পহেলা বৈশাখ উদযাপনে ইমান ও মুসলমানিত্ব যায় কিনা?

জিজ্ঞাসা–২৪: জনৈক মন্ত্রী বলেছেন,”পহেলা বৈশাখ উদযাপনে ইমান ও মুসলমানিত্ব যায় না। বরং পহেলা বৈশাখ উদযাপনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ দেশজ সংস্কৃতির চর্চা করবে। আর দেশজ সংস্কৃতিতে আমি লালিত না হলে, পক্ষে ধারণ না করলে আমার ইমান দুর্বল হয়ে যাবে।”এ বক্তব্য কতটুকু সঠিক?— Rahmat Ullah

জবাব :

এক. ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে সংস্কৃতি অর্থ সুসভ্য আচরণ, শিষ্টাচার ও উন্নত নৈতিক মূল্যবোধ। ইসলাম সেই সংস্কৃতি গ্রহণের অনুমোদন দিয়ে থাকে যা মুসলিম উম্মাহর জাতিসত্ত্বা ও ধর্মকে কলুষিত করে না। ইসলামী জীবন ও সংস্কৃতি নিয়ে যার এত আগ্রহ তার আগে ভাল করে জানা উচিত আল্লাহর কিতাব আল-কোরআন এবং সেই সঙ্গে রাসূলুল্লাহ -এর সুন্নাহ তথা জীবনাদর্শকে। যদি এদু’টি তার জানা না থাকে তাহলে যারা জানে তাদের থেকে জেনে নিবে। অন্যথায় তার জন্য উচিত হল, ইসলামী জীবন ও সংস্কৃতির ব্যাপারে কোনোপ্রকার ‘’মন্তব্য’’ ও ‘’বক্তব্য’’ থেকে নিজেকে বিরত রাখা।

দুই. আলোচ্য ব্যক্তির উক্ত জঘন্য মন্তব্য থেকে বোঝা যায়, ইসলামী জীবন ও সংস্কৃতি নিয়ে তার আগ্রহ থাকলেও তিনি এ দু’টি বিষয়ে অজ্ঞতার মধ্যে আছেন কিংবা জেনে-বুঝে সত্যকে গোপন করছেন।

প্রকৃত সত্য হল,পহেলা বৈশাখ উদযাপনে মৌলিকভাবে কমপক্ষে পাঁচটি ইসলাম ও ঈমান বিরোধী বিষয় রয়েছে–

১. ঈমান-আকিদাবিরোধী প্রথার প্রচলন। যেমন, জীবজন্তুর মূর্তি নিয়ে মঙ্গল শোভাযাত্রা, মুখে উল্কি আঁকা,শাঁখা-সিঁদুরের রংয়ে (সাদা ও লাল) পোশাক পরিধান,রাখি বাঁধা, শাঁখা পরা, কপালে লাল টিপ ও চন্দন এবং সিথিতে সিঁদুর দেয়া। রাসূলুল্লাহ বলেছেন,

أَبْغَضُ النَّاسِ إِلَى اللَّهِ ثَلاَثَةٌ: مُلْحِدٌ فِي الحَرَمِ، وَمُبْتَغٍ فِي الإِسْلاَمِ سُنَّةَ الجَاهِلِيَّةِ، وَمُطَّلِبُ دَمِ امْرِئٍ بِغَيْرِ حَقٍّ لِيُهَرِيقَ دَمَهُ

আল্লাহর নিকট তিন শ্রেণীর লোক সবচেয়ে বেশী ঘৃণিত – ১ম শ্রেণী হচ্ছে, যারা হারাম শরীফের মধ্যে কুফরী কার্যকলাপ করে। ২য় শ্রেণী হচ্ছে, যারা ইসলামে থাকা অবস্থায় (মুসলমান হয়েও) জাহিলিয়্যাতের রীতি–নীতি ও আদর্শ (কাফের মুশরিকদের অনুকরণ–অনুসরণ) পালন করে। ৩য় শ্রেণী হচ্ছে, যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে কারো রক্ত প্রবাহিত করে। (বুখারী ৬৮৮২ দিয়াত অধ্যায়)

২. বিজাতির অনুসরণ। বির্ধমীরা তাদের সংস্কৃতির রীতি অনুযায়ী ইংরেজী নববর্ষ পালন করে আর আমরা বাংলা সংস্কৃতি মতে বাংলা নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ পালন করি। অথচ রাসূলুল্লাহ বলেছেন,مَنْ تَشَبَّهَ بِقَوْمٍ فَهُوَ مِنْهُمْ যে ব্যক্তি যে জাতির অনুকরন করবে সে ব্যক্তি সে জাতির মধ্যে গণ্যহবে। (আবু দাউদ ৩৫১২)

