ওয়াকফ সম্পর্কে কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর

জিজ্ঞাসা–৪৬৮: জনাব , এক ব্যক্তি মসজিদের জন্য একটি জায়গা ওয়াকফ করেন এবং ওয়াকফ করার সময় মসজিদ কর্তৃপক্ষকে বলেন, আমি ইন্তেকাল করলে আমাকে মসজিদের ওয়াকফকৃত জায়গাতেই কবর দিবেন। তিনি 10 থেকে 12 বছর আগে ইন্তিকাল করলে মসজিদ কর্তৃপক্ষ মসজিদের ওয়াকফকৃত জায়গাতেই উনাকে কবর দেয়। বর্তমানে কবরের এই জায়গাটা ছাড়া মাসজিদের আর কোন জায়গা না থাকায় কমিটিগণ ইমাম মুয়াজ্জিন এর জন্য কবরের উপর ছাদ দিয়ে ছাদের উপর থেকে কামরা/ঘর নির্মাণ করতে চাচ্ছে। মৃত ওয়াকফকারীর ছেলে এবং তার স্ত্রী কবরস্থ হতে যাচ্ছে ওই মসজিদের ওয়াক্ফকৃত স্থানে যেখানে ওনাকে কবর দেওয়া হয়েছে। মসজিদ কর্তৃপক্ষ বলছে তোমরা যদি মসজিদের ওয়াকফকৃত জায়গায় কবরস্থ হতে চাও তাহলে 3 লক্ষ টাকা দিতে হবে। তারা টাকা দিতে রাজি হয়। এখন আমার জানার বিষয় হল-

ক) ওয়াকফকারী যে জায়গা মসজিদের জন্য ওয়াকফ করেছেন সেখানে ওনার কথা মোতাবেক উনাকে কবর কবর দেওয়া জায়েজ হয়েছে কি?

খ) মসজিদের জন্য ওয়াকফকৃত জায়গা কবরের জন্য ব্যবহার করা জায়েয হবে কি?

গ) ওয়াকফ করার সময় যে শর্ত করেছেন সেটা সঠিক হয়েছে কি?

ঘ) কবরের উপর ছাদ দিয়ে ছাদের উপর থেকে ঘর অথবা কামরা নির্মাণ করা জায়েজ হবে কি?

ঙ) টাকার (তিন লক্ষ) বিনিময়ে মসজিদের ওয়াকফকৃত জায়গায় কবরস্থ হওয়া অথবা কাউকে কবর দেওয়া জায়েজ হবে কি? এই টাকা মসজিদের উন্নয়নের জন্য ব্যবহার করা যাবে কি?

চ) মৃত ওয়াকফকারীর বংশধর অর্থাৎ তার ছেলে এবং স্ত্রী ওনার সাথে মসজিদের ওয়াক্ফকৃত জায়গায় কবরস্থ হতে পারবে কি ? কুরআন সুন্নাহর আলোকে জানিয়ে বাধিত করবেন।–মাওলানা সৈয়দ আহমাদ মাহবুব আল মাদানি। মুহতামিম, চৌবেপুর শামসুল উলুম মাদ্রাসা ,কসবা, বি-বাড়িয়া।

জবাব: মুহতারাম, নিম্নে আপনার প্রশ্নগুলোর উত্তর দেয়া হল-

ক, গ, চ- ওয়াকফ মূলগতভাবে সদকারই একটি প্রকার। যার কারণে ওয়াকফ করার পর তাতে আর ওয়াকফকারীর মালিকানা বহাল থাকে না। সুতরাং মসজিদের জন্য ওয়াকফকৃত জায়গা মসজিদের। এখন তা ব্যবহার করতে হবে মসজিদের জন্যই। সেখানে ওয়াকফকারীকে, ওয়াকফকারীর কোনো ওয়ারিসক কিংবা অন্য কোনো ব্যক্তিকে কবর দেয়া জায়েয হবে না। যদি ওয়াকফকারী মসজিদের জন্য ওয়াকফকৃত জায়গায় নিজের কবর দেয়ার শর্ত দিয়ে থাকেন, তাহলে তার এই শর্ত বাতিল। এই শর্ত মোতাবেক তাকে সেখানে কবর দেয়া জায়েয হয় নি।

شرائط الواقف معتبرة إذا لم تخالف الشرع

ওয়াকফকারীর শর্ত যদি শরিয়ত পরিপন্থী না হয় তাহলেই তা গ্রহণযোগ্য হবে; (অন্যথায় নয়)। (রদ্দুল মুহতার ৬/৫২৬)

