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করা।
২. حُسْنُ الِاقْتِدَاءِ بِرَسُولِ اللَّهِ ﷺ রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে উত্তমভাবে অনুসরণ করা।
এই দুই জিনিস আমাদের কাছে আছে, কিন্তু পরিপূর্ণভাবে নেই। যত বেশি এই দুই জিনিস আমাদের জীবনে আসবে, তত বেশি আমরা প্রকৃত দীনদার হয়ে উঠবো।
দীনের শাখাগত বিষয়
মুহতারাম হাজিরীন! এবার আসি—দীনের শাখাগত বিষয়ের দিকে। আবু আব্দুল্লাহ আস-সাবিহী রহ. বলেন, দীনের শাখাগত বিষয় চারটি।
প্রথম বিষয় : আল্লাহর সাথে কৃত ওয়াদা পূরণ করা
প্রথমটি হলো الْوَفَاءُ بِالْعُهُودِ অর্থাৎ, আল্লাহর সাথে কৃত ওয়াদা পূরণ করা।
ভাই, একজন ঈমানদার হিসেবে আল্লাহর সাথে আমাদের কিছু ওয়াদা আছে। কেউ বলতে পারে—আমি তো কখনো ওয়াদা করিনি!
একটা সহজ উদাহরণ দিই—তুমি বাংলাদেশের আইন মেনে চলবে; এই ওয়াদা কবে করেছো? তুমি তো মুখে বলোনি! কিন্তু তুমি এই দেশে জন্মেছো, নাগরিক হয়েছো, তোমার এনআইডি আছে—এর অর্থই হলো তুমি রাষ্ট্রের সাথে কিছু বিষয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ওয়াদাবদ্ধ।
ঠিক একইভাবে যখন আমরা বলি—
أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ
এই কালিমা উচ্চারণ করার মাধ্যমে আমরা আল্লাহ তাআলার সাথে এক বিশাল ওয়াদায় আবদ্ধ হয়ে যাই।
আল্লাহর সাথে কৃত ওয়াদা ওয়াদা কী?
সংক্ষেপে, আল্লাহর সাথে কৃত ওয়াদা দু’টি—
১. আমি আল্লাহর হকগুলো আদায় করবো।
২. আমি তাঁর বান্দাদের হকগুলো আদায় করবো।
অর্থাৎ, আল্লাহ যা ফরজ করেছেন, তা পালন করবো। যা হারাম করেছেন, তা বর্জন করবো।
তাই কেউ যদি পাঁচ ওয়াক্ত নামায না পড়ে—তাহলে সে শুধু একটা আমল ছেড়ে দিল না, সে আল্লাহর সাথে করা ওয়াদা ভঙ্গ করলো।
কেউ যদি যাকাত না দেয়—এটা শুধু সম্পদের ব্যাপার না, এটা ওয়াদা ভঙ্গের ব্যাপার।
আল্লাহ তাআলা কুরআনে বারবার বলেন, يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا হে ঈমানদারগণ..। এই সম্বোধনের মধ্যে যেন আল্লাহ আমাদের মনে করিয়ে দেন—তোমরা তো আমার সাথে ঈমানের মাধ্যমে ওয়াদা করেছো—এখন সেই ওয়াদা পূরণ করো। সুতরাং যে ব্যক্তি তার ওয়াদা রক্ষা করে—সে-ই সত্যিকার মুমিন। আর যে ওয়াদা ভঙ্গ করে—সে নিজের ঈমানকেই দুর্বল করে।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে ওয়াদা রক্ষা করার তাওফিক দান করুন। আমাদেরকে সত্যিকারের দীনদার বানান—আমীন।
দ্বিতীয় বিষয় : আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখাগুলো রক্ষা করা
দ্বীনের শাখাগত বিষয়গুলোর মধ্যে দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— حِفْظُ الْحُدُودِ অর্থাৎ আল্লাহ তাআলার নির্ধারিত সীমারেখাগুলোকে রক্ষা করা।
