ভার্সিটি, দ্বীন ও ভবিষ্যৎ — সিদ্ধান্তহীনতায় একজন ছাত্রীর প্রশ্ন

জিজ্ঞাসা–১৯২২ : আমি জেনারেল পড়ুয়া। পাবলিক ভার্সিটি ছেড়ে দিয়েছি সহশিক্ষার জন্য। এখন ইসলামিক ইউনিভার্সিটিতে কুরানিক সাইন্স নিয়ে পড়ছি । তবে জেনারাল হওয়ায় তেমন কিছুই শিখতে পারছি না। আর একটা বিষয় উপলব্ধি হলো যে, ভার্সিটিতে দ্বীন ইলম শিখা যায় না। যারা সার্টিফিকেটর জন্য যায় তাদের জন্য ঠিক আছে। এখন আমি ৪র্থ সেমিস্টারে। দেখা যাচ্ছে, আমার কুরআনটাও পুরোপুরি সহিহ না। অনেকেই সাজেস্ট করে এক্সট্রা কোর্স করে শিখতে ফরজ ইলম। তবে ভার্সিটির সাথে আরেকটা কোর্স করলে কোনোটাই পুরাপুরি ফোকাস করা যায় না। এই ভার্সিটিও ছেড়ে দিতে চাই, তবে পরিবার কখনো রাজি হবে না। আর যেহেতু একটা বয়সে চলে আসছি তো এখন পরিবার বিয়ের চিন্তা করছে। ছোট বোনেরাও আছে। তবে ঈমান, আমলের ও ইলমের এমন নড়বড়ে অবস্থায় আগাতে একদম মন সায় দেয়; না ভয় লাগে। নিজের পরিবারেও মাহরাম মেইনটেইন করা আত্মীয়দের সাথে অনেক কষ্টে হয়েছে, আল্লাহ সহজ করে দিয়েছেন এখন; আলহামদুলিল্লাহ । তবে নতুন কিছু করতে অনেক ভয় লাগে। যেহেতু এমন কোনো মাহরাম নাই (বাবা অনেক আগে মারা গিয়েছেন) যে দ্বীনি বিষয়গুলো বুঝবে। আর ইলম অর্জন অনলাইন কোর্সের মাধ্যমে এটা আমার কাছে মনে হয় যে, জাস্ট তথ্য নিচ্ছি এমন। যদিও আলহামদুলিল্লাহ অনেকেই শিখছেন। তবে ইলমের যে প্রশান্তি (নূর) আছে খুঁজে পাই না। আবার চিন্তা করলাম যে কওমি মাদ্রাসায় ভর্তি হয়ে যাবো। তবে এই পরিস্থিতি তে এতো বছর পরিবার কখনো সাপোর্ট করবে না। আবার চিন্তা করলাম যে, কোনো উস্তাযার মাধ্যমে আফলাইনে পড়বো। তবে এরকম কাউকে পাই নাই আমি। এখন আমার কি করা উচিত কিছুই বুঝতে পারছি না। পরামর্শ চাই—মিন ফাদ্বলিক।—জান্নাতুল মাওয়া সুরাইয়া।

জবাব :

এক. প্রিয় দ্বীনি বোন! আপনার কথাগুলোতে কয়েকটি জিনিস স্পষ্ট—

  • আপনি দ্বীনকে সত্যিই গুরুত্ব দেন।
  • আপস করে চলতে চান না।
  • কিন্তু আবেগ, ভয়, দায়িত্ব ও বাস্তবতা—সব একসাথে চাপ তৈরি করছে।

এ অবস্থায় সবচেয়ে বড় ভুল হবে হঠাৎ সব ছেড়ে দেওয়া। আর সবচেয়ে উপকারী পথ হতে পারে—ধীরে কিন্তু স্থিরভাবে এগোনো।

দুই. কিছু বিষয় বাস্তবভাবে বিবেচনা করুন।

প্রথমত, আপনি যে বুঝেছেন, ‘শুধু ইউনিভার্সিটি দ্বীনি ইলমের জন্য যথেষ্ট নয়’—এ উপলব্ধি সঠিক। Islamic University হোক বা অন্য কোথাও, একাডেমিক ইসলামিক স্টাডিজ আর তাযকিয়াভিত্তিক তালিবুল ইলমের জীবন এক নয়। তবে এর মানে এই নয় যে ভার্সিটি ছেড়ে দিতেই হবে।

আপনি এখন ৪র্থ সেমিস্টারে। এই অবস্থায় হঠাৎ ছেড়ে দিলে—

  • পরিবারে অস্থিরতা বাড়তে পারে,
  • বিয়ের চাপ আরও বেড়ে যেতে পারে,
  • আর্থিক ও সামাজিক অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে,
  • পরে আফসোসও হতে পারে।

