বিতির নামায নিয়ে বিভ্রান্তির জবাব

জিজ্ঞাসা–৮২৮: আসসালামুআলাইকুম ওয়ারহমাতুল্লাহ। হযরত, কেমন আছেন? আমার জন্য দোয়া করবেন। আমার প্রশ্ন হচ্ছে,  ইদানিং বিতর নামাজ নিয়ে আহলে হাদিসের আলেমরা কিছু বিভ্রান্ত ছড়াচ্ছে। বলছে এক রাকাত আবার ২ য় রাকাতে সালাম ফিরিয়ে আবার দাড়াতে হবে আবার নাকি ৩ রাকাতের আগে বসা যাবেনা….তাহলে এতদিন যা নামাজ পড়লাম সব ভুল? বিতরের নামজের বিষয় বিস্তারিত জানতে চাই। ধন্যবাদ।–শান্ত।

জবাব: وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

এক. সম্মানিত দীনি ভাই, শরীয়তে এমন কোনো নামায নেই, যা শুধু এক রাকাত পড়া যায় কিংবা মাঝে তাশাহহুদ ছাড়া দু’রাকাতের অধিক আদায় করা যায়; বরং শরীয়তে সকল নামাযের মূলকথা এই যে, প্রতি দুই রাকাতে বৈঠক হবে এবং তাশাহহুদ পড়া হবে। হযরত আয়েশা রাযি. থেকে সহীহ মুসলিম (১/১৯৪, হাদীস ৪৯৮)-এ একটি দীর্ঘ হাদীসে রাসূলুল্লাহﷺ-এর এক ব্যাপক বাণী উদ্ধৃত রয়েছে। তাতে তিনি ইরশাদ করেন- فِي كُلِّ رَكْعَتَيْنِ التَّحِيَّةَ ‘প্রতি দুই রাকাতে তাশাহহুদ রয়েছে।’ একই হুকুম একাধিক সাহাবায়ে কেরাম থেকে বর্ণিত রয়েছে। যেমন, আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাযি. বলেন, لَيْسَ مِنْ صَلَاةٍ إلَّا وَفِيهَا قِرَاءَةٌ وَجُلُوسٌ فِي الرَّكْعَتَيْنِ সকল নামাযে কিরাত আছে। আর আছে দু’ রাকাতে বসা। (মুসান্নাফ, ইবনে আবী শায়বা ৮৫৭৭)

শরীয়তের এ মৌলিক শিক্ষা পরিহার করে কোন রেওয়ায়াতের মনগড়া ব্যাখ্যা দিয়ে যদি কোনো ব্যক্তি একথা বলে যে, বিতির নামায এক রাকাত কিংবা তিন রাকাত বিতির পড়লে শুধু এক বৈঠকেই পড়তে হবে- তাহলে এতে কোন সন্দেহ নেই যে, এমন ব্যক্তি সালাফের অনুসারী আলেম হতে পারে না। বরং তার এজাতীয় বক্তব্য দীনের মধ্যে নব আবিষ্কৃত বেদআত বৈ কিছু নয়।

দুই. মুতাওয়াতির হাদীস দ্বারা প্রমাণিত যে, বিতির এক রাকাত নয়; তিন রাকাত। যেসব বর্ণনায় তিন রাকাতের অধিক, যথা পাঁচ, সাত বা নয় রাকাত পড়ার কথা বলা হয়েছে সেখানেও মূল বিতর তিন রাকাত। বর্ণনাকারী পূর্বের বা পরের রাকাতসমূহ মিলিয়ে সমষ্টিকে ‘বিতির’ বলে বর্ণনা করেছেন। নিম্নে কিছু প্রমাণ পেশ করা হল-

১. আবু সালামা ইবনে আবদুর রহমান উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রাযি. কে জিজ্ঞাসা করেন, রমযানুল মুবারকে নবী ﷺ -এর নামায কীরূপ হত? উম্মুল মুমিনীন বলেন,

مَا كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ يَزِيدُ فِي رَمَضَانَ وَلاَ فِي غَيْرِهِ عَلَى إِحْدَى عَشْرَةَ رَكْعَةً يُصَلِّي أَرْبَعًا، فَلاَ تَسَلْ عَنْ حُسْنِهِنَّ وَطُولِهِنَّ، ثُمَّ يُصَلِّي أَرْبَعًا، فَلاَ تَسَلْ عَنْ حُسْنِهِنَّ وَطُولِهِنَّ، ثُمَّ يُصَلِّي ثَلاَثًا

