জিজ্ঞাসা–১৯৪১ : আসসালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ। আমার প্রশ্নটি হল, আমার পিতা সুদি ব্যাংকে চাকরি করতেন। সেই ব্যাংক থেকে তিনি বাড়ি তৈরি করার জন্য ঋণ নিয়েছিলেন। চুক্তি অনুযায়ী এই ঋণের টাকা তার ব্যাংকে চাকুরির বেতন দিয়ে পরিশোধ করতে হবে যা হারাম। অর্থাৎ বাড়িটি হারাম সম্পদ। এই ঋণের টাকা পুরো পরিশোধ না হতেই আমি বাড়িটি জোর করে আমার পিতার কাছ থেকে লিখে নিয়েছি। এখন আমি জানি যে, পিতার হারাম সম্পদ সন্তান নিলে সন্তানের গোনাহ হবে না। কিন্তু এক্ষেত্রে সম্পদটি আমার পিতার মালিকানায় আসা জরুরী ছিলো। পিতার মালিকানায় না আসতেই আমি জোর করে নিয়েছি, তাহলে কি আমার হারাম সম্পদ উপার্জনের গোনাহ হবে? চুক্তিতে এটাও বলা ছিল যে, ঋণ পরিশোধ না হলে বাড়ি বিক্রি করা যাবে না। যদিও আমার পিতা এটা আমাকে দিয়েছেন বিক্রি করেন নাই। এখন এই বাড়ির জন্য ঋণের সুদসহ যত পরিশোধ আমার পিতার ব্যাংকের চাকরির বেতন দিয়ে পরিশোধ হবে, তত টাকা আমি সদকা কতে দিলে এই বাড়ি আমার জন্য হালাল হবে নাকি ঋণের টাকা সুদসহ ও আমার বাবা ব্যাংকে চাকরিতে যত টাকা বেতন এতদিন যাবৎ উপার্জন করেছেন সেটাসহ সদকা করতে হবে? এখানে তো হারাম সম্পদ ১ম পক্ষ মানে আমার পিতার ততক্ষণ মালিকানা হবে না যতক্ষণ ঋণ পরিশোধ না হয়। তার আগেই তো আমি তার কাছ থেকে জোর করে লিখে নিয়েছি। সেক্ষেত্রে আমার করণীয় কি? ব্যাংকের নিয়ম হল সেখানে চাকরি করতেই হবে। না হলে পুরো টাকা একসাথে দিতে হবে, যা সম্ভব না। তাই আমার পিতা ব্যাংকে চাকরি করছেন এবং এখনো পরিশোধ হচ্ছে।—ফাহিম।
জবাব : وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
আপনার প্রশ্নটি জটিল এবং এতে সুদ, সম্পদের মালিকানা, জোরপূর্বক দখল ও হারাম উপার্জনের একাধিক মাসআলা জড়িত। তাই বিষয়টি ধাপে ধাপে বুঝতে হবে।
এক. সুদি ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া এবং সুদভিত্তিক চুক্তিতে জড়িত হওয়া গুনাহের কাজ। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا
আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন। [সূরা বাকারা : ২৭৫]
তবে ঋণ নিয়ে বাড়ি তৈরি করলে, ঋণ পরিশোধ না হওয়া পর্যন্তও বাড়ির মূল মালিকানা সাধারণত ঋণগ্রহীতারই থাকে। ব্যাংক সেটিকে জামানত বা মর্টগেজ হিসেবে আটকে রাখে। তাই বাড়িটি আপনার পিতার মালিকানায় এসেছে—এ কথা শরয়ি দৃষ্টিতে বলা হবে।
কিন্তু আপনি যদি আপনার পিতার পূর্ণ সন্তুষ্টি ছাড়া জোরপূর্বক বাড়িটি নিজের নামে লিখে নিয়ে থাকেন, তাহলে সেটি অন্যায় ও গুনাহের কাজ হয়েছে। কারণ ইসলামে কারো সম্পদ জবরদখল করা হারাম। রাসূল ﷺ বলেছেন,
مَنْ ظَلَمَ شِبْرًا مِنَ الْأَرْضِ طُوِّقَهُ مِنْ سَبْعِ أَرَضِينَ
যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে কারো এক বিঘত জমিও দখল করবে, কিয়ামতের দিন সাত তবক জমিন তার গলায় বেড়ি বানিয়ে দেওয়া হবে। [সহিহ বুখারী : ২৪৫২]
অতএব, যদি সত্যিই জোরপূর্বক নেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে আপনার করণীয় হলো—পিতার সন্তুষ্টি অর্জন করা, সম্ভব হলে বিষয়টি পারিবারিকভাবে ঠিক করা এবং ভবিষ্যতে কোনো জুলুম বা চাপ থেকে বিরত থাকা।
দুই. এখন আসি ‘হারাম সম্পদ’ প্রসঙ্গে। আপনার পিতা সুদি চাকরি ও ঋণের মাধ্যমে গুনাহে জড়িত হয়ে থাকলে, সেই গুনাহের মূল দায়ভার তাঁর উপর। আপনি সরাসরি সেই সুদি চুক্তির পক্ষ ছিলেন না। তাই আপনার উপর আপনার পিতার সমগ্র বেতন বা পুরো বাড়ির মূল্য সদকা করা আবশ্যক নয়।
তবে যেহেতু সম্পদটির সাথে সুদি লেনদেন জড়িত, তাই তাকওয়া ও সতর্কতার খাতিরে আপনি চাইলে সুদের আনুপাতিক অংশের সমপরিমাণ অর্থ গরিবদের কল্যাণে ব্যয় করতে পারেন। তবে তা সওয়াবের নিয়তে নয়; বরং আত্মশুদ্ধি ও সন্দেহমুক্ত থাকার উদ্দেশ্যে।
সবচেয়ে উত্তম করণীয় হলো—
১. পিতার সাথে সম্পর্ক সুন্দর রাখা।
২. জোরপূর্বক কিছু নিয়ে থাকলে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জন করা।
৩. সুদভিত্তিক লেনদেন থেকে নিজেকে বাঁচানো।
৪. সম্ভব হলে হালাল উপায়ে ঋণ দ্রুত পরিশোধে সাহায্য করা।
৫. আল্লাহর কাছে তওবা ও ইস্তিগফার করা।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَتُوبُوا إِلَى اللَّهِ جَمِيعًا أَيُّهَا الْمُؤْمِنُونَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ
হে মুমিনগণ! তোমরা সবাই আল্লাহর কাছে তওবা কর, যাতে তোমরা সফল হতে পারো। [সূরা নূর : ৩১]
উল্লেখ্য, এ ধরনের জটিল আর্থিক ও পারিবারিক বিষয়ে দলিলপত্রসহ কোনো নির্ভরযোগ্য মুফতির কাছে সরাসরি পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।