অতএব, যেখানে ওয়াকফকারীকে কবর দেয়া হয়ে গেছে, যদি একান্ত কোনো কারণে মসজিদের জন্য জায়গাটির প্রয়োজন হয় তাহলে কবরটি পুরনো হয়ে গেলে সেখানে মাটির নিচে পুঁতে রেখে সমান করার মাধ্যমে কবর মিটিয়ে দিয়ে উপরে মসজিদ নির্মাণ করা যাবে। এ ক্ষেত্রে ওয়ারিসগণের আপত্তি গ্রহণযোগ্য হবে না। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া ৬/৯৫; কিতাবুন নাওয়াযিল ১৩/৮৩)

খ- আগেই বলা হয়েছে, মসজিদের জন্য ওয়াক্ফকৃত জায়গা অন্যদের কবরের জন্য ব্যবহার করা জায়েয হবে না। কেননা, ওয়াকফ যে উদ্দেশ্যে করা হয়, সেই উদ্দেশ্যেই ব্যবহার করতে হয়। আর প্রশ্নের বিবরণ থেকে বুঝা যায়, ওয়াকফ করা হয়েছে মসজিদের জন্য; কবরের জন্য নয়। সুতরাং মসজিদের জন্য ওয়াক্ফকৃত জায়গা কবরের জন্য ব্যবহার করা জায়েয হবে না। (আলআশবাহ ওয়ান নাযায়ের ২/২২৮; আলমুগনী, ইবনে কুদামা ৮/২৩৬)

আল্লামা ইবন আবেদীন রহ. বলেন,

لا يجوز صرف وقف مسجد خرب إلى حوض وعكسه. وفي شرح الملتقى يصرف وقفها لأقرب مجانس لها

বিরান মসজিদের ওয়াক্ফ কোন হাউজে খরচ করা যাবে না। অনুরূপভাবে হাউজের ওয়াকফ মসজিদে খরচ করা যাবে না। (তবে) খাত বিলুপ্ত ওয়াকফকে সমশ্রেণীর কোন খাতে ব্যয় করা হবে। (রদ্দুল মুহতার ৬/৫৫১)

ঘ-কবরের উপর ছাদ দিয়ে ছাদের উপর থেকে ঘর অথবা কামরা নির্মাণ করা  যাবে না। কেননা, কবরের উপর ঘর তৈরি করে বসবাস করা নাজায়েয ও নিন্দনীয় কাজ। এমনকি কবরের উপর বসাও অত্যন্ত গর্হিত কাজ। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,

 لا تُصَلُّوا إِلَى الْقُبُورِ وَلا تَجْلِسُوا عَلَيْهَا

তোমরা কবরের দিকে মুখ করে নামায পড়বে না এবং কবরের উপর বসবে না।  (মুসলিম ২১২২)

ইবনু তাইমিয়াহ রহ. বলেন,  ফকীহগণ এ বিষয়ে একমত যে, কবরের উপর মসজিদ, বাড়ি-ঘর ইত্যাদি করা যাবে না। কেননা রাসূলুল্লাহ ﷺ এ ব্যাপারে নিষেধ করে গিয়েছেন। (মাজমূ‘ ফাতাওয়া ২২/১৯৪-৯৫ )

ঙ) টাকার বিনিময়েও মসজিদের ওয়াকফকৃত জায়গায় কবর দেয়া এবং সে টাকা মসজিদের কাজে ব্যবহার করা জায়েয হবে না। কেননা, এটা ওয়াকফ পরিপন্থী কাজ হবে। হাদিস শরিফে এসেছে, উমর রাযি. একটি খেজুর বাগান ওয়াকফ করতে চাইলে রাসূলুল্লাহ তাকে বলেছিলেন, তুমি মূল সম্পত্তিটি এভাবে সদকা (ওয়াকফ) কর যে,لاَ يُبَاعُ وَلاَ يُوهَبُ وَلاَ يُورَثُ، وَلَكِنْ يُنْفَقُ ثَمَرُهُ তা বিক্রি করা যাবে না, কাউকে দান করা যাবে না এবং এতে উত্তরাধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে না। এর থেকে উৎপন্ন ফলফলাদি (নির্ধারিত খাতে) ব্যয় হবে। এরপর উমর রাযি. তা ঐভাবে সদকা (ওয়াকফ) করেছিলেন। (সহীহ বুখারী ২৭২৪)

والله اعلم بالصواب

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

3 + eight =