আল্লাহ তাআলা আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে একটি সীমানা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। যেমন,
— আমরা খাই—কিন্তু সব কিছু খেতে পারি না।
— আমাদের জৈবিক চাহিদা আছে—কিন্তু তা পূরণের জন্য বৈধ পথ নির্ধারিত।
— আল্লাহ আমাদেরকে দৃষ্টিশক্তি দিয়েছেন—কিন্তু সব কিছু দেখা বৈধ নয়।
— তিনি আমাদেরকে শ্রবণশক্তি দিয়েছেন—কিন্তু সব কিছু শোনা হালাল নয়।
অর্থাৎ, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে একটি বাউন্ডারি, একটি সীমারেখা আছে।
এই সীমারেখাগুলোকে রক্ষা করাই হলো— حِفْظُ الْحُدُودِ সহজ ভাষায়—সব গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা। সুতরাং حِفْظُ الْحُدُودِ শুধু একটি বিষয় নয়; এটি পুরো দীনকে সংরক্ষণ করার একটি শক্ত ভিত্তি।
গুনাহ সম্পর্কে তিনটি মৌলিক বিষয়
এখন গুনাহ সম্পর্কে তিনটি মৌলিক বিষয় বুঝে নেওয়া জরুরি—
প্রথমত, একটি কবিরা গুনাহই একজন মানুষকে জাহান্নামে নিয়ে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট—যদি আল্লাহ তাআলা তাঁর রহমত না করেন।
আমরা অনেক সময় গুনাহ করি এই চিন্তায়—কী হবে? সবাই তো করছে, আমিও করলাম! এই মানসিকতা অত্যন্ত বিপজ্জনক। কারণ, এই চিন্তা গুনাহকে ছোট করে দেয়, আর গুনাহকে ছোট মনে করা নিজেই বড় গুনাহে পরিণত হয়।
দ্বিতীয়ত, কেউ যদি এই চিন্তা নিয়ে গুনাহ করে, ‘সবাই করছে, আমিও করলাম’—তাহলে সে শুধু ফাসেক থাকে না, ধীরে ধীরে তার অন্তর কঠিন হতে থাকে। সে ফাসেক থেকে মুনাফিকির দিকে, আর সেখান থেকে ঈমান হারানোর দিকেও চলে যেতে পারে।
হাসান বসরী রহ. বলেন
وَالْمُنَافِقُ يَقُولُ: سَوَادُ النَّاسِ كَثِيرٌ وَسَيُغْفَرُ لِي، وَلَا بَأْسَ عَلَيَّ، يَسِيئُ فِي الْعَمَلِ وَيَتَمَنَّى عَلَى اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ
মুনাফিক দ্বিধাহীন কণ্ঠে বলে বেড়ায়, আমার মত বহু লোক আছে| তারা ক্ষমা পেলে আমিও পেয়ে যাব। এত চিন্তা কিসের! এই মানসিকতার কারণে সে গোনাহ করে বেড়ায় আর আল্লাহর প্রতি অর্থহীন আশা মনের মাঝে লালন করে। [ইবনু আবিদ্দুনয়া, আযযুহদ : ১৯৬]
তৃতীয়ত, গুনাহের ব্যাপারে মানুষের সর্বদা আল্লাহর সামনে বিনয়ী থাকা জরুরি। এই বিনয় দুইভাবে প্রকাশ পায়—
১. গুনাহ করার আগেই অন্তরে ভয় কাজ করবে—‘আমি কীভাবে আমার মহান রবের অবাধ্যতা করি?’ এই ভাবনা মানুষকে গুনাহ থেকে বিরত রাখে।
২. যদি ভুলবশত গুনাহ হয়ে যায়—তাহলে হতাশ না হয়ে, বিনয়ী হয়ে আল্লাহর দিকে এই চিন্তা করে ফিরে আসা—‘আমি তুচ্ছ, নগণ্য একজন বান্দা, আর আমার রব অতি মহান, অতি ক্ষমাশীল|’ এই বিশ্বাস নিয়ে তাওবা করা—এটাও আল্লাহর বড়ত্বের স্বীকৃতি।