নবী ﷺ রমযানে ও রমযানের বাইরে এগারো রাকাতের বেশি পড়তেন না। প্রথমে চার রাকাত পড়তেন-এত সুন্দর ও দীর্ঘ সে নামায, যা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। অতঃপর চার রাকাত পড়তেন-এরও দীর্ঘতা ও সৌন্দর্য সম্পর্কে জানতে চেয়ো না। এরপর তিন রাকাত পড়তেন। (বুখারী ১১৪৭ মুসলিম  ৭৩৮  নাসায়ী ১৬০৭ আবু দাউদ ১৩৪১ তিরমিযী ৪৩৯ মুসনাদে আহমদ ৬/৩৬, ৩৯, ৭৩, ১০৪)

২. আয়েশা রাযি. বলেন,

كَانَ النَّبِيُّ ﷺ لَا يُسَلِّمُ فِي رَكْعَتَيْ الْوِتْرِ

নবী ﷺ বিতরের দুই রাকাতে সালাম ফেরাতেন না। ( নাসায়ী  ১৬৯৮; মুয়াত্তা মুহাম্মাদ ১৫১ (বাবুস সালাম ফিল বিতর) মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা ৬৯১২ সুনানে দারাকুতনী ১৫৬৫ সুনানে কুবরা বাইহাকী ৩/৩১)

এই হাদীসটি ইমাম হাকেম আবু আব্দুল্লাহ রহ.ও ‘মুস্তাদরাক আলাস সহীহাইন’ কিতাবে বর্ণনা করেছেন। তার আরবী পাঠ এই-

كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ لَا يُسَلِّمُ فِي الرَّكْعَتَيْنِ الْأُولَيَيْنِ مِنْ الْوِتْرِ

অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ ﷺ বিতরের প্রথম দুই রাকাতে সালাম ফেরাতেন না।

ইমাম হাকেম রহ. তা বর্ণনা করার পর বলেন- هذا حديث صحيح على شرط الشيخين অর্থাৎ হাদীসটি বুখারী ও মুসলিমের শর্ত মোতাবেক সহীহ। ইমাম শামসুদ্দীন যাহাবী রহ. ‘তালখীসুল মুস্তাদরাক’-এ হাকেম রহ.-এর সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছেন। (মুস্তাদরাক আলাস সহীহাইন ১/৩০৪, হাদীস ১১৮০)

৩. আব্দুল্লাহ ইবনে আবী কাইস বলেন, আমি হযরত আয়েশা রাযি.-এর কাছে জিজ্ঞাসা করলাম যে, নবীজী ﷺ বিতরে কত রাকাত পড়তেন? উত্তরে তিনি বলেন,

 كَانَ يُوتِرُ بِأَرْبَعٍ وَثَلَاثٍ وَسِتٍّ وَثَلَاثٍ وَثَمَانٍ وَثَلَاثٍ وَعَشْرَةٍ وَثَلَاثٍ وَلَمْ يَكُنْ يُوتِرُ بِأَكْثَرَ مِنْ ثَلَاثَ عَشْرَةَ وَلَا أَنْقَصَ مِنْ سَبْعٍ

অর্থাৎ  চার এবং তিন, ছয় এবং তিন, আট এবং তিন, দশ এবং তিন। তিনি বিতরে তের রাকাতের অধিক এবং সাত রাকাতের কম  পড়তেন না। ( আবু দাউদ ১১৯০ তহাবী ১০৬৬ মুসনাদে আহমদ ২৬৬১০ আসসুনানুল কাবীর লিল বাইহাকী ৪৪৭১ মুসনাদে ইসহাক ইবন রাহয়াইহ ১৪৮৫)

লক্ষণীয় বিষয় হল, রাসূলুল্লাহ ﷺ তাহাজ্জুদ নামায কখনো চার রাকাত, কখনো ছয় রাকাত, কখনো আট রাকাত, কখনো দশ রাকাত পড়তেন; কিন্তু মূল বিতর সর্বদা তিন রাকাতই হত।

