জিজ্ঞাসা–১৯৬০ : আসসালামুয়ালাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ। আমার স্বামীর কুরআন হাদীস সম্পর্কে কোনো জ্ঞান নেই, আমার সংসার জীবনে শুরু অনেক কষ্ট , আমার একটি ছেলে একটি মেয়ে, আমার স্বামী খুব কৃপণতা করে ছেলে-মেয়েকে কোনো টাকা পয়সা দিতে চায়না। একেবারে কোনো কিছুই সে দেয়না। আমি নিজে অনেক কষ্ট করে তাদের চাহিদা পূরণ করি, তবে সব না দিতে পারলেও কিছুটা দিতে পারি, আর ছেলে মেয়ের কোনো খরচের টাকা বা আমার কোনো খরচের টাকা চাই সে দেয়না, আরো অনেক কথা শোনায়, খারাপ ভাষায় গালিগালাজ করে, খুব খারাপ আচরণ করে। তার সংসারে আমিও অনেক রোজগার করে দিয়েছি, আর এখন আমার ছেলে রোজগার করে। আমার ছেলের সব টাকা নিয়ে নেয়, এক টাকাও দেয়না, আর আমার ছেলের সাথে অমানবিক নির্যাতন করে, খারাপ আচরণ করে। এমতাবস্থায় আমার করণীয় কি? আমি কি সংসার থেকে আমার স্বামীর অজান্তে কোনো অর্থ আমার বা আমার ছেলে মেয়ের জন্য খরচ করতে পারবো? কুরআন-হাদীস মতে এর সমাধান দিলে খুব উপকৃত হতাম।—বানেছা বেগম।
জবাব : وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
এক. প্রিয় বোন, আপনার বর্ণনা অনুযায়ী, সমস্যা শুধু স্বামীর কৃপণতা নয়; বরং স্ত্রী ও সন্তানের ভরণপোষণ না দেওয়া, গালিগালাজ করা এবং সন্তানের ওপর অমানবিক আচরণ করার অভিযোগও রয়েছে। যদি বাস্তবতা এমনই হয়, তাহলে শরিয়তের দৃষ্টিতে স্বামী তার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হচ্ছেন।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَعَلَى الْمَوْلُودِ لَهُ رِزْقُهُنَّ وَكِسْوَتُهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ
সন্তানের পিতার ওপর তাদের (মা ও সন্তানের) ভরণপোষণ ও পোশাকের দায়িত্ব রয়েছে, প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী। [সূরা আল-বাকারা : ২৩৩]
আর আল্লাহ তাআলা বলেন,
لِيُنْفِقْ ذُو سَعَةٍ مِنْ سَعَتِهِ
সচ্ছল ব্যক্তি যেন তার সচ্ছলতা অনুযায়ী ব্যয় করে। [সূরা আত-তালাক : ৭]
অতএব, স্ত্রী ও অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের প্রয়োজনীয় খরচ বহন করা স্বামীর দায়িত্ব।
দুই. এ বিষয়ে একটি বিখ্যাত হাদিস রয়েছে। হিন্দ বিনতে উতবা রাসূল ﷺ-কে বললেন, আবু সুফিয়ান একজন কৃপণ ব্যক্তি। তিনি আমাকে ও আমার সন্তানকে প্রয়োজনমতো খরচ দেন না। আমি কি তার অজান্তে তার সম্পদ থেকে নিতে পারি?
রাসূল ﷺ উত্তরে বললেন,
خُذي ما يَكفيكِ وولدَكِ بالمعروفِ
তুমি তোমার ও তোমার সন্তানের প্রয়োজনমতো (ন্যায্য পরিমাণ) নিয়ে নাও। [সহীহ বুখারী : ৩৮২৫]
এই হাদিসের ভিত্তিতে ফুকাহায়ে কেরাম বলেছেন, যদি স্বামী সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও স্ত্রীর ও সন্তানের আবশ্যক খরচ না দেন, তাহলে স্ত্রী প্রয়োজনীয় পরিমাণ অর্থ স্বামীর অজান্তে নিতে পারবেন। তবে শর্ত হলো—
- শুধু প্রকৃত প্রয়োজনের পরিমাণ নেবেন।
- অপচয় বা অতিরিক্ত নেবেন না।
- প্রতিশোধ বা শাস্তি দেওয়ার উদ্দেশ্যে নেবেন না।
- নিশ্চিত হতে হবে যে স্বামী সত্যিই প্রাপ্য খরচ দিচ্ছেন না।
তিন. আর আপনার ছেলে যদি প্রাপ্তবয়স্ক ও উপার্জনক্ষম হয়, তাহলে তার উপার্জনের মালিক মূলত সে নিজেই। শরিয়তের দৃষ্টিতে ছেলের উপার্জন স্বয়ংক্রিয়ভাবে পিতার সম্পত্তি হয়ে যায় না। তবে সন্তানের উচিত পিতামাতার খেদমত ও সহযোগিতা করা। কিন্তু জোরপূর্বক সব আয় নিয়ে নেওয়া এবং তাকে প্রয়োজনীয় ব্যয় থেকেও বঞ্চিত করা গ্রহণযোগ্য নয়।
চার. আপনার করণীয়—
- ধৈর্য ও হিকমতের সঙ্গে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করা।
- পরিবারের মুরব্বি, দায়িত্বশীল আত্মীয় বা কোনো বিজ্ঞ আলেমের মাধ্যমে স্বামীকে বোঝানোর ব্যবস্থা করা।
- নিজের ও সন্তানের প্রয়োজনীয় খরচ যদি সত্যিই না দেওয়া হয়, তাহলে হাদিসে বর্ণিত সীমার মধ্যে প্রয়োজনীয় অর্থ গ্রহণ করা।
-
যদি নির্যাতন, গালিগালাজ ও অধিকারহরণ অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছে যায়, তাহলে স্থানীয় আলেম, দারুল ইফতা বা পারিবারিক সালিশের শরণাপন্ন হওয়া।