পুরুষ ও নারীর সিজদা-পদ্ধতি: একটি বিভ্রান্তির জবাব

জিজ্ঞাসা–১১৯: হযরতজী, আমি আপনার মাস্তুরাতের প্রোগ্রামগুলোতে নিয়মিত শরিক থাকি। আলহামদুলিল্লাহ। ইদানিং আমরা বিশেষ করে আমি একটা সমস্যায় পড়েছি। তাহল, আমার দূরসম্পর্কের একজন আত্মীয়া যাকে আমাদের পরিবারের সকলেই খুব সম্মান করে। তিনি আমাদেরকে বলেন, আমরা এতদিন যাবত নামাজের সিজদা যেভাবে দিয়ে আসছি,ওটা নাকি ভুল! বুখারি শরিফে নাকি আছে, এটা নাকি কুকুরের বসার সঙ্গে মিলে যায়। আমরা তার কথা শুনে সন্দেহে পড়ে গেলাম। আপনি আমাদেরকে বিষয়টা একটু বলে দিলে ভালো হয় যে, আসলেই কি ওই মহিলার কথা সত্য? ভুল হলে মাফ করে দিবেন।–উম্মে কুলছুম।

জবাব: সম্মানিত দ্বীনী বোন, প্রথমেই আপনাকে ধন্যবাদ জানাই এজন্য যে, আপনি উক্ত মহিলার কথার ওপর অন্ধবিশ্বাস না করে বরং প্রকৃত বিষয়টা জানতে চেয়েছেন। যে কোনো নতুন দাওয়াতে সহজে সাড়া না দিয়ে যদি এভাবে আপনার মত সকলেই ওলামায়েকেরামের কাছে প্রকৃত বিষয় জানার চেষ্টা করত তাহলে সকল ভুল ধারণার অবসান ঘটত। আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন। আমীন।

সম্মানিত দ্বীনী বোন, উক্ত মহিলা -যদিও এদের জ্ঞান সম্পূর্ণরূপে অন্যের ওপর নির্ভরশীল এবং বেনামাযীদেরকে নামাযী বানানোর চেষ্টায় নয়; বরং এদের চিন্তা ও মনোযোগের সিংহভাগ ব্যয় হয় নামাযীদেরকে বিরক্ত করার কাজে। যাই হোক, মহিলাটি সহীহ বুখারীর যে হাদীসটির কথা বোঝাতে চেয়েছেন, তার মূলপাঠ হল এই,

عَنْ أَنَسٍ رضي الله عنه قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ : اعْتَدِلُوا فِي السُّجُودِ، وَلَا يَبْسُطْ أَحَدُكُمْ ذِرَاعَيْهِ انْبِسَاطَ الْكَلْبِ

অর্থাৎ, আনাস রাযি. থেকে তা বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়সাল্লাম বলেছেন, তোমরা ঠিকভাবে সিজদা কর। তোমাদের কেউ যেন সিজদায় তার হাতকে বিছিয়ে না দেয় যেভাবে কুকুর হাত বিছিয়ে দেয়। (সহীহ বুখারী, হাদীস ৮২২; সহীহ মুসলিম,হাদীস ৪৯৩)

এভাবে সিজদা করার নিয়ম এছাড়াও আরো বিভিন্ন হাদীসে এসেছে। অর্থাৎ, সিজদায় দুই হাতের বাহু পাঁজর থেকে আলাদা থাকবে এবং পেট উরু থেকে আলাদা থাকবে আর দুই হাত (অর্থাৎ কনুই থেকে কব্জি পর্যন্ত অংশ) মাটি থেকে উপরে থাকবে।

কিন্তু প্রশ্ন হল, নারী-পুরুষ সকলে এ নিয়মের অন্তর্ভুক্ত কিনা? যার সামনে শুধু বাংলা তরজমা আছে তিনি উক্ত মহিলার মত বলে বসতে পারেন যে, রাসূলে কারীম তো বহুবচনের শব্দ ব্যবহার করেছেন। সুতরাং সবার জন্যে এ নিয়ম। নারী-পুরুষ সকলে এ বিধানের অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহর রাসূল সবাইকে সম্বোধন করে বলেছেন, ‘তোমরা তোমাদের হাত মাটিতে বিছিয়ে দিয়ো না।’ সুতরাং পুরুষ যেভাবে সিজদা করে নারীও সেভাবে সিজদা করবে।