যদি একজন মানুষ এই দুই অবস্থায় নিজেকে ঠিক রাখতে পারে—গুনাহের আগে ভয়, গুনাহর পরে তাওবা—তাহলে ইনশাআল্লাহ আল্লাহ তাআলা তাকে গুনাহ থেকে হেফাজত করবেন।
গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার একটি সহজ কৌশল
গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার একটি সহজ কিন্তু গভীর কৌশল আছে—হিম্মত করা (দৃঢ় সংকল্প নেওয়া)।
কিন্তু এখানে আমাদের বড় একটি ভুল রয়েছে। আমরা হিম্মত করি, কিন্তু খুব বড় করে করি। যেমন বলি, ‘আর কখনো মোবাইলে গুনাহ দেখবো না।’ দুই দিন ঠিক থাকলাম, তিন দিনের মাথায় আবার গুনাহ হয়ে গেল। তারপর আফসোস করলাম… কিন্তু চতুর্থ দিনে সেই আফসোসটাও আর থাকে না। কারণ, একবার ভেঙে গেছে, এখন আর নতুন করে শুরু করার মনোভাব থাকে না।
হিম্মত হবে ছোট, কিন্তু ধারাবাহিক
এই জন্যই আমাদের মাশায়েখ বলেন, হিম্মত বড় করে করো না, হিম্মত ছোট করে করো—কিন্তু বারবার করো। এক কথায়, হিম্মত হবে ছোট—কিন্তু ধারাবাহিক। যেমন—
— ‘আমি সারাজীবন মিথ্যা বলবো না’—এ হিম্মত রক্ষা করা কঠিন। কিন্তু ‘আগামীকাল আমি মিথ্যা বলবো না’—এটা সম্ভব।
— ‘আমি আর কখনো মোবাইলে গুনাহ করবো না’—এটা কঠিন। কিন্তু ‘এই এক ঘণ্টা আমি গুনাহ থেকে বেঁচে থাকবো’—এটা সহজ।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন
الْمُؤْمِنُ الْقَوِيُّ خَيْرٌ وَأَحَبُّ إِلَى اللَّهِ مِنَ الْمُؤْمِنِ الضَّعِيفِ
আল্লাহর কাছে শক্তিশালী মুমিন দুর্বল মুমিন থেকে অধিক উত্তম ও প্রিয়। [সহীহ মুসলিম : ২৪৬৪]
এই ছোট ছোট হিম্মত ধীরে ধীরে বড় পরিবর্তন এনে দেয়। এরপর মানুষ একটি জিনিস অনুভব করতে শুরু করে—গুনাহতে যেমন একটা মজা আছে, তেমনি নেক আমলেও একটা স্বাদ আছে। তবে পার্থক্য হলো—গুনাহের মজা আসলে সাজা—এই মজার ভিতরে শাস্তি লুকানো।
একটি বাস্তব উদাহরণ
একজন হার্ট সার্জনকে নিয়ে বসা হয়েছে খাবারের টেবিলে| সামনে সুস্বাদু মাংস, চর্বিযুক্ত খাবার—সবকিছু রয়েছে। কিন্তু তিনি কিছুই স্পর্শ করছেন না। তাকে বলা হলো, ‘আপনি খাচ্ছেন না কেন?’
তিনি বললেন, আমি যখন হার্ট অপারেশন করি, তখন এই চর্বির ক্ষতি চোখে দেখি। তাই আমি আর খেতে পারি না।’
অর্থাৎ, তিনি মজার ভিতরের ক্ষতিটা বুঝে গেছেন। তাই সেই ‘মজা’ আর তার কাছে মজা লাগে না।
সবচেয়ে বড় আলেম
এজন্যই ইমাম গাজালী রহ. বলেন, সবচেয়ে বড় আলেম সে নয়, যার কাছে বেশি জ্ঞান মুখস্থ আছে; বরং সবচেয়ে বড় আলেম সে, যে গুনাহের ক্ষতি সবচেয়ে বেশি জানে।
কারণ, যদি গুনাহর ক্ষতি আপনার কাছে স্পষ্ট হয়ে যায়, তাহলে আপনি গুনাহ করার সাহসই পাবেন না। আমরা গুনাহ করি কেন? কারণ গুনাহের ক্ষতি আমাদের কাছে পরিষ্কার নয়।
একটি হৃদয়স্পর্শী কথা
আমাদের নকশবন্দী সিলসিলার একজন বড় বুযুর্গ ছিলেন আবুল হাসান খিরকানী রহ। তিনি বলেন, যে ব্যক্তি একটি দিন গুনাহ থেকে বেঁচে থাকতে পারল, সে দিন সে যেন রূহানিভাবে নবীজি ﷺ-এর সাথেই ছিল।
