দেওবন্দ মাদরাসার নাম কেন দেওবন্দ মাদরাসা?

জিজ্ঞাসা–৬২১: দেওবন্দ মাদ্রাসার, দেওবন্দ নামকরণের ইতিহাস জানতে চাই। কেন  দেওবন্দ নাম রাখা হল? দয়া করে জানালে খুব উপকৃত হতাম। –সজীব আহমদ।

জবাব: দারুল উলুম দেওবন্দ। বর্তমান বিশ্বের অন্যতম নিখুঁত এরাবিক ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়, ইলমে হাদিস ও ইলমে তাফসিরের মাকবুল এবং অনন্য দরসগাহ। আউলিয়ায়ে কেরাম এবং মাশায়িখে হিন্দের প্রধান রুহানি দীক্ষাগার। হিন্দের স্বাধীনতা সংগ্রামের অগ্র সৈনিকদের একমাত্র অবস্থান কেন্দ্রই হল এই দারুল উলূম দেওবন্দ। যে বিদ্যাপীঠকে ‘আযহারে হিন্দ’ বলে আখ্যা দেয়া হয়। যার শাখা প্রশাখা আজ সাত সমুদ্র পাড়ি দিয়ে বিশ্বের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে আছে। আর সমগ্র বিশ্বের ইলম পিপাসুরা তার অথবা তার থেকে সৃষ্ট পেয়ালা থেকে তাদের ইলমের পিপাসা নিবারণ করছে। এই বিশ্ব বিখ্যাত ইসলামি বিদ্যাপীঠ ভারতের উত্তর প্রদেশের সাহারানপুর জেলার দেওবন্দ নামক স্থানে অবস্থিত।  এজন্য একে ‘দেওবন্দ মাদরাসা’ও বলা হয়। অন্যথায় এর প্রকৃত নাম ‘দারুল উলুম দেওবন্দ’।

এক. দেওবন্দের নাম কেন দেওবন্দ?

দারুল উলুম দেওবন্দের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস মুফতী মোহাম্মদ আমিন পালনপুরী দারুল উলূম দেওবন্দের ৫২ বছর মুহতামিম খতিবুল ইসলাম ক্বারী তায়্যিব সাহেব রহ. -এর বরাতে বলেন, দেও শব্দের অর্থ হলো জিন, (দেবী)। আর বন্দ অর্থ বন্ধ করা, আটক করা। আগের যুগে হিন্দুদের একটি প্রথা ছিল যে, তারা তাদের কোন এক পুজা বা মেলায় একজন করে কুমারি মেয়েকে সুন্দর করে সাজিয়ে সন্ধ্যাবেলা মন্দিরের ভেতরে রেখে আসতো; কিন্তু সকালে গিয়ে আর সেই মেয়েকে পাওয়া যেত না। এভাবে তাদের এ প্রথা দীর্ঘ যুগের পর যুগ চলছিল।

একবছর একটি ঘটনা ঘটলো, এক মন্দিরে কুমারি মেয়েকে দেওয়ার জন্য এলাকার সকল কুমারি মেয়েদের নাম সংগ্রহ করল। আর এ সিদ্ধান্ত হল যে, লটারিতে যার নাম আসবে তাকেই দেওয়া হবে মন্দিরে। আর সে সময়ে এই এলাকায় দু’একজন ছাড়া তেমন কোনো মুসলমান ছিল না। কিন্তু অনেক দূরের কোথাও থেকে এক মুসলমান মুসাফির এই এলাকায় আগমন করে এক হিন্দু বাড়িতে মেহমান হলো। ঘটনাক্রমে সেই হিন্দু বাড়ির পাশের ঘরের কুমারি মেয়ের নাম-ই লটারিতে উঠেছিল মন্দিরে দেওয়ার জন্য। তখন মুসলমান মুসাফির ব্যক্তি পাশের ঘরে কান্নার আওয়াজ শুনতে পেয়ে কারণ জানতে চাইলো। তখন হিন্দু ব্যক্তি বললো যে, আমার একটিমাত্র মেয়ে অন্য কোন সন্তান নেই। কিন্তু মন্দিরে দেওয়ার জন্য আমার মেয়ের নামই উঠেছে। তাই কান্না করছে সবাই।

