ঈসালে সাওয়াবের বৈধ পদ্ধতি

জিজ্ঞাসা–১১৩: আসসালামুয়ালাইকুম। হুজুর, আমার বাবা আমাদের বংশের সকল মৃত মুরুব্বিদের জন্য মাদরাসায় খাবারের ব্যবস্থা করতে চাচ্ছেন। আমার প্রশ্ন হলো, এই ধরনের আয়োজন নবীজী (সাঃ) শিক্ষা দিয়েছেন কিনা বা এর মাধ্যমে আমাদের মুরুব্বিরা কতুটুকু সাহায্য পাবেন?–Tahsin : [email protected]

জবাব: ওয়ালাইকুমুসসালাম। প্রথমেই জেনে রাখতে হবে, 

(ক) মৃতব্যক্তির জন্য যা কিছু করা হবে তা মানুষকে দেখানোর উদ্দেশে নয়; বরং আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার নিয়তে করতে হবে।
(খ) মৃতব্যক্তির জন্য যা কিছু করা হবে তা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক অনুমোদিত হতে হবে। যদি অনুমোদিত না হয় তবে তা হবে প্রত্যাখ্যাত। তাতে কোন সওয়াবই হবে না। সওয়াব না হলে মৃতের কাছে পৌঁছার কিছু থাকে না।
প্রিয় প্রশ্নকারী ভাই, এখন দেখার বিষয় হল, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক মৃতব্যক্তির কল্যাণে কোন কিছু করার দিক-নির্দেশনা আছে কি-না? উত্তর : অবশ্যই আছে। যেমন, হাদীসে এসেছে—
১. সাহাবী আবু উসাইদ আস-সায়েদী রা. কর্তৃক বর্ণিত, তিনি বলেন,
 سأل رجل من بني سلمة فقال يارسول الله هل بقي من بر أبواي شيء أبرهما بعد موتهما، فقال نعم، الصلاة عليهما والاستغفار لهما وإنفاذ عهدهما بعد موتهما وصلة الرحم التي لا توصل إلا بهما وإكرام صديقهما.رواه أبو داود وابن ماجة
 বনুসালামা গোত্রের একব্যক্তি এসে জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রাসূল! আমার পিতা-মাতার মৃত্যুর পর এমন কোন কল্যাণমূলক কাজ আছে যা করলে পিতা-মাতার উপকার হবে? আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উত্তর দিলেন, হ্যাঁ, আছে। তাহল, তাদের উভয়ের জন্য আল্লাহর রহমত প্রার্থনা করা। উভয়ের মাগফিরাতের জন্য দুআ করা। তাদের কৃত ওয়াদা পূর্ণ করা। তাদের আত্মীয়-স্বজনদের সাথে সুসম্পর্ক রাখা ও তাদের বন্ধু-বান্ধবদের সম্মান করা।(আবু দাউদ ও ইবনে মাজা)
২.আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত,তিনি বলেন,
 أن رجلا أتى النبى صلى الله عليه وسلم، فقال يا رسول الله إن أمي افتلتت نفسها ولم توص وأظنها لو تكلمت تصدقت أفلها أجر إن تصدقت عنها؟ قال: نعم.رواه البخاري  و مسلم
 একব্যক্তি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করল যে, আমার মা হঠাৎ মৃত্যু বরণ করেছেন, কোন কিছু দান করে যেতে পারেননি। আমার মনে হয় যদি তি কথা বলতে পারতেন তবে কিছু সদকা করার নির্দেশ দিতেন। আমি যদি তার পক্ষে সদকা করি তাহলে তিনি কি তা দিয়ে উপকৃত হবেন? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন : হ্যাঁ।(বুখারী  ১৬৩১, মুসলিম ৩৫৯১)
৩. অপর হাদীসে এসেছে—
عن سعد بن عبادة رضي الله عنه أنه قال: يا رسول الله إن أم سعد ماتت فأي الصدقة أفضل؟  قال: الماء، فحفر بئرا  وقال : لأم سعد. رواه النسائي  وأحمد
সাহাবী সা’দ বিন উবাদাহ রা. থেকে বর্ণিত, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমার মা ইন্তেকাল করেছেন। কী ধরনের দান-সদকা তার জন্য বেশি উপকারী হবে? আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন: ‘পানির ব্যবস্থা কর।’ অত:পর তিনি (সা’দ) একটা পানির কূপ খনন করে তার মায়ের নামে (জনসাধারণের জন্য) উৎসর্গ করলেন।(নাসায়ী ও মুসনাদ আহমদ)
৪. হাদীসে আরো এসেছে,
عن ابن عباس رضي الله عنهما أن رجلا قال يا رسول الله إن أمه توفيت أفينفعها إن تصدقت عنها، قال نعم، قال فإن لي مخرفا فأشهدك أني قد قد تصدقت به عنها. رواه النسائي
ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত একব্যক্তি বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমার মা মৃত্যুবরণ করেছে। যদি আমি তার পক্ষে সদকা (দান) করি তাহলে এতে তার কোন উপকার হবে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, হ্যাঁ। এরপর লোকটি বলল, আপনাকে সাক্ষী রেখে বলছি আমি আমার একটি ফসলের ক্ষেত তার পক্ষ থেকে সদকাহ করে দিলাম।(নাসায়ী ৩৫৯৫)

