তারাবীর নামাযের রাকাত সংখ্যা কত?

জিজ্ঞাসা–৩৩৬: আসসালামু আলাইকুম। হুজুর, আপনাকে খুব মহব্বত করি। যখন থেকে আপনার সোহবত পেয়েছি, আপনার বয়ানের উপর আমল করার চেষ্টা করি। আমার প্রশ্ন হচ্ছে, এটিএন চ্যানেলে এক বক্তা বলেছেন, ‘তারাবীর নামাজ্য ফরজ নয়, ওয়াজিব নয়, সামান্য সুন্নত মাত্র। না পড়লে গুনাহ নেই।’ তার একথা কি ঠিক?  তিনি আরও বলেছেন, ‘২০ রাকাত তারাবীর কোনও দলিল নেই।’ তার একথা কি সত্য? হুজুর, আপনাকে মহব্বত করি, তাই আপনার কাছে জানতে চাই।– md billal hossain: [email protected]

জবাব: وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

এক. প্রিয় প্রশ্নকারী দীনি ভাই, আল্লাহ আপনার এই মহব্বত কবুল করুন এবং এই মহব্বত আমাদের পরস্পরের জন্য দুনিয়া ও আখেরাতে উপকারী করুন। আমীন।

প্রশ্নকারী দীনি ভাই, উক্ত বক্তার এজাতীয় বিভ্রান্তিমূলক ও অর্বাচীন বক্তব্য থেকে আল্লাহর কাছে উম্মতের জন্য পানাহ চাই। মূলতঃ তারাবী ২০ রাকাত। এটাই সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত। চার মাযহাবের ইমামগণ এ বিষয়ে একমত। সাহাবা-যুগ থেকে আজ পর্যন্ত হারামাইন শরীফাইনে এভাবেই তারাবী পড়া হয়েছে। বিশ রাকাতের কম কখনো পড়া হয় নি। বর্তমানে যারা তারাবীর নামায আট রাকাত বলে দাবি করে তারা কিছু ‘মুনকার’ রেওয়ায়েত দ্বারা দলিল দিয়ে থাকে, কিংবা তাহাজ্জুদের হাদীসকে তারাবীর ক্ষেত্রে প্রয়োগ করে থাকে।

‘২০ রাকাত তারাবীর কোনও দলিল নেই।’–উক্ত বক্তার এই বক্তব্য নিঃসন্দেহে অজ্ঞতাপ্রসূত কিংবা উদ্দেশ্য-প্রণোদিত। কেননা তারাবী ২০ রাকাত–এমর্মে বহু দলিল রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ এখানে আমরা সহিহ সনদে বর্ণিত হয়েছে এমন কিছু দলিল উল্লেখ করছি–

১. ইমাম বুখারীসহ সিহাহ সিত্তার সকল গ্রন্থকারের উস্তাদের ২৬ খন্ডে রচিত কিতাব ‘মুসান্নাফ ইবনে আবি শাইবাহ’( ২/১৬৪)-তে সহিহ সনদে এসেছে, আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, ﺃَﻥَّ ﺭَﺳُﻮﻝَ ﺍﻟﻠَّﻪِ ﻛَﺎﻥَ ﻳُﺼَﻠِّﻲ ﻓِﻲ ﺭَﻣَﻀَﺎﻥَ ﻋِﺸْﺮِﻳﻦَ ﺭَﻛْﻌَﺔً ﻭَﺍﻟْﻮِﺗْﺮَ  রাসূল রমযান মাসে বিশ রাকাআত তারাবী ও বিতির আদায় করতেন।

হাদিসটি এই হাদিসগ্রন্থগুলোতেও বর্ণিত হয়েছে– সুনানুল কোবরা লিল-বায়হাকী: ২/৬৯৮, আল-মুনতাখিব: ৬৫৩, আল-মু’জামুল কাবীর: ১১/৩৯৩, আল-মু’জামুল আওসাত: ১/২৪৩।

২. ইয়াজিদ বিন রূমান বলেন, كان الناس يقومون في زمان عمر بن الخطاب في رمضان بثلاث وعشرين ركعة লোকেরা (সাহাবী ও তাবেয়িগণ) ওমর রাযি. এর শাসনামলে বিশ রাকাত তারাবী এবং তিন রাকাত বিতির রমযান মাসে আদায় করতো। (মারিফাতুস সুনান ওয়াল আসার, হাদীস নং-১৪৪৩, মুয়াত্তা মালিক, হাদীস নং-৩৮০, সুনানে বায়হাকী কুবরা, হাদীস নং-৪৩৯৪)

৩. সায়েব বিন ইয়াজিদ বলেন, كـانوا يقـومـون عهد عمر بن الخطاب رضى الله عنه فى شهر رمضان بعشرين ركعة وكانوا يقومون بالمأتين وكانو يتوكؤن على عصيتهم فى عهد عثمان من شدة القيام  ওমর রাযি. এর শাসনামলে লোকেরা (সাহাবী ও তাবেয়িগণ) বিশ রাকাত তারাবী পড়তেন। আর উসমান রাযি. এর শাসনামলে লম্বা কেরাতের কারণে লাঠির উপর ভর দিতেন। (বায়হাকী-৪/২৯৬)

