গোপনে বিয়ে ও তালাকের পর ভবিষ্যতে তা প্রকাশ করা কি জরুরি?

জিজ্ঞাসা–১৯৩৯ :আসসালামু আলাইকুম। হযরত! ইউনিভার্সিটির ৩য় বর্ষে থাকাকালীন বাবা মাকে না জানিয়ে লুকিয়ে আমার বিয়ে হয়েছিল এক মেয়ের সাথে। তার সাথে অনলাইনে পরিচয়। বিয়ের আগে সরাসরি দেখিওনি তাকে। আমার বয়স কম ছিল, আবেগ বেশি ছিল। আর সেই মেয়েটি এভাবে লুকিয়ে বিয়ের জন্য অনেক চাপাচাপি করেছিল যেন সম্পর্কটা হালাল হয়, আর তার পরিচিত অন্যরাও এমন করেছে। আমিও আবেগতাড়িত হয়ে রাজি হই। দ্বীন পুরোপুরি মানতে না পারলেও মানার ইচ্ছা ছিল। তার বাবা মাও জানতেন না বিয়ের ব্যাপারে। ছোট এক মাদ্রাসা-মসজিদে একজন হুযুর ঐ মেয়ের থেকে ফোনের মাধ্যমে সম্মতি নিয়ে অল্প মোহরানায় বিয়ে পড়িয়ে দেন। বিয়ের পর দেখতে পাই তার মধ্যে বেশ কিছু সমস্যা। তার বাবা মা তেমন শিক্ষিত না আর আমার বাবা মা সরকারী কর্মকর্তা ও সরকারি চাকরিরত এবং শিক্ষিত। সেই মেয়েটির সাথে আমার অনেক বেশি ঝগড়া হতো কারণ সে আমার সুবিধা-অসুবিধা বুঝতে চাইতো না, অনেক বেশি অভিযোগ করতো যার বেশিরভাগই মিথ্যা। অনেক বেশি নেগেটিভ চিন্তা করতো আর মিথ্যা অপবাদ দিতো আমাকে। তার কোনো ভুল হলে আর সেটা নিয়ে তাকে বললেই ঝগড়া শুরু হয়ে যেত, নিজের ভুল মানতে চাইতো না আর অনেক বেশি আঘাত দিয়ে কথা বলতো। কোনো কিছু তার মন মতো না হলেই তার মুখ ছুটে যেত আর আজেবাজে সত্যমিথ্যা অনেক কথা বলতো। বাসায় মা আর বড় বোনকে বলেছিলাম মেয়েটির সাথে সম্পর্ক আছে তবে বিয়ের কথা বলিনি। তার ব্যাপারে জেনে মা ও বড় বোন উভয়ই তার সাথে রিলেশন ছেড়ে দিতে বলেন। তার আর আমার মাঝে বিদ্যমান কুফুগত অমিল ও সমস্যাগুলোর কথা চিন্তা করে গোপনেই তাকে এক তালাক দিয়ে দেই। তার সাথে লুকিয়ে বিয়ে এবং ঘটে যাওয়া যাবতীয় কর্মকাণ্ড থেকে আল্লাহর নিকট তাওবা করছি আল্লাহ যেন আমাকে ক্ষমা করে দেন।

এখন প্রশ্ন হলো পরবর্তীতে আমার বিয়ে করতে গেলে কি এই লুকিয়ে বিয়ে ও ডিভোর্স এর ব্যাপারে সবাইকে জানানোটা আবশ্যক? খুবই দুশ্চিন্তায় আছি এটা নিয়ে। কারণ আমার বাবা মা, পাড়াপ্রতিবেশি ও আত্মীয়স্বজন আমাকে অনেক বিশ্বাস ও ভরসা করে এবং সম্মান করে। আমার এই কাজ নিয়ে জানতে পারলে তারা অনেক দুঃখ পাবে এবং আমার মুখ দেখানোর জায়গা থাকবে না।

এছাড়া নতুন করে কাউকে বিয়ে করতে গেলে কি তাকে অতীতের এই কালো দাগ যা থেকে আমি সম্পূর্ণভাবে তাওবা করেছি সেটি বলা আবশ্যক? কারণ স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে এরকম বিষয় অনেক সুদূরপ্রসারী খারাপ প্রভাব ফেলে। এখন আমার করণীয় সম্পর্কে দয়া করে জানাবেন। অতীতের এই কলঙ্ক কাউকে জানালে যে পরিমাণ অপমানিত ও অসম্মানিত হবো আমি ও আমার পরিবার তার চেয়ে মনে হয় মরে যাওয়াও ভালো।—ইফতেখার আলম। 

‎‎জবাব : وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

এক. আপনি যে কাজগুলো করেছেন—গোপনে সম্পর্ক, লুকিয়ে বিয়ে, পরে তালাক—এসবের কারণে অনুশোচনা হওয়া এবং আল্লাহর কাছে তওবা করা ভালো লক্ষণ। মানুষ ভুল করতে পারে, বিশেষত কম বয়স, আবেগ ও অপরিপক্ব অবস্থায়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কেউ গুনাহ বা ভুল থেকে ফিরে এসে সত্যিকারের তওবা করলে আল্লাহ তাআলার রহমতের দরজা খোলা থাকে।

