কবরের আযাব অস্বীকারের জবাব

জিজ্ঞাসা–১৯০৫ : এক ভাই এই লিখা দিল। এখন এর জবাব কী হবে?

কবরের আজাব বলতে কিছু নেই। [সুরা ইয়াসিন ৩৬:৫১-৫২] ‘আর যখন শিঙ্গায় ফুঁক দেওয়া হবে, তৎক্ষণাত তারা কবর থেকে বের হয়ে তাদের রবের দিকে ছুটে আসবে। তারা বলবে, হায় দুর্ভোগ আমাদের, কে আমাদেরকে আমাদের নিদ্রাস্থল থেকে উঠালো।’ [সূরা জুমার ৩৯:৪২] আল্লাহ প্রাণসমূহকে তুলে নেনে তাদের মৃত্যুকালে, আর যারা মরেনি তাদের নিদ্রাকালে। অতঃপর যার জন্য তিনি মৃত্যুর ফায়সালা করেন তার প্রাণ তিনি রেখে দেন এবং অন্যগুলো ফিরিয়ে দেন একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য।

উপরের দুই আয়াত থেকে এই কথা স্পষ্ট যে মৃত্যু আর নিদ্রা একই জিনিস, পার্থক্য হলো কেবল নিদ্রা একপ্রকার সাময়িক মৃত্যু। অর্থাৎ কবরের জীবন বলতে কোনো কিছু নেই। কবর বা বারযাখ যেটাই বলেন না কেন, তাতে কোনো প্রকার আজাব দেওয়া হবে—এমন কথা কুরআন থেকে প্রমাণ করা সম্ভব নয়।

কমনসেন্স থেকেও কবরের আজাবের অযৌক্তিকতা বোঝা যায়। বিচার হওয়ার আগেই কাউকে শাস্তি দেওয়াটা একপ্রকার অবিচার। কারো যদি আগেই শাস্তি হয়ে যায় তাহলে কিয়ামতের দিন তার আর বিচারের কি দরকার? কবরে কেউ এসে একজনের বিচার ফায়সালা করে যাবে আর আজাব দেওয়া শুরু করবে এমন কথা আল্লাহর হুকুমতের সাথে সাংঘর্ষিক। আল্লাহ কুরআনে স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছেন যে ‘তিনি নিজ কর্তৃত্বে কাউকে শরীক করেন না।’ [১৮:২৬] ‘কুরআনে আরও বলা আছে, ‘যেদিন কিয়ামাত হবে সেদিন অপরাধীরা শপথ করে বলবে যে, তারা মুহূর্তকালের বেশি (কবরে) অবস্থান করেনি। এভাবেই তারা সত্যভ্রষ্ট হত।’ [৩০:৫৫] অর্থাৎ অবিশ্বাসীদের পরকাল সম্পর্কে কোনো ধারণা না থাকায় তারা মনে করবে তারা কবরে ছিল মাত্র একঘন্টার মতো। কিন্তু বিশ্বাসীরা প্রকৃত ঘটনা বুঝতে পারবে এবং তারা অপরাধীদের লক্ষ্য করে বলবে ‘তোমরা আল্লাহর বিধান অনুযায়ী পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত অবস্থান করেছ, আর এটিই পুনরুত্থান দিবস।’ [৩০:৫৬]

