যদি আল্লাহ সব মানুষের মনের কথা বুঝে থাকেন তাহলে…

জিজ্ঞাসা–৬০১: আসসালামু আলাইকুম। এই পৃথিবীতে আল্লাহ তাআলা মানুষ ছাড়া আরো অন্যান্য প্রাণী সৃষ্টি করেছেন যেগুলোর দেখাশোনা প্রতিনিয়ত তিনি করছেন। এখন আমার প্রশ্ন, আমরা অনেক সময় আল্লাহকে ডাকি, আমাদের মনের চাওয়াগুলো তার কাছে প্রার্থনা করি কিংবা খারাপ কোন কিছু চিন্তা করি তাহলে এই পৃথিবীতে এত মানুষ, আল্লাহ তাআলা এত মানুষের মনের খবর কিভাবে বুঝতে পারে? আর যদি বুঝতে পারি তাহলে আমাদের সব চাওয়াগুলো পূরণ হয় না কেন? আমাদের মা-বাবাকে ও তো আল্লাহ তাআলা সৃষ্টি করেছেন। সন্তান যত খারাপই হোক মা বাবার কাছে কোন কিছু চাইলে জোর করে হোক আর যেভাবেই হোক সন্তানের চাওয়াটা তারা পূরণ করে। তাহলে আমরা আল্লাহর কাছে চাইলে আল্লাহ আমাদের সব চাওয়া কেন পূরণ করে না?–Firoz Mahmud

জবাব: وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

এক. আল্লাহ তাআলা আমাদের মত নন; বরং তাঁর রয়েছে পরিপূর্ণ গুণ; তিনি সব ধরণের অক্ষমতা ও ব্যর্থতা থেকে পবিত্র এবং মুক্ত। আল্লাহ বলেন, لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَهُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ কোন কিছুই তাঁর অনুরূপ নয়। তিনি সব শুনেন, সব দেখেন। (সূরা শূরা ১১)

সুতরাং সকল মানুষের মনের খবর রাখা তাঁদের চাওয়াগুলো পূরণ করা তাঁর জন্য মোটেও কঠিন নয়। আল্লাহ বলেন,  إِنَّ ذَلِكَ عَلَى اللَّهِ يَسِيرٌ এটা আল্লাহর কাছে সহজ- (সূরা হজ ৭০)। অন্যত্র তিনি বলেন,

وَأَسِرُّوا قَوْلَكُمْ أَوِ اجْهَرُوا بِهِ إِنَّهُ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ أَلا يَعْلَمُ مَنْ خَلَقَ وَهُوَ اللَّطِيفُ الْخَبِيرُ

তোমরা তোমাদের কথা গোপনে বল অথবা প্রকাশ্যে বল, তিনি তো অন্তরের বিষয়াদি সম্পর্কে সম্যক অবগত। যিনি সৃষ্টি করেছেন, তিনি কি করে জানবেন না? তিনি সূক্ষ্নজ্ঞানী, সম্যক জ্ঞাত। (সূরা মূলক ১৩, ১৪)

শায়খ সা’দী রহ. উক্ত আয়াতের তাফসিরে লিখেন,

” هذا إخبار من الله بسعة علمه ، وشمول لطفه ، فقال : وَأَسِرُّوا قَوْلَكُمْ أَوِ اجْهَرُوا بِهِ ، أي : كلها سواء لديه ، لا يخفى عليه منها خافية ، فـ إِنَّهُ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ أي: بما فيها من النيات والإرادات ، فكيف بالأقوال والأفعال التي تسمع وترى ؟!

ثم قال مستدلا بدليل عقلي على علمه : أَلا يَعْلَمُ مَنْ خَلَقَ ؛ فمن خلق الخلق وأتقنه وأحسنه ، كيف لا يعلمه وَهُوَ اللَّطِيفُ الْخَبِيرُ ، الذي لطف علمه وخبره حتى أدرك السرائر والضمائر ، والخبايا والخفايا والغيوب ؟

উক্ত আয়াতে আল্লাহ তাআলার জ্ঞানের ব্যাপকতা ও সূক্ষদর্শিতার ব্যপ্তিময়তা বিষয়ে সংবাদ রয়েছে। তাই তিনি বলেছেন, ‘তোমরা তোমাদের কথা গোপনে বল অথবা প্রকাশ্যে বল…’ অর্থাৎ, তাঁর কাছে সবটাই সমান। তাঁর কাছে কোনো কিছু গোপন নয়। কেননা, ‘ তিনি তো অন্তরের বিষয়াদি সম্পর্কে সম্যক অবগত’। সুতরাং কথা ও কর্মাদি যে তিনি শোনেন ও দেখেন; এটা তো আর বলার অপেক্ষা রাখে না! তারপর তাঁর জ্ঞানের ব্যাপকতার বিষয়ে যুক্তি পেশ করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘ যিনি সৃষ্টি করেছেন, তিনি কি করে জানবেন না?’ অর্থাৎ, যিনি এত সুনিপুণ ও সুন্দরভাবে নিজের সৃষ্টি বানিয়েছেন তিনি কি করে জানবেন না? অথচ ‘তিনি তো সূক্ষদর্শী ও সম্যক জ্ঞাত’। তাই তিনি জানেন সকল গুপ্ত, লুকনো, নিগূঢ়, রহস্যময় ও অদৃশ্য বিষয়। (তাফসির আস সা’দী ৮৭৬)

দুই. আগেই বলেছি, আল্লাহ তাআলা আমাদের মত নন। তিনি স্রষ্টা, আমরা তাঁর সৃষ্টি। তিনি মালিক, আমরা তাঁর গোলাম। তাঁর জ্ঞানের পরিধি অসীম, আমাদের জ্ঞানের পরিধি সসীম। তাই অনেক সময় আমরা একটা বিষয়কে কল্যাণকর মনে করি, অথচ আল্লাহ জানেন, তা কল্যাণকর নয়। আবার আমরা অনেক সময় কল্যাণকর বিষয়কেও অকল্যাণকর মনে করি। প্রকৃতপক্ষে কিসে আমাদের কল্যাণ এবং কিসে কল্যাণ নয়; তা আমরা জানি না। আল্লাহ জানেন। আল্লাহ বলেন,

وَعَسَى أَنْ تَكْرَهُوا شَيْئًا وَهُوَ خَيْرٌ لَكُمْ وَعَسَى أَنْ تُحِبُّوا شَيْئًا وَهُوَ شَرٌّ لَكُمْ وَاللَّهُ يَعْلَمُ وَأَنْتُمْ لَا تَعْلَمُونَ

তোমাদের কাছে হয়তো কোন একটা বিষয় পছন্দসই নয়, অথচ তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর। আর হয়তোবা কোন একটি বিষয় তোমাদের কাছে পছন্দনীয় অথচ তোমাদের জন্যে অকল্যাণকর। বস্তুতঃ আল্লাহই জানেন, তোমরা জান না। (সূরা বাকারা ২১৬)

সুতরাং আল্লাহ তাঁর বিশ্বাসী বান্দার জন্য যা কিছু নির্ধারিত করে রেখেছেন, তাঁর সব কিছুতেই রয়েছে কল্যাণ। চাই তা বান্দার বুঝে আসুক বা না আসুক। আর কেনই বা তা হবে না! ‏ اللَّهُ أَرْحَمُ بِعِبَادِهِ مِنْ هَذِهِ بِوَلَدِهَا আল্লাহ তো একজন মা তার সন্তানের উপর যতটুকু দয়ালু, তিনি তার বান্দার উপর তদাপেক্ষা অধিক দয়ালু। (বুখারি ৫৫৭৩)

তাই রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,

عَجَبًا لِأَمْرِ الْمُؤْمِنِ إِنَّ أَمْرَهُ كُلَّهُ خَيْرٌ وَلَيْسَ ذَاكَ لِأَحَدٍ إِلَّا لِلْمُؤْمِنِ : إِنْ أَصَابَتْهُ سَرَّاءُ شَكَرَ ، فَكَانَ خَيْرًا لَهُ ، وَإِنْ أَصَابَتْهُ ضَرَّاءُ صَبَرَ ، فَكَانَ خَيْرًا لَهُ

মুমিনের অবস্থা ভারি অদ্ভুত। তাঁর সমস্ত কাজই তাঁর জন্য কল্যাণকর। মুমিন ব্যাতিত অন্য কারো জন্য এ কল্যাণ লাভের ব্যাবস্থা নেই। তাঁরা আনন্দ (সুখ শান্তি) লাভ করলে শুকরিয়া জ্ঞাপন করে, তা তাঁর জন্য কল্যাণকর হয়, আর দুঃখকষ্টে আক্রান্ত হলে ধৈর্যধারণ করে, এও তাঁর জন্য কল্যাণকর হয়। (মুসলিম ৭২২৯)

সুতরাং প্রিয় প্রশ্নকারী ভাই, আমরা আল্লাহর কাছে কোনো কিছু চাইলে যদি তিনি হুবহু তা আমাদেরকে না দিয়ে থাকেন তাহলে মুমিন হিসেবে এটাই বিশ্বাস করতে হবে যে, এতেই আমাদের জন্য কল্যাণ নিহিত ছিল। তাছাড়া দুনিয়াতেই সব চাওয়া পূরণ হয়ে গেলে আখেরাত কেন! আল্লাহ বলেন,

انظُرْ كَيْفَ فَضَّلْنَا بَعْضَهُمْ عَلَى بَعْضٍ وَلَلآخِرَةُ أَكْبَرُ دَرَجَاتٍ وَأَكْبَرُ تَفْضِيلاً
দেখুন, আমি তাদের একদলকে অপরের উপর কিভাবে শ্রেষ্ঠত্ব দান করলাম। পরকাল তো নিশ্চয়ই মর্তবায় শ্রেষ্ঠ এবং ফযীলতে শ্রেষ্ঠতম। (সূরা ইসরা ২১)
তিন. দোয়ার ব্যাপারে অধিকাংশ মানুষ দুটি ভুল করে থাকে। আর প্রিয় ভাই, আপনার প্রশ্নের আলোকে আমরা আপনাকে দুটি ভুলের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করছি-
১. আপনার ধারণা মতে দোয়া করলেই কবুল হওয়া বাঞ্ছনীয়। আপনার এই ধারণা ভুল। কেননা, দোয়া কবুল হওয়ার কিছু শর্ত আছে। অনুরূপভাবে কবুল না হওয়ার ক্ষেত্রেও কিছু প্রতিবন্ধকতা আছে। যেমন, প্রতিবন্ধকতার বিষয়ে এক হাদিসে এভাবে এসেছে, রাসুলুল্লাহ বলেন,
لَا يَزَالُ يُسْتَجَابُ لِلْعَبْدِ مَا لَمْ يَدْعُ بِإِثْمٍ أَوْ قَطِيعَةِ رَحِمٍ مَا لَمْ يَسْتَعْجِلْ قِيلَ يَا رَسُولَ اللَّهِ مَا الِاسْتِعْجَالُ قَالَ يَقُولُ قَدْ دَعَوْتُ وَقَدْ دَعَوْتُ فَلَمْ أَرَ يَسْتَجِيبُ لِي فَيَسْتَحْسِرُ عِنْدَ ذَلِكَ وَيَدَعُ الدُّعَاءَ
বান্দার দোয়া সর্বদা গৃহীত হয় যদি না সে অন্যায় কাজ অথবা আত্মীয়তার সম্পর্কচ্ছেদ করার জন্য দোয়া করে এবং (দোয়ায়) তাড়াহুড়া না করে। জিজ্ঞেস করা হলো, হে আল্লাহর রসূল! (দোয়ায়) তাড়াহুড়া করা কি? তিনি বললেন, সে বলতে থাকে, আমি দোয়া তো করেছি, আমি দোয়া তো করেছি; কিন্তু আমি দেখতে পেলাম না যে, তিনি আমার দোয়া কবুল করেছেন। তখন সে ক্লান্ত হয়ে পড়ে, আর দোয়া করা পরিত্যাগ করে। (মুসলিম ২৭৩৫)