কারণ, নবীজি ﷺ-এর সাহচর্যের বরকত ছিল—সাহাবায়ে কেরাম গুনাহ থেকে দূরে থাকতেন। আর আপনি যখন গুনাহ থেকে বেঁচে থাকলেন—তখন সেই একই সোহবতের সুবাস যেন আপনার জীবনেও চলে এসেছে।
মনে রাখবেন, আল্লাহ তাআলার বিশেষ রহমত হল, গুনাহে লিপ্ত থাকা অবস্থায় মরণ না আসা এবং গুনাহের পর তাওবার তাওফিক হওয়া।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে আমল করার তাওফিক দান করুন—আমীন।
তৃতীয় বিষয় : যা আছে, তা নিয়ে খুশি থাকা
দীনের শাখাগত তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো الرِّضَا بِالْمَوْجُودِ অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলা যা দিয়েছেন, তার উপর সন্তুষ্ট থাকা এবং শোকর আদায় করা।
আজকের বাস্তবতা হলো—আমরা যা নেই, তা নিয়ে বেশি চিন্তা করি; আর যা আছে, তার জন্য কৃতজ্ঞতা কম প্রকাশ করি। অথচ একজন মুমিনের বৈশিষ্ট্য হলো—সে যা আছে, তার উপর খুশি থাকে এবং অন্তর থেকে বলে—আলহামদুলিল্লাহ।
পুরো পরিবারকে শোকরগুজার বানাতে হয়
একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বুঝতে হবে—নেয়ামত কখনো একা একজন মানুষ ভোগ করে না। এর সুফল ছড়িয়ে পড়ে তার পরিবার, তার আশেপাশের মানুষদের মাঝেও। যেমন—
— একজন ব্যক্তির মেয়ে সুন্দরী—এর সুফল কী? একটি ভালো পরিবারে বিয়ে হয়—পরিবারও উপকৃত হয়।
— কেউ শিক্ষিত। তার শিক্ষা শুধু তার নিজের জন্য নয়; ভালো চাকরি পেলে তার পরিবারও এর সুবিধা ভোগ করে।
— কারো কাছে যদি একটি আরামদায়ক গাড়ি থাকে—সে একা বসে না, তার স্ত্রী-সন্তানও সেই আরাম উপভোগ করে।
— আল্লাহ যদি একটি সুন্দর বাড়ি দান করেন—সে একা থাকে না, পুরো পরিবার সেই ঘরেই বাস করে।
— যদি ভালো খাবারের ব্যবস্থা থাকে—পুরো পরিবারই তা ভোগ করে।
অর্থাৎ—নেয়ামত একার নয়, নেয়ামত সামষ্টিক। এর সুফল পরিবার, আত্মীয়—সবার মাঝে ছড়িয়ে পড়ে। এই জন্যই শোকরও একার হওয়া উচিত নয়। শোকর হওয়া উচিত পারিবারিক।
শুধু আপনি ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বললেই যথেষ্ট নয়—আপনার স্ত্রী, সন্তান—পুরো পরিবারকে শোকরগুজার বানাতে হবে। ঘরের পরিবেশ এমন হতে হবে— যেখানে কৃতজ্ঞতা থাকবে, আল্লাহর স্মরণ থাকবে, নেয়ামতের মূল্যায়ন থাকবে।
হযরত দাউদ আ.-এর পরিবার
আল্লাহ তাআলা হযরত দাউদ আ.-কে এ শিক্ষাটাই দিয়েছিলেন। আল্লাহ তাআলা বলেন
اعْمَلُوا آلَ دَاوُدَ شُكْرًا
হে দাউদের পরিবার! তোমরা এমন আমল করো, যা কৃতজ্ঞতার প্রকাশ ঘটায়। [সূরা সাবা : ১৩]
এখানে একটি সূক্ষ্ম প্রশ্ন আসে—রাজত্ব তো দাউদ আ.-কে ব্যক্তিগতভাবে দেওয়া হয়েছিল, তাহলে পুরো পরিবারকে কেন শোকর আদায়ের নির্দেশ দেওয়া হলো?