৪. আবু আব্দুর রহমান সুলামী বলেন, عن على قال دعى القراء فى رمضان فامر منهم رجلا يصلى بالناس عشرين ركعة قالوكان على يوتر بهم আলী রাযি. রমযান মাসে কারীদের ডাকতেন। তারপর তাদের মাঝে একজনকে বিশ রাকাত তারাবী পড়াতে হুকুম দিতেন। আর বিতিরের জামাত আলী রাযি. নিজেই পড়াতেন। (বায়হাকী-৪/৪৯৬)

প্রশ্নকারী দীনি ভাই, লক্ষণীয় বিষয় হল, ওমর রাযি. উসমান রাযি. ও আলী রাযি. এর শাসনামলে যে বিশ রাকাত তারাবী হত; সেখানে মুসল্লি কারা ছিলেন? নিশ্চয় মুহাজির, আনসার ও বদরী সাহাবাসহ বিপুল সংখ্যক সাহাবী এবং তাবিঈ তখন মুসল্লী ছিলেন। কেননা, দারুল খিলাফায় মসজিদে নববীতে বিপুল সংখ্যক সাহাবীর উপস্থিতিতে এটি হয়েছে। তখন কেউ কোনো দিন আপত্তি করেছেন বলে একটা দুর্বল বর্ণনাও কেউ দেখাতে পারবে না! উপরন্তু রাসুলুল্লাহ বলেছেন, عليكم بسنتى وسنة الخلفـاءالمهـدين الراشـديـن عضوا عليها بالنواجذ ‘তোমরা আমার সুন্নতকে এবং সৎপথ প্রাপ্ত খুলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নতকে মজবুত ভাবে আঁকড়ে ধর। তার উপর তোমরা অটুট থাক। (সুনানে আবু দাউদ ৪৬০৭, সুনানে তিরমিযি ২৬৭৬)

অতএব প্রশ্নকারী ভাই, আপনি তারাবীর নামাজ ২০ রাকাত হওয়ার ব্যাপারে বিভ্রান্ত হবেন না। কারণ মুসলিম উম্মাহ প্রজন্মের পর প্রজন্ম তারাবীর নামাজ ২০ রাকাত পালন করেছেন। ১২৮৪ হিজরীর ইংরেজ আমলের আগে পৃথিবীর কোন মসজিদে রমযানের পুরো মাস মসজিদে আট রাকাত তারাবী জামাতের সাথে পড়ার কোন নজীর নেই। একটি মসজিদের নাম এজাতীয় বক্তারা বা কোন কথিত আহলে হাদীস দেখাতে পারবে না। না মসজিদে নববীতে কোনদিন আট রাকাত তারাবী পড়া হয়েছে। না বাইতুল্লায়। না পৃথিবীর কোন মুসলিম পল্লিতে। মূলতঃ রানী ভিক্টোরিয়ার আমলে সর্বপ্রথম এ বিদআতের সূচনা হয়।

দুই. তারাবী সুন্নতে মুআক্কাদা। কেননা, রাসূলে করীম তারাবী সম্পর্কে বলেছেন, كتب الله عليكم صيامه وسننت لكم فيه قيامه আল্লাহ তাআলা এই মাসের রোযা তোমাদের উপর ফরয করেছেন এবং এই মাসে রাত জেগে নামায পড়াকে সুন্নত করেছি। (নাসাঈ ২২১০)

এজন্য ইমাম নববী বলেন, صلاة التراويح سنة بإجماع العلماء আলেমগণের ইজমা অনুযায়ী তারাবীর সালাত পড়া সুন্নত। (আলমাজমূ ৪/৩১)

মনে রাখবেন, সুন্নতে মুআক্কাদা ওয়াজিবের মতই। অর্থাৎ ওয়াজিবের ব্যাপারে যেমন জবাবদিহী করতে হবে, তেমনি সুন্নতে মুআক্কাদার ক্ষেত্রে জবাবদিহী করতে হবে। তবে ওয়াজিব তরককারীর জন্য সুনিশ্চিত শাস্তি পেতে হবে, আর সুন্নতে মুআক্কাদা ছেড়ে দিলে কখনো মাফ পেয়েও যেতে পারে। তবে শাস্তিও পেতে পারে।

সুতরাং প্রশ্নকারী ভাই, উক্ত বক্তার কথায় বিভ্রান্ত না হয়ে বরং সহিহ হাদিস এবং উলামায়ে সালাফের তরিকা মতে রমযানে তারাবীর প্রতি গুরুত্ব দিন এবং পূর্ণ বিশ রাকাআত পড়ুন।

والله اعلم بالصواب
উত্তর দিয়েছেন
মাওলানা উমায়ের কোব্বাদী