তখন মুসলমান মুসাফির ব্যক্তিটি বলল, একটি কাজ করুন, সেটা হলো আপনার মেয়ের পরিবর্তে আমাকে সাজিয়ে মন্দিরের ভিতরে রেখে আসুন। তখন হিন্দু ব্যক্তি বললো আপনি আমার মেহমান এটা করে  আপনাকে অসম্মান করতে পারব না। আর সে ভয়ও পাচ্ছিল যে মেয়ের পরিবর্তে একজন পুুরুষ কিভাবে পাঠাবে। কিন্তু অনেকবার বলার পর হিন্দু ব্যক্তি রাজি হল। অতপর তাকে মেয়ের মত সুন্দর করে সাজাল, যাতে কেউ বুঝতে না পারে। যখন সন্ধ্যা হল, তাকে পালকিতে উঠিয়ে মন্দিরের ভেতরে রেখে এসে বাহির দিয়ে দরওয়াজা বন্ধ করে দিল। অতপর মুসলিম মুসাফির ব্যক্তিটি কাপড় পরিবর্তন করে মন্দিরের ভিতরের দিকে একটি খাল/পুকুরে অজু করে বিভিন্ন অজিফা দু’আ পাঠ করছিল। একটু পর সে দেখলো ঐ খাল দিয়ে বিভিন্ন রকমের লাইট দ্বারা সজ্জিত একটি জাহাজ মন্দিরের দিকে এগিয়ে আসছে। তখন সে খুব বেশি বেশি আয়াতুল কুরসী পাঠ করছিল। জাহাজ যত কাছে আসছিল সে তত জোরে জোরে আয়াতুল কুরসী পাঠ করতে লাগলো। যখন জাহাজটি মন্দিরের ঘাটে এসে ধাক্কা লাগল সাথে সাথে অনেক দুরে চলে গেলো। আবার কাছে আসতে চাইলে সে বারে বারে আয়াতুল কুরসী পড়তে লাগল। ফলে তা আর তার কাছে আসতে পারল না। অতপর সেই জাহাজটি ঘাটের সাথে ধাক্কা লেগে অনেক মাঝে গিয়ে দুটুকরো হয়ে ডুবে গেল। আর তাতে ছিল সেই দেও (জিন) যে কুমারি মেয়েকে গায়েব করে দিত। অতপর সে আর আসতেই পারল না।

এদিকে সকাল বেলা লোকেরা দেখল যে, মন্দিরের ভিতরে কে যেন কি পড়ছে। ভেতরে ঢোকে দেখল, একজন পুুরুষ লোক ভেতরে বসে আছে। লোকেরা কারণ জানতে চাইলে সে সব খুলে বললো। ওই যে বন্ধ হলো দেও আসা তারপর আর কখনো আসে নি। আর তখন থেকে হিন্দুরা কুমারি মেয়েকে মন্দিরে দেওয়াও বন্ধ করে দিল। আর যেহেতু ঐ মুসলিম মুসাফির ব্যক্তির মাধ্যমে দেও আসা বন্ধ হল তাই এ এলাকা কে দেওবন্দ নামে নামকরণ করা  হয়। (http://komashisha.com)

