আত্মহত্যাকারী কি চিরকাল জাহান্নামে থাকবে?

জিজ্ঞাসা১৫২: হাদিসে এসেছে, আত্মহত্যাকারী চিরকাল জাহান্নামে থাকবে। কিন্ত এই চিরকাল মানে আসলে দীর্ঘকাল বোঝানো হয়েছে না চিরকাল বলতে চিরস্থায়ী সময়কে বোঝানো হয়েছে?  —Sharmin Hasan

জবাব:

এক. সন্দেহ নেই, আত্মহত্যা শিরকের কাছাকাছি কবিরা গোনাহ। তবে  কোরআন-হাদিসের শক্তিশালী দলিলের ভিত্তিতে আহলুসসুন্নাহ ওয়ালজামাতের কোন আলেম এটাকে শিরক কিংবা কুফরি বলেন নি। ”আল-মাউসুআ’তুল ফিকহিয়া”তে (৬/২৯১) এসেছে,   لم يقل بكفر المنتحر أحد من علماء المذاهب الأربعة অর্থাৎ চার মাজহাবের কোন ইমাম আত্মহত্যাকারীকে কাফির বলেন নি। আর আমরা জানি, কোন ঈমানদার ব্যক্তি যত বড় গোনাহই করুক না কেন; কিছুতেই চিরকালের জন্য জাহান্নামে যাবে না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

عن أنس عن النبي صلى الله عليه و سلم قال يخرج من النار من قال لا إله إلا الله وفي قلبه وزن شعيرة من خير ويخرج من النار من قال لا إله إلا الله وفي قلبه وزن برة من خير ويخرج من النار من قال لا إله إلا الله وفي قلبه وزن ذرة من خير

যে ব্যক্তি লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলবে আর তার অন্তরে একটি যব পরিমাণও নেকী থাকবে, তাকে জাহান্নাম থেকে বের করা হবে এবং যে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলবে আর তার অন্তরে একটি অণু পরিমাণও নেকী থাকবে তাকে জাহান্নাম থেকে বের করা হবে। (সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৪৪, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১২৫)

দুই. সুতরাং আত্মহত্যাকারীও চিরস্থায়ী জাহান্নামী হবে না। অতএব, হাদিসে যে আত্মহত্যাকে চিরকাল জাহান্নামে যাওয়ার কারণ হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে, তা ব্যাখ্যাসাপেক্ষ। যেমন হাদিসে এসেছে,

ﻣَﻦْ ﺗَﺮَﺩَّﻯ ﻣِﻦْ ﺟَﺒَﻞٍ ﻓَﻘَﺘَﻞَﻧَﻔْﺴَﻪُ ﻓَﻬْﻮَ ﻓِﻰ ﻧَﺎﺭِ ﺟَﻬَﻨَّﻢَ ﻳَﺘَﺮَﺩَّﻯ ﻓِﻴﻪِ ﺧَﺎﻟِﺪًﺍ ﻣُﺨَﻠَّﺪًﺍﻓِﻴﻬَﺎ ﺃَﺑَﺪًﺍ، ﻭَﻣَﻦْ ﺗَﺤَﺴَّﻰ ﺳَﻤًّﺎ ﻓَﻘَﺘَﻞَ ﻧَﻔْﺴَﻪُ ﻓَﺴَﻤُّﻪُ ﻓِﻰﻳَﺪِﻩِ ﻳَﺘَﺤَﺴَّﺎﻩُ ﻓِﻰ ﻧَﺎﺭِ ﺟَﻬَﻨَّﻢَ ﺧَﺎﻟِﺪًﺍ ﻣُﺨَﻠَّﺪًﺍ ﻓِﻴﻬَﺎ ﺃَﺑَﺪًﺍ،ﻭَﻣَﻦْ ﻗَﺘَﻞَ ﻧَﻔْﺴَﻪُ ﺑِﺤَﺪِﻳﺪَﺓٍ ﻓَﺤَﺪِﻳﺪَﺗُﻪُ ﻓِﻰ ﻳَﺪِﻩِ ﻳَﺠَﺄُ ﺑِﻬَﺎﻓِﻰ ﺑَﻄْﻨِﻪِ ﻓِﻰ ﻧَﺎﺭِ ﺟَﻬَﻨَّﻢَ ﺧَﺎﻟِﺪًﺍ ﻣُﺨَﻠَّﺪًﺍ ﻓِﻴﻬَﺎ ﺃَﺑَﺪًﺍ 