মুফাসসিরগণ বলেন, ‘এর কারণ হলো, নেয়ামত কখনো একার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। যে ব্যক্তি নেয়ামত পায়, তার পরিবার-পরিজনও সেই নেয়ামতের অংশীদার হয়ে যায়।’
তাই শোকরও একার হওয়া যথেষ্ট নয়, শোকর হতে হবে পারিবারিক। একটি বাস্তব সত্য হলো, যদি স্বামী শোকরগুজার হয়, কিন্তু স্ত্রী নাশোকর হয় অথবা পরিবারের কেউ শোকর করে, কেউ না করে—তাহলে এই বৈপরীত্য দীর্ঘস্থায়ী হয় না। কারণ, শোকর ও নাশোকর একসাথে টিকে থাকতে পারে না। ফলে যে ব্যক্তি নেয়ামতের কদর করে না—কোনো না কোনোভাবে সে সেই নেয়ামত থেকে বঞ্চিত হয় অথবা সেই পরিবেশ থেকে আলাদা হয়ে যায়।
তাফসিরে বর্ণিত আছে, যখন এই নির্দেশনা এলো, দাউদ আ. তাঁর পরিবারকে একত্রিত করলেন। তিনি তাদেরকে বুঝালেন—আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে নেয়ামত দিয়েছেন, আর যদি আমরা শোকর না করি, তাহলে সেই আল্লাহই নেয়ামত ফিরিয়ে নিতে পারেন।
এরপর কী করলেন?
পুরো পরিবার মিলে একটি ব্যবস্থা করলেন—দিন-রাত ২৪ ঘণ্টাকে ভাগ করে নিলেন। একেক সময় একেকজন ইবাদতে মশগুল থাকবেন, বাকিরা সংসারের কাজ, রুজি-রোজগার ইত্যাদি সামলাবেন। ফলে দিনের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এমন কোনো সময় থাকত না, যখন দাউদ আ.-এর পরিবারে কেউ না কেউ আল্লাহর শোকরে লিপ্ত নেই।
এটি ছিল এক আদর্শ পরিবার—যেখানে নেয়ামতের কদর ছিল, যেখানে শোকর ছিল জীবনের অংশ, যেখানে ইবাদত ছিল ধারাবাহিক। আজ আমাদের ঘরগুলোতে যদি এমন পরিবেশ ˆতরি হতো—কেউ কুরআন পড়ছে, কেউ জিকির করছে, কেউ দোয়া করছে, তাহলে সেই ঘরগুলোও রহমতের ঘরে পরিণত হয়ে যেত।
আল্লাহ তাআলা আমাদের পরিবারগুলোকে শোকরগুজার বানিয়ে দিন—আমীন।
আমরা অনেকেই অজান্তেই ‘রাজার মতো’ জীবন যাপন করছি
কুরআন মাজীদে আল্লাহ তাআলা বনী ইসরাঈলকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, হযরত মূসা আ. তাঁদের উদ্দেশে বলেছিলেন
إِذْ جَعَلَ فِيكُمْ أَنْبِيَاءَ وَجَعَلَكُمْ مُلُوكًا وَآتَاكُم مَّا لَمْ يُؤْتِ أَحَدًا مِّنَ الْعَالَمِينَ
হে আমার জাতি! আল্লাহর সেই নিয়ামত স্মরণ করো, যা তিনি তোমাদের প্রতি বর্ষণ করেছেন—তিনি তোমাদের মধ্যে নবী প্রেরণ করেছেন, তোমাদেরকে রাজা বানিয়েছেন এবং তোমাদের এমন কিছু দান করেছেন,যা তোমাদের আগে বিশ্বের অন্য কাউকেও দেননি। [সূরা মায়িদাহ : ২০]
মুফাসসিরগণ এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, হযরত মূসা আ.-এর উম্মতকে যে রাজত্ব দেওয়া হয়েছিল, সেই রাজত্বের একটি অংশ আল্লাহ তাআলা আমাদের উম্মতের সাধারণ মানুষের মাঝেও ছড়িয়ে দিয়েছেন। অর্থাৎ—আমরা অনেকেই অজান্তেই ‘রাজার মতো’ জীবন যাপন করছি।
মুফাসসিরগণ বলেন
كُلُّ مَن مَلَكَ بَيْتًا وَخَادِمًا وَامْرَأَةً، فَهُوَ مَلِكٌ
যার কাছে তিনটি জিনিস আছে, সে-ই প্রকৃত অর্থে রাজা।
১. যার মাথা গোঁজার মতো একটি ঘর আছে।
২. যার খেদমতের ব্যবস্থা আছে—মানুষ হোক বা যন্ত্র।
৩. যার একটি স্ত্রী আছে। [তাফসির তাবারী : ১১১]
আজ আমাদের দিকে তাকান—ঘর আছে, পরিবার আছে, আর কত রকম ‘খাদেম’ আছে! যেমন—ফ্রিজ আমাদের খাবার সংরক্ষণ করছে, ওয়াশিং মেশিন কাপড় ধুয়ে দিচ্ছে, ফ্যান হাওয়া করছে, গ্যাসের চুলা মুহূর্তে আগুন জ্বালিয়ে দিচ্ছে।
আপনি মাত্র শত বছর আগে কল্পনা করুন—একটি ঘরে বাতাস করার জন্য মানুষ রাখতে হতো, ঠান্ডা পানি পাওয়া ছিল কঠিন, রান্না করা ছিল কষ্টসাধ্য| আজ আমরা একটি বোতাম চাপলেই সব পাচ্ছি। আমরা কি বুঝতে পারছি, আমরা কী পরিমাণ নিয়ামতের মধ্যে আছি?