দুই. দারুল উলুম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

মুঘল শাসনামলের শেষ দিকের কথা। তখন পুরো ভারতবর্ষে  ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারত বর্ষের ক্ষমতা নিজ হাতে নিয়ে নিয়েছিল। সেই দিন মুসনাদুল হিন্দ শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলবি রহ. এর সুযোগ্য সন্তান হযরত শাহ আবদুল আযিয মুহাদ্দিসে দেহলভি রহ. দীপ্ত কণ্ঠে ফতোয়া দিয়েছিলেন যে- ‘ভারতবর্ষ এখন দারুল হরব’। (শত্রুকবলিত দেশ) তাই প্রত্যেক ভারতবাসীর উপর ফরজ হলো- একে স্বাধীন করা। তার এই সাহসী উচ্চারণ পুরো দিকদিগন্তে মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে দাবানলের ন্যায়। ফলে দিশেহারা মুসলিম জাতি উলামায়ে কেরাম’র নেতৃত্বে ১৮৫৭ সালে সিপাহি বিপ্লব সমাপ্ত শুরু করেন। যার ফলশ্রুতিতে শুরু হয়, আলেম-উলামার উপর দমন-নিপীড়ন। হাজার হাজার আলেম-উলামাকে ফাঁসি দেওয়া হয়। দিল্লির প্রতিটা অলিগলি আলেম ওলামার রক্তে রঞ্জিত হয়। এহেন অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছিল যে, ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য ইসলামের নামটুকু হয়তো আর বাকি থাকবে না।
বর্তমানের চেয়ে ভবিষ্যত আরো খতরনাকই হবে- জাতির এমনই এক ক্রান্তিলগ্নে প্রয়োজন দেখা দিল এমন একদল দীক্ষাপ্রাপ্ত সচেতন মুজাহিদ তৈরি করা; যাদের মাধ্যমে আযাদি আন্দোলনের স্রোতধারাকে ভারতবর্ষের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে দেয়া সহজতর হবে। তাই দীর্ঘ চিন্তা-ভাবনা, শলা-পরামর্শের পর সাময়িকভাবে সশস্ত্র সংগ্রাম বন্ধ রেখে সাম্রাজ্যবাদ ইংরেজদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা সংগ্রামের চেতনায় উজ্জীবিত, দীনি চেতনায় উৎসর্গ একদল জানবায মুজাহিদ তৈরির লক্ষ্যে এবং ইলমে নববির সংরক্ষণ ও ইসলামি শিক্ষা-সংস্কৃতির প্রচার-প্রসারের মহান উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে ১৮৬৬ ঈসায়ি সনের ৩০ মে, মোতাবেক ১৫ই মুহররম ১২৮৩ হিজরি সনে ভারতের উত্তর প্রদেশস্থ সাহারানপুর জেলায় দেওবন্দ নামক গ্রামে ঐতিহাসিক সাত্তা মসজিদ প্রাঙ্গনে একটি ডালিম গাছের ছায়ায়, ইলহামিভাবে কোনো প্রকার সরকারি সাহায্য ছাড়াই একমাত্র আল্লাহর ওপর ভরসা করে প্রতিষ্ঠিত হয় আজকের দারুল উলুম দেওবন্দ। (মুখতাসার তারিখে দারুল উলুম দেওবন্দ, মাও. মুহাম্মদ উল্লাহ কাসিমী, পৃষ্ঠা. ৫৯, মাকতাবায়ে দারুল উলুম দেওবন্দ)

দারুল উলুম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠার পেছনেও রয়েছে এক অলৌকিক ঘটনা। দারুল উলুম দেওবন্দের সূচনাকালেও রয়েছে কিছু মানুষের ত্যাগ। যথাক্রমে তাঁরা হলেন মাওলানা কাসেম নানুতবি রহ. (ইন্তেকাল-১২৯৭ হি.), মাওলানা ইয়াকুব নানুতবি রহ. (১৩০২ হি.), হাজি আবেদ হোসাইন রহ. (১৩৩১ হি.), মাওলানা শাহ রফি উদ্দিন রহ. (১৩০৮ হি.), মাওলানা যুলফিকার দেওবন্দি রহ. (১৩২২ হি.), মাওলানা ফযলুর রহমান উসমানি রহ. (১৩২৫ হি.) প্রমুখ। তো তাদের মধ্য হতে মাও. রফি উদ্দিন ছিলেন অন্যতম। তিনি একদিন ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখেন যে, রাসুলুল্লাহ ﷺ তাঁকে নিয়ে গিয়ে বর্তমান সাত্তা মসজিদের পাশে একটি স্থানে দাগ টেনে দিলেন এবং সেখানেই মাদরাসার ভিত্তি স্থাপন করতে বলেন। তিনি যখন ঘুম থেকে জাগ্রত হলেন, সত্যিই তিনি রাসুলের দেখিয়ে দেয়া স্থানে টেনে যাওয়া দাগ দেখতে পেলেন। অবশেষে সেখানেই বিখ্যাত ইলমি প্রতিষ্ঠান দারুল উলুম দেওবন্দ’র শিক্ষাভবন নির্মাণ হলো। (তারিখে দারুল উলুম দেওবন্দ, ভূমিকা; মাকতাবায়ে দারুল উলুম দেওবন্দ; ইখলাস কা তাজমহল)

والله اعلم بالصواب
উত্তর দিয়েছেন
মাওলানা উমায়ের কোব্বাদী
আরো পড়ুন–

১ টি মন্তব্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

thirteen − twelve =