২. আপনার ধারণা মতে দোয়া কবুল হওয়ার পদ্ধতি একটাই। তাহল, যেটির জন্য দোয়া করা হয়েছে হুবহু তা পেয়ে যাওয়া। অথচ এ ধারণাও সঠিক নয়। কেননা, মূলত দোয়া কবুল হয় তিন পদ্ধতিতে। কাঙ্ক্ষিত বস্তু অর্জনের মাধ্যমে অথবা কোনো ক্ষতি দূরীভূত হওয়ার মাধ্যমে কিংবা আখেরাতে সাওয়াব অর্জনের মাধ্যমে। এ মর্মে রাসুলুল্লাহ বলেন,
مَا مِنْ مُسْلِمٍ يَدْعُو بِدَعْوَةٍ لَيْسَ فِيهَا إِثْمٌ وَلَا قَطِيعَةُ رَحِمٍ إِلَّا أَعْطَاهُ اللَّهُ بِهَا إِحْدَى ثَلَاثٍ : إِمَّا أَنْ تُعَجَّلَ لَهُ دَعْوَتُهُ ، وَإِمَّا أَنْ يَدَّخِرَهَا لَهُ فِي الْآخِرَةِ ، وَإِمَّا أَنْ يَصْرِفَ عَنْهُ مِنْ السُّوءِ مِثْلَهَا ، قَالُوا : إِذًا نُكْثِرُ ؟ قَالَ : اللَّهُ أَكْثَرُ
যে কোন মুসলমান ব্যক্তি পাপাচার বা আত্মীয় সম্পর্ক ছিন্ন করার দোয়া ব্যতীত যে কোন দোয়া করলে আল্লাহ তাকে তিনটি জিনিসের যে কোন একটি দান করেন- (১) হয় দ্রুত তার দোয়া কবুল করেন অথবা (২) তা তার পরকালের জন্য সঞ্চিত রাখেন অথবা (৩) অনুরূপ কোন ক্ষতি তার থেকে অপসারিত করেন। এক ব্যক্তি বললো, তাহলে সে তো অধিক পরিমাণে দোয়া করতে পারে। তিনি বলেন, আল্লাহ তার চেয়েও অধিক কবুলকারী। (মুসনাদে আহমাদ ১০৭৪৯ আল আদাবুল মুফরাদ ৭১৫)
والله اعلم بالصواب
উত্তর দিয়েছেন
মাওলানা উমায়ের কোব্বাদী
আরো পড়ুন-
শুধু ঈমানের উপর কি জান্নাতের সুসংবাদ; যদিও ব্যক্তি কবিরা গুনাহ করে? অমুসলিম দুনিয়া ও আখেরাতে ভাল কাজের প্রতিদান পাবে কিনা? বিধর্মীর ঘরে জন্ম নেয়া মানে কি আল্লাহ্‌র রহমত থেকে বঞ্চিত হওয়া?তাওহীদ বাস্তবায়িত হয় কিভাবে এবং বাস্তবায়নকারী কী পুরস্কার পাবে?মুসলিম হওয়ার পর কুফরি যামানার ভাল কাজগুলোর সাওয়াব পাবে কিনা?অপঘাতে মারা গেলে আখেরাতে ক্ষমা পাবে কিনা?শনির দশা থেকে মুক্তির উপায় বিষয়ে ইসলাম কী বলে?চিরকাল জান্নাতে এবং চিরকাল জাহান্নামে বলতে কী বুঝানো হয়েছে?আল্লাহর কাছে কি এমন কিছু চাওয়া যাবে না যা মানুষের কাছে চাওয়া যায়? ইসমে আ’যম কী? আমি ডিপ্রেশনে ভুগছি; কী করতে পারি? সুস্বাস্থ্যের জন্য আমল ও দোয়া

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

four × four =