অনেকে সুরা গাফির (সুরা মুমিন নামেও পরিচিত) এর একটি আয়াত দেখিয়ে বারযাখের শাস্তি প্রমাণ করতে চেষ্টা করে। আয়াতটি হলো: [৪০:৪৬] ‘তাদেরকে (ফিরাউন সম্প্রদায়কে) সকাল সন্ধ্যা আগুনের সামনে উপস্থাপন করা হয়।’ তাদের ভাষ্য হলো কাউকে যদি সকাল-সন্ধ্যা আগুন দেখানো হয়, তাহলে সেটাও এক প্রকার কঠিন শাস্তি। কিন্তু কেউ যদি আয়াতের আরবিটি মনোযোগ দিয়ে পড়ে তাহলে বুঝতে পারবে যে এখানে আসলে ফিরাউন সম্প্রদায়কে আগুন দেখানো হচ্ছে না, বরং আগুনকে দেখানো হচ্ছে ফিরাউন সম্প্রদায়। অর্থাৎ, এই ক্ষেত্রে দর্শক হলো আগুন/জাহান্নাম। অন্যদিকে সুরা কাহফে স্পষ্টভাবে বলা আছে ‘আর আমি সেদিন কাফিরদের সামনে জাহান্নামকে সরাসরি উপস্থাপন করবো।’ [১৮:১০০] অর্থাৎ কাফিররা জাহান্নাম দেখবে কেবল কিয়ামতের দিন, এর আগে নয়। কুরআন থেকে এই কথা চূড়ান্ত যে কবরের আজাব বলতে কিছু নেই। হাদিস সংকলনকালে অনেক ইহুদি আক্বিদা-বিশ্বাস মুসলিমদের মাঝে ঢুকে যায়। কবরের আজাবও ইহুদি ধর্ম থেকে আগত এমন একটি ভ্রান্ত ধারণা যা শুধু কুরআন বহির্ভূতই নয়; বরং কুরআনের সাথে সাংঘর্ষিকও।—Abdullah Jubayer

জবাব সংক্ষেপে : কুরআনে বারযাখ আছে, কুরআনে কিয়ামতের আগের শাস্তির ইঙ্গিত আছে, আর সহীহ হাদীসে কবরের আযাব স্পষ্টভাবে এসেছে। তাই কবরের আযাব আহলুস সুন্নাহর প্রতিষ্ঠিত আকীদা।

আপনি চাইলে একটু সবিস্তারে এভাবে জবাব দিতে পারেন—

এক. কবরের আযাব অস্বীকার করার এই বক্তব্যটা মূলত কুরআনের কিছু আয়াতকে আংশিকভাবে ব্যাখ্যা করার ফল। অথচ কুরআন ও সহীহ হাদীস—দুটো মিলিয়েই আকীদা বুঝতে হয়।

প্রথমত, ‘কবরের জীবন’ বা বারযাখ কুরআনেই আছে। আল্লাহ তাআলা বলেন,

وَمِنْ وَرَائِهِم بَرْزَخٌ إِلَىٰ يَوْمِ يُبْعَثُونَ

তাদের সামনে রয়েছে বারযাখ, পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত। [সূরা মুমিনুন : ১০০]

অর্থাৎ মৃত্যু ও কিয়ামতের মাঝখানে একটি পৃথক অবস্থা আছে।

দুই.  এখন আসি ফিরআউনের আয়াতে। আল্লাহ তাআলা বলেন,

النَّارُ يُعْرَضُونَ عَلَيْهَا غُدُوًّا وَعَشِيًّا ۖ وَيَوْمَ تَقُومُ السَّاعَةُ أَدْخِلُوا آلَ فِرْعَوْنَ أَشَدَّ الْعَذَابِ

তাদেরকে সকাল-সন্ধ্যা আগুনের সামনে উপস্থিত করা হয়। আর যেদিন কিয়ামত হবে, বলা হবে—ফিরআউনের সম্প্রদায়কে কঠিন শাস্তিতে প্রবেশ করাও। [সূরা গাফির : ৪৬]

এখানে স্পষ্ট দুই ধাপের কথা বলা হয়েছে—

১। غُدُوًّا وَعَشِيًّا ‘সকাল-সন্ধ্যা আগুনের সামনে উপস্থিত করা।’ এটা কিয়ামতের আগের অবস্থা।

২। وَيَوْمَ تَقُومُ السَّاعَةُ ‘আর যেদিন কিয়ামত হবে…এরপর বলা হচ্ছে أَدْخِلُوا آلَ فِرْعَوْنَ أَشَدَّ الْعَذَابِ ‘সবচেয়ে কঠিন শাস্তিতে ঢুকাও।’ এটা কিয়ামতের পরের বড় শাস্তি

যদি প্রথমটাও কিয়ামতের শাস্তি হতো, তাহলে ‘আর যেদিন কিয়ামত হবে’ বলে আলাদা করে বলার দরকার ছিল না।

আর يُعْرَضُونَ عَلَيْهَا এর অর্থ ‘তাদেরকে আগুনের সামনে পেশ করা হয়।’ এখানে আগুন দর্শক—এই ব্যাখ্যা আরবি ভাষার দিক থেকেও দুর্বল এবং তাফসীরের ইমামদের বক্তব্যের বিরোধী।