আবূ হুরাইরাহ রাযি. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,‘যে ব্যক্তি নিজেকে পাহাড়ের ওপর  আত্মহত্যা করবে, সে জাহান্নামে যাবে। সেখানে সর্বদা সে ওইভাবে নিজেকে নিক্ষেপ করতে থাকবে অনন্তকাল ধরে। যে ব্যক্তি বিষপান করে আত্মহত্যা করবে, সে তার বিষ তার হাতে থাকবে। জাহান্নামে সর্বদা সে ওইভাবে নিজেকে বিষ খাইয়ে মারতে থাকবে অনন্তকাল ধরে। যে কোনো ধারালো অস্ত্র দ্বারা আত্মহত্যা করেছে তার কাছে জাহান্নামে সে ধারালো অস্ত্র থাকবে যার দ্বারা সে সর্বদা নিজের পেটকে ফুঁড়তে থাকবে।(সহীহ বুখারী, হাদীস নং-৫৪৪২)

উক্ত হাদিসের ব্যাখ্যায় আহলুসসুন্নাহ ওয়ালজামাতের আলেমগণ বলেন,

১.ইবনে খুজাইমা রহ. বলেন, কোরআন-হাদিসে মুমিনদের ব্যাপারে যত প্রকার শাস্তির বিবরণ এসেছে সবগুলো শর্তসাপেক্ষে। আর তা এই যে, বর্ণিত শাস্তি আল্লাহ চাইলে মাফ হয়ে যাবে। যেমন আল্লাহ বলেছেন,

إِنَّ اللّهَ لاَ يَغْفِرُ أَن يُشْرَكَ بِهِ  وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَن يَشَاء

নিশ্চয় আল্লাহ তাকে ক্ষমা করেন না, যে তাঁর সাথে কাউকে শরীক করে। এছাড়া যাকে ইচ্ছা, ক্ষমা করেন। (সূরা নিসা-১১৬)

সুতরাং আলোচ্য হাদিসে বর্ণিত শাস্তিও আল্লাহ চাইলে কমিয়ে দিতে কিংবা মাফ করে দিতে পারেন। অন্যথায় আত্মহত্যাকারীর অপরাধটা এমনই যে, সে চিরকালের জন্য জাহান্নামে যাওয়ার উপযুক্ত। (কিতাবুত তাওহিদ ২/৮৬৯)

. আরবের পরিভাষায় خالدا مخلدا শব্দ, যার অনুবাদ করা হয়, ‘চিরকাল’। মূলত এর দ্বারা আরবের লোকেরা কখনো কখনো দীর্ঘস্থায়ী অবস্থাকে বুঝিয়ে থাকেন। উক্ত হাদীসেও উদ্দেশ্যও দীর্ঘস্থায়ী হওয়া। চিরস্থায়ী হওয়া নয়। (আজইবা মুফিদাহ, সুওয়াল নং ৩১১৭৪)

৩. হাদীসে যে বলা হয়েছে আত্মহত্যাকারী চিরদিন জাহান্নামে থাকবে, তা ওই ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে যে হালাল মনে করে আত্মহত্যা করেছে। কেননা আহলুসসুন্নাহ ওয়ালজামাতের নিকট যে কবিরা গোনাহকে বৈধ মনে করে সে কাফের হয়ে যাবে। আর কাফের তো চিরদিন জাহান্নামে থাকবে এতে কোন সন্দেহ নাই।(আদ্দুররুল মুখতার ২/১২৫)

والله اعلم بالصواب

১ টি মন্তব্য

মন্তব্য বন্ধ