জিজ্ঞাসা–১৯৫৭ : আসসালামুয়ালাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ।
স্বামীর অমানবিক নির্যাতনে স্ত্রীর করণীয় কি? স্বামীর থেকে মুক্তির জন্য স্বামীকে রেখে চলে যেতে পারবে কিনা? গেলে কি গুনাহ হবে ?—সাবিনা ইয়াসমিন।
জবাব : وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
এক. প্রিয় বোন, আপনার বর্ণিত পরিস্থিতি নিঃসন্দেহে কষ্টদায়ক। একজন মুসলিমের জন্য দাম্পত্য জীবন শান্তি, ভালোবাসা ও নিরাপত্তার স্থান হওয়ার কথা। আল্লাহ তাআলা স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক সম্পর্কে বলেন,
وَمِنْ آيَاتِهِ أَنْ خَلَقَ لَكُمْ مِنْ أَنْفُسِكُمْ أَزْوَاجًا لِّتَسْكُنُوا إِلَيْهَا وَجَعَلَ بَيْنَكُمْ مَوَدَّةً وَرَحْمَةً
তাঁর নিদর্শনসমূহের মধ্যে একটি হলো, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকেই স্ত্রী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে শান্তি পাও; আর তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। [সূরা রূম : ২১]
তাই যদি স্বামীর আচরণে আপনি শারীরিক, মানসিক বা পারিবারিকভাবে কষ্ট পেয়ে থাকেন, তাহলে বিষয়টিকে হালকাভাবে না দেখে প্রজ্ঞা ও ধৈর্যের সঙ্গে সমাধানের চেষ্টা করা উচিত।
আপনার প্রতি আমাদের পরামর্শ হলো—
১. সবার আগে আল্লাহ তাআলার দিকে মনোনিবেশ করুন। অধিক দোয়া, ইস্তিগফার ও সালাতের মাধ্যমে তাঁর সাহায্য প্রার্থনা করুন। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَمَنْ يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَلْ لَهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ
যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ বের করে দেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিযিক দেন, যা সে কল্পনাও করে না। [সূরা তালাক: ২-৩]
২. একইসঙ্গে আপনার স্বামীর সংশোধনের জন্য চেষ্টা করুন। পরিবারের দায়িত্বশীল ব্যক্তি, সম্মানিত আত্মীয় বা কোনো আমলদার ও প্রজ্ঞাবান আলেমের মাধ্যমে তাকে নসিহত করানোর ব্যবস্থা করা যেতে পারে। আল্লাহ তাআলা দাম্পত্য বিরোধ মীমাংসার জন্য সালিশ নিয়োগের নির্দেশ দিয়েছেন,
فَابْعَثُوا حَكَمًا مِنْ أَهْلِهِ وَحَكَمًا مِنْ أَهْلِهَا
তোমরা স্বামীর পরিবার থেকে একজন এবং স্ত্রীর পরিবার থেকে একজন সালিশ নিযুক্ত কর। [সূরা নিসা : ৩৫]
৩. পাশাপাশি নিজের দিকটিও নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়ন করুন। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের টানাপোড়েনে কখনো কখনো উভয় পক্ষেরই কিছু ভুল থাকতে পারে। যদি এমন কোনো কথা, আচরণ বা অভ্যাস থেকে থাকে যা স্বামীর রাগ বা বিরক্তির কারণ হয়, তাহলে তা সংশোধনের চেষ্টা করুন।
অনেক সময় পুরুষ তার চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হলে মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়। সুতরাং তিনি বিশেষ কাজে আহবান করলে আপনার সম্মতি যেন থাকে। প্রয়োজনে কৃত্রিমভাবে হলেও আপনি এবিষয়ে আগ্রহ বেশি দেখাবেন। দেখবেন, এটাও তার রাগ প্রশমনে খুব দ্রুত কাজ করবে।
অবশ্যই এর অর্থ এই নয় যে স্বামীর জুলুম বৈধ হয়ে যায়; বরং সম্পর্ক রক্ষার জন্য নিজের পক্ষ থেকেও সর্বোচ্চ চেষ্টা করা।
৪. এটাও মনে রাখুন, কোনো মানুষের মাঝেই শুধু খারাপ দিক থাকে না। আপনার স্বামীর মধ্যে যদি কোনো ভালো গুণ, দ্বীনদারী, সন্তানের প্রতি দায়িত্ববোধ বা অন্য কোনো ইতিবাচক বৈশিষ্ট্য থাকে, সেগুলোকেও বিবেচনায় রাখুন। আল্লাহ তাআলা বলেন,
فَإِنْ كَرِهْتُمُوهُنَّ فَعَسَى أَنْ تَكْرَهُوا شَيْئًا وَيَجْعَلَ اللَّهُ فِيهِ خَيْرًا كَثِيرًا
তোমরা যদি কাউকে অপছন্দ করো, তবে হতে পারে তোমরা এমন একটি বিষয় অপছন্দ করছো, যাতে আল্লাহ অনেক কল্যাণ রেখেছেন। [সূরা নিসা : ১৯]
দুই. তবে এসব পরামর্শের অর্থ এই নয় যে, ইসলাম একজন নারীকে নির্যাতন সহ্য করতেই বাধ্য করেছে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,
لا ضَررَ ولا ضِرارَ
নিজে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া যাবে না এবং অন্যকেও ক্ষতিগ্রস্ত করা যাবে না। [ইবনে মাজাহ : ২৩৪১]
সুতরাং যদি নির্যাতন এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে আপনার জীবন, স্বাস্থ্য, সম্মান বা মানসিক স্থিতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তাহলে নিরাপত্তার জন্য আলাদা স্থানে চলে যাওয়া আপনার জন্য জায়েজ হতে পারে। এ অবস্থায় আপনি গুনাহগার হবেন না। বরং নিজের নিরাপত্তা রক্ষা করা শরিয়তসম্মত অধিকার।
তিন. তবে স্বামীর ঘর ছেড়ে চলে গেলেই বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে যায় না। যদি একসঙ্গে বসবাস অসম্ভব হয়ে পড়ে, তাহলে পরিবার, আলেম বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তালাক, খুলা বা শরয়ী বিচ্ছেদের পথ অনুসরণ করা উচিত।
অতএব, ধৈর্য, দোয়া, আত্মসমালোচনা, স্বামীর সংশোধনের চেষ্টা এবং প্রয়োজনে নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা—এসবের সমন্বয়েই আপনার করণীয় নির্ধারিত হবে। তবে যদি নির্যাতন বাস্তব ও গুরুতর হয়, তাহলে শুধু “স্ত্রী বলে সহ্য করতেই হবে”—এমন কোনো বাধ্যবাধকতা ইসলামে নেই। আল্লাহ তাআলা আপনার কষ্ট দূর করুন এবং আপনাকে উত্তম সমাধান দান করুন। আমীন।