তিন.  এখন ‘কে আমাদেরকে নিদ্রাস্থল থেকে উঠালো?’  এই আয়াতের কথায় আসি। আল্লাহ তাআলা বলেন,

قَالُوا يَا وَيْلَنَا مَن بَعَثَنَا مِن مَّرْقَدِنَا

তারা বলবে, হায় আমাদের দুর্ভোগ! কে আমাদেরকে আমাদের নিদ্রাস্থল থেকে উঠালো? [সূরা ইয়াসিন : ৫২]

এখানে ‘মারকাদ’ (مرقد) শব্দের অর্থ বিশ্রামস্থল বা নিদ্রাস্থল। এর মানে এই না যে সেখানে কোনো অনুভূতি ছিল না। কিয়ামতের ভয়াবহতার তুলনায় আগের অবস্থা তাদের কাছে ঘুমের মতো মনে হবে। মৃতদের কাছে দীর্ঘ সময়টাকে ঘুমের মতো মনে হওয়া স্বাভাবিক। কুরআনেই আছে, কিয়ামতের দিন মানুষ দুনিয়ার জীবনকেও অল্প মনে করবে। তাই ‘নিদ্রা’ বলা মানে আযাব নেই— এটা বাধ্যতামূলক অর্থ নয়।

যেমন কুরআনেই আছে—

كَأَنَّهُمْ يَوْمَ يَرَوْنَهَا لَمْ يَلْبَثُوا إِلَّا عَشِيَّةً أَوْ ضُحَاهَا

যেদিন তারা কিয়ামত দেখবে, মনে হবে তারা যেন মাত্র এক সন্ধ্যা বা এক সকাল অবস্থান করেছিল। [সূরা নাযিয়াত : ৪৬]

সুতরাং ‘আমাদেরকে নিদ্রাস্থল থেকে উঠালো?’— এই আয়াত কবরের আযাব অস্বীকার করে না।

আর ‘মৃত্যু ও ঘুম একই’—এটাও পুরোপুরি সঠিক না। ঘুমকে কুরআনে ‘সাময়িক মৃত্যু’ বলা হয়েছে, কিন্তু তাই বলে মৃত্যুর পর কোনো বারযাখ নেই—এটা কুরআন বলেনি।

চার. ‘বিচারের আগে শাস্তি অবিচার’—এই যুক্তিও ঠিক নয়। ইসলাম অনুযায়ী কবরের আযাব চূড়ান্ত জাহান্নামের শাস্তি নয়; এটা বারযাখের অবস্থা। যেমন দুনিয়াতেও মানুষ অপরাধের পর গ্রেফতার বা রিমান্ডে থাকে, তারপর চূড়ান্ত রায় হয়। এতে বিচারব্যবস্থার বিরোধ হয় না।

পাঁচ. সহীহ হাদীসে কবরের আযাব এত বেশি তাওয়াতুর অর্থে এসেছে যে তা অস্বীকার করা আহলুস সুন্নাহর আকীদার বিরুদ্ধে। নবীজি ﷺ নিজেই নিয়মিত কবরের আযাব থেকে আশ্রয় চাইতেন—

اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ

হে আল্লাহ, আমি কবরের আযাব থেকে আপনার আশ্রয় চাই। [সহীহ বুখারী : ১৩৭৭; সহীহ মুসলিম : ৫৮৮]

নবীজি ﷺ যদি কবরের আযাব না থাকত, তাহলে নিয়মিত এ দোয়া করতেন না। তাই কবরের আযাবকেয ‘ইহুদি আকীদা’ বলা সঠিক নয়। ইসলামে কোনো বিষয় ইহুদিদেরও কাছে থাকলে সেটা মিথ্যা হয়ে যায় না। তাওহীদ, নবুওত, আখিরাত—এসবের মূল কথাও আগের কিতাবগুলোতে ছিল।

সুতরাং কবরের আযাব কুরআন, সহীহ হাদীস এবং সাহাবা-তাবেঈনের সর্বসম্মত আকীদা। কিছু আয়াতকে বিচ্ছিন্নভাবে ব্যাখ্যা করে তা অস্বীকার করা সঠিক পদ্ধতি নয়।

والله أعلم بالصواب

উত্তর দিয়েছেন