‘ইলম অর্জন’ বলতে কোন কোন বিষয় এর অন্তর্ভুক্ত?

জিজ্ঞাসা–৭০৮: আসসালামুআলাইকুম। হযরত, ইলম শিক্ষা গ্রহন বলতে কি বুঝায়? কোন কোন বিষয় এর অন্তর্ভুক্ত? দয়া করে জানাবেন।– Mohammad Tafsir Ahmed

জবাব: وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

এক. প্রিয় ভাই, ইলম বা বিদ্যাকে যদি বিশ্লেষণ করা হয় তাহলে দেখা যাবে যে, ইলম মৌলিকভাবে দুই প্রকার : দীনি ইলম এবং দুনিয়াবি বা জাগতিক ইলম। আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি-অসন্তুষ্টির জ্ঞান হচ্ছে দীনি ইলম। যেমন, কোরআন, সুন্নাহ, তাফসির, ফিকাহ ইত্যাদি। আর মানুষের জাগতিক প্রয়োজন পূরণের উপযোগী জ্ঞান ও বিদ্যা হচ্ছে জাগতিক ইলম। যেমন বিজ্ঞান, চিকিৎসা, গণিত ইত্যাদি। প্রথমটার মূল সূত্র ওহী। দ্বিতীয়টার মূল সূত্র অভিজ্ঞতা। 

আর ‘ইলম অর্জন বা শিক্ষা’ বলতে উভয় প্রকার ইলমকেই বুঝানো হয়। সুতরাং যে সকল ইলম মানুষের দীন কিংবা দুনিয়ার উপকারে আসবে সবই ইসলামের দৃষ্টিতে ইলমের আওতাভুক্ত হবে। এরই কারণে রাসূলুল্লাহ আল্লাহর নিকট উপকারী ইলমের প্রার্থনা করতেন। হাদীসের ভাষায় তিনি প্রতি ফজর নামাযের পর দোয়া করতেন এ বলে যে , اللَّهُمَّ إِنِّى أَسْأَلُكَ عِلْمًا نَافِعًا وَرِزْقًا طَيِّبًا وَعَمَلاً مُتَقَبَّلاً হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকট উপকারী ইলম, কবুলযোগ্য আমল ও পবিত্র রূযী প্রার্থনা করছি। (আহমাদ ইবনে মাজাহ,তাবারানী,মিশকাত ২৪৯৮)। আর তিনি এই দোয়াও করতেন اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ عِلْمٍ لَا يَنْفَعُ وَمِنْ قَلْبٍ لَا يَخْشَعُ، وَمِنْ نَفْسٍ لَا تَشْبَعُ، وَمِنْ دُعَاءٍ لَا يُسْمَعُ হে আল্লাহ! আমি অনুপকারী ইলম, নির্ভয় অন্তর, অতৃপ্ত প্রবৃত্তি এবং ঐ দোয়া থেকে আপনার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি, যা শ্রবণ করা হয় না। (নাসাঈ ৫৫৩৭)। 

তবে যেহেতু মুসলিমসমাজের সকল শ্রেণীর সকল মানুষ দীন মোতাবেক চলা এবং হারাম থেকে বেঁচে হালালভাবে জীবন যাপন করা অপরিহার্য তাই দীনি ইলম শিক্ষা করা প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর উপর এই পরিমাণ ফরযে আইন যে, যে পরিমাণ ইলম শিখলে একজন মানুষ ঈমানের উপর থাকতে পারে এবং হারাম থেকে বেঁচে থেকে দীন মোতাবেক জীবন যাপন করতে পারে। পক্ষান্তরে দুনিয়ার ব্যবস্থাপনা ঠিক রাখার জন্য জাগতিক-ইলম শিক্ষা করারও প্রয়োজন আছে বিধায় মুসলিমসমাজের প্রয়োজনানুপাতে দুনিয়াবি বা জাগতিক উপকারী-ইলম শিক্ষা করা ফরযে কেফায়া, যাতে করে মুসলিমরা তাদের জাগতিক প্রয়োজন পূরণের ক্ষেত্রে অমুসলিমদের মুখাপেক্ষী হতে না হয়।

পক্ষান্তরে যে ইলম বা জ্ঞান মানুষকে কুফর শিরক ও নাস্তিকতার দিকে টেনে নিয়ে যায় তা চর্চা করা হারাম। যেমন ইসলামবিরোধী প্রাচীন ও আধুনিক দর্শন, কুফরী সাহিত্য ইত্যাদি। তদ্রূপ অকল্যাণকর ও অপ্রয়োজনীয় জ্ঞান চর্চা করাও নিষেধ।

দুই.  ইসলাম দীনি ও দুনিয়াবি সকল কল্যাণকর-ইলম অর্জনের প্রতি আহবান করলেও ইলমের মর্যাদাগত পার্থক্য করে দীনি-ইলমকেই ইসলাম সর্বশ্রেষ্ঠ হিসেবে আখ্যায়িত করে। তারপর চিকিৎসা-বিদ্যা। তারপর অন্যান্য উপকারী-বিদ্যা। ইমাম শাফিঈ রহ বলেন,

لاَ أَعْلَمُ عِلْماً بَعْدَ الحَلاَلِ وَالحَرَامِ أَنْبَلَ مِنَ الطِّبِّ إلَّا أَنَّ أَهْلَ الكِتَابِ قَدْ غَلَبُوْنَا عَلَيْهِ

হালাল-হারামের ইলমের পরে চিকিৎসা-বিদ্যার চাইতে অভিজাতবিদ্যা দ্বিতীয়টি নেই। তবে আফসোস! আহলে-কিতাবিরা এ বিষয়ে আমাদের আধিপত্য বিস্তার করে নিয়েছে। (সিয়ারু আ’লামিন নুবালা ৮/২৫৮)

আর দীনি-ইলম সর্বশ্রেষ্ঠ হওয়ার কারণ হল, আল্লাহ তাআলা এই ইলম দিয়েই নবীগণকে পাঠিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন,

لَقَدْ مَنَّ اللَّهُ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ إِذْ بَعَثَ فِيهِمْ رَسُولًا مِنْ أَنْفُسِهِمْ يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَإِنْ كَانُوا مِنْ قَبْلُ لَفِي ضَلَالٍ مُبِينٍ

আল্লাহ ঈমানদারদের উপর অনুগ্রহ করেছেন যে, তাদের মাঝে তাদের নিজেদের মধ্য থেকে নবী পাঠিয়েছেন। তিনি তাদের জন্য তাঁর আয়াতসমূহ পাঠ করেন। তাদেরকে পরিশোধন করেন এবং তাদেরকে কিতাব ও হিকমাহ (সুন্নাহ) শিক্ষা দেন। বস্তুতঃ তারা ছিল পূর্ব থেকেই পথভ্রষ্ট। (সূরা আলি ইমরান ১৬৪)

একারণে রাসূলুল্লাহ বলেন, مَنْ يُرِدِ اللَّهُ بِهِ خَيْرًا يُفَقِّهْهُ فِي الدِّينِ، وَإِنَّمَا أَنَا قَاسِمٌ وَاللَّهُ يُعْطِيআল্লাহ যার মঙ্গল চান, তাকে দীনের ইলম দান করেন। আমি তো বিতরণকারী মাত্র, আল্লাহই ( ইলম) দাতা। (বুখারি ৭১ মুসলিম ১০৩৭)

والله اعلم بالصواب
উত্তর দিয়েছেন
মাওলানা উমায়ের কোব্বাদী
আরো পড়ুন–

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

three × 2 =