অথচ এখানে একথাটা বলা ঠিক হবে না। কারণ উক্ত হাদীসের প্রতি লক্ষ্য করুন, হাদীসটিতে বলা হয়েছে,اعْتَدِلُوا فِي السُّجُودِ এখানে اعْتَدِلُوا ক্রিয়াপদটি আরবী ভাষায় ব্যবহৃত হচ্ছে বহুবচনে পুরুষকে সম্বোধন করার জন্যে। অর্থাৎ হে পুরুষেরা! তোমরা ঠিকঠাকভাবে সিজদা কর। اعْتَدِلُوا শব্দটাতেই জেন্ডার আছে। পুরুষকে সম্বোধন করা হচ্ছে। মহিলাদেরকে সম্বোধন করা হলে বলা হত اعْتَدِلْن । সুতরাং শব্দ থেকেই বোঝা যাচ্ছে, এখানে সম্বোধন করা হচ্ছে, পুরুষদেরকে; মহিলাদেরকে নয়। অনুরূপভাবেوَلَا يَبْسُطْ أَحَدُكُمْ ذِرَاعَيْهِ انْبِسَاطَ الْكَلْبِ এখানে أَحَدُكُمْ -শব্দটাতেই জেন্ডার আছে। আরবীতে أَحَدُكُمْ এর كُمْ শব্দটি পুরুষবাচক। নারীদের জন্যে হলে বলা হত إحداكن। 

সম্মানিত দ্বীনী বোন, আশা করি লক্ষ্য করেছেন, আরবী ও বাংলার ভাষাগত পার্থক্যের কারণেই কিছু বিষয় হাদীসটির মূলপাঠে থাকলেও বাংলা তরজমায় আসছে না। অর্থাৎ,  যখন أَحَدُكُمْ -এর বাংলা তরজমা করা হয়, ‘তোমাদের কেউ’ তখন জেন্ডার উহ্য হয়ে যায়। কারণ, বাংলায় পুরুষের ক্ষেত্রেও ‘তোমাদের কেউ’, নারীর ক্ষেত্রেও ‘তোমাদের কেউ’। হাদীসের বাংলা তরজমায় বাংলাভাষার বৈশিষ্ট্যের কারণেই ক্রিয়াপদ থেকে জেন্ডারের লক্ষণ চলে যায়। এখন অতিউৎসাহী যে কেউ এখান থেকে বিভ্রান্তির শিকার হতে পারেন, যেমনটি আপনার উক্ত আত্মীয়া হয়েছেন যে, এখানে তো নারী-পুরুষ সবাইকে বলা হচ্ছে! আল্লাহর রাসূল ব্যাপক শব্দে সবাইকে বলেছেন! আসলে সবাইকে বলেননি। বরং আরবী-পাঠে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শুধু পুরুষকে সম্বোধন করে এ কথাটা বলেছেন।

সম্মানিত দ্বীনী বোন, এ প্রসঙ্গে আরেকটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি মনে করছি। তাহল এই যে, শরঈ-দলীলে কিছু কিছু ক্ষেত্র এমন আছে, যেখানে সম্বোধন করা হয় পুরুষদেরকে তবে বিধানটি নারীদেরকেও শামিল করে। মনে রাখববেন, এটা হল দ্বিতীয় পর্যায়ের বিষয়। বরং এর আগে অন্য দলীলের আলোকে বিবেচনা করতে হয়, এই বিধানটা শুধুই পুরুষের জন্যে, না এই বিধানে নারীও শামিল। আর এখানে সহীহ বুখারীর যে হাদীসটি পেশ করা হয়েছে, হাদীসটিতে রাসূলে কারীম সিজদার যে নিয়ম শিখিয়েছেন, আমরা প্রথমত লক্ষ্য করেছি, এখানে সম্বোধন করা হয়েছে পুরুষদেরকে। এরপর যদি আরো বিস্তৃতভাবে হাদীস অধ্যয়ন করি তাহলে দেখতে পাই, স্বয়ং রাসূলে কারীম নারীর সিজদার আলাদা নিয়ম ইরশাদ করেছেন। যথা-

১. ইমাম আবু দাউদ রাহ. তাঁর কিতাবুস সুনানের কিতাবুল মারাসীলে বিখ্যাত ইমাম ইয়াযিদ ইবনে আবী হাবীব রহ.-এর সূত্রে হাদীস বর্ণনা করেন যে,

أن النبى مر على امرأتين تصليان فقال : اذا سجدتما فضما بعض اللحم الى الأرض، فان المرأة ليست فى ذلك كالرجل

আল্লাহর রাসূল দুইজন মহিলার পাশ দিয়ে অতিক্রম করলেন। তারা নামায পড়ছিল। তিনি তাদের বললেন, ‘যখন তোমরা সিজদা করবে তোমাদের শরীরের কিছু অংশ, (মানে পিছনের অংশ) মাটির সাথে মিলিয়ে রাখবে। কারণ নারী এই বিষয়ে পুরুষের মত নয়।’ (মারাসীলে আবু দাউদ, হাদীস ৮৭; সুনানে কুবরা, বায়হাকী, হাদীস ৩২০১; মারিফাতুস সুনানি ওয়াল আছার, বায়হাকী, হাদীস ৪০৫৪)

দেখুন, হাদীসটিতে রাসূলে কারীম পুরুষকেও সিজদার নিয়ম শিখিয়েছেন, নারীকেও সিজদার নিয়ম শিখিয়েছেন। পুরুষকে সম্বোধন করে বলেছেন, সবগুলো অঙ্গ যেন ফাঁকা ফাঁকা থাকে। দুই বাহু যেন পাঁজরের সাথে মিলে না থাকে। কনুই যেন মাটিতে বিছানো না থাকে। পেট যেন উরুর সাথে মিশে না থাকে। এভাবে পুরুষকে সিজদা শিখিয়েছেন। আর নারীকে বলেছেন- فان المرأة ليست فى ذلك كالرجل ‘নারী এই বিষয়ে পুরুষের মত নয়।’