আল্লাহ তাআলা বলেন

إِلَّا مَنْ تَابَ وَآمَنَ وَعَمِلَ عَمَلًا صَالِحًا فَأُولَٰئِكَ يُبَدِّلُ اللَّهُ سَيِّئَاتِهِمْ حَسَنَاتٍ

তবে যারা তওবা করে, ঈমান আনে এবং সৎকাজ করে—আল্লাহ তাদের মন্দ কাজগুলোকে নেকিতে পরিবর্তন করে দেন। [সূরা ফুরকান : ৭০]

দুই. এখন আপনার মূল প্রশ্নের উত্তর হলো

আপনার অতীতের এ বিয়ে ও তালাক সবার কাছে প্রকাশ করা শরয়িভাবে আবশ্যক নয়।  ইসলামে নিজের গোপন গুনাহ বা অতীতের ভুল অযথা প্রচার করতে উৎসাহ দেওয়া হয় না। রাসূল ﷺ বলেছেন,

كُلُّ أُمَّتِي مُعَافًى إِلَّا الْمُجَاهِرِينَ

আমার উম্মতের সবাই ক্ষমাপ্রাপ্ত হতে পারে, তবে যারা প্রকাশ্যে গুনাহ প্রচার করে তারা নয়। [সহিহ বুখারী : ৬০৬৯; সহিহ মুসলিম : ৭৬৭৬]

তাই অতীতের এমন বিষয় যা আল্লাহ গোপন রেখেছেন, তা অপ্রয়োজনীয়ভাবে সবার কাছে বলা জরুরি নয়।

তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে: ভবিষ্যতে বিয়ের সময় যদি আইনগত, সামাজিক বা শরয়ি কোনো জটিলতা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে—যেমন,

  • আগের স্ত্রীর কোনো দাবি,
  • কাবিন/ডকুমেন্ট,
  • সাক্ষী বা প্রমাণ,
  • ভবিষ্যতে প্রকাশ পেলে বড় ধরনের প্রতারণার অভিযোগ,

তাহলে বিশ্বস্ত আলেম ও আইনগত পরামর্শ নিয়ে কীভাবে বিষয়টি পরিচালনা করবেন, তা ঠিক করা উচিত।

তিন. আর নতুন যাকে বিয়ে করবেন তাকে সব বিস্তারিত অতীত খুলে বলা ‘ফরজ’ নয়। তবে সরাসরি মিথ্যা বলা বা প্রতারণা করাও জায়েজ নয়। যদি এমন প্রশ্ন আসে যেখানে সত্য গোপন করলে গুরুতর ক্ষতি বা প্রতারণা হয়, তখন কৌশলী ও সীমিতভাবে সত্য বলা যেতে পারে।

ইসলাম যে তিনটি ক্ষেত্রে ‘তাওরিয়া’ তথা কৌশলী-উত্তর দেয়ার অবকাশ দিয়েছে, তন্মধ্য থেকে একটি হল, স্বামী-স্ত্রীর মাঝে ভালোবাসা ও মিল সৃষ্টি বা রক্ষা করার জন্য। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন,

لاَ يَحِلُّ الْكَذِبُ إِلاَّ فِي ثَلاَثٍ يُحَدِّثُ الرَّجُلُ امْرَأَتَهُ لِيُرْضِيَهَا وَالْكَذِبُ فِي الْحَرْبِ وَالْكَذِبُ لِيُصْلِحَ بَيْنَ النَّاسِ

তিনটি ক্ষেত্র ব্যতীত অসত্য বলা হালাল নয়–১। স্ত্রীকে সন্তুষ্ট করতে যেয়ে কিছু বলা ২। যুদ্ধের প্রয়োজনে অসত্য বলা ৩। এবং পরস্পর সুসম্পর্ক স্থাপন করতে গিয়ে কিছু অসত্য বলা। [তিরমিযী : ১৯৪৫]

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো— 

  • আন্তরিক তওবা বজায় রাখা,
  • ভবিষ্যতে হারাম সম্পর্ক থেকে বেঁচে থাকা,
  • পরিবারকে কষ্ট দেয় এমন গোপন সম্পর্ক আর না করা,
  • দ্বীনদার, চরিত্রবান জীবন গড়া।

চার. আর একটি কথা; ‘মরে যাওয়াই ভালো’—এ ধরনের চিন্তা বিপজ্জনক। আপনি ভুল করেছেন, কিন্তু তওবার দরজা বন্ধ হয়নি। মানুষের সম্মানের চেয়ে আল্লাহর রহমত বড়। জীবন শেষ করে দেওয়া সমাধান নয়।

আল্লাহ তাআলা বলেন

لَا تَقْنَطُوا مِنْ رَحْمَةِ اللَّهِ

তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। [সূরা যুমার : ৫৩]

আপনি এখন স্থিরভাবে জীবন গুছানোর চেষ্টা করুন, দ্বীনের পথে থাকুন, এবং প্রয়োজনে কোনো বিজ্ঞ আলেম বা বিশ্বস্ত কাউন্সেলরের সাথে ব্যক্তিগতভাবে পরামর্শ করুন।

والله أعلم بالصواب
উত্তর দিয়েছেন