গোপন গুনাহর চিকিৎসা (পর্ব-০৪)

দুই. নির্জন অবস্থান

প্রিয় উপস্থিতি, ব্যভিচারের দ্বিতীয় কারণ হল, নির্জন অবস্থান। কারণ, নির্জনতার সুযোগ নিয়ে শয়তান নানা ধরণের চিন্তা মাথায় ঢুকিয়ে দিয়ে থাকে। হ্যাঁ, ইবাদতের উদ্দেশ্যে নির্জনতা অবলম্বনে অসুবিধা নেই। কিন্তু বিনা কাজে নির্জনতা অবলম্বন মানে শয়তানকে সুযোগ করে দেয়া। এজন্য আমাদের মাশায়েখগণ বিশেষত যুবকদেরকে উপদেশ দিয়ে থাকেন, তোমরা নির্জনে অবস্থান করবে না। এমনকি তাঁরা বলে থাকেন, অবিবাহিতরা বাথরুমেও বেশি সময় কাটাবে না। গাইরে মাহরাম কারো সঙ্গে নির্জনে সময় অতিবাহিত করবে না। গাইরে মাহরামের সঙ্গে একাকী সফর করবে না।

পরিতাপের বিষয় হল, অথচ এ ব্যাপারে এমনকি দীনদার ফ্যামিলিতেও শীথিলতা দেখা দেয়। বিশেষত দেবর-ভাবী, শালী-দুলাভাই এবং কাজিনদের ক্ষেত্রে। দেবরের সঙ্গে বাবার বাড়িতে যাওয়া, ডাক্তারের কাছে যাওয়া, দুলা ভাইয়ের সঙ্গে ঘুরতে বের হওয়া, বাড়ির কাজের লোক বা মহিলা রেখে স্ত্রী স্বামীকে রেখে স্বামী স্ত্রীকে রেখে বাইরে চলে যাওয়া, টিউটর ও ছাত্রীর একান্তে নির্জনবাস ও পড়াশোনা– এসব তো এখন সাধারণ ব্যাপার হয়ে গেছে। যার কারণে এদের মাঝেই বিপর্যয় বেশি ঘটে। অথচ রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,

‏ لاَ يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةٍ إِلاَّ كَانَ ثَالِثَهُمَا الشَّيْطَانُ

কোনো পুরুষ যখন কোন স্ত্রীলোকের সঙ্গে নির্জনে সাক্ষাৎ করে তখন এদের সঙ্গে অবশ্যই তৃতীয় জন থাকে শয়তান। (তিরমিযী ১১৭২)

এ রোগের চিকিৎসা

নির্জনতার মুহূর্তে ব্যভিচারের চিন্তা আসলে তার চিকিৎসা কী? আসলে ইতিপূর্বে যে  চিকিৎসাগুলোর কথা বলা হয়েছে, সেগুলো এখানেও প্রযোজ্য। তবুও আমাদের মাশায়েখগণ এজাতীয় রোগের আরো কিছু চিকিৎসার কথা বলেছেন। সেখান থেকে আরো তিনটি বলে দিচ্ছি। আল্লাহ বক্তা-শ্রোতা সকলকে আমল করার তাওফিক দান করুন। আমীন।

১. চিন্তা করুন

আল্লাহ তাআলা বলেন,

اَلَمْ يَأْنِ لِلَّذِيْنَ آمَنُوْا اَنْ تَخْشَعَ قُلُوْبُهُمْ لِذِكْرِ اللهِ وَمَا نَزَلَ مِنَ الْحَقِّ

‘যারা ঈমান আনে তাদের হৃদয় কি আল্লাহর স্মরণে ও যে সত্য অবতীর্ণ হয়েছে তাতে বিগলিত হওয়ার সময় কি আসে নি?’ (সূরা হাদীদ ১৬)