তুমি তো রাজাদের একজন
হযরত আব্দুল্লাহ ইবন আমর ইবনুল আস রাযি.-এর কাছে এক ব্যক্তি এসে বলল, আমি গরীব, আমি মুহাজির, আমার কিছু নেই।
তিনি জিজ্ঞেস করলেন, أَلَكَ امْرَأَةٌ ؟ তোমার কি স্ত্রী আছে?
বলল, আছে।
أَلَكَ مَسْكَنٌ تَسْكُنُهُ؟ তোমার কি থাকার ঘর আছে?
বলল, আছে।
তিনি বললেন, فَأَنْتَ مِنَ الأَغْنِيَاءِ তাহলে তুমি গরীব নও, তুমি ধনী।
লোকটি বলল, আমার একজন খাদেমও আছে।
তখন তিনি বললেন, فَأَنْتَ مِنَ الْمُلُوكِ তাহলে তুমি শুধু ধনী নও—তুমি তো রাজাদের একজন! [তাফসির তাবারী : ২৭৮]
বাস্তবতা হলো—আমরা অনেকেই রাজাদের মতো জীবন যাপন করছি, কিন্তু রাজাদের মতো শোকর আদায় করি না। এই জন্যই আবু আব্দুল্লাহ আস-সাবিহী রহ. বলেন, الرِّضَا بِالْمَوْجُودِ যা কিছু তোমার কাছে আছে, তার উপর সন্তুষ্ট থাকা এবং শোকর আদায় করা—এটা দীনের গুরুত্বপূর্ণ একটি শাখা।
নাশোকর বান্দার অবস্থা কী?
সে কখনো অন্তর থেকে সুখী হতে পারে না।
সে নিয়ামত ধরে রাখতে পারে না।
সে দুনিয়ার নিয়ামত থেকেও বঞ্চিত হয়।
আখিরাতের নিয়ামত থেকেও বঞ্চিত হয়।
তার অন্তরে জন্ম নেয়—হিংসা, লোভ, অস্থিরতা।
নিচের দিকে তাকাও
এই জন্যই রাসূলুল্লাহ ﷺ শিক্ষা দিয়েছেন
انْظُرُوا إِلَى مَنْ هُوَ أسْفَلَ مِنْكُمْ وَلاَ تَنْظُرُوا إِلَى مَنْ هُوَ فَوْقَكُمْ
তোমার চেয়ে নিচের দিকে তাকাও, উপরের দিকে তাকিও না। [সহীহ মুসলিম : ২৯৬৩]
যদি তোমার পাকা ঘর থাকে—কুঁড়েঘরের দিকে তাকাও। যদি কুঁড়েঘর থাকে—রাস্তার মানুষের দিকে তাকাও। তখন তুমি বুঝতে পারবে—আল্লাহ তোমাকে কত বড় নিয়ামতের মধ্যে রেখেছেন।
রাবিয়া বসরী রহ.
হযরত রাবিয়া বসরী রহ. একদিন শুকনো রুটি খাচ্ছিলেন—কোনো তরকারি নেই, শক্ত রুটি—খেতেই কষ্ট হয়। কিন্তু তিনি বারবার বলছেন—আলহামদুলিল্লাহ… আলহামদুলিল্লাহ…।
একজন জিজ্ঞেস করল, ‘এত কষ্টের খাবার খেয়েও এত শোকর কেন?’