এসব হাদীসের আলোকে ইমাম আবু হানিফা র. ইমাম মালেক র. ইমাম আহমদ র.সহ উম্মতের সংখ্যাগরিষ্ঠ ফকিহ বলে থাকেন, সকল প্রকার (নফল-মুসতাহাব) নেক আমল যা কুরআন ও হাদীসে নেক আমল বলে স্বীকৃত তার সকল কিছুই মৃতব্যক্তির জন্য নিবেদন করা যায়। তাঁরা বলে থাকেন, যে ব্যক্তি ইবাদত-বন্দেগী বা কোন নেক আমল করবে তার মালিক সে। সে যাকে ইচ্ছা তার উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করবে। উপরেল্লেখিত হাদীসসমূহে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে যে সকল নেক আমল সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছে, তিনি সে সকল সম্পর্কে অনুমতি দিয়েছেন, রোযা, হজ, সদকা ইত্যাদি। তাঁকে যদি অন্য নেক আমল যেমন-কুরআন তিলাওয়াত, জিকির, সালাত,মসজিদ-মাদরাসায় দান ইত্যাদি সম্পর্কে প্রশ্ন করা হত, তাহলে তিনি অনুমতি দিতেন এবং বলতেন : হ্যাঁ, এগুলো মৃতব্যক্তির উদ্দেশ্যে তোমরা করতে পার। (শরহুল-আকীদাহ আত-তাহাভীয়্যাহ ২/৬৭৩)

আর বলা বাহুল্য, মাদরাসার তালিবে ইলমদের জন্য কিতাব-পত্রের ব্যবস্থা করা, কোনো প্রকার অনুষ্ঠান ব্যতিরেকে তাদের জন্য দু’ একবেলা খাবারের ব্যবস্থা করা কিংবা অন্য কোনো উপায়ে তাদেরকে দ্বীন শেখার জন্য সহযোগিতা করা অবশ্যই অনুমোদিত নেক আমল। সুতরাং মৃতব্যক্তির কল্যাণে এধরনের নেক আমল বেদআতের পর্যায়ে পড়ে না; বরং এগুলোও ঈসালের সওয়াবের অনুমোদিত পদ্ধতি। এগুলোর মাধ্যমেও মৃতব্যক্তি উপকৃত হয়।

والله اعلم بالصواب
উত্তর দিয়েছেন
মাওলানা উমায়ের কোব্বাদী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

four × 2 =