স্বামী-স্ত্রী একে অপরের লাশ দেখা ও গোসল দেয়া কি নাজায়েয?

জিজ্ঞাসা–১৯১৬ :আমি একজন সুন্নি মুসলিম। ইসলামের প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর রাযি. যখন মারা যান, তখন তাঁর মৃত্যুর পর তাঁকে গোসল দিয়েছিলেন তাঁর স্ত্রী। তাছাড়া, এই কাজে সহযোগিতা করেছিলেন তাঁর নিজের ছেলে।

অপরদিকে, হযরত আলী রাযি.-এর স্ত্রী হযরত ফাতিমা রাযি. যখন মারা যান, তখন তাঁর মৃত্যুর পর তাঁকে গোসল দিয়েছিলেন তাঁর স্বামী। এর পাশাপাশি, এই কাজে সহযোগিতা করেছিলেন হযরত আলী রাযি.-এর ভাইয়ের স্ত্রী।
এখন আমার মনে একটি প্রশ্ন জেগেছে। কিসের ভিত্তিতে হানাফি মাযহাবে স্বামী বা স্ত্রীর কোনো একজনের মৃত্যুর পর অপরজনের লাশ দেখা নাজায়েয বলা হয়?–আবু হানিফ।

জবাব :

এক. আমাদের সমাজে একটি বহুল প্রচলিত ভুল ধারণা রয়েছে। অনেকেই মনে করেন, মৃত্যুর পর স্বামী-স্ত্রী একে অপরের জন্য পরপুরুষ বা পরনারী হয়ে যান। এর ফলে তারা আর একে অপরের লাশ দেখতে পারেন না।

বাস্তবে, হানাফি মাযহাবে স্বামী বা স্ত্রীর মৃত্যুর পর একে অপরের লাশ দেখা নাজায়েয নয়; বরং শেষ দেখা সম্পূর্ণ জায়েয। হানাফি ফিকহের কোনো কিতাবেই লাশ দেখাকে হারাম বলা হয়নি।
দুই. তবে, স্বামী-স্ত্রীর একজন মারা গেলে অপরজন মৃতদেহ গোসল দিতে পারবে কি না—এ বিষয়ে হানাফি ফকিহরা বলেন,
  • স্ত্রী তার মৃত স্বামীকে গোসল দিতে পারবে।
  • কিন্তু স্বামী তার মৃত স্ত্রীকে গোসল দেবে না।

তাদের যুক্তি হলো, স্ত্রীর মৃত্যুর সাথে সাথেই বৈবাহিক সম্পর্ক সম্পূর্ণ শেষ হয়ে যায়। ফলে স্ত্রী মারা যাওয়ার পর স্বামীর ওপর কোনো ‘ইদ্দত’ বা অপেক্ষার সময় থাকে না। সুতরাং, স্বামী চাইলে পরদিনই অন্য কাউকে বিয়ে করতে পারেন। এমনকি তিনি মৃত স্ত্রীর আপন বোনকেও বিয়ে করতে পারেন। জীবিত অবস্থায় শ্যালিকাকে বিয়ে করা হারাম হলেও মৃত্যুর পর তা জায়েয হয়। এর মাধ্যমে প্রমাণ হয় যে, পূর্বের বৈবাহিক সম্পর্কটি আর অবশিষ্ট নেই। সম্পর্ক না থাকায় স্বামী পরনারীর মতো মৃত স্ত্রীকে স্পর্শ করতে বা গোসল দিতে পারেন না।

অপরদিকে, স্বামী মারা গেলে কিন্তু স্ত্রীর বৈবাহিক সম্পর্ক সাথে সাথে শেষ হয়না। কারণ, স্ত্রীকে ৪ মাস ১০ দিন ‘ইদ্দত’ পালন করতে হয়। এই ইদ্দতকালীন সময়ে তিনি অন্য কোথাও বিয়ে করতে পারেন না। অর্থাৎ, বৈবাহিক সম্পর্কের একটি অংশ তখনও বাকি থাকে। এই কারণে, হযরত আবু বকর রাযি.-এর মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রী আসমা বিনতে উমাইস রাযি. তাঁকে গোসল দিতে পেরেছিলেন। এটি হানাফি মাযহাবেও সম্পূর্ণ জায়েয।

এ মর্মে ইমাম সারাখসী তাঁর ‘আল-মাবসুত’ গ্রন্থে লিখেন,

النكاح بموتها ارتفع بجميع علائقه، فلا يبقى حل المس والنظر…ولهذا جاز للزوج أن يتزوج بأختها، وأربع سواها بخلاف ما إذا مات الزوج

স্ত্রীর মৃত্যুর কারণে বৈবাহিক সম্পর্ক তার সমস্ত বন্ধনসহ বিলুপ্ত হয়ে যায়। ফলে তাকে স্পর্শ করা ও দেখার বৈধতা আর অবশিষ্ট থাকে না। এ কারণেই স্ত্রীর মৃত্যুর পরপরই তার বোনকে বিবাহ করা এবং নতুনভাবে চারজন পর্যন্ত স্ত্রী গ্রহণ করা বৈধ হয়ে যায়। পক্ষান্তরে স্বামী মারা গেলে বিষয়টি ভিন্ন। [আল-মাবসুত : ২/৭১]

তিন. হযরত আলী ও ফাতিমা রাযি.-এর ঘটনার ব্যাখ্যা

আপনি যে ঘটনার কথা উল্লেখ করেছেন, সেটি অন্য তিন মাযহাবের (শাফেয়ী, মালেকী ও হাম্বলী) প্রধান দলিল। তবে, হানাফি ফকিহগণ এই ঘটনার দুটি চমৎকার ব্যাখ্যা দিয়ে থাকেন

. বিশেষ অনুমতি বা খাস বিধান : অর্থাৎ, রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর পরিবার বা আহলে বাইতের জন্য এটি একটি বিশেষ বিধান ছিল। রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজেই এক হাদিসে বলেছিলেন যে, জান্নাতেও ফাতিমা আলী রাযি.-এর স্ত্রী হিসেবেই থাকবেন। তাছাড়া, তাঁদের বৈবাহিক সম্পর্ক মৃত্যুর পরও ছিন্ন হয়নি।

২. তত্ত্বাবধানের অর্থ : অর্থাৎ, আলী রাযি. নিজেই সশরীরে হাত দিয়ে গোসল করিয়েছেন বিষয়টি তেমন নয়। বরং, তিনি গোসলের যাবতীয় ব্যবস্থা এবং কাফন-দাফনের পুরো প্রক্রিয়াটি নিজে দাঁড়িয়ে তত্ত্বাবধান করেছিলেন। মূল গোসলের কাজটি করেছিলেন আসমা বিনতে উমাইস রাযি.। আরবি ভাষায় ব্যবস্থাপককে অনেক সময় কাজের প্রধান কর্তা হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

তাই এ মাসআলাটি এমন নয় যে, এক পক্ষ সুন্নাহ মানছে আর অন্য পক্ষ সুন্নাহবিরোধী। বরং উভয় পক্ষই কুরআন, হাদিস, সাহাবিদের আমল ও ফিকহি মূলনীতির আলোকে ইজতিহাদ করেছেন; তবে দলিল মূল্যায়নে পার্থক্য হয়েছে। যারা হানাফি মাযহাবের প্রসিদ্ধ মত অনুসরণ করেন, তারাও ফিকহি ভিত্তির উপরই তা অনুসরণ করেন।

والله أعلم بالصواب
উত্তর দিয়েছেন