তিনি বললেন, ‘আল্লাহ তাআলা যখন রিযিক বণ্টন করেছেন, তখন যদি আমার নামটাই না রাখতেন—তাহলে কী হতো? তিনি এত বড় মালিক—তবুও আমার নামটি রেখেছেন, আমাকে দিয়েছেন—এই জন্যই আমি শোকর করি।
সুবহানাল্লাহ! কী গভীর উপলব্ধি!
খুব কম বান্দাই শোকর আদায় করে
আল্লাহ তাআলা আপনাকে যখন কোনো নেয়ামত দেন, এর মানে হলো—তিনি আপনাকে স্মরণ করেছেন। যেন তিনি বলছেন, ‘আমি তোমাকে দিচ্ছি, তুমি আমার দিকে ফিরে বল—আলহামদুলিল্লাহ।’
কিন্তু আফসোস! আমরা আল্লাহ তাআলার এই ম্যাসেজটা বুঝি না| আল্লাহ তাআলা নিজেই বলেন
وَقَلِيلٌ مِنْ عِبَادِيَ الشَّكُورُ
আমার খুব কম বান্দাই শোকর আদায় করে। [সূরা সাবা : ১৩]
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সত্যিকারের শোকর আদায়কারী বান্দা বানিয়ে দিন—আমীন।
চতুর্থ বিষয় : যা আমরা পাইনি, তার উপর সবর করা
দ্বীনের শাখাগত চতুর্থ বিষয় হলো الصَّبْرُ عَلَى الْمَفْقُودِ অর্থাৎ, যা আমরা পাইনি, তার উপর সবর করা।
যা আছে তার উপর শোকর, আর যা নেই তার উপর সবর—এই দুইয়ের সমন্বয়ই একজন মুমিনের সৌন্দর্য।
আমরা কী করি?
আল্লাহ তাআলা কি আমাকে-আপনাকে সবকিছু দিতে বাধ্য? না। বরং এই দুনিয়া সম্পূর্ণ আল্লাহ তাআলার—তিনি যাকে চান দেন, যাকে চান দেন না।
কখনো আল্লাহ সন্তান দেন, কখনো নিয়ে নেন।
কখনো সম্পদ দেন, কখনো কমিয়ে দেন।
কখনো সুখ দেন, কখনো কষ্ট দেন।
বাস্তবতা হলো, আল্লাহ আমাদের হাজার হাজার নেয়ামত ঠিক রাখেন। যেমন, চোখ ঠিক আছে, হৃদপিণ্ড চলছে, পরিবার ঠিক আছে, ঘর ঠিক আছে…। কিন্তু মাঝে মাঝে একটি জিনিসে সমস্যা দেন, দেখার জন্য—বান্দা সবর করে কিনা।
কিন্তু আমরা কী করি? সেই একটি সমস্যার দিকে তাকিয়ে হাজার নেয়ামত ভুলে যাই।
সবরকারীদের জন্য সুসংবাদ
আল্লাহ চান বান্দা তাঁর দিকে ফিরে আসুক, তাঁকে ডাকুক, তাঁর সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলুক। এই জন্যই আল্লাহ তাআলা বলেন
وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ
সবরকারীদেরকে সুসংবাদ দিন। [সূরা বাকারা : ১৫৫]
আর অন্য জায়গায় বলেন
إِنَّمَا يُوَفَّى الصَّابِرُونَ أَجْرَهُم بِغَيْرِ حِسَابٍ
আমি তাদেরকে অগণিত, সীমাহীন পুরস্কার দিব। [সূরা জুমার : ১০]
একটি ঘটনা
ঘটনাটি লিখেছেন হাকিমুল উম্মত আশরাফ আলী থানবী রহ.। একজন মুমিন ও একজন কাফের মাছ ধরতে গেল। কাফের বারবার মাছ পাচ্ছে, মুমিন কিছুই পাচ্ছে না। শেষে মুমিন একটি ছোট মাছ পেল—সেটাও লাফ দিয়ে চলে গেল।
এই দৃশ্য দেখে ফেরেশতা আল্লাহ তাআলাকে বললেন, ‘ইয়া আল্লাহ! আপনার মুমিন বান্দার সাথে এমন কেন?’
