ব্যভিচার থেকে ত‌ওবা করার পরেও কি পবিত্র জীবনসঙ্গী পাওয়া যাবে না?

জিজ্ঞাসা–৫১৭:সূরা আন নূর ২৬ আয়াত অনুযায়ী খারাপ মানুষ কিভাবে খারাপ লাইফ পার্টনার পাবে।  ত‌ওবা করলেও কি পাবে?– Abdul Ali Roni

জবাব:

এক- সূরা নূরের ২৬ নং আয়াতে আল্লাহ বলেছেন,

الْخَبِيثَاتُ لِلْخَبِيثِينَ وَالْخَبِيثُونَ لِلْخَبِيثَاتِ ۖ وَالطَّيِّبَاتُ لِلطَّيِّبِينَ وَالطَّيِّبُونَ لِلطَّيِّبَاتِ ۚ أُولَٰئِكَ مُبَرَّءُونَ مِمَّا يَقُولُونَ ۖ لَهُم مَّغْفِرَةٌ وَرِزْقٌ كَرِيمٌ
দুশ্চরিত্রা নারীকূল দুশ্চরিত্র পুরুষকুলের জন্যে এবং দুশ্চরিত্র পুরুষকুল দুশ্চরিত্রা নারীকুলের জন্যে। সচ্চরিত্রা নারীকুল সচ্চরিত্র পুরুষকুলের জন্যে এবং সচ্চরিত্র পুরুষকুল সচ্চরিত্রা নারীকুলের জন্যে। তাদের সম্পর্কে লোকে যা বলে, তার সাথে তারা সম্পর্কহীন। তাদের জন্যে আছে ক্ষমা ও সম্মানজনক জীবিকা।
উক্ত আয়াতের তাফসিরে মুফতি শফি উসমানী লিখেন,
এ আয়াতে একটি নীতিগত কথা বুঝানো হয়েছে। আল্লাহ্‌ তা‘আলা মানবচরিত্রে স্বাভাবিকভাবে যোগসূত্র রেখেছেন। দুশ্চরিত্রা, ব্যভিচারিণী নারী ব্যভিচারী পুরুষের প্রতি এবং দুশ্চরিত্র ও ব্যভিচারী পুরুষ দুশ্চরিত্রা নারীদের প্রতি আকৃষ্ট হয়। এমনিভাবে সচ্চরিত্রা নারীদের আগ্রহ সচ্চরিত্র পুরুষদের প্রতি এবং সচ্চরিত্র পুরুষদের আগ্রহ সচ্চরিত্রা নারীদের প্রতি হয়ে থাকে। প্রত্যেকেই নিজ নিজ আগ্রহ অনুযায়ী জীবনসঙ্গী খোঁজ করে নেয় এবং আল্লাহ্‌র বিধান অনুযায়ী সে সেরূপই পায়। (সংক্ষিপ্ত মাআরিফুল কুরআন ৯৩৫)
ইবন কাসীর লিখেন,
ما كان الله ليجعل عائشة زوجة لرسول الله صلى الله عليه وسلم إلا وهي طيبة ؛ لأنه أطيب من كل طيب من البشر ، ولو كانت خبيثة لما صلحت له ، لا شرعاً ولا قَدَراً ؛ ولهذا قال : ( أُولَئِكَ مُبَرَّءُونَ مِمَّا يَقُولُونَ ) أي : هم بُعَداء عما يقوله أهل الإفك والعدوان
রাসুলুল্লাহ -এর স্ত্রী আয়েশা রাযি.-কে আল্লাহ অবশ্যই পবিত্র বানিয়েছেন। কেননা, রাসুলুল্লাহ ছিলেন সকল মানুষের মধ্য হতে সবচেয়ে পবিত্র। সুতরাং যদি আয়েশা রাযি. দুশ্চরিত্রা হতেন তাহলে তিনি শরিয়ত ও নীতিগত বিচারে রাসুলুল্লাহ -এর উপযুক্ত হতেন না। এজন্যই আয়াতের শেষাংশে বলা হয়েছে, তাদের সম্পর্কে লোকে যা বলে, তার সাথে তারা সম্পর্কহীন। অর্থাৎ,অপবাদদাতারা যা বলে তার সাথে তাদের কোন সম্পর্ক নেই। (তাফসিরে ইবন কাসীর ৬/৩৫)
ইমাম তাবারী লিখেন,
  عنى بالخبيثات : الخبيثات من القول ، وذلك قبيحه وسيئه ، للخبيثين من الرجال والنساء ، والخبيثون من الناس للخبيثات من القول ، هم بها أولى ؛ لأنهم أهلها ، والطيبات من القول ، وذلك حسنه وجميله ، للطيبين من الناس ، والطيبون من الناس للطيبات من القول ; لأنهم أهلها وأحقّ بها