আমাদের শায়েখ ও মুর্শিদ মাহবুবুল ওলামা মাওলানা পীর যুলফিকার আহমদ নকশবন্দী মুজাদ্দেদী দা. বা. বলেন, নির্জনতার মুহূর্তে যখনই গুনাহ করতে মনে চাইবে তখনই সঙ্গে সঙ্গে আয়াতটির বিষয়বস্তু সম্পর্কে চিন্তা করবে। এরপর নিজেকে সম্বোধন করে বলবে, ‘ঈমানদারের কি এখনও আল্লাহকে ভয় করার সময় হয় নি?’ পাশাপাশি মনে মনে আল্লাহর কাছে সাহায্য কামনা করতে থাকো। এতে আল্লাহতাআলা নিজের ভয় তোমার অন্তরে তৈরি করে দিবেন এবং সত্যিকারের তাওবা আপনার নসিব হবে।

২. সময়ের মূল্য  দিন

শাইখুল ইসলাম মুফতি তাকী উসমানী দা. বা. বলেন, সময়কে গুনাহর মধ্য দিয়ে কাটানোর ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় কর। কখনও অবসর সময় কাটাবে না। যখনই নির্জনে থাকবে, অবসর থাকবে তখনই নিজেকে কোনো কাজে ব্যস্ত করে নিবে। কাজটি দুনিয়ার বৈধ কাজ হলেও অসুবিধা নেই। তবুও আল্লাহর নাফরমানির ভেতর সময় নষ্ট করো না। আর যদি কাজটি হয় ভাল বই পড়া, জিকির-মোরাকাবা করা, তেলাওয়াত করা তাহলে তো সবচে’ ভাল।  তিনি বলেন, আমাদের শায়েখ ও মুর্শিদ ডা. আব্দুল  হাই আরেফী রহ. বলতেন, ‘কাজের ভেতরে কাজ ঢুকিয়ে দাও। অবসর আছো তো কোনো কাজের প্রোগ্রাম করে নাও। হাতে একটি কাজ আছে তো আরেকটি কাজের প্রোগ্রাম বানিয়ে নাও।’

দেখুন, রাসূলুল্লাহ বলেছেন,

نِعْمَتَانِ مَغْبُونٌ فِيهِمَا كَثِيرٌ مِنَ النَّاسِ الصِّحَّةُ وَالْفَرَاغُ

দুটো নিয়ামত এমন যে দুটোর বিষয়ে বহু লোক ধোঁকায় নিপতিত- স্বাস্থ্য এবং অবসর। (তিরমিযী ২৩০৭)

অতএব, সময় নষ্ট করবেন না। জীবনের খণ্ড খণ্ড অংশগুলোর নামই তো সময়। সুতরাং সময় নষ্ট করা মানে জীবন নষ্ট করা। আল্লাহ আমাদেরকে আমল করার তাওফিক দিন। আমীন।

৩.পরিবেশ বেছে চলুন

এটাই সবচেয়ে বড় সতর্কতা যে, যেসব পরিবেশে ব্যভিচারের কল্পনা আসে, সেসব পরিবেশ থেকে দূরে থাকা। আমাদের শায়েখ বলেন, সবসময় মনে রাখবে, নারীরা আমাদের সাথে পর্দা করবে না, আমাদেরকেই তাদের সঙ্গে পর্দা করতে হবে। সুতরাং নিজের বাসায়ও ঢোকার সময় গলা খাঁকারি দিয়ে বা আওয়াজ করে ঢুকবেন। আল্লাহ তাআলার কাছে নিজের ঈমান বাঁচানোর বিনীত প্রার্থনা করবেন। । কবির ভাষায়-

ميں امتحان كے قابل نہيں مرے مولى

مجهے گناه كا موقع نصيب نہ كرنا

‘মাওলা আমার! আমি পরীক্ষার যোগ্য নই,

আমাকে গুনাহ করার সুযোগ দিবেন না।’

(চলবে)

আরো পড়ুন–