তাই আপাতত ডিগ্রি শেষ করার নিয়ত রাখুন। তবে নিজের মূল পরিচয় গড়ে তুলুন একজন তালিবাতুল ইলম হিসেবে।

দ্বিতীয়ত, আপনি বলেছেন, ‘আমার কুরআনও পুরো সহিহ না’—এটি খুব গুরুত্বপূর্ণ উপলব্ধি। এখান থেকেই শুরু করুন। অনেক সময় মানুষ বড় বড় বিষয়ে ছুটে কিন্তু কুরআন-সালাতের ভিত্তি দুর্বল থাকে।

এখন আপনার জন্য অগ্রাধিকার হওয়া উচিত—

১. কুরআন সহিহ করা
২. ফরজে আইন ইলম শেখা
৩. আমল স্থির করা
৪. নেক সোহবত খোঁজা

এসব একদিনে পরিপূর্ণ হবে না; ধীরে ধীরে হবে।

তিন. আপনি বলেছেন অনলাইন ইলমে ‘নূর’ অনুভব করেন না। এটি অস্বাভাবিক নয়। কারণ ইলম শুধু তথ্য নয়; এর সঙ্গে সোহবত, আদব, হাল ও তাযকিয়াও জড়িত। তবে অনলাইন মাধ্যম একেবারে মূল্যহীনও নয়। বর্তমানে অনেকেই এভাবেই ভিত্তি তৈরি করছেন।

আপনার ক্ষেত্রে সম্ভবত সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ হবে—

  • মূল পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া,
  • পাশাপাশি ছোট কিন্তু ধারাবাহিক অফলাইন দ্বীনি সংযোগ তৈরি করা।

যেমন—

  • স্থানীয় কোনো হিফজ বা তাজবিদ শিক্ষিকার কাছে কুরআন ঠিক করা,
  • প্রতিদিন অল্প সময় হলেও নিয়মিত পড়া।

এ মুহূর্তে হঠাৎ সব ছেড়ে কওমি মাদ্রাসায় চলে যাওয়া আপনার বাস্তবতায় কঠিন বলেই মনে হচ্ছে। আর শরিয়তও সাধ্যের বাইরে চাপ দেয় না।

আল্লাহ তাআলা বলেন,

لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا

আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যের বাইরে দায়িত্ব দেন না। [সূরা বাকারা : ২৮৬]

চার. আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—সব ভয় তাকওয়া নয়। কখনও কখনও শয়তান মানুষকে ‘আমি এখনও যথেষ্ট ভালো নই’, ‘আমার ইলম কম’, ‘আমি প্রস্তুত নই’—এ ধরনের চিন্তার মাধ্যমে স্থবির করে দেয়। অথচ বাস্তবে মানুষ ধীরে ধীরে বড় হয়।

আপনি ইতিমধ্যে—

  • সহশিক্ষা ছেড়েছেন,
  • মাহরাম মেইনটেইনের চেষ্টা করছেন,
  • দ্বীনের জন্য কষ্ট করছেন।

এগুলো ছোট বিষয় নয়।

এখন দরকার—

  • স্থিতিশীলতা,
  • বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা,
  • এবং অতিরিক্ত আত্মদোষারোপ কমানো।

পাঁচ. আমি হলে আপাতত এভাবে এগোতাম—

  • ভার্সিটি এখনই ছাড়তাম না।
  • প্রতিদিন ৪৫–৬০ মিনিট শুধু কুরআন ও তাজবিদে দিতাম।
  • অফলাইনে অন্তত একজন নির্ভরযোগ্য দ্বীনি আপু বা উস্তাযার সোহবত খুঁজতাম।
  • বিয়েকে একেবারে বাধা হিসেবে না দেখে, দ্বীনদার পরিবেশের সম্ভাবনা হিসেবেও বিবেচনা করতাম।
  • নিজের উপর ‘এখনই সব ঠিক করতে হবে’—এ চাপ কমাতাম।

ইলমের নূর সাধারণত হঠাৎ আসে না। দীর্ঘ সময়ের ইখলাস, সবর, আমল, গুনাহ বর্জন এবং কুরআনের সঙ্গে সম্পর্ক—এসবের মাধ্যমে ধীরে ধীরে আসে।

আপনি পথ হারাননি; বরং পথ খুঁজছেন। এ দুটির মধ্যে বড় পার্থক্য আছে।

আল্লাহ তাআলা আপনার জন্য উত্তম পথ সহজ করে দিন।

والله أعلم بالصواب
উত্তর দিয়েছেন