তখন আল্লাহ তাআলা ফেরেশতাকে দেখালেন, জান্নাতে এই মুমিন বান্দার জন্য একটি বিশাল প্রাসাদ প্রস্তুত। তারপর বললেন, ‘তার আমল এখনো যথেষ্ট হয়নি, তাই আমি তাকে কষ্ট দিয়ে প্রস্তুত করছি।’
আর কাফেরের জন্য দেখালেন জাহান্নামের শাস্তি এবং বললেন, ‘দুনিয়ায় তাকে কিছু দিয়েছি, যাতে আখিরাতে আর কিছু না থাকে।’
তাই আমাদের মনে রাখতে হবে—আল্লাহ যা করেন, আমাদের ভালোর জন্যই করেন। যদিও আমরা তা বুঝতে পারি না।
সবর মানে কী?
এখন প্রশ হলো—সবর মানে কী?
আমরা অনেকেই ভুল বুঝি—ভাবি, কাঁদা যাবে না, দুঃখ প্রকাশ করা যাবে না—এইটাই সবর। না; বরং সবর মানে হলো—আল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযোগ না করা। আর সবরের বিপরীত হলো—আল্লাহর ব্যাপারে অভিযোগ করা। যেমন, ‘আল্লাহ শুধু আমাকে কষ্ট দেন…’, ‘আমার সাথেই কেন এমন হয়…’ এই কথাগুলো—সবরের পরিপন্থী।
একজন মানুষের সন্তান মারা গেছে—সে কাঁদছে, চোখ দিয়ে পানি পড়ছে—এটা সবরের বিরোধী নয়।
রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজেও তাঁর ছেলে ইবরাহিম রাযি.-এর ইন্তেকালে কেঁদেছিলেন। তাঁর দিয়ে অশ্রু ঝরেছে। তখন তিনি বলেছিলেন
تَدمَعُ العَينُ ويَحزَنُ القَلبُ، ولا نَقولُ إلَّا ما يَرضى رَبُّنا
চোখ অশ্রু ঝরায়, অন্তর ব্যথিত হয়—কিন্তু আমরা এমন কিছু বলি না, যা আমাদের রবকে অসন্তুষ্ট করে। [সহীহ মুসলিম : ২৩২৫]
সবর তো প্রথম আঘাতের সময়ই
হাদিসে এসেছে, নবীজি ﷺ একদিন পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন| দেখলেন, এক মহিলা কাঁদছে—তার সন্তান মারা গেছে।
নবীজি ﷺ তাকে বললেন
اتَّقِي اللَّهَ، وَاصْبِرِي
আল্লাহকে ভয় করো এবং ˆধর্য ধরো।
কিন্তু মহিলা নবীজিকে চিনতে পারেনি। সে উত্তরে বলে ফেলল, ‘আপনার তো এমন হয়নি, তাই আপনি বুঝবেন না!’
পাশ থেকে একজন বলল, ‘তুমি জানো, তুমি কার সাথে কথা বলছো? তিনি তো রাসূলুল্লাহ ﷺ!’
মহিলা লজ্জিত হয়ে দৌড়ে এসে বলল, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাকে মাফ করে দিন। আমি আপনাকে চিনতে পারিনি!
তখন নবীজি ﷺ বললেন
إِنَّمَا الصَّبْرُ عِنْدَ الصَّدْمَةِ الْأُولَى
সবর তো প্রথম আঘাতের সময়ই। [সহীহ বুখারী : ১২৮৩]
অর্থাৎ, বিপদ আসার প্রথম মুহূর্তেই আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়াই আসল সবর।
শেষ কথা
আবু আব্দুল্লাহ আস-সাবিহী রহ. খুব সুন্দরভাবে পুরো দীনকে ছয়টি কথায় সংক্ষেপ করেছেন। তিনি বলেন, দীনের মৌলিক দুটি বিষয় হলো—
১. আল্লাহর প্রতি সত্যিকারের মুখাপেক্ষিতা।
২. রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর উত্তম অনুসরণ।
আর দীনের শাখাগত চারটি বিষয় হলো—
১. আল্লাহর সাথে কৃত অঙ্গীকার পূরণ করা।
২. আল্লাহর নির্ধারিত সীমা রক্ষা করা।
৩. যা আছে—তার উপর শোকর করা।
৪. যা নেই—তার উপর সবর করা।
এই ছয়টি বিষয়ের উপরই পুরো দীন দাঁড়িয়ে আছে।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে এই ছয়টি বিষয় বুঝার, গ্রহণ করার এবং জীবনে বাস্তবায়ন করার তাওফীক দান করুন—আমীন।
وَآخِرُ دَعْوَانَا أَنِ الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِين