মনে খেয়াল আসা বা ওয়াসওসা দ্বারা তালাক সংঘটিত হয় কি?

জিজ্ঞাসা–১৯২৯ : আসসালামু আলাইকুম,‎ সম্মানিত মুফতি সাহেব হুজুর! আমার তিনটা প্রশ্ন‎—আমার প্রশ্নগুলো লম্বা হওয়ার কারণে শুরুতেই আমি ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি?

১. আমার প্রত্যেকটি বিষয়ে ওয়াসওসা আসে আর মাথার ভিতর শুধু নেগেটিভ ও ভয়ের দিক সিগন্যাল দেয়।‎ আমি বিবাহ করেছি দুই বছর আমার স্ত্রীর প্রতি আমি সন্তুষ্ট। স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার কোনো নিয়ত উদ্দেশ্য কিছুই নাই। ‎একবার ‎আমি আমার নিজেকে সম্বোধন করে নিজে নিজেকেই এভাবে মাসয়ালা বলতেছিলাম যে, কেউ যদি কেনায়া শব্দ ব্যবহার করে যেমন, আমার স্ত্রী আমার থেকে পৃথক তাহলে নিয়তের প্রয়োজন হবে। আর যদি কেউ সরীহ শব্দ ব্যবহার করে যেমন, আমি আমার স্ত্রীকে তালাক দিলাম অথবা আমার স্ত্রী তালাক এভাবে বলে তাহলে নিয়ত ছাড়াই তালাক হয়ে যাবে।‎ এখন আমার প্রশ্ন হলো , আমি এই যে মুখে বলে ফেললাম, ‘আমার স্ত্রীকে তালাক দিলাম’ এটা বলার দ্বারা কি আমার তালাক হয়ে গেল কিনা?‎ এখানে আমার তালাকের কোনো উদ্দেশ্য ছিল না। শুধুমাত্র নিজে নিজেকে বলেছিলাম—কোনটা সরীহ আর কোনটা কেনায়া; প্রত্যেকটির উদাহরণসহ।‎ এখন আমার শুধু ভয় হচ্ছে তালাক হয়ে গেল কিনা?

২. আমি বিভিন্ন ফতোয়ার ওয়েবসাইট যেমন , ফতোয়ায়ে দারুল উলুম দেওবন্দ, বিননুরি টাউন এই সকল উর্দু ওয়েবসাইটসহ বিভিন্ন বাংলা ফতোয়া ওয়েবসাইটে তালাকের মাসয়ালা পড়ছিলাম। ‎মুফতি লুৎফর রহমান ফরায়েজী সাহেবের আহলে হক মিডিয়া ওয়েবসাইটে একটা তালাকসংক্রান্ত প্রশ্ন পড়ছিলাম। সেই প্রশ্নের মধ্যে এভাবে লেখা ছিল যে, ‘আমার স্ত্রী এক তালাক’। যখন প্রশ্নের মধ্যে এই বাক্যটুকু পড়েছিলাম তখন আমার অন্তরে ‎অটোমেটিক আমার স্ত্রীর প্রতি একটা খেয়াল নিয়ত চলে আসে। প্রশ্নের মধ্যে ‘আমার স্ত্রী এক তালাক’ এই বাক্যটুকু পড়ার আগে আমার তালাকের নিয়ত উদ্দেশ্য কোনো কিছুই মনের মধ্যে ছিল না। আর আমি আমার স্ত্রীর প্রতি অনেক সন্তুষ্ট। তাকে তালাক দেওয়ার কোনো ইচ্ছায় আমার নেই। শুধুমাত্র তালাকের এই বাক্যটুকু পড়ার সময় হঠাৎ নিজের অজান্তেই স্ত্রীর প্রতি একটা খেয়াল চলে আসে।‎ আমি এখন জানতে চাচ্ছি,‎ আমার অন্তরে হঠাৎ এই খেয়াল আসাটা শয়তানের পক্ষ থেকে শুধুমাত্র একটা ওয়াসওসা নাকি আমার তালাক হয়ে গেল?‎‎—ইয়াসিন।

‎‎জবাব : وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

আপনার বর্ণনা অনুযায়ী কোনো তালাক সংঘটিত হয়নি। আপনি মূলত ওয়াসওয়াসা ও অযথা ভয়ের সমস্যায় ভুগছেন। প্রথম ঘটনায় আপনি তালাক দেওয়ার উদ্দেশ্যে কথা বলেননি; বরং তালাকের মাসআলা বোঝানোর জন্য উদাহরণ দিচ্ছিলেন যে, সরীহ শব্দ কী এবং কেনায়া শব্দ কী। এ অবস্থায় ‘আমি আমার স্ত্রীকে তালাক দিলাম’ বাক্যটি আপনি বাস্তব তালাকের নিয়তে বলেননি; বরং শিক্ষামূলক উদাহরণ হিসেবে বলেছেন। ফিকহের ভাষায় এটি حكاية اللفظ অর্থাৎ শব্দ উদ্ধৃত করা বা উদাহরণ হিসেবে বলা—এটি প্রকৃত তালাক নয়। কারণ তালাক কার্যকর হওয়ার জন্য কথাটি তালাকের উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা লাগে। শুধু উদাহরণ, উদ্ধৃতি, মাসআলা বোঝানো বা অন্যের কথা বর্ণনা করার কারণে তালাক হয় না।

দ্বিতীয় ঘটনাতেও তালাক হয়নি। কোনো ফতোয়া বা লেখা পড়ার সময় হঠাৎ অন্তরে খেয়াল আসা, স্ত্রীর কথা মনে পড়া, বা মনে অটোমেটিক কোনো ধারণা চলে আসা—এসব দ্বারা তালাক সংঘটিত হয় না। ইসলামে শুধু অন্তরের ওয়াসওসা, অনিচ্ছাকৃত কল্পনা বা হঠাৎ আসা চিন্তার উপর হুকুম আরোপ করা হয় না। রাসূল ﷺ বলেছেন,

إِنَّ اللَّهَ تَجَاوَزَ لِأُمَّتِي مَا حَدَّثَتْ بِهِ أَنْفُسَهَا مَا لَمْ تَعْمَلْ أَوْ تَتَكَلَّمْ

আমার উম্মতের অন্তরের কথাকে আল্লাহ মাফ করে দিয়েছেন, যতক্ষণ না সে তা কার্যকর করে বা মুখে প্রকাশ করে। [সহিহ বুখারী : ৬৬৬৪]

অর্থাৎ শুধু মনে কোনো কথা আসা, খেয়াল হওয়া, বা ভয় সৃষ্টি হওয়ার কারণে তালাক হয় না। আপনার ক্ষেত্রে তো তালাক দেওয়ার ইচ্ছাই ছিল না; বরং আপনি স্ত্রীকে ভালোবাসেন এবং তাকে তালাক দিতে চান না। তাই এসব চিন্তা শরয়ি দৃষ্টিতে ওয়াসওয়াসা ছাড়া কিছু নয়।

ফিকহের একটি মৌলিক নীতি হলো— اليقين لا يزول بالشك ‘নিশ্চিত বিষয় সন্দেহ দ্বারা দূর হয় না।’ আপনার বিবাহ নিশ্চিতভাবে বিদ্যমান। এখন সন্দেহ, ভয়, ওয়াসওয়াসা বা মনে খেয়াল আসার কারণে সেই বিবাহ নষ্ট হয়ে গেছে—এ কথা ধরা হবে না।

তাই আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন। আপনার স্ত্রী এখনো আপনার স্ত্রীই আছেন, কোনো তালাক সংঘটিত হয়নি। বারবার এসব মাসআলা খুঁজে পড়া, তালাকের বাক্য নিয়ে আতঙ্কিত হওয়া, বা ‘হয়েছে কিনা’ এই প্রশ্ন পুনরাবৃত্তি করা ওয়াসওয়াসাকে আরও বাড়ায়। এসব উপেক্ষা করুন, আল্লাহর কাছে আশ্রয় চান, أعوذ بالله من الشيطان الرجيم পড়ুন, এবং স্বাভাবিক দাম্পত্য জীবন চালিয়ে যান।

والله أعلم بالصواب
উত্তর দিয়েছেন