ব্যভিচার থেকে তাওবা করার পর আল্লাহ তাআলার ক্ষমা পাওয়া যাবে কি?

জিজ্ঞাসা–১৪৩০: হুজুর,আমি গোপনে আমার প্রতিবেশী এক বিধবা নারীর সাথে যেনা করে ফেলেছি একাধিক বার এবং এখন আমি তার থেকে বিরত। এখন তার বিবাহ হয়ে গেছে। আমি তার সাথে যেনা করার পর আমার অপরাধের জন্য কতটা শাস্তি হতে পারে তা হাদিস থেকে জানতে পেরে তার কাছে ক্ষমা চাই। নিজে তওবা করি এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই। আল্লাহ্ কি আমার এই গুনাহ ক্ষমা করেছেন? [বিঃদ্রঃআমি আমার এই অপরাধের কথা, অপরাধ করার যে পরিণতি হয়েছে তার কথা ঢাকা এফ এম এর রেডিও অনুষ্ঠান সিকরেটস্ এ প্রচার করি; এই কারণে যাতে করে আমার মতো অপরাধ যে আর কেউ না করে। এই প্রচারটা কি আমার অপরাধ হয়েছে? বলবেন প্লিজ।]–ইচ্ছাকৃতভাবে নাম প্রকাশ করা হয় নি।

জবাব:

এক. আলেমগণ বলেছেন, প্রত্যেক গুনাহ থেকে তাওবা করা ওয়াজিব। যদি গুনাহটি বান্দার মাঝে ও আল্লাহ্‌র মাঝে হয়ে থাকে; কোন মানুষের হক্বের সাথে সম্পৃক্ত না হয় তাহলে সে তাওবার জন্য শর্ত তিনটি: ১। গুনাহ ত্যাগ করা। ২। কৃত কর্মের জন্য অনুতপ্ত হওয়া। ৩। সে গুনাহতে পুনরায় লিপ্ত না হওয়ার দৃঢ় সিদ্ধান্ত নেওয়া। যদি এ তিনটি শর্তের কোন একটি না পাওয়া যায় তাহলে সে তাওবা শুদ্ধ হবে না।

আর যদি গুনাহটি মানুষের সাথে সম্পৃক্ত হয় তাহলে সে তাওবার জন্য শর্ত চারটি: উল্লেখিত তিনটি এবং হক্বদারের হক্ব থেকে নিজেকে মুক্ত করা।

প্রিয় প্রশ্নকারী দীনী ভাই, আল্লাহ তাআলার অশেষ রহমত যে, তিনি তাওবার দরজা খোলা রেখেছেন। সুতরাং যদি আপনার ক্ষেত্রে এ শর্তগুলো পূর্ণ হয় তাহলে আল্লাহ্‌র ইচ্ছায় আপনার তাওবা কবুল হওয়ার উপযোগী। এরপরে তাওবা কবুল হয় নি; এমন ওয়াসওয়াসা বা খুতখুত রাখা উচিত হবে না। কেননা এটি শয়তানের পক্ষ থেকে এবং আল্লাহ্‌ ও তাঁর রাসূল যেভাবে উল্লেখ করেছেন যে, একনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত তওবাকারীর তাওবা কবুল হয়— এ ধরণের খুতখুত এর বিপরীত। আল্লাহ বলেন,

إِنَّمَا التَّوْبَةُ عَلَى اللَّهِ لِلَّذِينَ يَعْمَلُونَ السُّوءَ بِجَهَالَةٍ ثُمَّ يَتُوبُونَ مِنْ قَرِيبٍ فَأُولَئِكَ يَتُوبُ اللَّهُ عَلَيْهِمْ وَكَانَ اللَّهُ عَلِيماً حَكِيماً

নিশ্চয় তাওবা কবূল করা আল্লাহর জিম্মায় তাদের জন্য, যারা অজ্ঞতাবশত মন্দ কাজ করে। তারপর শীঘ্রই তাওবা করে। অতঃপর আল্লাহ এদের তাওবা কবুল করবেন আর আল্লাহ মহাজ্ঞানী, প্রজ্ঞাময়। (সূরা নিসা ১৭)

হাদিস শরিফে এসেছে, মা’ইয ইবনু মালিক রাযি. রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর নিকট এসে বললো, হে আল্লাহর রাসুল! আমাকে পবিত্র করুন। তখন রাসুলুল্লাহ ﷺ বললেন,

وَيْحَكَ، ارْجِعْ فَاسْتَغْفِرِ اللَّهَ وَتُبْ إلَيْهِ

দুর্ভাগা! ফিরে চলে যাও এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর ও তাওবা কর। (সহিহ মুসলিম ১৬৯৫)

উক্ত হাদিসের ব্যাখ্যায় ইমাম নববী রহ. বলেন,

وَفِي هَذَا الْحَدِيث دَلِيل عَلَى سُقُوط إِثْم الْمَعَاصِي الْكَبَائِر بِالتَّوْبَةِ , وَهُوَ بِإِجْمَاعِ الْمُسْلِمِينَ

তাওবার মাধ্যমে কবিরা গুনাহয় লিপ্ত ব্যক্তির গুনাহ অকৃতকার্য হয়ে পড়ে। এক্ষেত্রে মুসলিম উম্মাহর ঐক্যমত রয়েছে। (শরহু মুসলিম ১১/১৯৯)

দুই. উদ্দেশ্য যেটাই হোক; আল্লাহ তাআলা আপনার যে অপরাধ গোপন রেখেছেন, তা রেডিও অনুষ্ঠানের মাধ্যমে প্রচার করে গোটা দেশবাসীকে জনানো জায়েয হয় নি। সুতরাং এ থেকেও তাওবা করুন। কেননা, রাসূলুল্লাহ বলেছেন,

اِجْتَنِبُوْا هَذِهِ الْقَاذُوْرَاتِ الَّتِيْ نَهَى اللهُ عَنْهَا، فَمَنْ أَلَمَّ بِهَا فَلْيَسْتَتِرْ بِسِتْرِ اللهِ، وَلْيَتُبْ إِلَى اللهِ، فَإِنَّهُ مَنْ يُبْدِ لَنَا صَفْحَتَهُ نُقِمْ عَلَيْهِ كِتَابَ اللهِ تَعَالَى

তোমরা ব্যভিচার থেকে দূরে থাকো, যা আল্লাহ তাআলা তোমাদের জন্য নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন। এরপরও যে ব্যক্তি শয়তানের ধোঁকায় পড়ে তা করে ফেলে সে যেন তা লুকিয়ে রাখে। যখন আল্লাহ তাআলা তা গোপনই রেখেছেন। তবে সে যেন এ জন্য আল্লাহ তাআলার নিকট তাওবা করে নেয়। কারণ, যে ব্যক্তি তা আমাদের (তথা বিচারকের) নিকট প্রকাশ করে দিবে তার ওপর আমরা অবশ্যই আল্লাহ তাআলার বিধান প্রয়োগ করবোই। ( হাকিম ৪/২৭২ বাইহাকী ৮/৩৩০)

হাফেয ইবনু হাজার আসকালনী রহ. বলেন,

ويؤخذ من قضيته – أي : ماعز عندما أقرَّ بالزنى – أنه يستحب لمن وقع في مثل قضيته أن يتوب إلى الله تعالى ويستر نفسه ولا يذكر ذلك لأحدٍ . . . وبهذا جزم الشافعي رضي الله عنه فقال : أُحبُّ لمن أصاب ذنباً فستره الله عليه أن يستره على نفسه ويتوب

মা’ইয রাযি.-এর ব্যভিচারের স্বীকারোক্তির ঘটনা থেকে এই শিক্ষা নেয়া যায় যে, যে ব্যক্তি এজাতীয় বিষয়ে লিপ্ত হবে তার জন্য মুস্তাহাব হল, তাওবা করা, বিষয়টি গোপন রাখা, কারো কাছে প্রকাশ না করা। ইমাম শাফিঈ রহ. দৃঢ়তার সঙ্গে একথাই বলেন যে, যে ব্যক্তি গুনাহয় লিপ্ত হয়েছে, আর আল্লাহ তাআলা তা গোপন রেখেছেন, তার ব্যাপারে আমি এটা পসন্দ করি যে, সে নিজেও যেন তা গোপন রাখে এবং তাওবা করে। (ফাতহুল বারী ১২/১২৪, ১২৫)

والله أعلم بالصواب