৩. নগ্নতা, অশ্লীলতা, ব্যভিচারপূর্ণ অনুষ্ঠান। এই ব্যভিচার বিভিন্ন অঙ্গের দ্বারা হতে পারে, যেমনটি রাসূলুল্লাহ বললেছেন যে,

فَالْعَيْنَانِ زِنَاهُمَا النَّظَرُ ، وَالأُذُنَانِ زِنَاهُمَا الاسْتِمَاعُ ، وَاللِّسَانُ زِنَاهُ الْكَلامُ ، وَالْيَدُ زِنَاهَا الْبَطْشُ ، وَالرِّجْلُ زِنَاهَا الْخُطَا ، وَالْقَلْبُ يَهْوَى وَيَتَمَنَّى ، وَيُصَدِّقُ ذَلِكَ الْفَرْجُ وَيُكَذِّبُهُ

দুই চোখের ব্যভিচার হল হারাম দৃষ্টি দেয়া, দুই কানের ব্যভিচার হল পরনারীর কণ্ঠস্বর শোনা, জিহবার ব্যভিচার হল, [পরনারীর সাথে সুড়সুড়িমূলক] কথোপকথন। হাতের ব্যভিচার হল পরনারী স্পর্শ করা, পায়ের ব্যভিচার হল গুনাহর কাজের দিকে পা বাড়ান, অন্তরের ব্যভিচার হল কামনা-বাসনা আর গুপ্তাঙ্গঁ তা সত্য অথবা মিথ্যায় পরিণত করে। (মুসলিম ২৬৫৭, মুসনাদে আহমাদ ৮৯৩২)

আর আল্লাহ তাআলা বলেছেন,

وَلَا تَقْرَبُوا الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ

নির্লজ্জতা ও অশ্লীলতার কাছেও যেও না, চাই তা প্রত্যক্ষ হোক আর পরোক্ষ হোক। (সূরা আনআম ১৫১)

৪. গান ও বাদ্য ও মদ্যপানপূর্ণ অনুষ্ঠান। রাসূলুল্লাহ বললেছেন,

ي هَذِهِ الأُمَّةِ خَسْفٌ وَمَسْخٌ وَقَذْفٌ‏ ‏.‏ فَقَالَ رَجُلٌ مِنَ الْمُسْلِمِينَ يَا رَسُولَ اللَّهِ وَمَتَى ذَاكَ قَالَ إِذَا ظَهَرَتِ الْقَيْنَاتُ وَالْمَعَازِفُ وَشُرِبَتِ الْخُمُورُ

এই উম্মতের জন্য ভূমিধ্বস, চেহারা বিকৃতি এবং পাথর বর্ষণের আযাব রয়েছে। জনৈক মুসলিম ব্যক্তি তখন বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, কখন হবে তা? তিনি বললেন, যখন গায়িকা ও বাদ্যযন্ত্রের বিস্তার ঘটবে এবং মদ্যপান দেখা দিবে। (তিরমিযী ২২১৫)

৫. সময় অপচয়কারী অনর্থক ও বাজে কথা এবং কাজ। আল্লাহ পাক বলেন, সেই মুমিনরা সফলকাম হয়েছে, وَالَّذِينَ هُمْ عَنِ اللَّغْوِ مُعْرِضُونَ যারা বাজে কাজ থেকে বিরত থেকেছে। (সূরা মুমিনুন ৩)

সুতরাং যে সংস্কৃতির মধ্যে এতগুলো ইমান ও ইসলামবিরোধী কর্ম বিদ্যমান;সেই সংস্কৃতি পালনে ইমান ও মুসলমানিত্ব যায় না নয়; বরং ইমান ও মুসলমানিত্ব থাকে না। এ সংস্কৃতিতে লালিত না হলে, পক্ষে ধারণ না করলে আমার ইমান দুর্বল হয়ে যাবে না নয়; বরং এ সংস্কৃতিতে লালিত হলে, পক্ষে ধারণ করলে আমার ইমান চরমভাবে অপমানিত হবে।

والله اعلم بالصواب
উত্তর দিয়েছেন
শায়েখ উমায়ের কোব্বাদী