তিন. দোয়ায়ে কুনূত রুকুর আগে,না পরে? এ বিষয়ে মতভেদ আছে। হানাফী মাযহবের আলিমগণ বলেন, রুকুর আগে পড়া হবে। এর দলিল হল, সহীহ বুখারী (১/১৩৬) ‘বাবুল কুনূত কাবলার রুকু ওয়া বা’দাহ’ শীর্ষক পরিচ্ছেদে আছে, আসিম আহওয়াল বলেন,

سَأَلْتُ أَنَسَ بْنَ مَالِكٍ، عَنِ الْقُنُوتِ؟ فَقَالَ: قَدْ كَانَ الْقُنُوتُ، قُلْتُ: قَبْلَ الرُّكُوعِ أَوْ بَعْدَهُ؟ قَالَ: قَبْلَهُ، قُلْتُ: فَإِنَّ فُلَانًا أَخْبَرَنِي عَنْكَ، أَنَّكَ قُلْتَ: بَعْدَ الرُّكُوعِ، فَقَالَ: كَذَبَ، إِنَّمَا قَنَتَ رَسُولُ اللَّهِ – ﷺ– بَعْدَ الرُّكُوعِ شَهْرًا،.

আমি আনাস ইবনে মালিক রাযি.কে কুনূত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, কুনূত আছে। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, রুকুর আগে, না পরে? তিনি বললেন, রুকুর আগে। আমি বললাম, জনৈক ব্যক্তি আমাকে বলেছেন যে, আপনি রুকুর পরে কুনূত পড়ার কথা বলেছেন? তিনি বললেন, সে ভুল বলেছে। রুকুর পরে তো নবী ﷺ শুধু এক মাস কুনূত পড়েছেন।

এছাড়াও আরো দলিল আছে। তবে রুকুর পরে কুনূতের কথাও হদীসে আছে। হানাফী আলিমগণ উভয় বর্ণনার মাঝে সমন্বয়  এভাবে করেন যে, কুনূতে নাযেলা রুকুর পরে ও বিশেষ বিশেষ অবস্থায় পড়া হবে। আর বিতিরের কুনূত রুকুর আগে ও সব সময় পড়া হবে। কেননা,  আনাস রাযি. থেকেই অন্য বর্ণনায় আছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ মৃত্যু পর্যন্ত কুনূত পড়েছেন। (বাযযার-মাজমাউয যাওয়াইদ ১/১৩৯) এই বর্ণনায় বিতরের কুনূতই উদ্দেশ্য। কারণ ফজরের কুনূত সর্বদা পড়ার প্রমাণ পাওয়া যায় না।

চার. যারা উপরোক্ত হাদীসসমূহের ভিত্তিতে রুকুর আগে কুনূত পড়ার কথা বলেন তাদের নিকট কিরাত ও কুনূতের মাঝে তাকবীর দেওয়া সুন্নত। এই তাকবীরের সাথে রাফয়ে ইয়াদাইন (হাত উত্তোলন) আছে। এজন্য ইমাম তহাবী রহ. বলেন, وقد أجمع الذين يقنتون قبل الركوع على الرفع معها ‘যারা রুকুর পূর্বে কুনূত পড়ার কথা বলেন তাদের ইজমা রয়েছে যে, এই তাকবীরের সাথে রাফয়ে ইয়াদাইনও করতে হবে।’ (তহাবী ১/৩৩২) এ প্রসঙ্গে সাহাবায়ে কেরামের আমল থেকে কিছু দলিল উল্লেখ করা হল। কেননা, সাহাবায়ে কেরামের আমল নিশ্চয় নবী ﷺ-এর সুস্পষ্ট শিক্ষা থেকেই গৃহীত আমল।

১. আবু ইসহাক থেকে বর্ণিত, মাসরূক রহ., আসওয়াদ রহ. ও ইবনে মাসউদ রাযি.-এর অন্য শাগরিদগণ বলেছেন,

وَكَانَ عَبْدُ اللَّهِ لا يَقْنُتُ إلا فِي الْوِتْرِوَكَانَ يَقْنُتُ قَبْلَ الرُّكُوعِ يُكَبِّرُ إِذَا فَرَغَ مِنْ قِرَاءَتِهِ حِينَ يَقْنُتُ

আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাযি. শুধু বিতর নামাযে কুনূত পড়তেন আর তিনি কুনূত পড়তেন রুকুর আগে এবং কিরাআত সমাপ্ত হওয়ার পর কুনূত পড়ার সময় তাকবীর দিতেন। (শরহু মুশকিলিল আছার ১১/৩৭৪  মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা ২/৩০৭)

২. ইমাম বুখারী রহ. জুয্‌উ রাফয়িল ইয়াদাইন (পৃ. ৬৮)-এ উল্লেখ করেছেন, عن أبي عثمان كان عمر رضي الله عنه يرفع يديه في القنوت  আবু উছমান বলেন, ‘উমর রাযি. কুনূতে রাফয়ে ইয়াদাইন করতেন।’

৩. ইমাম বাইহাকী রহ. উল্লেখ করেছেন,  إن عدداً من الصحابة – رضي الله عنهم – رفعوا أيديهم في القنوت ‘নিশ্চয় সাহাবায়ে কেরামের অনেকেই কুনূতে রাফয়ে ইয়াদাইন করতেন।’ (আস সুনানুল কুবরা ২/২১১)

পাঁচ.  রাফয়ে ইয়াদাইন (হাত উত্তোলন) পর হাত কী করবে? এর তিনটি পদ্ধতি হতে পারে- ১. দোয়ার মতো হাত উঠিয়ে রাখবে ২. রাফয়ে ইয়াদাইন (হাত উত্তোলন) করার পর কওমার মত হাত ছেড়ে দিবে ৩. রাফয়ে ইয়াদাইনের পর কিয়ামের মত দুই হাত বেঁধে নিবে।

প্রথম পদ্ধতিটি হানাফী ইমামগণের নিকট পসন্দনীয় নয়। কেননা, যদিও হাত তুলে দোয়া করাই দোয়ার সাধারণ নিয়ম কিন্তু নামাযের যত জায়গায় দোয়া আছে কোথাও হাত ওঠানোর নিয়ম নেই। সুতরাং দোয়ায়ে কুনুতের সময়ও এর ব্যতিক্রম হবে না। এজন্যই ইবনে উমর রাযি. এই পদ্ধতিকে বিদআত বলেছেন। তিনি বলেন,

أرأيتم قيامكم عند فراغ الإمام من السورة هذا القنوت والله إنه لبدعة ما فعله رسول الله ﷺ غير شهر ثم تركه أرأيتم رفعكم في الصلاة والله إنه لبدعة ما زاد رسول الله ﷺهذا قط فرفع يديه حيال منكبيه، رواه الطبراني في الكبير وفيه شهر بن حوشب ضعفه أحمد وابن معين وأبو زرعة وأبو حاتم والناسئي ووثقه أيوب وابن عدي

দেখ, তোমরা যে ফজরের নামাযেও ইমামের কিরাত শেষে কুনূতের জন্য দাঁড়াও,আল্লাহর কসম,এটা বিদআত। নবী ﷺ তা শুধু এক মাস করেছেন। দেখ, তোমরা যে নামাযে হাত তুলে কুনূত পড়, আল্লাহর কসম, এটিও বিদআত। নবী ﷺ তো শুধু কাঁধ পর্যন্ত হাত তুলতেন। (আলমু’জামুল কাবীর তবারানী; মাজমাউয যাওয়াইদ ২/১৩৭)

উপরোক্ত রেওয়ায়েতের সরল অর্থ এটাই যে, নবী ﷺ কুনূতের জন্য যদিও রাফয়ে ইয়াদাইন করতেন কিন্তু দোয়ার মতো হাত উঠিয়ে কুনূত পড়তেন না।

দ্বিতীয় ও তৃতীয় পদ্ধতি সম্পর্কে কথা এই যে, কুনূত যদি রুকুর আগে পড়া হয়, যেমন বিতরের কুনূত, তো রুকুর আগের হালত যেহেতু কিয়ামের হালত, আর কিয়ামের হালতে হাত বাঁধা সুন্নত তাই এ সময় হাত বাঁধা থাকবে। পক্ষান্তরে কুনূতে নাযিলা যেহেতু রুকুর পর কওমার হালতে পড়া হয় আর কওমার হালতে হাত বাঁধা সুন্নত নয় এজন্য এ কুনূত হাত ছেড়ে পড়া হবে।

والله اعلم بالصواب
উত্তর দিয়েছেন
শায়েখ উমায়ের কোব্বাদী