মা বাবার অবাধ্য হওয়া কখন বৈধ?

জিজ্ঞাসা–১২৭৮: মা-বাবার অবাধ্য কখন হওয়া জায়েয? যেমন: ইবাতদ-বন্দেগী ছাড়া বা হারাম থেকে বেঁচে থাকার জন্যে অবাধ্য হওয়া যাবে?–মোহাম্মদ মনজুরুল আলম।

জবাব:

এক. মা-বাবাকে শ্রদ্ধা করা, ভালবাসা, তাঁদের কৃতজ্ঞতা স্বীকার করা, কথা শোনা, গুরুত্ব দেওয়া, বাধ্য হওয়া শরিয়তের দৃষ্টিতে ওয়াজিব এবং তাঁদের অবহেলা করা, নাফরমানি করা হারাম। তবে বাবা-মা যদি অনৈতিক কাজে কিংবা অবৈধ কাজে জোর করে তাহলে বাধ্য হওয়া যাবে না। কেননা, আল্লাহ তাআলা বলেন,

وَإِن جَاهَدَاكَ عَلى أَن تُشْرِكَ بِي مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ فَلَا تُطِعْهُمَا وَصَاحِبْهُمَا فِي الدُّنْيَا مَعْرُوفًا وَاتَّبِعْ سَبِيلَ مَنْ أَنَابَ إِلَيَّ ثُمَّ إِلَيَّ مَرْجِعُكُمْ فَأُنَبِّئُكُم بِمَا كُنتُمْ تَعْمَلُونَ

যদি তাঁরা (পিতামাতা) তোমাদের উপর চাপ প্রয়োগ করে আমার সাথে কাউকে শরীক করার জন্য যা (শিরক) তোমার বোধগম্য নয়, তাহলে তুমি তাঁদের কথা অমান্য করো, (অর্থাৎ আমি আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করো না) আর পার্থিব জীবনে উৎকৃষ্ট পন্থায় তাঁদের সাথে সৎ সম্পর্ক বজায় রেখো। আর তুমি তাঁদের পথ অনুসরণ করো যারা (আমি এক) আমার প্রতি অবিচলভাবে আকৃষ্ট রয়েছে।’ (সূরা লুকমান ১৫)

রাসূলুল্লাহ বলেন,

فَإِنْ أُمِرَ بِمَعْصِيَةٍ، فَلَا سَمْعَ وَلَا طَاعَةَ

অসৎকাজে আনুগত্য নয় ;আনুগত্য কেবলমাত্র সৎকাজের ক্ষেত্রেই হতে হবে। (বুখারী ৭১৪৫  মুসলিম ১৮৪০)

হাসান বসরী রহ. বলেন, إن منعتْه أمُّه عن العشاء في الجماعة شفقة : لم يطعها যদি মা সন্তানের প্রতি মায়া দেখিয়ে ইশার জামাতে শরিক হতে বারণ করে তাহলে এ ক্ষেত্রে তাঁর আনুগত্য করা যাবে না। (বুখারী ১/২৩০)

ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল রহ.-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, বাবা যদি সন্তানকে জামাতে নামায আদায় করা থেকে নিষেধ করে তাহলে কী করবে? তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, এ জাতীয় ক্ষেত্রে বাবার কথা অমান্য করবে। (গিযাউল লুবাব ১/৩৮৫)

তাঁকে আরো জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, এক ব্যক্তি তাঁর সন্তানকে আদেশ করেছে যে, ফরয নামায ছাড়া কোনো নামায পড়বে না। এখন সন্তানের করণীয় কী? তিনি উত্তর দিয়েছেন, এই হুকুম অমান্য করবে এবং নফল পড়বে। (গিযাউল লুবাব ১/৩৮৪)

শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়া রহ. বলেন,

ويلزم الإنسان طاعة والديه في غير المعصية وإن كانا فاسقين ، وهو ظاهر إطلاق أحمد ، فإن شق عليه ولم يضره : وجب ، وإلا فلا

বাবা-মা ফাসেক হলেও বৈধ কাজের ক্ষেত্রে তাঁদের বাধ্য থাকা আবশ্যক। ইমাম আহমাদ রহ.-এর বক্তব্যের উদ্দেশ্যও এটাই। আর যদি বৈধ কাজ করতে গিয়ে সন্তানের জন্য কেবল কষ্ট হয় কিন্তু ক্ষতিকর না হয় তাহলেও তাঁদের বাধ্য থাকা ওয়াজিব। ( আল ফাতাওয়াল কুবরা ৫/৩৮১)

দুই. উক্ত আলোচনার আলোকে আমরা বাবা-মায়ের আনুগত্যের সীমারেখা সংক্ষেপে এভাবে নির্ণয় করতে পারি–

১. তাঁদের বাধ্য থাকার বিষয়টি কেবল বৈধ কাজের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। সুতরাং যদি তাঁরা ফরযে আইন, ওয়াজিব কিংবা সুন্নাতে মুয়াক্কাদা বর্জন করতে বলেন অথবা যদি তাঁরা কোনো হারাম কাজ করতে বলেন তাহলে সে ক্ষেত্রে তাঁদের আনুগত্য করা জায়েয হবে না।

২. যদি তাঁরা নফল-মুস্তাহাব পুরোপুরি ছেড়ে দেয়ার নির্দেশ দেন তাহলে তাঁদের এই নির্দেশ মানা যাবে না। কেননা, এর মাধ্যমে তাঁদের ইসলামের প্রতি অবহেলা প্রকাশ পায় এবং এই নির্দেশের মান্য করার মাঝে তাঁদের কোনো উপকার নিহিত নেই।

৩. যদি তাঁরা নফল-মুস্তাহাব পুরোপুরি নয় বরং বিশেষ কোনো যৌক্তিক কারণে নির্দিষ্ট কোনো নফল-মুস্তাহাব ছেড়ে দেয়ার নির্দেশ দেন তাহলে এক্ষেত্রে তাঁদের হুকুম মানা ওয়াজিব। যেমন, সন্তানের শরীর দুর্বল তাই তাকে নফল রোজা না রাখার নির্দেশ দিলেন কিংবা বাবা বা মায়ের কোনো প্রয়োজনে সন্তানকে নফল আমল ছেড়ে দিয়ে ওই কাজটি করে দিতে বললেন– তাহলে এই হুকুম মানা সন্তানের উপর ওয়াজিব।

৪. তাঁদের হুকুমকৃত কাজটি তাঁদের জন্য উপকারী হতে হবে। সুতরাং যদি তা তাঁদের জন্য ক্ষতিকর হয় তাহলে ওই হুকুম মান্য করা যাবে না।

৫. বাবা-মা যদি এমন কাজ করতে বলেন যা সন্তানের পক্ষে অসম্ভব কিংবা সম্ভব তবে জীবনের ঝুঁকি আছে তাহলে সে ক্ষেত্রে তাঁদের প্রতি বাধ্য থাকা জরুরি নয়। কেননা, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, لا ضرر ولا ضرار ক্ষতি ও ক্ষতি সাধনের কোন অনুমতি নেই। (সুনানে দারাকুতনী ৩০৭৯)

৬. উক্ত ক্ষেত্রসমূহে তাঁদের আনুগত্য না করা মানে তাঁদের সঙ্গে অসদাচারণ করা নয়। কেননা, উক্ত আয়াতে বলা হয়েছে,  পিতামাতার সেবা ও সদ্ব্যবহারের জন্য তাঁদের মুসলমানও হওয়া জরুরী নয়।

والله اعلم بالصواب

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

eleven − five =