শর্তসাপেক্ষে প্রদত্ত তালাকের অধিকার সময় অতিবাহিত হওয়ার পর কার্যকর হবে কি?

জিজ্ঞাসা–১৯৭৫ : আসসালামু আলাইকুমগ মুহতারাম, তালাক সংক্রান্ত বিষয়ে প্রশ্ন! স্বামী বলেছিলো দশ তারিখের পর যদি এই কাজটা করতে না পারি তাহলে তুমি তোমার মতো করে ব্যবস্থা করে নিও, আমি কোনো বাঁধা দিবো না। এখানে মুলত তালাকের অধিকারই বুঝানো হইছিলো, কারন এ নিয়ে আমাদের মধ্যে পূর্বে কথা হয়েছিলো, তাই সে ইশারায় ইঙ্গিতে এমনটাই বুঝিয়েছিলেন। তো গত দশ তারিখ চলে গেছে। আজকে ২৫ তারিখ। সে সেই কাজটা করতে পারবে না তা আমি দশ তারিখের আগেই জানতে পারি। আমি এ বিষয়ে দশ তারিখের পর আর কিছুই বলিনি। কিন্তু গতকাল এ বিষয়ে ভাবতে গিয়ে কেমন করে যেন মনে মনে বলে ফেলি “তালাকের অধিকার গ্রহন করলাম” এই কথা। মনে মনেই বলছিলাম। তারপর থেকে মনের মধ্যে ভয় শুরু হইছে। আমি ইচ্ছে করে এমনটা করিনি, ভুলে ভেবে ফেলছিলাম। তারপর থেকে ওয়াসওয়াসা বাড়তেই আছে। ঠোঁট নাড়িয়ে, জিব্হা নাড়িয়ে কয়েকবার এই কথাটা উচ্চারন করেছি। কিন্তু কোনো শব্দ হয়নি। এখানে প্রশ্ন পাঠানোর সময়, এমনকি গুগলকে প্রশ্ন করার সময় ও এই কথাটা উচ্চারন করেছি। এখন আমার প্রশ্ন কোনো সমস্যা হবে হুজুর? আর সেখানে কি সত্যি অধিকার পড়ছিলো? অধিকারটা কি সারাজীবনের জন্য ছিলো নাকি গত দশ তারিখের পরেই তা শেষ হয়ে গেছে? আর যদি সত্যি অধিকারটা পড়ে থাকে তাহলে তা বর্জন করবো কিভাবে? দয়া করে জানাবেন হুজুর! ঠোঁট জিহ্বা নাড়ালো কিন্তু কোনো শব্দ হলো না তাহলেও কি তালাক পড়ে যাবে?—নুপুর

‎‎জবাব : وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

প্রশ্নে বর্ণিত ঘটনা অনুযায়ী, স্বামী একটি নির্দিষ্ট শর্ত ও সময়ের সঙ্গে স্ত্রীকে তালাকের অধিকার (تفويض الطلاق) প্রদান করেছেন। শরিয়তের মূলনীতি হলো, মুসলিমগণ তাদের নির্ধারিত শর্তের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ থাকবে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,

الْمُسْلِمُونَ عَلَى شُرُوطِهِمْ

মুসলিমগণ তাদের শর্তসমূহের ওপর অটল থাকবে। [আবু দাউদ : ৩৫৫৫]

অতএব, স্বামী যে শর্ত ও সীমার মধ্যে তালাকের অধিকার অর্পণ করেছেন, সেই অধিকারও ওই শর্ত ও সীমার মধ্যেই প্রযোজ্য হবে।

ফিকহগ্রন্থে এসেছে,

أَمَّا إِذَا كَانَ مُعَلَّقًا بِالشَّرْطِ فَلَا يَصِيرُ الْأَمْرُ بِيَدِهَا إِلَّا إِذَا جَاءَ الشَّرْطُ…

অর্থাৎ, যদি তালাকের অধিকার কোনো শর্তের সঙ্গে যুক্ত থাকে, তবে শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত সেই অধিকার স্ত্রীর হাতে আসে না। [আল-বাহরুর রায়িক : ৩/৩৫১]

আরও এসেছে,

وَأَمَّا إِذَا كَانَ مُوَقَّتًا بِوَقْتٍ… فَالْأَمْرُ بِيَدِهَا مَا دَامَ الْوَقْتُ بَاقِيًا… فَإِذَا مَضَى الْوَقْتُ انْتَهَى عَلِمَتْ أَوْ لَا

অর্থাৎ, যদি তালাকের অধিকার নির্দিষ্ট সময়ের জন্য প্রদান করা হয়, তবে নির্ধারিত সময় পর্যন্তই সেই অধিকার বহাল থাকবে। সময় অতিবাহিত হয়ে গেলে সেই অধিকার শেষ হয়ে যাবে—স্ত্রী তা জানুক বা না-জানুক। [প্রাগুক্ত]

অতএব, প্রশ্নে বর্ণিত ঘটনায় যদি স্বামীর প্রদত্ত অধিকার প্রকৃতপক্ষে নির্দিষ্ট শর্ত ও সময়সীমার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত হয়ে থাকে, তাহলে তা সেই শর্ত ও সময়সীমার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। স্ত্রী নিজের পক্ষ থেকে নতুন কোনো শর্ত কল্পনা করে বা নির্ধারিত সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পর সেই অধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন না।

আর আপনি বলেছেন যে, পরে আপনার মনে ‘তালাকের অধিকার গ্রহণ করলাম’ কথাটি এসেছে এবং পরে কয়েকবার ঠোঁট ও জিহ্বা নাড়ালেও কোনো শব্দ উচ্চারিত হয়নি। এ দ্বারা তালাক সংঘটিত হবে না। কারণ রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,

إِنَّ اللَّهَ تَجَاوَزَ لِأُمَّتِي مَا حَدَّثَتْ بِهِ أَنْفُسَهَا مَا لَمْ تَتَكَلَّمْ بِهِ أَوْ تَعْمَلْ

আল্লাহ আমার উম্মতের অন্তরের কথাগুলো ক্ষমা করেছেন, যতক্ষণ না তারা তা মুখে বলে বা কাজে পরিণত করে। [সহীহ বুখারী : ২৩৯১]

সুতরাং, প্রশ্নে বর্ণিত তথ্যের ভিত্তিতে কেবল মনে মনে ভাবা এবং শব্দ ছাড়া ঠোঁট-জিহ্বা নাড়ানোর কারণে তালাক সংঘটিত হয়েছে বলে গণ্য হবে না।

والله تعالى أعلم بالصواب

উত্তর দিয়েছেন