এক সঙ্গে তিন তালাক দিলে কি এক তালাক হয়?

জিজ্ঞাসা–১১৬০: আস্সালামু আলাইকুম। জনাব, এক সাথে তিন তালাক দিলে কি এক তালাক পতিত হয় ? তখন কি তিন মাসের মধ্যে ফিরিয়ে আনা যায়?–এম এম রহমান।

জবাব: وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

এক. এক সাথে তিন তালাক দেয়া জঘন্য গুনাহ, তবে এর দ্বারা তিন তালাকই কার্যকর হয়। এক তালাক নয়। এর দলিল হল–

১. নাফে রহ. বলেন,

كَانَ ابْنُ عُمَرَ إِذَا سُئِلَ عَنِ الرَّجُلِ يُطَلِّقُ امْرَأَتَهُ وَهْىَ حَائِضٌ يَقُولُ أَمَّا أَنْتَ طَلَّقْتَهَا وَاحِدَةً أَوِ اثْنَتَيْنِ ‏.‏ إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ أَمَرَهُ أَنْ يَرْجِعَهَا ثُمَّ يُمْهِلَهَا حَتَّى تَحِيضَ حَيْضَةً أُخْرَى ثُمَّ يُمْهِلَهَا حَتَّى تَطْهُرَ ثُمَّ يُطَلِّقَهَا قَبْلَ أَنْ يَمَسَّهَا وَأَمَّا أَنْتَ طَلَّقْتَهَا ثَلاَثًا فَقَدْ عَصَيْتَ رَبَّكَ فِيمَا أَمَرَكَ بِهِ مِنْ طَلاَقِ امْرَأَتِكَ ‏.‏ وَبَانَتْ مِنْكَ ‏

যখন ইবনে ওমর রাযি. এর কাছে এক সাথে তিন তালাক দিলে ‎তিন তালাক পতিত হওয়া না হওয়া (রুজু’ করা যাবে কিনা) বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হয়,‎ তখন তিনি বলেন, যদি তুমি তাকে এক কিংবা দুই তালাক দিয়ে থাক, নিশ্চয়ই রাসুলুল্লাহ ﷺ তাকে হুকুম দিয়েছেন যে, সে তাকে রাজআত করে নিবে। তারপর আর একটি হায়েয (ঋতুমতী হওয়া) পর্যন্ত তাকে অবকাশ দিবে, এরপর পবিত্রতা (তুহুর) পর্যন্ত তাকে অবকাশ দিবে। অতঃপর স্পর্শ (সহবাস) করার আগেই তালাক দিবে (যদি ইচ্ছা কর)। আর যদি তুমি তাকে তিন তালাক দিয়ে থাক তবে তুমি তোমার প্রতিপালকের অবাধ্য হয়েছ- তোমার স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার ব্যাপারে তিনি তোমাকে যে আদেশ প্রদান করেছেন সে ব্যাপারে (অর্থাৎ তোমার জঘন্য গুনাহ হয়েছে)। আর সে স্ত্রী (তিন তালাকই কার্যকর হওয়ার কারণে) তোমার সঙ্গ হতে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন (বাইন) হয়ে গিয়েছে।  (সহিহ মুসলিম ৩৫২০)

২. এক দীর্ঘ হাদিসে এসেছে, সাহল ইবন সা’দ সাঈদী রাযি. বলেন যে, উওয়াইমির আজলানী রাযি. রাসূলুল্লাহ্ ﷺ- এর নিকট এসে জিজ্ঞেস করলেন যে, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আপনি ঐ ব্যক্তি সম্বন্ধে কী বলেন, যে তার স্ত্রীর সাথে অন্য কোন ব্যক্তিকে দেখতে পায়। সে কি তাকে হত্যা করবে, ফলে আপনারাও তাকে হত্যা করবেন অথবা সে কি করবে? তখন রাসূলুল্লাহ্ ﷺ বললেন, তোমার এবং তোমার স্ত্রীর ব্যাপারে ফয়সালা নাযিল হয়েছে। অতএব তুমি গিয়ে তাকে নিয়ে এসো। সাহল রাযি. বলেন, এরপর উভয়ে এসে লিআন’ করলো। আর তখন আমি অন্যান্য লোকের সাথে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর নিকট ছিলাম। যখন উওয়াইমির লি’আন শেষ করলেন। তখন তিনি বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! যদি আমি তাকে রাখি, তাহলে লোকেরা বলবে, আমি তার উপর মিথ্যা অপবাদ লাগিয়ে ছিলাম। এরপর রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর আদেশ করার পূর্বেই সে তাকে তিন তালাক দিয়ে দিল। (সহিহ বুখারী ৪৭৬৮)

অপর বর্ণনায় এসেছে,

طَلَّقَهَا ثَلَاثَ تَطْلِيقَاتٍ عِنْدَ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ ، فَأَنْفَذَهُ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ

