শিরকের ওয়াসওয়াসা থেকে বেঁচে থাকার আমল ও দোয়া

জিজ্ঞাসা–১৪৪০: শিরক কি তা জানার পর আমি খুব চিন্তায় আছি। চলাচলের সময় কোন মেয়ে বা কোন স্যর দেখলে মাথা একটু নিচু করলেই মনে হয় শিরক করলাম। আবার ডিউটিতে সবাই চেয়ারে বসে থাকলে মাঝে মাঝে আমি পিছনে থেকে সামনের বন্ধুর বসা চেয়ারে মাথা ঠেকিয়ে ঘুমায়। পরে মনে হল আমি শিরক করলাম। অনেক সময় বলি, মাস্ক পরে থাক তাহলে করোনা হবে না , এই ওষুধ খেলে ঠিক হয়ে যাবি তুই। এই সব বললেই মনে হয় শিরক করলাম। কিন্তু আমি সব সময় মনে করি, আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই। আমি কি সত্যিই শিরক করতেছি? আমি বার বার এই শিরক গুনাহর জন্য তওবা করি। এই শিরক গুনাহ বার বার করে তওবা করলে কি তওবা কবুল হবে? খুব খারাপ লাগে, দূশ্চচিন্তায় আছি অনেক।–Rakib Hossain

জবাব:

এক. প্রিয় ভাই, প্রশ্নেল্লেখিত বিষয়গুলো শিরক নয়; বরং এটা শয়তানের ওয়াসওয়াসা। সুতরাং আপনি আল্লাহর রহমত হতে নিরাশ হবেন না। কেননা, এটা ঈমানের লক্ষণ যে, আপনার মনে এই সব কথা আসলে আপনি উদ্বিগ্ন হন। আপনার কাছে এগুলো মন্দ চিন্তা বলে মনে হয়। ভেবে দেখুন, অন্তরে যদি ঈমান না থাকত তাহলে কি আপনি উদ্বিগ্ন হতেন না কিংবা একে মন্দ বলে মনে করতেন? বোঝা গেল যে, অন্তরে ঈমানের দৌলত রয়েছে।

হাদিসে এসেছে, একবার সাহাবায়ে কেরমের একদল রাসূলুল্লাহ -এর কাছে এসে জিজ্ঞাসা করলেন, আমরা আমাদের অন্তরে কখনো কখনো এমন বিষয় অনুভব করি, যা মুখ দিয়ে উচ্চারণ করা আমাদের কাছে খুব কঠিন মনে হয়। রাসূলুল্লাহ বললেন, সত্যিই কি তোমরা এরকম পেয়ে থাক? তাঁরা বললেন হ্যাঁ, আমরা এরকম অনুভব করে থাকি। রাসূলুল্লাহ বললেন, ذَاكَ صَرِيحُ الْإِيمَانِ এটি তোমাদের ঈমানের স্পষ্ট প্রমাণ। (মুসলিম, কিতাবুল ঈমান, অনুচ্ছেদ: অন্তরের ওয়াসওয়াসা)

সুতরাং এইসব অনাহূত ভাবনা যখন আপনাকে বিরক্ত করবে তখন স্মরণ করুন যে, এটা ঈমানের আলামত। শয়তান তার উদ্দেশ্য হাসিলের চেষ্টা করছে। তাকে বলে দিন, ঠিক আছে তুমি তোমারা মতো চেষ্টা কর, আমিও আমার মতো চেষ্টা করছি। এরপর নিজ কাজে মগ্ন হয়ে যান। এদিকে বেশি মনোযোগ দিবেন না। কেননা, এইসব অবাঞ্ছিত চিন্তাকে গুরুত্ব দিয়ে কীভাবে তা দূর করা যায় এ চিন্তায় পড়ে গেলে আপনি এখানেই আটকা পড়ে যাবেন। সামনে অগ্রসর হওয়া আর সম্ভব হবে না। এভাবে শয়তানের উদ্দেশ্য পূরণ হয়ে যাবে।

যে কোনো ওয়াসওয়াসার প্রধান চিকিৎসা এটাই যে, একে গুরুত্ব না দেয়া। কী চিন্তা আসল, কী চিন্তা গেল-তা না ভেবে নিজের কাজে মশগুল থাকুন। কেননা, এটা মূলত শয়তানের কাজ। আল্লাহ তাআলা বলেন,

إِنَّمَا النَّجْوَىٰ مِنَ الشَّيْطَانِ لِيَحْزُنَ الَّذِينَ آمَنُوا وَلَيْسَ بِضَارِّهِمْ شَيْئًا إِلَّا بِإِذْنِ اللَّهِ ۚ وَعَلَى اللَّهِ فَلْيَتَوَكَّلِ الْمُؤْمِنُونَ

এই ওয়াসওয়াসা তো শয়তানের কাজ; মুমিনদেরকে দুঃখ দেয়ার দেয়ার জন্যে। তবে (এই ওয়াসওয়াসা সৃষ্টি করে) সে মুমিনদেরকে চুল পরিমাণ ক্ষতি করতে পারে না, আল্লাহর হুকুম ছাড়া। মুমিনদের উচিত আল্লাহর উপর ভরসা করা। (সূরা মুজাদালাহ ১০)

দুই. প্রিয় ভাই, শিরক থেকে বেঁচে থাকার জন্য আল্লাহ তাআলার নিকট প্রার্থনা করার উপায়ও রাসুলুল্লাহ ﷺ শিখিয়ে দিয়েছেন। হাদিস শরিফে এসেছে, মা’কাল ইবনু ইয়াসার রাযি. বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ আবু বকর রাযি.-কে বলেছেন,

يا أبا بكرٍ ، لَلشِّركُ فيكم أخْفى من دبيبِ النَّملِ والذي نفسي بيدِه ، لَلشِّركُ أخْفى من دَبيبِ النَّملِ ، ألا أدُلُّك على شيءٍ إذا فعلتَه ذهب عنك قليلهُ و كثيرهُ ؟ قل : ااَللَّهُمَّ اِنِّىْ اَعُوْذُبِكَ اَنْ أُشْرِكَ بِكَ وَ اَنَا أَعْلَمُ وَ اَسْتَغْفِرُكَ لِمَا لَا أَعْلَمُ

হে আবু বকর! নিশ্চয় তোমাদের মাঝে শিরক পিপীলিকার পদধ্বনির চেয়ে সূক্ষ্ম। সেই সত্তার শপথ যাঁর হাতে আমার প্রাণ, শিরক পিপীলিকার পদধ্বনির চেয়ে সূক্ষ্ম। আমি কি আপনাকে এমন কিছু শিখিয়ে দেব না, যা বললে শিরকের অল্প ও বেশি সবই দূর হয়ে যাবে? আপনি বলুন,

ااَللَّهُمَّ اِنِّىْ اَعُوْذُبِكَ اَنْ أُشْرِكَ بِكَ وَ اَنَا أَعْلَمُ وَ اَسْتَغْفِرُكَ لِمَا لَا أَعْلَمُ

হে আল্লাহ, আমি সজ্ঞানে তোমার সঙ্গে শিরক করা থেকে তোমার কাছে আশ্রয় চাই এবং যা আমার অজ্ঞাত তা থেকেও তোমার কাছে ক্ষমা চাই। (সহিহ আলআদাবুল মুফরাদ ৫৫১)

والله أعلم بالصواب