স্বামীর ‘তুমি দাও’ উক্তি এবং স্ত্রীর মনে মনে তালাক দেওয়ার শরয়ী হুকুম

জিজ্ঞাসা–১৯৭৪ : কজন স্ত্রী রাগের মাথায় বা অভিমান করে একাধিকবার স্বামীর কাছে তালাক চাইতেন। তখন স্বামী প্রায়ই মেসেজে বলতেন, ‘তুমি দাও’ বা এ ধরনের কথা। তবে স্বামী স্ত্রীকে তালাক দিতে চাইতেন না; বরং পরে তিনি বলেন, ‘এসব কথা আমি মন থেকে বলতাম না, তোমাকে থামানোর জন্য বলতাম।’ আবার এক সময় বলেন, ‘মনে নেই, কী বলেছিলাম।’

সেই সময় স্বামী-স্ত্রী কেউই জানতেন না যে, স্বামী অধিকার দিলে স্ত্রী নিজেকে তালাক দিতে পারে (তাফওয়ীযে তালাক)। তাই স্ত্রী ‘তুমি দাও’ কথার অর্থ কখনো নিজের ওপর তালাক কার্যকর করা মনে করেননি। তবে কয়েকবার তিনি মনে মনে শুধু স্বামীর দিকে ইঙ্গিত করে তিনবার ‘তালাক’ বলেছেন, কিন্তু নিজের দিকে ইঙ্গিত করেননি এবং নিজেকে তালাক দেওয়ার নিয়তও তাঁর ছিল না। তিনি তখন জানতেনই না যে স্ত্রী নিজের ওপর তালাক কার্যকর করতে পারে।

পরে কয়েক মাস পর স্ত্রী স্বামীকে জিজ্ঞেস করেন, ‘আমি তালাক চাইলে তুমি যে ‘তুমি দাও’ বলতে, কাকে দিতে বলতে? তোমাকে?’ উত্তরে স্বামী বলেন, ‘এসব কথা আমি মন থেকে বলতাম না; তোমাকে থামানোর জন্য বলতাম।’ আবার পরে বলেন, ‘মনে নেই, কী বলেছিলাম।’

উল্লেখ্য, স্বামীর যতদূর মনে আছে, তিনি কখনো স্পষ্টভাবে ‘আমি তোমাকে তালাক দিলাম’ বলেননি। স্ত্রীরও মনে হয় তিনি এমন কথা বলেননি। তবে বহু আগের ঘটনা হওয়ায় উভয়েরই স্মৃতিতে কিছু অস্পষ্টতা রয়েছে। সমস্ত কথোপকথন মেসেজে হয়েছিল; ভিডিও কল চালু থাকলেও মূল আলোচনা লিখিত বার্তায় হয়েছে।

এ অবস্থায় জানতে চাই:

১. স্বামীর ‘তুমি দাও’ কথার দ্বারা কি স্ত্রী তালাকের অধিকার (তাফওয়ীযে তালাক) পেয়েছিলেন?

২. স্ত্রী যে শুধু মনে মনে স্বামীর দিকে ইঙ্গিত করে তিনবার ‘তালাক’ বলেছেন, কিন্তু নিজের ওপর তালাক কার্যকর করার জ্ঞান বা নিয়ত ছিল না—এর দ্বারা কি কোনো তালাক সংঘটিত হয়েছে?

৩. পরবর্তীতে স্বামীর ‘আমি মন থেকে বলিনি’ বা ‘মনে নেই’—এ ধরনের বক্তব্যের কারণে কি পূর্বের কোনো তালাক সাব্যস্ত হবে?

দয়া করে প্রদান করলে উপকৃত হব।—নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক।

‎‎জবাব : প্রশ্নে বর্ণিত ঘটনা অনুযায়ী, কেবল স্বামীর ‘তুমি দাও’ কথার দ্বারা স্ত্রীকে তালাকের অধিকার (تفويض الطلاق) প্রদান করা হয়েছে—এ কথা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। কেননা তাফওয়ীযে তালাকের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত শব্দ, প্রসঙ্গ এবং স্বামীর উদ্দেশ্য (নিয়ত) বিবেচ্য বিষয়।

অতএব, যদি স্বামী প্রকৃতপক্ষে স্ত্রীকে তালাকের অধিকার অর্পণ না করে থাকেন, তবে কেবল ‘তুমি দাও’ কথাকে তাফওয়ীযে তালাক হিসেবে গণ্য করা যাবে না।

আর প্রশ্নে উল্লেখ আছে যে, স্ত্রী তখন জানতেনই না যে, স্বামী অধিকার দিলে স্ত্রী নিজেকে তালাক দিতে পারে। তিনি শুধু মনে মনে স্বামীর দিকে ইঙ্গিত করে ‘তালাক’ বলেছেন; নিজের ওপর তালাক কার্যকর করার জ্ঞান বা নিয়ত তাঁর ছিল না।

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,

إِنَّ اللَّهَ تَجَاوَزَ لِأُمَّتِي مَا حَدَّثَتْ بِهِ أَنْفُسَهَا مَا لَمْ تَتَكَلَّمْ بِهِ أَوْ تَعْمَلْ

আল্লাহ আমার উম্মতের অন্তরের কথাগুলো ক্ষমা করেছেন, যতক্ষণ না তারা তা মুখে বলে বা কাজে পরিণত করে। [সহীহ বুখারী : ২৩৯১]

অতএব, কেবল মনে মনে ভাবা বা মনের মধ্যে স্বামীর দিকে ইঙ্গিত করার দ্বারা তালাক সংঘটিত হয় না।

এছাড়া, স্বামী পরবর্তীতে বলেছেন যে, তিনি এসব কথা স্ত্রীকে থামানোর জন্য বলতেন এবং তাঁর মনে নেই যে তিনি কী কী শব্দ ব্যবহার করেছিলেন। এই অবস্থায় সন্দেহ ও অনুমানের ভিত্তিতে তালাক সাব্যস্ত করা যাবে না। কারণ, দাম্পত্য সম্পর্ক একটি নিশ্চিত বিষয়; কেবল সন্দেহ বা স্মৃতির অস্পষ্টতার ভিত্তিতে তা নষ্ট হয়েছে বলে গণ্য করা হয় না।

সুতরাং, প্রশ্নে বর্ণিত তথ্যের ভিত্তিতে কোনো তালাক সংঘটিত হয়েছে বলে সাব্যস্ত হবে না।

তবে যদি মূল মেসেজগুলো সংরক্ষিত থাকে, তাহলে সেগুলোর হুবহু ভাষা দেখে একজন যোগ্য মুফতির নিকট উপস্থাপন করাই সর্বাধিক নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি।

والله تعالى أعلم بالصواب

উত্তর দিয়েছেন