এরপর উওয়াইমির রাযি. রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর উপস্থিতিতে তার স্ত্রীকে তিন তালাক প্রদান করলেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ তা কার্যকর করে দিলেন। (সুনানু আবী দাউদ ২২৫০)

৩. হারুন ইবনে আনতারা তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, তার পিতা বলেছেন, আমি একদিন আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি.-এর নিকট বসা ছিলাম। ইতিমধ্যে এক লোক এসে বলল, সে তার স্ত্রীকে এক বারেই একশো তালাক দিয়েছে। সে জানতে চাইল, এতে কি এক তালাক গণ্য হবে নাকি তিন তালাক গণ্য হবে? আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি. বললেন, তিন তালাক কার্যকর হয়ে তোমার স্ত্রী তোমার থেকে সম্পূর্ণরূপে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। আর বাকি সাতানব্বই তালাকের গুনাহ তোমার উপর বর্তাবে। (মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা আসার নং ১৮১০১)

এজন্যই বিখ্যাত ফকীহ ও মুহাদ্দিস আল্লামা ইবনুল হুমাম রহ. (মৃত.৬৮১হি.) আলোচ্য মাসআলাটি যে সাহাবাযুগ থেকেই অবিসংবাদিত তা উল্লেখ করার পর লিখেছেন- (তরজমা) ‘আর এ জন্যই যদি কোন (শরয়ী) আদালতের বিচারক এই সিদ্ধান্ত দেয় যে, এক সাথে তিন তালাক দিলে এক তালাক হয়, তাহলে তার ফায়সালা গ্রহণযোগ্য হবে না। কেননা বিষয়টিতে নতুন ইজতিহাদ ও সিদ্ধান্তের কোন সুযোগ নেই। সুতরাং নতুন কোন সিদ্ধান্ত দেয়া হলে তা শরীয়তসম্মত ‘মতপার্থক্য’ নয়; শরীয়ত গর্হিত ‘বিচ্ছিন্নতা’ হিসাবেই গণ্য হবে।’

দুই. তিন তালাক দেয়া যেহেতু একটি জঘন্য কাজ, তাই আল্লাহ তাআলা এর শাস্তি হিসেবে এই বিধান দিয়েছেন যে, তারা স্বামী-স্ত্রী হিসেবে পুনরায় একসাথে বসবাস করতে চাইলে স্ত্রীর ইদ্দত অতিবাহিত হওয়ার পর অন্যত্র তার বিয়ে হওয়া এবং সে স্বামীর সাথে তার মিলন হওয়া অপরিহার্য। এরপর কোনো কারণে সে তালাকপ্রাপ্তা হলে কিংবা স্বামীর মৃত্যু হলে ইদ্দত পালনের পর এরা দু’জন পরস্পর সম্মত হলে নতুন করে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারে।

 আল্লাহ তাআলা বলেন,

فَإِن طَلَّقَهَا فَلَا تَحِلُّ لَهُ مِن بَعْدُ حَتَّىٰ تَنكِحَ زَوْجًا غَيْرَهُ ۗ فَإِن طَلَّقَهَا فَلَا جُنَاحَ عَلَيْهِمَا أَن يَتَرَاجَعَا إِن ظَنَّا أَن يُقِيمَا حُدُودَ اللَّهِ ۗ وَتِلْكَ حُدُودُ اللَّهِ يُبَيِّنُهَا لِقَوْمٍ يَعْلَمُونَ

তারপর যদি সে স্ত্রীকে (তৃতীয়বার) তালাক দেয়া হয়, তবে সে স্ত্রী যে পর্যন্ত তাকে ছাড়া অপর কোন স্বামীর সাথে বিয়ে করে না নেবে, তার জন্য হালাল নয়। অতঃপর যদি দ্বিতীয় স্বামী তালাক দিয়ে দেয়, তাহলে তাদের উভয়ের জন্যই পরস্পরকে পুনরায় বিয়ে করাতে কোন পাপ নেই। যদি আল্লাহর হুকুম বজায় রাখার ইচ্ছা থাকে। আর এই হলো আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত সীমা; যারা উপলব্ধি করে তাদের জন্য এসব বর্ণনা করা হয়। (সূরা বাকারা-২৩০)

এ মর্মে হাদীস শরিফে এসেছে,

আম্মাজান আয়েশা রা. থেকে বরণিত, রাফায়ার স্ত্রী বলল, হে আল্লাহর রাসুল, আমার স্বামী রাফায়া আমাকে এক সাথে তিন তালাক দিয়েছে? এরপর আমি আব্দুর রাহমানের সাথে বিবাহ করেছি। এখন রাফায়ার কাছে যেতে পারবো কিনা? নবীজী বললেন, আবদুর রহমান তোমার সাথে সহবাস করলে এরপর রাফায়ার নিকট যেতে পারবে। (সহীহ বুখারী ৫২৬১)

والله اعلم بالصواب
উত্তর দিয়েছেন
শায়েখ উমায়ের কোব্বাদী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

two × three =