অর্থাৎ, অপবিত্র কথাবার্তা অপবিত্র পুরুষদের জন্য; অপবিত্র পুরুষ অপবিত্র কথাবার্তার জন্য এবং পবিত্র কথাবার্তা পবিত্র পুরুষদের জন্য; পবিত্র পুরুষ পবিত্র কথাবার্তার জন্য। উদ্দেশ্য হল, অপবিত্র ও নোংরা কথাবার্তা সেই নরনারী বলে থাকে, যারা অপবিত্র ও নোংরা। আর পবিত্র ও উত্তম কথাবার্তা বলা পবিত্র ও উত্তম নর-নারীর অভ্যাস। (তাফসিরে তাবারী ১৯/১৪৪)
এতে ইঙ্গিত রয়েছে যে, হযরত আয়েশা রাযি. -এর প্রতি অপবিত্রতা আরোপকারী নিজেই অপবিত্র এবং তাঁকে পবিত্রাজ্ঞানকারী পবিত্র মানুষ।
এরপর তিনি লিখেন,
ويكون معنى الآية : الأفعال الخبيثات للخبيثين من الرجال ، وكذا الخبيثون من الناس للخبيثات من الأفعال ، وكذا الأفعال الطيبات للطيبين من الناس ، والطيبون من الناس للطيبات من الأفعال
আয়াতটির অর্থ, এও হতে পারে যে, খারাপ কাজ  খারাপ লোকদের জন্য  অনুরূপভাবে খারাপ কাজের জন্য খারাপ লোক  এবং ভালো কাজ ভালো লোকদের জন্য অনুরূপভাবে ভাল কাজের জন্য ভাল লোক  শোভনীয়। (প্রাগুক্ত)
এতে ইঙ্গিত রয়েছে যে, হযরত আয়েশা রাযি. -এর প্রতি যারা অপবাদ দিয়েছে, তারা ভাল লোক হতে পারে না। কেননা, ভালো লোকেরা খারাপ কাজের অপবাদ বহন থেকে পবিত্র। এজন্য আয়াতের শেষাংশে বলা হয়েছে, তাদের সম্পর্কে লোকে যা বলে, তার সাথে তারা সম্পর্কহীন। তাদের জন্যে আছে ক্ষমা ও সম্মানজনক জীবিকা।
দুই- আয়াতের উক্ত তাফসির থেকে বোঝা গেল, আয়াতটি নাযিল হয়েছে, আয়েশা রাযি. -এর প্রতি মুনাফিকদের অপবাদের ঘটনাকে (ইফক) কেন্দ্র করে এবং আয়াতটিতে মানবচরিত্রের একটি স্বাভাবিক রুচিবোধের কথা বলা হয়েছে যে, প্রত্যেকেই নিজ নিজ আগ্রহ এবং রুচিবোধ অনুসারে জীবন সঙ্গী খোঁজ করে নেয়। সেজন্যই তো প্রবাদে বলা হয় ‘যেইছা কু তেইছা মিলে’ অর্থাৎ, যেমনের তেমন মিলে। আল্লাহও তাই বলেন, দুশ্চরিত্রা নারীকূল দুশ্চরিত্র পুরুষকুলের জন্যে এবং দুশ্চরিত্র পুরুষকুল দুশ্চরিত্রা নারীকুলের জন্যে। সচ্চরিত্রা নারীকুল সচ্চরিত্র পুরুষকুলের জন্যে এবং সচ্চরিত্র পুরুষকুল সচ্চরিত্রা নারীকুলের জন্যে।
আয়াতটিতে এটা বলা হয় নি যে, কারো পক্ষ থেকে উক্ত নৈতিক অপরাধ সংঘটিত হয়ে যাওয়ার পর যদি সে লজ্জিত হয়ে আন্তরিকতার সঙ্গে তওবা করে, তাহলে চরিত্রবান জীবনসঙ্গী পাবে না। বরং অন্যত্র বলা হয়েছে, যদি ব্যভিচারী সত্যিকার অর্থে দৃঢ়চিত্তে তাওবা করে, তাহলে আল্লাহ তাআলা তার তাওবা কবুল করেন এবং তাকে ক্ষমা করে দেন। ব্যভিচারীর পরকালীন শাস্তির ওয়াদার কথা উল্লেখের পর আল্লাহ তাআলা বলেন,
إِلَّا مَن تَابَ وَآمَنَ وَعَمِلَ عَمَلًا صَالِحًا فَأُوْلَئِكَ يُبَدِّلُ اللَّهُ سَيِّئَاتِهِمْ حَسَنَاتٍ وَكَانَ اللَّهُ غَفُورًارَّحِيمًا
তবে যে তাওবা করে ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে। পরিণামে আল্লাহ তাদের পাপগুলোকে পুণ্য দ্বারা পরিবর্তন করে দেবেন। আল্লাহ অতীব ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।(সূরা আল ফুরকান ৭০)
والله اعلم بالصواب
উত্তর দিয়েছেন
শায়েখ উমায়ের কোব্বাদী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

seven − seven =