ইমাম আবু দাউদ রাহ. হাদীসটি উল্লেখ করেছেন। হাদীস-বিচারের নীতি অনুসারে এটি দলীল হিসেবে গ্রহণযোগ্য। বিখ্যাত লা-মাযহাবী মুহাদ্দিস -দেখুন, হানাফী মুহাদ্দিস না!- নওয়াব সিদ্দীক হাসান খান রাহ. সহীহ বুখারীর ভাষ্যগ্রন্থ ‘আওনুল বারী’তে এবং আরেকজন গায়রে মুকাল্লিদ মুহাদ্দিস بلوغ المرام -এর ভাষ্যগ্রন্থ سبل السلام-এ স্বীকার এই হাদীস সকল ইমামের উসুল মোতাবেক দলীল হওয়ার উপযুক্ত। অর্থাৎ এটা নির্ভরযোগ্য দলীল।

২. ইমাম বায়হাকী রাহ. তাঁর ‘আসসুনানুল কুবরা’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত, আল্লাহর ইরশাদ করেন,

إذا جلست المرأة في الصلاة وضعت فخذها على فخذها الأخرى وإذا سجدت ألصقت بطنها في فخذيها كأستر ما يكون لها وإن الله تعالى ينظر إليها ويقول يا ملائكتي أشهدكم أني قد غفرت لها.

‘নারী যখন নামাযে বসবে তখন তার এক উরু অন্য উরুর উপর রাখবে। আর যখন সিজদা করবে তখন তার পেটকে উরুর সাথে মিলিয়ে রাখবে। আল্লাহ পাক ঐ নারীর দিকে তাকান এবং বলেন, হে ফিরিশতাগণ! আমি তোমাদের সাক্ষী রাখছি যে, আমি তাকে মাফ করে দিয়েছি।’ (সুনানে কুবরা, বায়হাকী, হাদীস ৩১৯৯)

এই হাদীসেরও সনদ হাসান পর্যায়ের, নির্ভরযোগ্য পর্যায়ের।

এ হাদীসদ্বয় এবং এ বিষয়ের আরো কিছু রেওয়ায়েতের ভিত্তিতে পরিষ্কার প্রমাণিত হয় যে, স্বয়ং রাসূলে কারীম নারীর নামাযে সিজদার কিছু পার্থক্য নিদের্শ করেছেন। যেমন, ‘মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক’, ‘মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবাহ’ হাদীসের দুই বিখ্যাত ও মূল্যবান কিতাব। ইমাম আব্দুর রাযযাক, ইমাম ইবনে আবী শায়বাহ হলেন ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিমের উস্তায। এই দুই কিতাবে আলী ইবনে আবী তালিব রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে, سئل عن صلاة المرأة নারীর নামায সম্পর্কে তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হল। তিনি বললেন, إذا سجدت المرأة فلتحتفز ولتلصق فخذيها ببطنهاনারী যখন সিজদা করবে তখন যেন সে জড়সড় হয়ে সিজদা করে এবং তার দুই উরু পেটের সাথে মিলিয়ে রাখে।’ (মুসান্নাফে আব্দুর রায্যাক ৫০৭২; মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবাহ, ২৭৭৭)

সম্মানিত দ্বীনী বোন, উক্ত আলোচনা থেকে আশা করি বুঝেছেন,এই যে নিয়ম -নারীর নামাযের কিছু বিষয় পুরুষের নামাযের নিয়মের চেয়ে আলাদা, যে নিয়মে আপনারা পড়ে আসছিলেন- এ নিয়মটি শুধু ‘প্রচলিত’ একটা ব্যাপার নয়, বরং তা আল্লাহর রাসূলের সুন্নাহর দ্বারা প্রতিষ্ঠিত নিয়ম, যা মুসলিম জাহানে যুগ যুগ ধরে অনুসৃত হয়ে আসছে। এবার বলুন, এখন কেউ যদি ভুলক্রমে কিছু বিচ্ছিন্ন মত গ্রহণ করে এবং সঠিক তথ্য-প্রমাণ সামনে আসার পরও ঐ ভুল নিয়মের উপরই থাকে তাহলে আসলে কি সে সুন্নাহর অনুসারী হবে, না ব্যক্তির মতের অনুসারী হবে?

আল্লাহ আপনার উক্ত আত্মীয়াসহ সকলকে হেদায়য়াত দান করুন। আমীন।

والله اعلم بالصواب
উত্তর দিয়েছেন
শায়েখ উমায়ের কোব্বাদী

ন্তব্য

  1. নিজের মাযহাব কে রক্ষা করার জন্য ভুয়া উওর দিয়েছেন। মাযহাবের গোড়ামী এগুলো শিখায়!
    ভুয়া হাদীসকে হাসান মানের হাদীস বলা শিখায় এই গোড়ামী মতবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

1 × 4 =